https://www.prothomalony.com/

17809

new-york

নিউইয়র্ক

নিউইয়র্কে কাঁঠালিয়া আড্ডায় সুবোধ সরকারঃ কাঁঠাল নিয়ে এমন আড্ডা এই প্রথম দেখলাম

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬ ০১:৫৫

প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার বৃহস্পতিবারের আড্ডা—একসময় যা ছিল কয়েকজনের সাপ্তাহিক মিলন, আজ তা পরিণত হয়েছে এক অনন্য সাংস্কৃতিক পরিসরে। এমন এক আড্ডা, যেখানে আলোচনার কোনো নির্দিষ্ট বিষয় নেই, নেই কোনো আনুষ্ঠানিক কার্যসূচি। গল্প থেকে গল্পে, মানুষ থেকে মানুষে, স্মৃতি থেকে স্বপ্নে কথারা নিজেরাই পথ খুঁজে নেয়। হয়তো এ কারণেই এই আড্ডার প্রতি মানুষের টান কখনো কমে না।

এই আড্ডা থেকেই জন্ম নিয়েছে কত বিচিত্র আয়োজন। কখনও নিউইয়র্কে ষাটের দশকের সাজে নারীদের মিলনমেলা, কখনও বই নিয়ে আড্ডা, কখনও কবিতার সন্ধ্যা, আবার কখনও করোনা মহামারির অন্ধকার দিনগুলোকে স্মরণ করে আলোকচিত্র প্রদর্শনী। প্রতিটি আড্ডাই যেন পরের আড্ডার জন্ম দেয়, রেখে যায় নতুন কোনো গল্পের বীজ।

এবারের আয়োজন ছিল একেবারেই ব্যতিক্রমী—বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠালকে ঘিরে "কাঁঠালিয়া আড্ডা"।

৩০ জুলাই বৃহস্পতিবার হিলসাইডের ইলহাম একাডেমির মিলনায়তনে বিকেলের শেষ আলোয় শুরু হয় এই ব্যতিক্রমী আয়োজন। প্রথম আলো ফাউন্ডেশনের রাশিদা আখতার শুরু থেকেই ব্যস্ত ছিলেন আয়োজনের প্রস্তুতিতে। ঠিক সময়মতো এসে পৌঁছান কমিউনিটির বিশিষ্টজন নাসির খান পল ও নিলুফার খান। এরপর একে একে ভরে ওঠে মিলনায়তন। কাঁঠালের সুবাস যেন পথচারীদেরও কৌতূহলী করে তোলে। কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর পেয়ে ছুটে আসেন, কেউ আবার পরিচিতদের আমন্ত্রণে যোগ দেন এই অভিনব আড্ডায়।

অনেকেই কাঁঠালের রঙের শাড়ি পরে এসেছিলেন—হলুদ, সবুজ আর সোনালির নানা ছায়ায়। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল পাকা কাঁঠালের ঘ্রাণ। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে দামি সুগন্ধিও সেদিন হার মেনেছিল এই দেশি ফলের সহজ-সরল সুবাসের কাছে।

আড্ডায় ছিল গান, কবিতা, হাসি, স্মৃতিচারণ আর শৈশবের গল্প। কেউ বলছিলেন গ্রামের বাড়ির বিশাল কাঁঠাল গাছের কথা, কেউ স্মরণ করছিলেন কাঁঠাল খেতে গিয়ে হাতে লেগে থাকা আঠার কথা। ভালোবাসা ছিল, বিরক্তিও ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবাই একমত—কাঁঠাল বাঙালির শৈশব, গ্রামবাংলা আর শেকড়ের আরেক নাম।

আড্ডার অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন বাংলা ভাষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমকালীন কবি সুবোধ সরকার। অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, "আম নিয়ে অনেক অনুষ্ঠান ও উৎসবের কথা শুনেছি। কিন্তু কাঁঠালকে নিয়ে এমন আড্ডা বা উৎসব এবারই প্রথম দেখলাম।" কথা প্রসঙ্গে তিনি প্রয়াত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি বহুল উদ্ধৃত বক্তব্য স্মরণ করেন। তাঁর ভাষায়, "সুনীলদা বলতেন, বাংলা ভাষা যদি পৃথিবীতে টিকে থাকে, তাহলে বাংলাদেশিদের জন্যই টিকে থাকবে।"

বিশ্বকাপে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালনের স্মারক কবি সুবোধ সরকারের হাতে তুলে দেন সম্পাদক ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন।

খ্যাতিমান বাচিকশিল্পী ডা. ফারুক আজম তাঁর কণ্ঠে কবিতাকে নতুন আবেগে প্রাণবন্ত করে তোলেন। অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন কবি ধনঞ্জয় সাহা।

খাবারের টেবিলেও ছিল দেশীয় আবহ। নিউইয়র্কের প্রথম বাঙালি নারী রিয়েল এস্টেট এজেন্ট ও লেখক সেলিনা উদ্দিন নিয়ে এসেছিলেন বিরনি চালের পায়েস। সঙ্গে ছিল দুধ, দই, চিড়া, মুড়ি এবং অফুরন্ত আন্তরিকতা। সামসুন ফাওজিয়া কাঁঠালের ইঁচড় রান্না করে নিয়ে এসেছেন ব্রংক্স থেকে।  নিউজার্সি থেকে মোহাম্মদ চৌধুরী ও তাহনিনা চৌধুরী তাঁদের আঙিনার বাগানে ফলানো তাজা শাকসবজি পাঠিয়ে ভালোবাসার অংশীদার হন। কাঁঠাল নিয়ে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠানের প্রথম পরিকল্পক লেখক নুরুল খান সম্পূর্ণ কাঁঠাল আয়োজনের সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন। 

অনুষ্ঠানের আরেকটি স্মরণীয় মুহূর্ত ছিল সদ্য সমাপ্ত ফিফা বিশ্বকাপে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতি। ফিফা প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরিত স্বেচ্ছাসেবক সনদ ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন ও আবু বকর সিদ্দিকীর হাতে তুলে দেন প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার সাংবাদিক ও লেখকেরা। উপস্থিত সবাই করতালির মধ্য দিয়ে মুহূর্তটিকে স্মরণীয় করে রাখেন। দূরের কয়েকটি অঙ্গরাজ্য থেকেও অনেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন। প্রযুক্তি সেদিন ভৌগোলিক দূরত্বকে হার মানিয়েছিল। ইলহাম একাডেমির কর্ণধার সাংবাদিক মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ধর্মগ্রন্থ থেকে ফলের গুরুত্ব নিয়ে উদ্ধৃতি তুলে ধরে অতিথিদের স্বাগত জানান।

অনুষ্ঠানে সেনেগাল থেকে আসা ফাতিমা নিয়াস বাংলাদেশিদের একটি ফলকে ঘিরে এমন উচ্ছ্বাস ও ভালোবাসা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন ও বক্তব্য রাখেন ফখরুল ইসলাম দেলোয়ার, মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, রাজিয়া নাজমী, ভায়লা সালিনা, শেলী জামান খান, গীতিকার মাহফুজ, সুলতানা ফেরদৌসী, শিহাব নূরী, মো. মোস্তাফিজুর রহমান, ফরিদা ইয়াসমিন, মো. আবু বকর সিদ্দিক, রাবেয়া খান, মনি লতিফ, মিনু লতিফ, রুনু লতিফ, মনজুরুল হক, রুদ্র মাসুদ, ইশতেহাক চৌধুরী, সাদাত কবির, নুজহাত, মৌসুমী কাপালী, সোহানা নাজনীন, মাহবুব রহমান, মিয়া এম. আসকির, ডা. ফারুক আজম, লুৎফুর চৌধুরী হেলাল, পল খান, স্বপ্না খান, ফরিদা ইয়াসমিন, রোকেয়া দীপা, এম. মাহিন কাঞ্চন, সামসুন ফওজিয়া, সালমা ফেরদৌস, জেবুননেছা জ্যোৎস্না, আবুল মনসুর খান, জেসমিন আক্তার, মুহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম, জেসমীন আক্তার, আদিবা ভূঁইয়া, হুমায়ুন কবীর লিটন, শেলিনা উদ্দিন, রওশন হক, সুনতানা ফেরদৌসী, মকবুল হক, মাহমুদুল্লাহ, সৈয়দ উতবা, মো. ফয়সল, শাহ পলাশ, নিলুফার খান, জাকির হোসেন, মোহাম্মদ কলিম, সুলতানা, কে. এম. ফজলুল হক (ঝুমা), রানা, সুমনা বাকের, শান্তনু সাজ্জাদ, আরিফ আহমেদ অর্ণব, সজল রোশন, ওয়াহিদা শামসুন বাঁধন, সেন্টু চৌধুরী, মারিয়া মরিয়ম (মিনার), রশীদ হক, মঈন ইলিয়াস খসরু, মানস চৌধুরী, ইসমাইল সিদ্দিক, মফিজা সুলতানা, ফকু চৌধুরী, দেওয়ান নাসের, নুরুল খান, মুকুল হক, জয় আচার্যি, ওয়াহিদা শামসুন।

নিউইয়র্কের প্রবীণ প্রবাসী নাসির খান পল বলেন, "প্রথম আলোর কাঁঠালিয়া আড্ডার মধ্য দিয়ে একটি নতুন সাংস্কৃতিক ধারার সূচনা হলো। আগামী দিনে এই আড্ডা আরও বিস্তৃত হবে এবং এর মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের শেকড়কে আরও ঘনিষ্ঠভাবে খুঁজে পাব।"

সেলিনা উদ্দিন বলেন, প্রথম আলোর এই কাঁঠালিয়া আড্ডা নিউইয়র্কের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এ ধরনের সৃষ্টিশীল আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পেরে তিনি আনন্দিত।

ইব্রাহীম চৌধুরী খোকনের সঞ্চালনায় প্রায় দুই ঘণ্টার আড্ডা শেষ হলেও আড্ডার রেশ রয়ে যায় সবার মনে। বিদায়ের সময় অনেকের মুখেই ছিল একই প্রশ্ন—পরের আড্ডা কবে, আর কী নিয়ে? হয়তো এটাই এই আড্ডার সবচেয়ে বড় সার্থকতা। কারণ প্রবাসে মানুষ বড় কোনো জাতীয় দিবসের চেয়ে কখনও কখনও বেশি করে নিজের দেশকে খুঁজে পায় কাঁঠালের গন্ধে, শৈশবের কোনো স্বাদে কিংবা এক কাপ চায়ের পাশে অকারণ শুরু হয়ে যাওয়া এক টুকরো আড্ডায়। সেই কারণেই এই আড্ডার কোনো কার্যবিবরণী লেখা হয় না। লেখা থাকে শুধু মানুষের মনে—কিছু মুখ, কিছু হাসি, কিছু কবিতা, কিছু গান আর কিছু গন্ধ; যেগুলো সময়ের সঙ্গে মুছে যায় না, বরং পরের বৃহস্পতিবারের অপেক্ষাকে আরও গভীর করে তোলে।

নিউইয়র্ক থেকে আরো পড়ুন