https://www.prothomalony.com/

17808

north-america

উত্তর আমেরিকা

বিশ্বকাপ কি বিক্রির পথে? ফুটবলের মালিকানা নিয়ে ফিফা-উয়েফার মুখোমুখি সংঘাত

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬ ০১:৩৪


বিশ্বকাপকেই এখন কর্পোরেট শেয়ারহোল্ডিংয়ের ভাষায় ভাগ করে দেওয়ার প্রস্তাব উঠেছে। ফুটবল বিশ্বে নেমে এসেছে গত এক দশকের সবচেয়ে গভীর বিভাজন। ইউরোপীয় ফুটবলের পরিচালক সংস্থা উয়েফা — পঞ্চান্নটি সদস্য দেশ নিয়ে গঠিত। ৩০ জুলাই বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ড থেকে পরিচালিত এক জরুরি বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে ফিফার সমস্ত টুর্নামেন্ট বয়কট করার। প্রতিবাদ হিসেবে ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সেই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে, যেখানে বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে আংশিকভাবে বিক্রি করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী সূত্রগুলো বলছে, ইউরোপ পঞ্চাশটিরও বেশি দেশের সমর্থন নিয়ে "নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা" নিশ্চিত করতে "খুবই আত্মবিশ্বাসী।"

গত মঙ্গলবার ফিফা যে পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করে, তার কেন্দ্রে আছে "ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ" (এফএফই) নামের একটা নতুন সাবসিডিয়ারি কোম্পানি। যার আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছে বিশ বিলিয়ন ডলার। এই কোম্পানির শতকরা কুড়ি ভাগ শেয়ার বিক্রি করা হবে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে। যার নেতৃত্বে থাকবে থ্রাইভ ইটার্নাল নামের একটা তহবিল। জশ কুশনারের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান, যিনি ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই। আল জাজিরা আর টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী এই তহবিল ইতিমধ্যে স্যান ফ্রান্সিসকো জায়ান্টস বেসবল দলে একটা সংখ্যালঘু অংশীদারিত্ব কিনেছিল। এই লেনদেনের আর্থিক পরামর্শক হিসেবে কাজ করছে জেপি মরগান। প্রাথমিকভাবে এই এন্টারপ্রাইজ চার বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করবে বলে জানিয়েছে ফিফা, যার লক্ষ্য ফুটবল উন্নয়ন কর্মসূচি অর্থায়ন করা।

ইনফান্তিনো নিজে এই প্রস্তাবকে ফুটবলের "গণতন্ত্রীকরণ" বলে অভিহিত করেছেন। প্রতিটি সদস্য দেশকে প্রলোভন দেখিয়েছেন — যদি তারা প্রস্তাবে সায় দেয়, তাহলে ছোট ফেডারেশনগুলোর উন্নয়ন বরাদ্দ আট মিলিয়ন থেকে বেড়ে বিশ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে ২০৩০ সাল পর্যন্ত। ফোর্বসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি সদস্য দেশগুলোকে এই প্রস্তাবে ভোট দেওয়ার জন্য ঊনিশে সেপ্টেম্বরের একটা কড়া সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছেন।  প্রতিটি ফেডারেশনকে বেছে নিতে হবে নীতি আর নগদ অর্থের মধ্যে একটা।

কিন্তু উয়েফা এই প্রস্তাব প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী সংস্থাটি সরাসরি বিবৃতিতে বলে যে এটা ফিফার বিক্রি করার মতো কোনো সম্পত্তি নয়। কেউই ফুটবলের মালিক নয়। যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম বুধবার সামাজিক মাধ্যমে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে লেখেন যে ফুটবল কোনো পণ্য নয়। বিশ্বকাপ কখনোই কারো বিক্রি করার জিনিস ছিল না। ইইউ-এর ক্রীড়া কমিশনার গ্লেন মিকাল্লেফও সাংবাদিকদের বলেন যে ফুটবলের ক্রমাগত বাণিজ্যিকীকরণ এখন একটা ক্ষয়কারী প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। টিপ্পনী কেটে যোগ করেন যে এটা বেসবল নয়। জার্মান ফুটবল সংস্থার সহ-সভাপতি ও বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের সাবেক প্রধান নির্বাহী হান্স-ইওয়াখিম ভাটকে এই প্রস্তাবকে সরাসরি ফুটবলের ওপর আক্রমণ বলে অভিহিত করেন। ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও ফিফার "প্রক্রিয়া ও সুশাসনের ঘাটতি" নিয়ে কড়া সমালোচনা করে। এমনকি উয়েফা-চ্যাম্পিয়নস লিগ পরিচালনায় যৌথ উদ্যোগে থাকা আটশো পঞ্চাশ সদস্যের ইউরোপিয়ান ফুটবল ক্লাবস গোষ্ঠীও অভিযোগ করে যে তারা এই প্রস্তাব সম্পর্কে জানতে পেরেছে গণমাধ্যমের মাধ্যমেই, কোনো পূর্ব-পরামর্শ ছাড়াই।

আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী শুধু উয়েফাই নয়, এশিয়ার এএফসি আর উত্তর-মধ্য আমেরিকার কনকাকাফও প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানিয়েছে। একজন ক্রীড়া-শাসন বিশেষজ্ঞ অ্যান্টোইন দুভাল সতর্ক করে বলেছেন যে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের প্রবেশ ফিফাকে আরও বেশি মুনাফা-কেন্দ্রিক করে তুলতে পারে।  অতিরিক্ত হাইড্রেশন বিরতি, "ডায়নামিক প্রাইসিং"-এর মতো পদক্ষেপ আরও বাড়তে পারে, যা ইতিমধ্যে এবারের বিশ্বকাপে টিকিটের অগ্নিমূল্য নিয়ে সমালোচিত হয়েছে।

এই পুরো বিতর্কের গভীরে লুকিয়ে আছে এক রাজনৈতিক অস্বস্তিও। ইনফান্তিনো গত কয়েক বছরে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যেভাবে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেছেন, তা বহুবার সমালোচিত হয়েছে। ফিফা পিস প্রাইজ চালু করে তা ট্রাম্পকে দেওয়া, ট্রাম্প টাওয়ারে ফিফার নতুন কার্যালয় খোলা, এমনকি এই মাসেই ট্রাম্প নিজে ইনফান্তিনোকে ফোন করে মার্কিন ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ডের শাস্তি পুনর্বিবেচনার দাবি জানানোর পর তা সত্যিই পাল্টে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী মার্কিন কংগ্রেসের জুডিশিয়ারি কমিটির ডেমোক্র্যাটরা এক্স-এ (সাবেক টুইটার) কটাক্ষ করে লিখেছেন যে ফিফা এবার সরাসরি ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে ব্যবসায় নেমে পড়েছে।

 সিএনএনের প্রতিবেদন স্পষ্ট করে জানাচ্ছে যে জ্যারেড কুশনার নিজে এই বিনিয়োগকারী তালিকায় নেই। এটা তার ছোট ভাই জশ কুশনারের প্রতিষ্ঠান, যদিও ফিফা এই প্রস্তাব নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে পরামর্শ করেছিল বলে দ্য টাইমসের বরাতে জানিয়েছে একাধিক সূত্র। ফিফা নিজে অবশ্য জোর দিয়ে বলছে যে বিনিয়োগকারীরা শুধু সংখ্যালঘু, অ-পরিচালনাগত অংশীদার হবেন, আর তারা বিনিয়োগ করছেন ফিফার একটা সাবসিডিয়ারিতে, ফিফায় নিজেই নয় — অর্থাৎ ফিফার মূল কাঠামোয় কিছুই বদলাবে না বলে তাদের দাবি।

উয়েফার এই বয়কটের হুমকি নতুন কোনো কৌশল নয়। ইএসপিএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২১ সালে ঠিক এই একই অস্ত্র ব্যবহার করে উয়েফা ইনফান্তিনোর সেই পরিকল্পনা রুখে দিয়েছিল। যেখানে তিনি প্রতি চার বছরের বদলে প্রতি দুই বছরে বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আর তারও আগে, ২০১৮ সালে ইনফান্তিনো জাপানের সফটব্যাংকের সঙ্গে পঁচিশ বিলিয়ন ডলারের এক গোপন চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছিলেন, নতুন ক্লাব বিশ্বকাপ চালুর লক্ষ্যে। সেই প্রস্তাবও উয়েফার তীব্র প্রতিরোধের মুখে ভেস্তে যায়। তবে এবার বাজি আরও উঁচুতে। কারণ এবার প্রশ্নটা শুধু ক্যালেন্ডার নিয়ে নয়, বরং বিশ্বকাপের মালিকানার কাঠামো নিয়েই।

যদি সত্যিই বৃহস্পতিবারের বৈঠকে উয়েফা বয়কটের সিদ্ধান্তে সিলমোহর দেয়, তাহলে ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ খেলবে না ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানির মতো দলগুলো। যারা ২০০৬ সালের পর থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপ জিতেছে, একটি বাদে। ইউরোপের সবচেয়ে বড় তারকা আর সবচেয়ে সমৃদ্ধ টেলিভিশন বাজার ছাড়া বিশ্বকাপ কার্যত পঙ্গু হয়ে পড়বে। যার মানে ওয়াল স্ট্রিটের কাছে ইনফান্তিনোর এই বহু-বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবও হয়ে পড়তে পারে ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই মৃত। তবে ইউরোপীয় দলগুলো উয়েফার নিজস্ব নিয়ন্ত্রণাধীন চ্যাম্পিয়নস লিগ আর ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের মতো টুর্নামেন্টে খেলা চালিয়ে যাবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ এই বিদ্রোহ ইউরোপকে বিশ্ব ফুটবল থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য নয়, বরং ফিফার ওপর একটা রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল।

এই মাসেই যে স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে আমি নিজে হাজার হাজার মানুষের উল্লাস দেখেছি, স্পেনের ট্রফি উঁচিয়ে ধরা দেখেছি, সেই একই টুর্নামেন্ট এখন পরিণত হয়েছে একটা প্রশ্নবিদ্ধ আর্থিক দলিলে। যেখানে একটা পরিবারের ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক, একটা রাষ্ট্রপ্রধানের ব্যক্তিগত পছন্দ, আর একটা আন্তর্জাতিক সংস্থার একচ্ছত্র সিদ্ধান্ত মিলেমিশে ঠিক করে দিতে চাইছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় খেলাটার ভবিষ্যৎ কাঠামো কেমন হবে। যে টুর্নামেন্ট বাংলাদেশের অলিগলি থেকে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের পতাকা ওড়ানো ভক্তদের কাছে এখনো একটা সর্বজনীন উৎসব, সেটাকেই যখন কুড়ি শতাংশ শেয়ারের অংকে ভাগ করার প্রস্তাব ওঠে, তখন প্রশ্নটা অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায় — ফুটবল শেষ পর্যন্ত কার? যারা মাঠে খেলে, যারা স্ট্যান্ডে গলা ফাটায়, নাকি যারা বোর্ডরুমে বসে তার মূল্য নির্ধারণ করে? বৃহস্পতিবারের সেই জরুরি বৈঠকই হয়তো আপাতত এই প্রশ্নের প্রথম উত্তরটা দেবে, যদিও ইতিহাস বলছে ইনফান্তিনোর মতো মানুষদের কাছে প্রতিটি হার আসলে পরের পরিকল্পনার প্রস্তুতি মাত্র।

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন