https://www.prothomalony.com/

17779

canada

কানাডা

কুইবেকের ধর্মনিরপেক্ষতা আইন: আদালত, রাজনীতি ও নির্বাচনে নতুন বিতর্ক

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ ০৬:৩৭

কানাডার অন্য কোনো প্রদেশে এ ধরনের নজির না থাকলেও কুইবেকে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতা নীতিকে কেন্দ্র করে একের পর এক আইন প্রণয়ন দীর্ঘদিনের একটি সংবেদনশীল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। জনপরিসরের এ বিতর্ক এখন উচ্চ আদালতের বিচারাধীন। বিল ২১-এর পর বিল ৯৪ কার্যকর হওয়ায় ধর্মীয় প্রতীক খুলে ফেলতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে সম্প্রতি মন্ট্রিয়লের প্রায় ১৫০ জন সরকারি স্কুলকর্মী চাকরি হারিয়েছেন বা চাকরি ছেড়েছেন। এর অল্প সময়ের মধ্যেই বিল ৯ পাস করে শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানে নয়, উন্মুক্ত স্থানেও দলবদ্ধ ধর্মীয় উপাসনার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে কুইবেক সরকার। এসব আইন নিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে সরকারের দাবি, প্রদেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র অক্ষুণ্ন রাখতে এসব আইন প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল।

২০১৯ সালে কুইবেকের ক্ষমতাসীন কোয়ালিশন আভেনির কুইবেক (সিএকিউ) সরকারের তৎকালীন প্রিমিয়ার ফ্রাঁসোয়া লেগোর নেতৃত্বে বিল ২১ পাস হয়। এই আইনের মাধ্যমে বিচারক, পুলিশ কর্মকর্তা, সরকারি কৌঁসুলি, শিক্ষকসহ নির্দিষ্ট সরকারি কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনকালে দৃশ্যমান ধর্মীয় প্রতীক যেমন হিজাব, পাগড়ি, কিপ্পাহ বা বড় আকারের ক্রস পরিধান নিষিদ্ধ করা হয়। আইনটি কার্যকর রাখতে সরকার কানাডার সংবিধানের ধারা ৩৩, যা 'নটউইথস্ট্যান্ডিং ক্লজ' নামে পরিচিত, ব্যবহার করে।

এরপর ২০২৫ সালে বিল ৯৪ পাস করে সরকার এই নিষেধাজ্ঞার পরিধি আরও বাড়ায়। এতে শুধু শিক্ষক নন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সহকারী কর্মী, গ্রন্থাগার কর্মী, মনোবিজ্ঞানী, ক্যান্টিন কর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, মধ্যাহ্নভোজ তদারককারীসহ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করা সব কর্মীকেই ধর্মীয় প্রতীক পরিধান থেকে বিরত থাকতে বলা হয়।

এ বছরের এপ্রিলে স্কুল কর্তৃপক্ষের বরাতে সংবাদমাধ্যম সিবিসি জানায়, আইন কার্যকর হওয়ার পর এর প্রথম বড় প্রভাব পড়ে মন্ট্রিয়লের স্কুল ব্যবস্থায়। মন্ট্রিয়ল স্কুল সেবা কেন্দ্র জানায়, ধর্মীয় প্রতীক খুলে ফেলতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে প্রায় ১৫০ জন সহায়ক কর্মী চাকরি ছেড়ে গেছেন অথবা তাঁদের চাকরি শেষ হয়েছে। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে একাধিক স্কুল সেবা কেন্দ্র রেডিও-কানাডাকে জানিয়েছিল, বিল ৯৪ কার্যকর হওয়ার কারণে ইতোমধ্যে কয়েক ডজন কর্মীকে চাকরিচ্যুত বা সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে, অথবা তাঁরা নিজেরাই পদত্যাগ করেছেন। তবে কর্তৃপক্ষের দাবি, অধিকাংশ কর্মী শেষ পর্যন্ত আইনটি মেনে ধর্মীয় প্রতীক অপসারণে সম্মত হন।

অনেক কর্মীর ভাষ্য, তাঁদের সামনে দুটি পথই খোলা ছিল ধর্মীয় বিশ্বাস বজায় রাখা অথবা চাকরি ধরে রাখা। সরকারের বক্তব্য, এটি ধর্মের নয়, রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্ন। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, বাস্তবে এই নীতির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে মুসলিম নারী, শিখ ও ইহুদি সম্প্রদায়ের ওপর। বিশেষ করে হিজাব পরা মুসলিম নারী এবং পাগড়ি পরা শিখরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

২০২৬ সালের ২ এপ্রিল কুইবেকের জাতীয় পরিষদ বিল ৯ পাস করে। সরকার এটিকে বিল ২১-এর স্বাভাবিক সম্প্রসারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। নতুন আইনের আওতায় ভর্তুকিপ্রাপ্ত শিশুযত্ন কেন্দ্রের কর্মীদের ধর্মীয় প্রতীক পরিধানে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রার্থনার জন্য পৃথক কক্ষ রাখা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় কারণে বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও সীমিত করা হয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত বিধান হিসেবে রাস্তা, পার্ক বা অন্য কোনো উন্মুক্ত সরকারি স্থানে দলবদ্ধ নামাজ, প্রার্থনা কিংবা অন্য কোনো ধর্মীয় উপাসনার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

তিনটি আইনই সিএকিউ সরকারের আমলে প্রিমিয়ার ফ্রাঁসোয়া লেগোর নেতৃত্বে প্রণীত হয়েছে। সরকারের দাবি, রাষ্ট্র ও ধর্মের সুস্পষ্ট পৃথকীকরণ নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য। রাষ্ট্র পরিচালিত হবে নিজস্ব আইন ও নীতিতে, কোনো ধর্মীয় প্রভাব ছাড়াই। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রকাশ্য স্থানে রাস্তা বন্ধ করে নামাজ আদায় এবং বিভিন্ন ধরনের দলবদ্ধ ধর্মীয় উপাসনার প্রবণতা বেড়েছে। একই প্রবণতা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি ভবনেও দেখা যাচ্ছে। সরকারের মতে, এসব কার্যক্রম সমাজে ধর্মীয় বিভাজন বাড়াতে পারে। তাই সব ধর্মের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য এই আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, যাতে কোনো নাগরিক দৃশ্যমান ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা হয়ে না পড়েন এবং সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টি না হয়।

অন্যদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংগঠন ও ধর্মীয় সংগঠন এসব আইনের তীব্র সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, এসব আইন ধর্মীয় স্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকার সীমিত করছে, সংখ্যালঘুদের সরকারি চাকরিতে নিরুৎসাহিত করছে এবং বহুসাংস্কৃতিক সমাজে বিভাজন আরও বাড়াতে পারে। সমালোচকদের মতে, বিশেষ করে হিজাব পরা মুসলিম নারীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, কারণ তাঁদের অনেকেই হিজাবকে ধর্মীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন।

বিল ২১ পাস হওয়ার পর থেকেই এটি আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। সরকার সংবিধানের ধারা ৩৩ ব্যবহার করায় আইনের বড় অংশ কার্যকর থাকলেও এর বৈধতা নিয়ে মামলা এখন কানাডার সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন। আইনটির বিরুদ্ধে মামলা করেছে কানাডিয়ান সিভিল লিবার্টিজ অ্যাসোসিয়েশন, ন্যাশনাল কাউন্সিল অব কানাডিয়ান মুসলিমস, ইংলিশ মন্ট্রিয়ল স্কুল বোর্ড, ওয়ার্ল্ড শিখ অর্গানাইজেশন এবং বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন। তাঁদের দাবি, আইনটি ধর্মীয় স্বাধীনতা, সমতার অধিকার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন করছে। বিল ৯ নিয়েও একই ধরনের আইনি চ্যালেঞ্জের সম্ভাবনা রয়েছে।

আগামী ৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া কুইবেকের প্রাদেশিক নির্বাচনে বিষয়টি অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। যদিও কুইবেকের একটি বড় অংশ ধর্মনিরপেক্ষতা আইনকে সমর্থন করে, তবে মন্ট্রিয়লসহ শহুরে অঞ্চল, ইংরেজিভাষী ভোটার এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে এসব আইনের বিরোধিতা প্রবল। কুইবেকের জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল পার্টি কেবেকোয়া শুধু এসব আইনকে সমর্থনই করেনি, অনেক ক্ষেত্রে আরও কঠোর আইন প্রণয়নের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে কুইবেক লিবারেল পার্টি বিল ২১-এর বিরোধিতা করে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু অধিকারের প্রশ্ন তুলেছে। কেবেক সলিদার শুরু থেকেই আইনগুলোর বিরোধিতা করে সেগুলো বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছে।

কুইবেকের ধর্মনিরপেক্ষতা নীতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সরকার বলছে তারা রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা ও অভিন্ন নাগরিক পরিচয় রক্ষা করছে। বিপরীতে সমালোচকদের দাবি, এর মূল্য দিতে হচ্ছে চাকরি হারানো কর্মীদের এবং ধর্মীয় পরিচয় গোপন করতে বাধ্য হওয়া অনেক নাগরিককে। প্রায় ১৫০ কর্মীর চাকরি হারানো থেকে শুরু করে উন্মুক্ত স্থানে দলবদ্ধ ধর্মীয় উপাসনা নিষিদ্ধ করা পর্যন্ত বিল ২১, বিল ৯৪ ও বিল ৯ শুধু আইনি পরিবর্তন নয়; এগুলো কুইবেকের পরিচয়, ধর্মনিরপেক্ষতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে চলমান গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের প্রতীক হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে সংবিধানের ধারা ৩৩ ব্যবহারের সীমা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ফলে কানাডার সর্বোচ্চ আদালতের রায় এবং ২০২৬ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন—দুটিই কুইবেকের ধর্মনিরপেক্ষতা নীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

কানাডা থেকে আরো পড়ুন