https://www.prothomalony.com/
18136
canada
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:১৪
কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে ‘গ্লোবাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স সোসাইটি’র উদ্যোগে বার্ষিক ‘মাতৃভাষা উৎসব ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার নিউ ওয়েস্টমিনস্টারের কুইন্সবোরো কমিউনিটি সেন্টারের মুক্তমঞ্চে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এবারের উৎসবের প্রতিপাদ্য ছিল—‘ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যই আমাদের পরিচয়’। বিশ্বের বিভিন্ন মাতৃভাষার প্রচার, প্রসার ও সংরক্ষণের অঙ্গীকার নিয়ে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সমাজসেবক, লেখক, কবি, সাংস্কৃতিক কর্মী, শিল্পী এবং কানাডার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
কানাডার জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। পরে ফার্স্ট নেশনস বা কানাডার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর শিল্পীরা ঐতিহ্যবাহী সংগীত পরিবেশন করেন। বাংলাদেশের ভাষাশহীদসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মাতৃভাষা রক্ষায় জীবন উৎসর্গকারী ও সংগ্রামকারীদের স্মরণে ৩০ সেকেন্ড নীরবতা পালন করা হয়।
কানাডার ফেডারেল সংসদ সদস্য জেইক সাওয়াটস্কি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে না পারলেও একটি বিশেষ বার্তা পাঠান। বার্তায় তিনি মাতৃভাষা সংরক্ষণের চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তাঁর বার্তা পড়ে শোনান সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শফিউল আজম।
(1).png)
অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় বসবাসরত বাঙালি লেখক ও কবিরাও অংশ নেন। সাহিত্যিক ও সংবাদকর্মী ফারজানা নাজ শম্পা কানাডীয় কবি জর্জ এলিয়টের একটি ইংরেজি কবিতার বাংলা অনুবাদ ও আবৃত্তি উপস্থাপন করেন। তিনি বিভিন্ন ভাষার সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্য তুলে ধরার পাশাপাশি কানাডার সাহিত্য অনুবাদ এবং দেশটির আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ৭০টিরও বেশি ভাষা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
সংগঠনের দীর্ঘদিনের সহযোগী কবি শাহানা আক্তার মহুয়া তাঁর বক্তব্যে ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য কীভাবে মানুষের স্বতন্ত্র পরিচয় গঠনে ভূমিকা রাখে, তা তুলে ধরেন।
গ্লোবাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স সোসাইটির সভাপতি ড. আব্দুল মতিন বলেন, মাতৃভাষা রক্ষার উদ্যোগ শুরু হওয়া উচিত পরিবার থেকেই। সন্তানদের সঙ্গে প্রতিদিনের পারিবারিক জীবনে মাতৃভাষায় কথা বলার জন্য তিনি অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ভাষা মানুষের শিকড় ও বংশানুক্রমিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকার অন্যতম প্রধান সেতু। ভাষা হারিয়ে গেলে মানুষ নিজের সংস্কৃতি থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।
ড. আব্দুল মতিন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ২১ ফেব্রুয়ারির স্বীকৃতির পেছনে প্রয়াত রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালামের অবদানের কথাও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তাঁদের ঐতিহাসিক উদ্যোগের ফলে ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।
অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বে বাংলাদেশ, চীন, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ার শিল্পীরা নিজ নিজ দেশের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য পরিবেশন করেন। বহুজাতিক সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে। বৈচিত্র্যময় এই সাংস্কৃতিক মিলন প্রমাণ করে, ভাষা ও সংস্কৃতি মানুষকে বিভক্ত না করে বরং ঐক্যবদ্ধ করতে পারে।
অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সহ-আহ্বায়ক আবদুস সালামকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান গ্লোবাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স সোসাইটির সভাপতি ড. আব্দুল মতিন।
অনুষ্ঠানের সফল আয়োজনের জন্য সংগঠনের সহসভাপতি হাসান মামুন ও মাইকেল দীপায়ন মিত্র, সাধারণ সম্পাদক শফিউল আজমসহ নির্বাহী কমিটির সদস্যদের ধন্যবাদ জানানো হয়। তাঁদের পরিকল্পনা, সমন্বয় ও নিরলস প্রচেষ্টায় অনুষ্ঠানটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
সমাপনী বক্তব্যে ড. আব্দুল মতিন এবং ভ্যাঙ্কুভারে জিভিবিসিএর সভাপতি এম. এইচ. লিটন আয়োজনে সহযোগিতাকারী ফার্স্ট নেশনস দলের সদস্য, কারিগরি ও শব্দ নিয়ন্ত্রণ দল, স্বেচ্ছাসেবক এবং দর্শক-শ্রোতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
২০২৬ সালের এই মাতৃভাষা উৎসব শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল না; এটি ছিল ভাষা যে মানুষের ইতিহাস, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও পরিচয়ের অন্যতম প্রধান বাহক—সেই বার্তারও প্রকাশ। কানাডার বহুসাংস্কৃতিক সমাজে বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সম্মানের একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে এ আয়োজন।
কানাডা থেকে আরো পড়ুন