https://www.prothomalony.com/
17763
north-america
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ ২২:২৫
দুই দিনের জন্য যেন ইন্ডিয়ানার নোবলসভিল শহরটি বাংলাদেশেরই একটি সাংস্কৃতিক জনপদে পরিণত হয়েছিল। মঞ্চে কখনও ভেসে উঠেছে নজরুলের উত্তরাধিকার, কখনও কণ্ঠশিল্পী দিলশাদ নাহার কণার সুরে মুখর হয়েছে প্রবাসের আকাশ। শিশুদের কণ্ঠে বাংলা কবিতা, পিঠার ঘ্রাণ, বইয়ের পাতা, নৃত্যের ছন্দ আর সাহিত্যচর্চার প্রাণবন্ত আয়োজন মিলেমিশে এমন এক আবহ তৈরি করেছিল, যেখানে ভৌগোলিক দূরত্ব যেন মুহূর্তেই হার মেনেছে মাতৃভাষার কাছে।
প্রবাসে বসবাসকারী বাঙালি শুধু জীবিকার জন্য দেশ ছাড়েনি। সঙ্গে করে বহন করেছে একটি ভাষা, একটি ইতিহাস, একটি সংস্কৃতি এবং এক অমোচনীয় আত্মপরিচয়। সেই পরিচয়েরই উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমের অঙ্গরাজ্য ইন্ডিয়ানায় অনুষ্ঠিত ১৬তম উত্তর আমেরিকা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন (NABLCC) ২০২৬-এ। দুই দিনব্যাপী এই আয়োজন শেষে বক্তারা বলেছেন, বিশ্বের যেখানেই বাঙালি গেছে, সেখানেই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছে। আগামী প্রজন্মের হাত ধরেই সেই আলো আরও বহুদূর ছড়িয়ে যাবে।
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নাতনি অনিন্দিতা কাজীর কথামালা, জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী দিলশাদ নাহার কণার মনমাতানো সংগীত এবং স্থানীয় শিল্পী এমাদ রনি, আকাশ ও জনির প্রাণবন্ত পরিবেশনা সম্মেলনকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। সংগীত, নৃত্য, সাহিত্য ও শিল্পকলার সমন্বয়ে প্রবাসের এই উৎসব হয়ে ওঠে বাংলা সংস্কৃতির এক বর্ণিল মিলনমেলা।
নোবলসভিলে অনুষ্ঠিত দ্বিবার্ষিক এই সম্মেলনে উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে সাহিত্যিক, শিল্পী, শিক্ষাবিদ, গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী ও বাংলা ভাষাপ্রেমীরা একত্রিত হন। ভাষা, সাহিত্য, সংগীত ও শিল্পকলার মধ্য দিয়ে তাঁরা নতুন করে শেকড়ের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ককে দৃঢ় করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সম্মেলনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বাংলা বইয়ের মেলা। প্রথমবারের মতো ইন্ডিয়ানার এই অঞ্চলে আয়োজিত বইমেলায় নিউইয়র্ক থেকে অংশ নেয় মুক্তধারা। সমসাময়িক সাহিত্য থেকে গবেষণাধর্মী মূল্যবান প্রকাশনা—সব মিলিয়ে বইপ্রেমীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। মুক্তধারার কর্ণধার বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, নিউইয়র্ক ও নিউজার্সির মতো প্রবাসীবহুল এলাকার বাইরেও বাংলা বইয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ তাঁকে নতুন আশাবাদী করেছে।
সম্মেলনের আহ্বায়ক আজাদ হোসেন সফল আয়োজনের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ভারতের কনসাল জেনারেল সোমনাথ ঘোষ বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনের সময়ের স্মৃতিচারণ করেন। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগামী প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য পৌঁছে দিতে সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
শিকাগোতে বাংলাদেশের অনারারি কনসাল জেনারেল মুনির চৌধুরী ইন্ডিয়ানায় এমন সমৃদ্ধ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন আয়োজনের জন্য উদ্যোক্তাদের অভিনন্দন জানান।
অনিন্দিতা কাজী তাঁর বক্তব্যে বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম মানবতার কবি। তিনি কোনো ধর্মীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ ছিলেন না; তাঁর সাহিত্য মানুষের মুক্তি, সাম্য ও ভালোবাসার কথা বলে।
সম্মেলনের অন্যতম নীরব সংগঠক মাসুম মাহবুব বলেন, ইন্ডিয়ানার ইতিহাসে এবারের সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। এর ধারাবাহিকতায় এ রাজ্যে বসবাসরত বাঙালিরা ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর সাংস্কৃতিক উদ্যোগ নিতে অনুপ্রাণিত হবেন।
শিশুদের কবিতা আবৃত্তি, পিঠা উৎসব, সাহিত্য আলোচনা এবং স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনা পুরো আয়োজনকে পারিবারিক উষ্ণতায় ভরিয়ে তোলে। শিশুদের কণ্ঠে বাংলা কবিতা, মায়ের হাতে তৈরি পিঠার ঘ্রাণ এবং মঞ্চে ভেসে ওঠা বাংলা গানের সুরে মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছে—হাজার হাজার মাইল দূরে নয়, যেন বাংলারই কোনো গ্রাম কিংবা শহরে সবাই মিলিত হয়েছেন।
আজাদ হোসেন, দিলরুবা আমিন মিতা ও অঞ্জন রায়ের নেতৃত্বে পুরো আয়োজন ছিল সুশৃঙ্খল, আন্তরিক ও প্রাণবন্ত। দূরবর্তী এই অঙ্গরাজ্যে এমন বৃহৎ সাংস্কৃতিক আয়োজন সফল করতে যাঁরা নিরলস পরিশ্রম করেছেন, তাঁদের প্রতি অংশগ্রহণকারীরা আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
সম্মেলনে ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের সেক্রেটারি অব স্টেট দিয়েগো মোরালেসের শুভেচ্ছাবার্তা পাঠ করে শোনানো হয়। জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী কণা একের পর এক গান পরিবেশন করে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। অনুষ্ঠানে অতিথিদের সম্মাননা স্মারকও প্রদান করা হয়।
বাংলা সাহিত্যবিষয়ক আলোচনায় অংশ নেন ড. মীর মাসুম আলী, আজাদ হোসেন, প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার সম্পাদক ও লেখক ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন, সাংবাদিক হাসানুজ্জামান সাকী এবং পিনাকী তালুকদার। আলোচকেরা বলেন, প্রবাসীদের হাত ধরেই আজকের বিশ্ববাংলার ভিত নির্মিত হয়েছে। আগামী প্রজন্ম সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির পতাকা আরও উঁচুতে বহন করবে।
প্রথম দিনের আলোচনায় অংশ নেন সোনিয়া আজাদ, লীনা আলী, ড. ওয়াকার মোয়াজ্জেম, লিখন রশীদ প্রমুখ। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন নন্দিতা দাস গাঙ্গুলি, বিশ্বজিৎ সাহা ও দিদারুল আলম পান্না।
সম্মেলনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অনুষঙ্গ ছিল আলোকচিত্র ও শিল্পকর্ম প্রদর্শনী। ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশি পোশাক ও অলংকার, বাঙালি খাবারের আয়োজন এবং বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে পরিচয় ও সংযোগের সুযোগ অংশগ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। যেন একটিই বার্তা উচ্চারিত হয়েছে—প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতি কোনো স্মৃতির নাম নয়; এটি একটি জীবন্ত, চলমান জীবনধারা।
দুই দিনের এই সম্মেলন শেষ হলেও নোবলসভিলে রয়ে গেছে বাংলা ভাষার অনুরণন। ভাষা, সাহিত্য, গান, বই আর মানুষের মিলনে গড়ে ওঠা এই সাংস্কৃতিক উৎসব অনন্য হয়ে উঠেছিল।
২৪ ও ২৫ জুলাই দুইদিন ব্যাপী এ সম্মেলনের মিডিয়া পার্টনার ছিল প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা, সময় টেলিভিশন, টিবিএন-২৪ এবং দেশি ট্রিবিউন ডটকম।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন