https://www.prothomalony.com/

17734

sports

খেলাধুলা

ফিফা থেকে জাতিসংঘ: ইনফান্তিনোর জন্য নতুন এক "ফাইনাল"

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ ০২:৪৯

স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে সোনালি কনফেত্তি উড়ছিল। ট্রফির ঝলকে যখন পুরো নিউজার্সি ঝলমল করছিল।   কে ভেবেছিল যে বিশ্বকাপের এই উৎসবের আসল "নকআউট রাউন্ড" শুরু হবে মাঠের বাইরে। ওয়াশিংটনের করিডোরে? দিনের পর দিন স্টেডিয়ামের গেটে দাঁড়িয়ে টিকিট চেক করতে করতে, ভলান্টিয়ারদের জ্যাকেট গায়ে ঘামতে ঘামতে যে বিশ্বকাপ আমি নিজের চোখে দেখেছি, সেই টুর্নামেন্টের রাজনৈতিক রেশ এখন গড়াচ্ছে রাষ্ট্রসংঘের সবচেয়ে ক্ষমতাধর চেয়ারটির দিকে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাকি চান, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোই হোন জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব। নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বছরের বিশ্বকাপ আয়োজনের সুবাদে ট্রাম্প ও ইনফান্তিনোর সম্পর্ক এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ৫৬ বছর বয়সী সুইস প্রশাসক রীতিমতো ট্রাম্পের প্রিয়পাত্র বনে গেছেন। এমনকি ডিসেম্বরে ফিফার প্রথম "পিস প্রাইজ"ও তুলে দেওয়া হয়েছিল তার হাতে। যে মানুষ বছরের পর বছর নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য আক্ষেপ করে গেছেন, তাকে একটা ফুটবল সংস্থার তৈরি করা পুরস্কার দিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার মধ্যে একধরনের কাব্যিক ন্যায়বিচার আছে বৈকি।

পর্তুগালের আন্তোনিও গুতেরেস ডিসেম্বরের শেষে বিদায় নিচ্ছেন। আর সেই আসনের জন্য এখন লড়াই চলছে। নিরাপত্তা পরিষদের পনেরো সদস্যের অনুমোদন এবং সাধারণ পরিষদের সিলমোহর — এই দুই ধাপ পেরোতে হবে যে কাউকে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের তালিকায় আছেন চিলির সাবেক সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট মিশেল বাশেলে।  আছেন আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রোসি — যিনি এখন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান। কিন্তু ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে ব্রিটেনের সঙ্গে পুরনো বিরোধের কাঁটা তার পথে বিছানো। ল্যাটিন আমেরিকা থেকে শেষবার এই চেয়ারে বসেছিলেন পেরুর হাভিয়ের পেরেজ দে কুইয়ার। ১৯৮২ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত। সেই অলিখিত "আঞ্চলিক পালা"র হিসেব উল্টে দিতে চাইছেন ট্রাম্প। যদিও একাধিক সূত্র বলছে ইনফান্তিনো একাধিক দেশ থেকে সমর্থন পেতে পারেন, শুধু ট্রাম্পের একার আশীর্বাদ নয়।

এখানেই গল্পের সবচেয়ে মজার অংশ। ফিফা সভাপতি হিসেবে ইনফান্তিনোর বার্ষিক বেতন প্রায় ৬০ লাখ ডলার।   জাতিসংঘ মহাসচিবের বেতন মোটে চার লাখ আঠারো হাজার ডলারের আশপাশে। অর্থাৎ ফুটবলের বৈশ্বিক বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য ছেড়ে বিশ্ব-কূটনীতির আসনে বসতে গেলে ইনফান্তিনোকে বেতনের প্রায় নব্বই শতাংশ ছেড়ে দিতে হবে। যে খেলাটা এখন কোটি কোটি ডলারের স্পনসরশিপ, সম্প্রচার স্বত্ব আর বিলাসবহুল স্কাইবক্সের কারবার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার শীর্ষ কর্তা যদি সত্যিই এই "ডিমোশন" মেনে নেন, তাহলে বুঝতে হবে ক্ষমতার লোভ পয়সার লোভের চেয়েও বড় নেশা।

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ দূত পাওলো জাম্পোল্লি অবশ্য এই প্রস্তাবকে "প্রতিভাবান পরিকল্পনা" বলে উল্লেখ করেছেন। তার যুক্তি — জাতিসংঘে সদস্য রাষ্ট্র ১৯৩টি, আর ফিফায় সদস্য সংগঠন ২১১টি। ইনফান্তিনো যখন দুইশর বেশি সদস্য নিয়ে সংস্থা চালাতে পারেন, তখন জাতিসংঘের আমলাতান্ত্রিক জঙ্গলও তার নাগালের বাইরে নয়। যুক্তিটা শুনতে চটকদার, কিন্তু ফুটবল প্রশাসন আর বৈশ্বিক কূটনীতি — এই দুইয়ের মধ্যে যে ফারাক, তা বিশ্বকাপের ফাইনাল আর জলবায়ু আলোচনার মধ্যেকার ফারাকের চেয়ে কম নয়।

তবে ইনফান্তিনোর পথ মসৃণ নয়। আগামী মার্চে ফিফা সভাপতি পদে পুনর্নির্বাচনের প্রার্থী তিনি নিজেই।  বিশ্বকাপ চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ ঘিরে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তার আঁচ এখনও কমেনি। বেলজিয়ামের বিপক্ষে আমেরিকার হার সেই আগুনে কিছুটা পানি ঢেলেছে বটে। সাবেক ফিফা সভাপতি সেপ ব্লাটার — যিনি নিজে ঘুষ কেলেঙ্কারির দাগ নিয়ে বিদায় নিয়েছিলেন কাতার বিশ্বকাপ বরাদ্দের সময় — এখন ইনফান্তিনোর বিদায় দাবি করছেন। ইতিহাসের এমন এক পরিহাস, যেখানে দাগি প্রাক্তন নেতা বর্তমান নেতার নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে যে উচ্ছ্বাস আমি দেখেছি, লাখো মানুষের সেই উন্মাদনার আড়ালে যে ক্ষমতার দাবাখেলা চলে, তার একটা ঝলক এই খবরে স্পষ্ট। ফুটবল এখন প্রেসিডেন্ট আর প্রশাসকদের মধ্যে বন্ধুত্ব বিনিময়ের মুদ্রা। সেই বন্ধুত্বের দাম কখনও কখনও গড়ায় জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানের দরজা পর্যন্ত। ইনফান্তিনো শেষ পর্যন্ত এই আসনে বসবেন কি না, সেটা সময় বলবে। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত, ফুটবলের বৈশ্বিকীকরণের গল্পে রাজনীতি আর বাণিজ্যের সুতো এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে মাঠ আর মন্ত্রণালয়ের সীমানা প্রায় মুছে গেছে।
 

খেলাধুলা থেকে আরো পড়ুন