https://www.prothomalony.com/

17723

sports

খেলাধুলা

উনিশেই বিশ্বজয়, বুকজুড়ে ফিলিস্তিন—ফুটবলের নতুন রাজপুত্র ইয়ামাল

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ ০১:৫৭

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে তখন ইতিহাস লেখা হচ্ছে। প্রায় ৮০ হাজার দর্শকের গর্জনে কাঁপছে গ্যালারি। অতিরিক্ত সময়ের রুদ্ধশ্বাস লড়াই শেষে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নিয়েছে স্পেন। মাঠজুড়ে লাল জার্সিধারীদের উচ্ছ্বাস, আর সেই আনন্দের কেন্দ্রবিন্দুতে ১৯ বছর বয়সী লামিন ইয়ামাল। ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের হাসি তাঁর মুখে।

অন্যদিকে, কয়েক গজ দূরে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে সবকিছু দেখছেন লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সী কিংবদন্তির জন্য হয়তো এটিই বিশ্বকাপের শেষ অধ্যায়। ঠিক তখনই ঘটে এমন একটি দৃশ্য, যা হয়তো ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকবে। উচ্ছ্বাসে মেতে থাকা ইয়ামাল এগিয়ে গিয়ে আলিঙ্গন করেন তাঁর শৈশবের নায়ক মেসিকে। যেন এক প্রজন্ম আরেক প্রজন্মের হাতে নীরবে তুলে দিল ফুটবলের রাজদণ্ড।

মেসির কোলের সেই শিশু
এই গল্পের শুরু অবশ্য মেটলাইফ স্টেডিয়ামে নয়; প্রায় দুই দশক আগে।

২০০৭ সালে ইউনিসেফের একটি দাতব্য ক্যালেন্ডারের জন্য আয়োজিত ফটোশুটে ২০ বছর বয়সী তরুণ লিওনেল মেসির সঙ্গে দেখা হয়েছিল মাত্র পাঁচ মাস বয়সী এক শিশুর। লটারিতে নির্বাচিত হয়েছিল শিশুটির পরিবার। একটি নীল প্লাস্টিকের বাথটাবে শিশুটিকে গোসল করাতে তাঁর মাকে সাহায্য করছিলেন মেসি। সেই শিশুটিই আজকের লামিন ইয়ামাল।

সেই ছবি বহু বছর অজানাই ছিল। ইউরো ২০২৪ চলাকালে ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে। ফটোশুটের আলোকচিত্রী জোয়ান মনফোর্ট একে "ভাগ্যের অলৌকিক ঘটনা" বলেছিলেন। তাঁর ভাষায়, এটি যদি সিনেমার গল্প হতো, অনেকেই বিশ্বাস করতেন না।

বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে মেসিও সেই স্মৃতি মনে করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, শিশুকালে যার সঙ্গে ছবি তুলেছিলেন, আজ তার বিপক্ষেই বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলছেন—এটি অবিশ্বাস্য এক অনুভূতি।

উনিশেই বিশ্বজয়
মাত্র ১৯ বছর বয়সেই লামিন ইয়ামালের অর্জনের তালিকা বিস্ময়কর।

লা মাসিয়ার একাডেমি থেকে উঠে এসে বার্সেলোনার মূল দলে জায়গা করে নেওয়া, ইউরো ২০২৪ জিতে নেওয়া, তারপর বিশ্বকাপের মঞ্চেও স্পেনকে নেতৃত্ব দেওয়া—সবই যেন রূপকথার মতো।

বিশ্বকাপ ফাইনালের স্কোরশিটে তাঁর নাম না থাকলেও মাঠের সবচেয়ে আলোচিত খেলোয়াড়দের একজন ছিলেন ইয়ামাল। ডান প্রান্তে তাঁর গতি, ড্রিবলিং, সৃজনশীলতা এবং আক্রমণাত্মক মানসিকতা বারবার আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকে চাপে ফেলেছে। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের গোলে স্পেন ইতিহাস গড়ে।

রোকাফোন্দার সাধারণ এক শ্রমজীবী মহল্লা থেকে উঠে আসা এই তরুণ আজ স্পেনের জাতীয় গর্বে পরিণত হয়েছেন। নিজের এলাকার পোস্টকোড "৩০৪" হাতের ইশারায় উদযাপন করে তিনি সবসময়ই নিজের শিকড়কে সম্মান জানান।

ডেভিড বেকহ্যাম একবার বলেছিলেন, মেসির সঙ্গে কারও তুলনা হয় না, তবে ইয়ামালই সেই বিরল প্রতিভা, যার মধ্যে তিনি মেসির সবচেয়ে কাছাকাছি বৈশিষ্ট্য দেখতে পান।

ফিলিস্তিনের পাশে এক তারকা
ফুটবল মাঠের নায়ক হওয়ার পাশাপাশি মানবিক অবস্থানের কারণেও বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছেন ইয়ামাল।

বার্সেলোনার হয়ে লা লিগা শিরোপা জয়ের পর শহরজুড়ে বিজয় শোভাযাত্রায় তিনি হাতে তুলে নেন একটি বড় ফিলিস্তিনি পতাকা। মুহূর্তটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজাসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আলোচনার জন্ম দেয়।

এর কিছুদিন পর গাজার আল-শাতি শরণার্থী শিবিরে ধ্বংসস্তূপের দেয়ালে ফিলিস্তিনি শিল্পীরা আঁকেন লামিন ইয়ামালের বিশাল একটি ম্যুরাল। এটি ছিল শুধু একজন ফুটবলারের ছবি নয়, বরং এমন একজন তরুণের প্রতি শ্রদ্ধা, যিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সাহস দেখিয়েছেন।

গাজার বহু তরুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ইয়ামালের এই সংহতি তাঁদের কঠিন সময়েও আশা জুগিয়েছে। একজন তারকা যখন মানবিক অবস্থান নেন, তখন সেটি কেবল ক্রীড়াঙ্গনের খবর থাকে না; হয়ে ওঠে বৈশ্বিক সংহতির প্রতীক।

নিজের পরিচয়ে অটল
মরক্কো থেকে স্পেনে আসা এক মুসলিম বাবার সন্তান লামিন ইয়ামাল কখনো নিজের পরিচয় লুকিয়ে রাখেননি।

স্পেনের একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে গ্যালারি থেকে ইসলামবিদ্বেষী স্লোগান ওঠার পর তিনি প্রকাশ্যে এর প্রতিবাদ করেন। তিনি বলেন, এসব মন্তব্য ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে উদ্দেশ্য করে না হলেও একজন মুসলিম হিসেবে তা অসম্মানজনক এবং গ্রহণযোগ্য নয়।

জাতিগত বৈচিত্র্যপূর্ণ রোকাফোন্দা এলাকায় বেড়ে ওঠা ইয়ামাল প্রায়ই বলেন, ফুটবল মানুষকে এক করে, বিভক্ত করে না। তাঁর জীবনগল্পও যেন সেই বার্তাই বহন করে—একজন মরক্কান বাবা, ইকুয়েটোরিয়াল গিনির মা এবং স্পেনের জার্সিতে বিশ্বজয়ের নায়ক।

নতুন যুগের প্রতীক
লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ছিল সংগ্রাম, ব্যর্থতা এবং অবশেষে বিশ্বজয়ের এক অনন্য গল্প। বহু ফাইনালে হারার পর ২০২২ সালে তিনি বিশ্বকাপ জিতে অমরত্ব লাভ করেন। আর ২০২৬ সালে হয়তো বিশ্বমঞ্চে তাঁর শেষ উপস্থিতির সাক্ষী থাকল ফুটবল বিশ্ব।

সেই মঞ্চেই নতুন আলোয় আবির্ভূত হলেন লামিন ইয়ামাল।

তিনি এখনও মেসি নন, হয়তো কখনো হবেনও না। কারণ মেসির মতো কিংবদন্তির তুলনা হয় না। কিন্তু ইয়ামাল ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছেন, তিনি অন্য কারও ছায়া হয়ে নয়, নিজের পরিচয়েই ইতিহাস লিখতে চান।

মাত্র ১৯ বছর বয়সে ইউরোপের সেরা হওয়ার পর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া, মাঠে অসাধারণ পারফরম্যান্স, আবার মাঠের বাইরে মানবিক অবস্থান—সব মিলিয়ে নতুন প্রজন্মের ফুটবল তারকাদের মধ্যে তিনি এক অনন্য প্রতীক।

মেসির কোলের সেই পাঁচ মাসের শিশু আজ বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে দাঁড়িয়ে। সময়ই বলে দেবে তিনি কতটা দূর যাবেন। তবে একটি বিষয় এখনই নিশ্চিত—ফুটবলের নতুন যুগের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুখগুলোর একটি নাম লামিন ইয়ামাল। বিশ্বচ্যাম্পিয়নের সোনালি পদকের পাশাপাশি তিনি হয়ে উঠেছেন সাহস, মানবিকতা ও আশারও এক প্রতীক।

খেলাধুলা থেকে আরো পড়ুন