https://www.prothomalony.com/

17728

sports

খেলাধুলা

বিশ্বকাপ শেষ, উৎসব কি শেষ?

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ ০১:৫৮

এক মাসেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উৎসবের নাম ছিল—ফিফা বিশ্বকাপ। এখন শেষ বাঁশি বেজে গেছে। ট্রফি নতুন চ্যাম্পিয়নের হাতে উঠেছে। স্টেডিয়ামের আলো নিভতে শুরু করেছে। রঙিন পতাকাগুলো গুটিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বকাপ কি সত্যিই শেষ?

হয়তো মাঠের খেলা শেষ হয়েছে, কিন্তু মানুষের ভেতরে যে আবেগ, যে স্মৃতি, যে ঐক্যের অনুভূতি তৈরি হয়েছে, তা এত সহজে শেষ হওয়ার নয়। পৃথিবীতে এমন খুব কম আয়োজন আছে, যা একই সময়ে একই আবেগে কোটি কোটি মানুষকে যুক্ত করতে পারে। ভাষা আলাদা, ধর্ম আলাদা, সংস্কৃতি আলাদা, রাজনৈতিক মতাদর্শ আলাদা—তবুও একটি বল, একটি গোল আর ৯০ মিনিটের খেলাকে কেন্দ্র করে মানুষ একই সঙ্গে হাসে, কাঁদে, উল্লাস করে, আবার হতাশও হয়। বিশ্বকাপ আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়, মানুষের মিলগুলো আসলে বিভেদের চেয়ে অনেক বড়।

এবারের বিশ্বকাপও তার ব্যতিক্রম নয়। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশের মানুষ কোনো না কোনো দলের সমর্থক হয়েছেন। যারা নিজেদের দেশের দলকে পাননি, তারাও প্রিয় খেলোয়াড়, প্রিয় ফুটবল দর্শন কিংবা প্রিয় ইতিহাসকে অনুসরণ করে নতুন করে নিজেদের পরিচয় খুঁজে নিয়েছেন। ফুটবল এখানে শুধু একটি খেলা ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল এক বৈশ্বিক ভাষা।

নিউইয়র্ক, ঢাকা, বুয়েনস আইরেস, মাদ্রিদ, কায়রো, টোকিও কিংবা লাগোস—সব জায়গায় একই দৃশ্য। বিশাল পর্দার সামনে মানুষ। কেউ পতাকা কাঁধে জড়িয়ে আছে, কেউ মুখে রঙ মেখেছে, কেউ অচেনা মানুষের সঙ্গে আলিঙ্গন করছে। খেলা শেষ হওয়ার পরও কেউ অপরিচিত মানুষের সঙ্গে ছবি তুলছে। পৃথিবীর রাজনীতি যেখানে প্রায়ই বিভাজনের ভাষা শেখায়, সেখানে ফুটবল মানুষকে শেখায় পরিচয়ের আগে মানুষ হওয়া।

বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই। এটি মানুষকে প্রতিদ্বন্দ্বী বানায়, শত্রু নয়। মাঠে লড়াই থাকে, কিন্তু খেলা শেষে থাকে করমর্দন। একে অপরকে সম্মান জানানোর যে সংস্কৃতি ফুটবল তৈরি করেছে, সেটি আজকের পৃথিবীর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

তবে বিশ্বকাপের আরেকটি বাস্তবতাও আমাদের চোখ এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। ফুটবল এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিনোদন শিল্পগুলোর একটি। এই খেলাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে শত শত বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি। সম্প্রচার স্বত্ব, বিজ্ঞাপন, স্পন্সরশিপ, জার্সি বিক্রি, পর্যটন, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ এখন একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ইঞ্জিন। একটি ম্যাচের সঙ্গে যুক্ত থাকে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান।

কিন্তু একই সঙ্গে একটি প্রশ্নও থেকে যায়। যে শ্রমিক বিশ্বকাপের জার্সি তৈরি করেন, তিনি কি সেই জার্সি কেনার সামর্থ্য রাখেন? যে স্বেচ্ছাসেবক দিন-রাত কাজ করেন, তিনি হয়তো কোনো দিন ভিআইপি বক্সে বসে খেলা দেখতে পারবেন না। যে শিশু কাপড়ের বল বানিয়ে খেলতে খেলতে বড় হয়, সে হয়তো কোনো দিন বিশ্বকাপের স্টেডিয়ামে পৌঁছাবে না।

এই বৈপরীত্যই আধুনিক বিশ্বের বাস্তবতা। তবুও ফুটবলের সৌন্দর্য এখানেই যে, মাঠে সেই বৈষম্যের কোনো মূল্য নেই। সেখানে ধনী-গরিবের পরিচয় নয়, প্রতিভা, পরিশ্রম এবং দলগত ঐক্যই শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দেয়। ফুটবল অন্তত আমাদের এই স্বপ্ন দেখার সুযোগ দেয় যে, যোগ্যতা এখনো অনেক ক্ষেত্রে জন্মপরিচয়ের চেয়ে বড় হতে পারে।

এই বিশ্বকাপ আরেকটি বিষয়ও সামনে নিয়ে এসেছে—স্বেচ্ছাসেবকদের ভূমিকা। হাজার হাজার তরুণ-তরুণী, মধ্যবয়সী মানুষ, এমনকি অবসরপ্রাপ্ত নাগরিকও এই আয়োজনের অংশ হয়েছেন। তারা আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন না, ক্যামেরাও তাদের খুঁজে বেড়ায়নি। কিন্তু তাদের হাসিমুখ, আন্তরিকতা ও শ্রম ছাড়া এমন একটি আয়োজন সফল হওয়া সম্ভব হতো না। বিশ্বকাপ আমাদের শেখায়, বড় সাফল্যের পেছনে অসংখ্য নীরব মানুষের অবদান থাকে।

প্রযুক্তিও এবারের বিশ্বকাপে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশ্বের এক প্রান্তে বসে থাকা একজন দর্শকও মুহূর্তের মধ্যে অন্য প্রান্তের উল্লাসের অংশ হয়ে গেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশ্বকাপকে শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, বরং একটি বৈশ্বিক আলাপচারিতায় পরিণত করেছে। একটি গোল, একটি সেভ, একটি কান্না বা একটি আলিঙ্গন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কোটি মানুষের অনুভূতির অংশ হয়ে উঠেছে।

তবে বিশ্বকাপ আমাদের আরও একটি শিক্ষা দিয়ে যায়। জয় চিরস্থায়ী নয়, পরাজয়ও নয়। আজকের চ্যাম্পিয়নকে আগামীকাল আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। আর আজ যে হেরে গেছে, আগামী বিশ্বকাপে সেই-ই হয়তো ট্রফি উঁচিয়ে ধরবে। খেলাধুলার এই দর্শন জীবনকেও ব্যাখ্যা করে। সাফল্য যেমন স্থায়ী নয়, ব্যর্থতাও শেষ কথা নয়।

বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে, কিন্তু পৃথিবী এখনো অশান্ত। কোথাও যুদ্ধ চলছে, কোথাও ক্ষুধা, কোথাও জলবায়ু সংকট, কোথাও ঘৃণার রাজনীতি। এমন এক সময়ে ফুটবল আমাদের অন্তত কয়েক সপ্তাহের জন্য হলেও মনে করিয়ে দিয়েছে—মানুষ চাইলে একসঙ্গে আনন্দ করতে পারে, একসঙ্গে স্বপ্ন দেখতে পারে।

হয়তো এটাই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় জয়। ট্রফি একজন অধিনায়কের হাতে ওঠে, কিন্তু উৎসবটি হয়ে যায় পুরো পৃথিবীর। শেষ বাঁশি বাজলেও সেই আনন্দ, সেই কান্না, সেই স্মৃতি এবং সেই মানবিক সংযোগ রয়ে যায় মানুষের হৃদয়ে।

বিশ্বকাপ তাই মানবসভ্যতার এক বিরল মিলনমেলা, যেখানে ভাষার অনুবাদ লাগে না, ভিসার প্রয়োজন হয় না, রাজনৈতিক সীমারেখা মুছে যায়, আর কোটি কোটি মানুষ একই মুহূর্তে একই আবেগে স্পন্দিত হয়।

পরবর্তী বিশ্বকাপের জন্য অপেক্ষা আজ থেকেই শুরু। কিন্তু সেই অপেক্ষার মাঝেও আমাদের মনে রাখা উচিত, ফুটবলের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ট্রফি জেতা নয়; বরং মানুষকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসা। বিভক্ত পৃথিবীতে এই শিক্ষা আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।
 

খেলাধুলা থেকে আরো পড়ুন