https://www.prothomalony.com/

13793

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত‍্য

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৫ ০০:৩৬

নজরুলের কবিতায় শ্রেণিচেতনা

দীপংকর গৌতম

 

দরিদ্র, নিপীড়িত মানুষের জন্য জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মমত্ব কতটা অসীম, সেটা তার বিভিন্ন লেখায় প্রকাশিত হয়েছে। দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনতে তিনি লিখেছেন দুহাতে। তার 'সাম্যবাদী' কবিতাগ্রন্থে এর পরিষ্কার অভিব্যক্তি দেখা যায়। এই বইয়ে 'কুলি মজুর' কবিতায় তিনি লিখেছেন- 

'দেখিনু সেদিন রেলে,/ কুলি বলে এক বাবু সাব তারে ঠেলে দিলে নীচে ফেলে!/ চোখ ফেটে এলো জল,/ এমনি করে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?'  

সময় বহু পার হলেও এই কবিতার বাস্তবতা আমাদের অন্তরে নিপীড়কের বিরুদ্ধে অভিঘাত তোলে। প্রতিনিয়তই মনে হয়, এই সমাজ না-ভাঙা পর্যন্ত এসব দৃশ্য কোনো কালেই যাবেনা। এই সমাজ ভাঙার জন্য শ্রেণি সংগ্রামের বিকল্প নেই। কিন্তু এখানে প্রশ্ন হলো, আজ যে কবিতা দেখে শ্রেণি সংগ্রামের কথা মাথায় আসে, সেই কবিতা যিনি লিখেছেন, তার শ্রেণি সংগ্রামের এই চেতনার উৎস আছে কি?

'বিদ্রোহী' কবিতায়ও নজরুলের খেদ ভাঙার যে তেজ, তার উৎস কি শুধু ইংরেজরা? নজরুল বিদ্রোহী কবি, সাম্যের কবি; এটা নিঃসন্দেহে কিন্তু তার চেতনায় বলয় বৃদ্ধিতে আরেকজন মানুষের অবদানকে অস্বীকার করার উপায় নেই। তিনি হলেন ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মুজাফ্‌ফর আহমেদ। মুজাফ্‌ফর আহমদের সঙ্গে নজরুলের পরিচয়, সখ্য ও বসবাস একটি বিশেষ ঘটনা। মেহনতী মানুষের প্রতি অসীম দরদ ও তাদের শ্রেণিমুক্তির জন্য শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে তার যুদ্ধ ঘোষণা- এটা পরিশীলিত এজন্যে যে, হুটহাট করে কোনো চিন্তা করে কবি এক কলমও লেখেননি। সমাজের অধিকার হারা বঞ্চিত মানুষের প্রতি নজরুলের ভালোবাসা, দেশপ্রেম ইত্যাদি সাম্যবাদী চেতনায়, প্রলেতারিয়েত শ্রেণির রাজনীতিতে প্রবাহিত হয়েছিল কমরেড মুজাফ্‌ফর আহমেদের সান্নিধ্যে এসেই। 

'কাজী নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা' শিরোনামে যে বই তিনি লিখেছেন, তার মধ্যে তার অদেখা অতীত জীবনের অনেক ঘটনা উল্লেখ করেন। ক্লাসে ছাত্রদের মধ্যে সব সময় প্রথম হওয়া সত্ত্বেও দশম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায়ই তার যুদ্ধে যাওয়ার ঘটনাকে 'ম্যাট্রিকুলেশন পাসের চেয়ে দেশপ্রেমকেই উচ্চাসন দিয়েছেন নজরুল' বলে মন্তব্য করেছেন মুজাফ্‌ফর আহমদ।

'একটি অসাম্প্রদায়িক সমাজ বিনির্মাণে যে কজন বাঙালি সারা জীবন নিরলস কাজ করে গেছেন, তাদের মধ্যে একেবারে শীর্ষস্থানীয় কাজী নজরুল ইসলাম'- ঐতিহাসিক শুভবসুর এ কথার সমর্থন মেলে কমরেড মুজাফ্‌ফর আহমদ যখন বলেন, 'হিন্দু জমিদার কর্তৃক চালিত স্কুলে বেতন দিতে হতো না নজরুলকে। শুধু তাই নয়, তার হোস্টেলের খরচ ও মাসে ৭ টাকা জোগান দেওয়ার ব্যবস্থাও করেন ওই হিন্দু জমিদারেরাই। সম্ভবত এভাবেই নজরুল সমাজে অসাম্প্রদায়িকতার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এভাবেই অসাম্প্রদায়িকতার বীজও প্রোথিত হয় তার মনের গভীরে।'

রবীন্দ্রনাথ ওই অর্থে বিপ্লবী না, তিনি বিপ্লবী হতেও চাননি। তবু তৎকালীন ভারতবর্ষের খোল-নলচে বদলে দিতে একজন বিপ্লবীর আবির্ভাব কামনা করেছিলেন একান্তভাবে। সে জন্যে তিনি কবিতায় লিখেছিলেন- 'ঘরের মঙ্গলশঙ্খ নহে তোর তরে,/ নহে রে সন্ধ্যার দীপালোক,/নহে প্রেয়সীর অশ্রু-চোখ/ পথে পথে কণ্টকের অভ্যর্থনা,/পথে পথে গুপ্তসর্প গূঢ়ফণা।/ নিন্দা দিবে জয়শঙ্খনাদ/ এই তোর রুদ্রের প্রসাদ।'

তবে কি রবীন্দ্রনাথ নজরুলের অপেক্ষায়ই ছিলেন? তবে একথা ঠিক যে, কমরেড মুজাফ্‌ফর আহমেদের কারণে নজরুল সাংবাদিক ও সম্পাদক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন।তারা দুজনে একসঙ্গে পত্রিকাও সম্পাদনা করেছেন। পত্রিকা বন্ধ হয়েছে আবার পত্রিকা করেছেন। তবু তারা মানুষের পক্ষে কথা বলা বন্ধ করেননি। 

'নবযুগ' বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও রাজনীতিবিদ কমরেড মুজাফ্‌ফর আহমদের যুগ্ম সম্পাদনায় প্রকাশিত পত্রিকা। এটি ১৯২০ সালের ১২ জুলাই সান্ধ্য পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হওয়া শুরু করে। এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন শের-এ-বাংলা এ কে ফজলুল হক। তিনি নিজ অর্থে এই পত্রিকা প্রকাশ করেন। ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে পত্রিকাটিতে অনেক কবিতা ছাপা হয়। এক পর্যায়েব্রিটিশ সরকার এ পত্রিকার জামানত বাজেয়াপ্ত করে ও পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়। শের-এ-বাংলা এ কে ফজলুল হকের চেষ্টায় পত্রিকাটি আবার প্রকাশিত হয়। পরে ফজলুল হকের সঙ্গে মতবিরোধের কারণেন জরুল ও মুজাফ্‌ফর আহমদ সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করলে পত্রিকাটি আবার বন্ধ হয়ে যায়। 'নবযুগ' বন্ধ হলে কাজী নজরুল ইসলামের অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা ধূমকেতুর পত্রিকা প্রকাশ করেন। কমরেড মুজাফ্‌ফর আহম্মদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল খুবই অন্তরাত্মার। ধূমকেতু প্রকাশ বাংলা সংবাদপত্রের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা বললে ভুল হবে না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাধ ঠাকুর বিদ্রোহী কবিকে যেমন ভালোবাসতেন, তেমনি আশীর্বাদও করেছিলেন পত্রিকাটিকে। ধূমকেতুর প্রথম সংখ্যা বের হয়েছিল ১৯২২ (১০২৯) সালের ১১ আগস্ট। ৩২টি সংখ্যা প্রকাশের পর ১৯২৫ সালে (১৩২৯) এটি বন্ধ হয়ে যায়। পত্রিকার ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯২২ সংখ্যায় নজরুলের কবিতা আনন্দময়ীর আগমনে প্রকাশিত হয়। এই রাজনৈতিক কবিতা প্রকাশিত হওয়ায় ৮ নভেম্বর পত্রিকার ওই সংখ্যা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। ভারতের রাজনীতিতে সমধিক পরিচিত সেই খ্যাতিমান ব্যক্তি কমরেড মুজাফ্‌ফর আহমেদ 'দ্বৈপায়ণ' ছদ্মনামে ধূমকেতুতে তিনখানি পত্র লিখেছিলেন। নজরুল ইসলামকে সারথি নামে সম্বোধন করে লেখা ছিল তার চিঠি। দ্বৈপায়ণের প্রথম পত্রটি মুদ্রিত হয় 'ধূমকেতুরর ১৩শ সংখ্যায় (২৬ আশি^ন, ১৩ অক্টোবর ১৯২২)।দৈনিক ইত্তেফাকে এবং ১ সেপ্টেম্বর ২০০৬ সালে চিঠিটি ছাপা হয়েছিল। সেখান থেকে কিছুটা পত্রস্থ করা হলো- 

'ভাই সারথি, তোমার "ধূমকেতু" আমি রীতিমতো পড়ছি, কিন্তু সত্য কথা বলতে কি, সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে যে জিনিসটি চাইছি, সেটিই ওতে আমি পরিস্ফুটরূপে পাচ্ছিনে। আমার দেশের নির্যাতিত জনমণ্ডলীর প্রতি তোমার সহানুভূতি আছে। তোমার লেখাতেই তার পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু বড় দুঃখ যে, তুমি তাদের বিষয়ে পরিষ্কার করে আজও কিছু বলনি। নির্যাতিত জনসাধারণ বলতে আমাদের দেশের কৃষক ও শ্রমিকদিগকে বুঝি। এ ছাড়া আর সবাই নির্যাতনকারী নির্যাতিত নয়। এই সেদিনও "সনাতন" নামে একখানা কাগজ মধ্য শ্রেণির বাঙালির জন্য চোখের জল ফেলতে ফেলতে বাজারে বার করেছে।কিন্তু ওই মধ্য শ্রেণির লোকরা কি কম অত্যচারী? দেশের দাসত্বেও নিগড়কে সুদৃঢ় করার জন্য যতটা দায়ী জমিদার ও ধনী লোকেরা; তার চাইতে একটুও কম দায়ী নয় এই মধ্য শ্রেণির লোকেরা।'

এই চিঠির মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন বোঝা যায় তৎকালীন ভারতের শ্রেণির রাজনীতি ও কমরেড মুজাফ্‌ফর আহমদের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্ক। অন্যদিকে শ্রেণির মুক্তির প্রশ্নে নজরুলের দায়। নজরুলের সাম্যবাদী চেতনার এই জায়গা নির্মাণে কমরেড মুজাফ্‌ফর  আহমেদের অবদানকে কোনোমতে খাটো দেখা যাবে না।

 

 

জাতীয় কবি নজরুল: নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর

হৃদয় পান্ডে

 

ইতিহাসের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে কিছু মানুষ জন্ম নেন যাঁরা হয়ে ওঠেন এক জাতির মুখপাত্র। বঞ্চিত, শোষিত, নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর। কাজী নজরুল ইসলাম ঠিক তেমনই এক বিস্ময়কর প্রতিভা, যিনি তাঁর কবিতা, গান, প্রবন্ধ, নাটক ও উপন্যাসের মধ্য দিয়ে জাগিয়ে তুলেছেন হাজারো ঘুমন্ত প্রাণ, প্রতিবাদী করে তুলেছেন দুর্বল কণ্ঠ, এবং গড়ে তুলেছেন এক মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক চেতনার সমাজচিত্র। জাতীয় কবির সম্মান তাঁকে শুধু তাঁর সাহিত্যকীর্তির জন্য নয়, তাঁর অন্তরের গভীরতা, সাহসিকতা, সমাজ সচেতনতা এবং নিপীড়িতদের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসার জন্য দেওয়া হয়েছে। তাঁর কণ্ঠ কেবল নিজের নয়, সেইসব মানুষের, যারা সমাজের প্রান্তে, বঞ্চনার অতল গহ্বরে পড়ে থেকেও নিজের কথা বলার সুযোগ পায় না।

 

নজরুলের কবিতা শুরু থেকেই এক ঝড়ো চেতনার বাহক ছিল। ১৯২২ সালে প্রকাশিত 'বিদ্রোহী' কবিতাটি যেন শুধু একটি কবিতা নয়, একটি যুগান্তকারী ইশতেহার। এখানে কেবল একজন মানুষের আত্মপ্রকাশ নয়, একটি জাতির, একটি সমাজের, একটি বৈষম্য-পিষ্ট জনগোষ্ঠীর অন্তর্গত আর্তনাদ ধ্বনিত হয়। 'আমি চির বিদ্রোহী বীর' এই উচ্চারণে যেন শোষকের ভিত কেঁপে ওঠে, আর শোষিতের বুকের মধ্যে জন্ম নেয় সাহস। নজরুল বিদ্রোহ করেন ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে, ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে, সমাজের পচা কুসংস্কার ও শ্রেণিবিভেদের বিরুদ্ধে। তিনি ছিলেন নিপীড়িতদের ব্যথার কবি—কিন্তু এই ব্যথা তাঁর কাব্যে পরিণত হয়েছে শক্তিতে, এই কান্না রূপ নিয়েছে বজ্রনিনাদে। ফলে নজরুলের কবিতা শুধু আবেগময় নয়, তা আন্দোলনের ভাষা, বিপ্লবের হাতিয়ার।

 

নজরুলের সময় ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে উত্তাল এক সময়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন একদিকে মানুষের স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করেছিল, অপরদিকে সমাজে ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন গভীরতর হয়ে উঠছিল। 

এসময় নজরুল নির্ভীকভাবে লিখেছেন "আমরা হিন্দু না মুসলমান—আমরা মানুষ।" তিনি ধর্মকে দেখেছেন মুক্তির পথ হিসেবে, বিভেদের হাতিয়ার হিসেবে নয়। তাঁর কণ্ঠস্বর ধর্মের নামে নিপীড়নের বিরুদ্ধেও সোচ্চার, যেমনটি আমরা পাই তাঁর প্রবন্ধ 'ধর্ম ও মানবতা'তে। নজরুলের দৃষ্টিতে প্রকৃত ধর্ম কখনো মানুষকে গুটিয়ে দেয় না, সে মানুষকে মুক্ত করে, ভ্রাতৃত্ব শেখায়, সহানুভূতি ও ন্যায়বোধে জাগ্রত করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে করে তুলেছে বাঙালির অসাম্প্রদায়িকতার প্রথম ও প্রধান কবি।

 

একজন নিপীড়িত মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো তার বেদনার ভাষা, আর নজরুল সেই ভাষার রূপকার। তিনি কৃষক-শ্রমিকের কথা বলেছেন, নারীর স্বাধীনতার কথা বলেছেন, 'নারী' কবিতায় নারীর শক্তিকে ঈশ্বরতুল্য করেছেন, এবং 'মানুষ' কবিতায় সব ধর্ম-বর্ণ-জাতি-লিঙ্গের ঊর্ধ্বে উঠে ঘোষণা করেছেন " গাহি সাম্যের গান, যেখানে এসে এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান।" এই সাম্যের স্বপ্ন আজকের বিশ্বে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের নিপীড়িত জনগণের জন্য এক অনন্ত প্রেরণা। নজরুল যখন বলেন "দুলে উঠুক ধরণী, ঘুরুক গ্রহতারা/জেগে উঠুক নিষ্পেষিত, উঠুক জগৎসারা" তখন তা এক বাস্তব সমাজবদলের ডাক।

 

নজরুলের গানও নিপীড়িতের মুক্তির সুর হয়ে উঠেছে। তাঁর রাগাশ্রয়ী ইসলামী সংগীত যেমন ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক অনন্য রূপায়ণ, তেমনি তাঁর 'চাষার গান' , 'বিদ্রোহী দল', 'দরির গান', 'কারার ঐ লৌহ কপাট' ইত্যাদি গান গণমানুষের হৃদয়ে বিদ্রোহ ও আত্মমর্যাদার আগুন জ্বালিয়েছে। তিনি যে গানে বলেন "জাগো অনশন-সন্তান, উঠরে যত ভুখা,/আজ দুনিয়ার রাঙা রোদে কাঁপছে কাতর দুখা" সেই গান নিপীড়িতের কান্নাকে রূপ দেয় সংগ্রামের চেতনায়। নজরুল কাঁদেন নিপীড়িতের সাথে, কিন্তু কাঁদতে কাঁদতে তিনি গান বাঁধেন যা মানুষকে জাগায়, সাহস দেয়।

 

নজরুলের জীবনের নিজের অভিজ্ঞতাও তাঁকে এই সংগ্রামের দিকে নিয়ে গেছে। তিনি নিজেই দরিদ্র, পিতৃহীন, পথশিশু, সৈনিক, আবার এক সময়ের সম্পাদিত পত্রিকায় "আনন্দময়ীর আগমনে" কবিতা ছাপিয়ে ব্রিটিশ সরকারের কারাগারে বন্দী হন। তাঁর জীবনের দুঃখ-বঞ্চনা, অপ্রাপ্তি ও ব্যর্থতাও তাঁকে পিছিয়ে দেয়নি, তাতেই তিনি গড়েছেন নিজের কাব্যচেতনা। তাই তিনি নিপীড়িতের কথা বলেন নিছক সহানুভূতি থেকে নয়, তা আসে তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও আত্মজ জীবনের ভেতর থেকে। তিনি নিপীড়িতকে দূর থেকে দেখে হাত নেড়ে সমবেদনা জানাননি, তাঁদের কাতারে দাঁড়িয়ে কণ্ঠ মিলিয়েছেন।

 

আজকের বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিস্থিতিতে নজরুল আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন। যখন দারিদ্র্য, বৈষম্য, ধর্মীয় উগ্রতা ও নারী নিপীড়ন সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে, তখন নজরুলের কথা আমাদের আবারও ভাবতে শেখায়। তাঁর কণ্ঠস্বর আজও আমাদের বলে বিপ্লব চাই, কিন্তু তা মানবিক হতে হবে। ধর্ম চাই, কিন্তু তা সহানুভূতির হোক। প্রেম চাই, কিন্তু তা আত্মমর্যাদায় গঠিত হোক। একটি রাষ্ট্র তখনই পরিপূর্ণ হয়, যখন সে নিপীড়িতের ভাষা ধারণ করতে পারে, আর সে ভাষার অনুবাদক ছিলেন নজরুল।

 

নজরুলকে আমাদের কেবল জাতীয় কবি হিসেবে নয়, জাতীয় বিবেক হিসেবেও দেখতে হবে। তিনি আমাদের আত্মপরিচয়ের, আত্মমর্যাদার এবং মানবতার প্রতীক। তাঁর সাহিত্যচর্চা ছিল বিদ্রোহের মধ্যে দিয়ে মানুষকে মানুষ করার প্রচেষ্টা। আজকের সমাজে যদি নজরুলের কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হয়, তাহলে হয়তো নতুন করে সৃষ্টি হবে এক মানবিক, সাম্যভিত্তিক ও ন্যায়ের সমাজ।

 

 

সব মানুষের কবি নজরুল

শেখ একেএম জাকারিয়া

 

'থাকব না কো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে

কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।'

 

পঙ্‌ক্তি দুটি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের 'সংকল্প' কবিতা থেকে উদ্ধৃত। আমাদের দেশে অনেক খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিক আছেন, যাঁদের কবিতা-গল্প-গান-উপন্যাসে বাংলা সাহিত্য যুগে যুগে সমৃদ্ধ হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম একটু ব্যতিক্রম। তিনি বিদ্রোহের কবি, মানবতার কবি, প্রেমের কবি। বাংলা ভাষাভাষী মানুষ বাংলা সাহিত্যে তাঁর  অবদান কখনো ভুলবে না।

 

কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ সালের ২৪ মে (১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কাজী ফকির আহমদ এবং মাতার নাম জায়েদা খাতুন। নজরুলের বাল্যনাম ছিল দুঃখু মিয়া। বাল্যকাল থেকেই তিনি ছিলেন অসাধারণ বোধশক্তিসম্পন্ন। গাঁয়ের মক্তব থেকে পাঠশালা পেরিয়ে ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুর হাইস্কুলে কিছুদিন পড়ালেখা করেন। পরে ভর্তি হন বর্ধমান জেলার রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ হাইস্কুলে। এখানেই দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় ৪৯ নম্বর বেঙ্গলি রেজিমেন্টে সৈনিক হয়ে প্রথম মহাযুদ্ধে যোগ দেন। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার এখানেই সমাপ্তি ঘটে।

 

নজরুলের কর্মজীবন শুরু হয় কৈশোরেই। মাত্র বারো বছর বয়সে লেটো গানের দলে যোগ দেন, যেখানে প্রথম উপার্জন শুরু হয়। এরপর আসানসোলে একটি রুটির দোকানে মাসিক এক টাকা বেতনে চাকরি করেন। সৈনিক হিসেবে কিছুদিন কাজ করার পর সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। সাংবাদিক হিসেবেও নজরুল প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখেন। তাঁর সম্পাদিত নবযুগ, লাঙল ও ধূমকেতু পত্রিকা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

১৯২০ সালে তিনি পুরোদমে সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতা মুক্তি, তবে যে কবিতার জন্য তিনি পরিচিতি লাভ করেন তা হলো বিদ্রোহী। এই কবিতার মাধ্যমে তিনি 'বিদ্রোহী কবি' হিসেবে পরিচিত হন। আনন্দময়ীর আগমনে কবিতাটি রচনা করে তিনি ব্রিটিশ শাসকদের ব্যঙ্গ করেন, যার ফলে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়।

সাহিত্যচর্চার সুযোগ খুব বেশি সময় পাননি নজরুল। অল্প সময়েই তিনি রচনা করেন অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশি, চক্রবাক, দোলনচাঁপা, ফণীমনসা, কুহেলিকা, মৃত্যুক্ষুধা ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থ ও উপন্যাস। প্রায় দুই হাজার গান রচনা করেন, যার সুর ও শব্দের বৈচিত্র্য এখনও মানুষকে মুগ্ধ করে।

১৯২৯ সালে কলকাতার অ্যালবার্ট হলে বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে তাঁকে সম্মাননা দেওয়া হয়। ১৯৩৮ সালে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতির আসনে বসিয়ে সম্মান জানানো হয়। ১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'জগত্তারিণী' স্বর্ণপদক, ১৯৬০ সালে ভারত সরকারের 'পদ্মভূষণ' উপাধি এবং ১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি.লিট উপাধি লাভ করেন। ১৯৭৬ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন।

 

১৯৪২ সালে নজরুল মস্তিষ্কের পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। চিকিৎসার জন্য তাঁকে বিভিন্ন দেশে নেওয়া হলেও তিনি আর সুস্থ হননি। এরপর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি নীরব ছিলেন। ১৯৭২ সালে  শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে তাঁকে বাংলাদেশে এনে নাগরিকত্ব ও জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গণে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় তাঁকে দাফন করা হয়। প্রতি বছর তাঁর জন্ম ও মৃত্যুদিনে তাঁর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

 

বাঙালির অহংকার কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সাহিত্যসাধনার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন। তিনি শুধু একটি সময়ের কবি নন, তিনি সব সময়ের, সব মানুষের কবি। তাঁর সাহসী উচ্চারণ, প্রেম ও প্রতিবাদের ভাষা যুগে যুগে আমাদের প্রেরণা দিয়ে যাবে।

 

 

গীতপ্রভু নজরুল

সুমন শামসুদ্দিন

 

দুখুর চিত্ত অগ্নিরিক্ত নার্গিস বনে ঝড়,

অগ্নিবীণার অগ্নিকণা বঙ্গভাষার বর।

দুর্বিপাকের দৈন্যজীবন অলীক উপকূল, 

বুলবুলিটার কণ্ঠ রুদ্ধ, গীতপ্রভু নজরুল।

 

দোলন চাঁপায় কোমল-হৃদয় কাব্য-জাদুকর,

সর্বহারা বিষের বাঁশি ছন্দযুগল স্বর।

দ্রোহের দহন ধূমকেতু আর বিদ্রোহী তার গান,

অদম্য সেই প্রেমিক পুরুষ বাঁধনহারা প্রাণ।

 

সাম্যবাদের অগ্র-পথিক কাব্য-গীতি বীর,

কৃষ্টি-সৃজন অধ্যেতা সে কৃতি উচ্চশির।

অভেদ-মানব ঐক্য-কুঞ্জে উদ্ভাসে তাঁর সুর,

বঙ্গভাষীর মানসপীঠের মুখ্য অন্তঃপুর।

 

প্রেম ও দ্রোহ তাঁর লিখনে দীপ্ত-কীরণ সম,

পদ্মভূষণ কবির কাব্যে বাংলা করে নমঃ।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন