https://www.prothomalony.com/
11363
foundation
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৪ ০২:২৪
"গত সপ্তাহের এক জরিপে দেখা গেছে আরব আমেরিকান ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পের প্রতি জনপ্রিয়তা বেড়েছে। তাদের ৪৫ শতাংশ ট্রাম্পকে সমর্থন দিচ্ছে। গাজা যুদ্ধের কারণে ভোটারদের সমর্থন থেকে পিছিয়ে পড়ছে ডেমোক্র্যাটরা। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ইসরায়েল প্রীতি কমলা হ্যারিসের নির্বাচনে জয়ের আশাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে"-আসন্ন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে এমনটাই সমালোচনা করেছেন সিনিয়র সাংবাদিক মনোয়ারুল ইসলাম।
২৫ অক্টোবর প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার জনপ্রিয় সাপ্তাহিক সম্প্রচার 'টক অফ দ্য উইক' এ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন তিনি। সাংবাদিক মনোয়ারুল ইসলাম নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেসক্লাব এর প্রেসিডেন্ট। তিনি সাপ্তাহিক নিউইয়র্ক কাগজ এর সম্পাদক। যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন নির্বাচন ছাড়াও বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি কথা বলেছেন।
ঘনিয়ে আসা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে আছেন- রিপাবলিকান ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ডেমোক্র্যাটিক কমলা হ্যারিস। অনুষ্ঠানের প্রথমেই মনোয়ারুল ইসলামের কাছে প্রার্থীদের প্রচারণা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। তিনি বলেন, "এবারের নির্বাচন বেশ জটিল। ভিন্ন জরিপে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। কোথাও কমলা হ্যারিস আবার কোথাও ডোনাল্ড ট্রাম্প এগিয়ে আছেন। জাতীয়ভাবে করা জরিপগুলোতে কমলা হ্যারিস এগিয়ে থাকলেও সুইং স্টেটের জরিপের ফলাফল বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম আসছে। বিশেষ করে পেনসিলভেনিয়া, জর্জিয়া, উইসকনসিন, এরিজ্যোনা, মিশিগান, এবং নর্থ ক্যারোলাইনার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্টেটগুলোতে যারা ভালো করবেন তারাই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন। স্বভাবতই লাল স্টেটগুলো রিপাবলিকান এবং নীল স্টেটগুলো ডেমোক্র্যাটিক দলের দিকে যাবে। নিউইয়র্ক, নিউজার্সি, কানেকটিকাট স্টেটগুলোর ইলেক্টোরাল ভোট ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে যাবে। জর্জিয়ার জরিপে কমলা এবং ট্রাম্প দুজনেই সমান সমান আছেন। নভেম্বরের ৫ তারিখের আগে কিছুই বলা যাচ্ছে না। প্রবাসীরা আমরা সবাই মিশিগান স্টেটকে নিয়ে উদ্বিগ্ন। ২০১৬-এ মিশিগানে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিজয়ী হয়েছিল। ২০২০-এ মিশিগানে বাইডেন বড় ব্যবধানে জয়ী হন। মিশিগান স্টেটের একটা বড় অংশ হচ্ছে ইমিগ্র্যান্ট যাদের বেশির ভাগই আরব আমেরিকান। বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায় পূর্বে ডেমোক্র্যাট সমর্থন করে এসেছে। গতবারের জো বাইডেনের মিশিগান জয়ের পিছনে মুসলমানদের অবদান কাজ করেছে। কিন্তু এবারে মিডিয়া রিপোর্ট থেকে দেখতে পারছি যে আরব মুসলিমদের একটা বড় অংশ ডোনাল্ড ট্রাম্পের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। সেই ক্ষেত্রে মিশিগান আর পেনসিলভেনিয়া যদি কোনভাবে ডেমোক্র্যাটদের হাতছাড়া হয়ে যায়, তাহলে কমলা হ্যারিসের বিজয়ের সম্ভবনা কম। পেনসিলভানিয়া, জর্জিয়া, মিশিগানের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্টেটে ডেমোক্র্যাট জয়লাভ করলে আমরা মোটামুটি নিশ্চিত হবো যে কমলা হ্যারিস প্রসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন।"
অর্থৈতিক বৃদ্ধি বা সুবিধা, স্বাস্থ্যসেবা, ইমিগ্রেশন নীতি-এসব দিক থেকে আমেরিকান নাগরিকরা কাকে দিয়ে বেশি উপকৃত হবো বলে জানতে চাওয়া হলে মনোয়ারুল ইসলাম বলেন, "অর্থনৈতিক বিবেচনা অনুযায়ী আমেরিকাবাসীরা ট্রাম্পের উপর বেশি আস্থাশীল। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন সময়ে অনেক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ছিল। তাছাড়াও তার কেলেঙ্কারির অভিযোগ ছিল, অহংকার ছিল, অভিবাসনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের সময়ের অর্থনৈতিক সফলতা মানুষ এখনো ভোলেনি। বিশেষ করে স্টক ব্যাবসা খুব ভালো অবস্থায় ছিল। এদিকে জো বাইডেনের সময় লাখ লাখ আমেরিকান স্টক মার্কেট ধ্বসের কারণে পথে বসেছিল। বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যেও অনেক ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।"
একদা ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। এ বছরের মার্চে ফক্স নিউজের এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইসরায়েলের পক্ষে 'হ্যাঁ' বলেছেন। সমালোচকদের মতে, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র একসাথে গাজাকে এক বুনো রুক্ষ ভূমিতে পরিণত করছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার ইসরায়েলকে সমর্থন করার মাধ্যমে ৫০,০০০ টনেরও বেশি সামরিক সরঞ্জাম, গোলাবারুদ এবং অস্ত্র পাঠিয়েছে। তাদের মতে ইসরায়েলকে অস্ত্র দেওয়া মার্কিন আইনের বিরুদ্ধে। এই বিষয়ে মতামত জানিয়ে মনোয়ারুল ইসলাম বলেন, "যে দলেরই সমর্থক হোক না কেন, আমেরিকা বরাবরই ইসরায়েলের পৃষ্ঠপোষকতা করে। কংগ্রেসম্যান এবং সিনেটরের অনেকেই ইজরায়েলকে আমেরিকার একটা স্টেট হিসাবে ধরে। শুধু তাই না, আমেরিকার বাজেটের একটা বিশাল অংশ একক দেশ হিসাবে ইসরায়েল সবথেকে বেশি সহায়তা পেয়ে থাকে। গত পঞ্চাশ বছরের বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যাবে, ইসরায়েলের বাজেটের সিংহভাগ আমেরিকা থেকে আসে। এখানকার জুইশ কমিউনিটি আমেরিকার রাজনীতিতে বিশাল প্রভাব বিস্তার করার ফলে রাজনীতিবিদরা তাদের উপর নির্ভরশীল। অর্থনীতি ও রাজনীতি ছাড়াও আমেরিকার মিডিয়া, ব্যাবসা, প্রতিষ্ঠান জুইশদের দখলে। গত এক বছর ধরে হত্যাযজ্ঞ চলছে, হাসপাতালে বোমা ফেলে মানুষ মারা হচ্ছে, শিশু হত্যা চলছে, স্কুলগুলো নিরাপদ না। এর পরেও জো বাইডেন ঘোষণা দিয়ে সেখানে অস্ত্র পাঠাচ্ছেন। ইসরায়েল প্রশ্নে তারা দুই দলই সমান, একই সাথে কাজ করছে, আমি আলাদা কিছু দেখি না।"
বাংলাদেশে ছাত্রলীগ নিষিদ্ধের ব্যাপারে মনোয়ারুল ইসলাম জানান, "আমি ব্যাক্তিগতভাবে এই নিষিদ্ধকে সমর্থন করি না। একটা সংগ্রাম ও বিপ্লবের মধ্য দিয়ে হাসিনা সরকারের পতন ঘটেছে। এই বিপ্লবকে আমি দুর্বল বলবো। কারণ বিজয়ের মাধ্যমে বিপ্লব সাধনের পর সাধারণত বিদায়ী গোষ্ঠীর মূলোৎপাটন ঘটে। অর্থাৎ প্রতিবিপ্লব হবার সম্ভবনা থাকে না, সবগুলো শাখা-প্রশাখা ধ্বংস করা হয়। সরকারের পতন হলে ব্যাপক হারে আওয়ামী সমর্থকদের মেরে ফেলা হবে এই আশংকা আওয়ামীলীগ সমর্থকদের ছিল। কিন্তু এই বিপ্লবের ফলে তা ঘটেনি। স্বৈর শাসকদের জন্যে একটা নিরাপদ প্রস্থানের ব্যবস্থা ছিল। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটলেও আশঙ্কাজনিত কোন রক্তপাত হয়নি। বিপ্লবী সরকার হচ্ছে শক্তিশালী সরকার, কঠোর হস্তে সবকিছু দমন করে। যাতে পাল্টা বিপ্লব, বা অভ্যুত্থান না ঘটে। কিন্তু আমি মনে করি এই সরকার কোথায় যেন দুর্বল, যে কারণে সময়ের সাথে পারফেকশন থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। সরকারের দুর্বলতা গুলো প্রকাশ পাচ্ছে। যে জনসমর্থন নিয়ে বিপ্লব ঘটেছিল সেই জনসধারণের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। আবার কোনো অবস্থাতেই কোনো প্রকার যুক্তি দিয়ে এই স্বৈরতন্ত্রকে সমর্থন করার কোন যৌক্তিকতা নেই বলে আমি মনে করি। গত পনের বছরের লাগামহীন স্বৈরশাসনের চিত্র চোখে দেখে নিজের অজান্তেই ফ্যাসিজমের পতন কামনা করেছি। কে ক্ষমতায় আসবে সেটা মাথায় ছিল না। যে ক্ষমতায় আসবে তারা দেশের জন্যে খুব ভালো কিছু পরিবর্তন আনবে এটাই প্রত্যাশা ছিল। ড. ইউনুসের মতো ব্যাক্তিকে পেয়ে সেই প্রত্যাশা বেড়েছিল। কিন্তু আজকে সেনাবাহিনী, পুলিশের ভূমিকা রহস্যজনক। ইউনুস সরকারকে আরো সতর্ক থাকতে হবে।"
বাংলাদেশে গণমাধ্যমে স্ব-আরোপিত নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসায়ী-রাজনীতিবিদদের প্রভাব, এবং সাংবাদিকতার নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটেছে পনের বছর ধরে। নতুন সরকার এ বিষয়গুলো মোকাবিলায় কেমন কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "বিপ্লবের পর সব কিছুর মধ্যে স্বাধীন ভাব আসে। বর্তমানে পত্রিকা এবং সামাজিক মাধ্যমে এই স্বাধীনতাকে অপব্যাবহার করে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। বাক স্বাধীনতা না থাকার কারণে বিগত সরকারের যে কোনো কার্যকলাপের সমালোচনা হলে সেই সংবাদ মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করা হত। সেই বীভৎস অবস্থা থেকে আজকে লেখার, বলার স্বাধীনতা এসেছে। তাকে আমরা যথাযথ ভাবে ব্যবহার না করে অপব্যবহারের মাধ্যমে জাতিকে লজ্জাজনক অবস্থানে ফেলছি। অর্থনৈতিক ভাবে ধ্বংসের শেষ প্রান্তে নিয়ে যাওয়া দেশটিকে দুইমাসে মেরামত করা সম্ভব না। সময় লাগবে।"
দর্শকদের পক্ষ থেকে সুমন শামসুদ্দিন প্রশ্ন রাখেন, "আপনার কি মনে হয় না যে এই ধরনের স্বৈরাচারী শাসকের আমলের পর পুরো আওয়ামীলীগ কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা উচিত ছিল?" মনোয়ারুল ইসলাম বলেন, "কাগজে কলমে নিষিদ্ধ করে লাভ হবে না। দেশের মালিক হচ্ছে জনগণ, তারা নিষিদ্ধ করবে। জনগণকে সম্পৃক্ত করার মধ্য দিয়েই আওয়ামিলীগকে বঞ্চিত করা হোক, দূরে রাখা হোক। এভাবে আইন করে বা প্রজ্ঞাপন জারি করে তাদেরকে আটকানো যাবে না। গণতান্ত্রিক চর্চাকে লালনের মাধ্যমে একটা অবাধ সুষ্ঠ নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। জনগণ যাদেরকে চাইবে না তাদেরকে ভোট দেবে না। এখানে দমন পীড়নের প্রশ্ন আসে না। যারা দুর্নীতি করেছে তাদেরক শাস্তির আওতায় আনা হোক। দলগতভাবে আওয়ামীলীগকে নিষিদ্ধ করা কোন সমাধান নয়।"
দর্শকদের পক্ষ থেকে শামসুন ফৌজিয়ার প্রশ্ন ছিল, "৫ই আগস্টের সমস্ত হত্যাকান্ড আমরা দেখেছি ও জেনেছি। কিন্তু এর পর যে হত্যাগুলো হয়েছে, তার জন্যে কি শুধু ছাত্রলীগ দায়ী না কি অন্য কেউ?" উত্তরে মনোয়ারুল ইসলাম জানান, "৫ই আগস্টের পরে ছাত্রলীগ তাদের দল নিয়ে পালানোর কাজেই ব্যাস্ত ছিল। তখন অতিরঞ্জিত কোন ঘটনা ঘটেনি। অতি উৎসাহী আন্দোলনকামী জনতার কারণেই কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছিল যা একটা বিপ্লবের পরে স্বাভাবিক বলেই ধরা হয়। মানুষের ভিতরে আওয়ামীলীগের প্রতি পুঞ্জিত ক্ষোভটাই ঠেলে বের হয়েছিল। আমার মতে পতিত স্বৈরাচারের দোসররা খুবই ভাগ্যবান এবং আওয়ামিলীগ ও তাদের সমর্থকরাও ভাগ্যবান যে অনেকের প্রত্যাশিত তেমন সহিংসতা ঘটেনি।"
এভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন ও বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সেদিনের আলোচনা পর্বটি শেষ করেন উপস্থাপিকা সোহানা নাজনীন। পরিচালনায় ছিলেন এইচ বি রিতা। প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার সাপ্তাহিক সম্প্রচার "টক অফ দ্য উইক" প্রতি বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক সময় রাত নয়টায় ফেসবুকে লাইভে সম্প্রচারিত হয়ে থাকে।
ফাউন্ডেশন থেকে আরো পড়ুন