https://www.prothomalony.com/

11291

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত‍্য

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৪ ০১:৫৩

আশ্বিনের শারদ প্রাতে 

অপূর্ব চক্রবর্তী
সত্যি বলতে কি একটু আধটু ধূমপান করা ছাড়া আমার তেমন কোনো নেশার টান বড় একটা নেই। ছিলোও না কোনদিন। আর ছোটখাটো নেশা, সে সবই তো এখন অতীত স্মৃতি মাত্র। তবুও সেদিন নিজেকে কেমন যেন সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা 'কমলাকান্তের দপ্তর' এর আফিমখোড় কমলাকান্তের মতনই মনে হচ্ছিল। আর আমার অপরের দুয়ারে আড়ি পেতে কথা শোনার বদ্অভ্যাসও কোনদিনই ছিল না। 

আসলে এখন তো আশ্বিন মাস চলছে তাই রাতের ঘুমটা বেশ জমিয়েই এসেছিলো শেষ রাতের দিকে একটু  ঠান্ডা আমেজে। হঠাৎ দেখলাম আমি কৈলাসে পৌঁছে গিয়েছি। কি দুর্দান্ত সব প্রাকৃতিক দৃশ্যপট চোখে ভেসে উঠলো তা বলে বোঝানো যাবে না। আমি তো চিত্রার্পিত ঐ মনোরম হিল স্টেশন দেখে। সাধে কি দেবাদিদেব মহাদেব ভরা সংসার নিয়ে স্থায়ী বাসিন্দা হয়েছেন এই কৈলাসের। আর পার্বতী মা এই কৈলাসে ঘরকন্না করছেন যুগ যুগ ধরে! কৈলাসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে আমি তো একেবারে হতবাক হয়ে চারদিকে দু'চোখ মেলে শুধু দেখেই চলেছি। হঠাৎ যেন খুবই নীচু আওয়াজে কিছু কথাবার্তার শব্দ কানে ভেসে এলো। 

আমিও সাবধানে কান পাতলাম, থুরি আড়ি পাতলাম আর কি! ষ্পষ্ট শুনতে পেলাম দেবাদিদেব মহাদেব পার্বতী মাকে একান্তে বলছেন, 'বুঝলে গিন্নি এবার আর তোমার মর্তে বাপের বাড়িতে গিয়ে কাজ নেই।' 

শুনেই  পার্বতী মা যেন ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, 'কেন বলতো? বছরে তো এই চারটে দিন ই নিশ্চিন্তে নিজের মতন কোরে একটু শ্বাস ফেলতে পারি তোমার হাজারটা বায়নাক্কা থেকে মুক্তি পেয়ে।' 

এবার গলায় উদ্বেগ নিয়ে মহাদেব বলে উঠলেন, 'আজকাল যে সব কান্ড হচ্ছে ওখানে, ওই যে  আর জি কর হাসপাতালের সমস্ত ঘটনা শুনে তোমাকে সোমত্ত দু'দুটো মেয়েকে নিয়ে ওখানে পাঠিয়ে কি উৎকণ্ঠাতে যে দিন কাটাবো সে তোমাকে মেয়ের বাপ হয়ে কি করে বোঝাবো যে আমি।'

পার্বতী মায়ের চট্ জলদি জবাব, 'কেন কার্তিক গণেশ দু দুটো জোয়ান মদ্দ ছেলে তো আমার সাথেই যাচ্ছে। তুমি আর অতো চিন্তা করো না তো। আর নন্দী ভৃঙ্গী তো রইলোই। মোটে তো চারটে  দিন ঠিক কেটে যাবে দেখো। যাই এবার গোছগাছের ব্যবস্থা করি আমি।' 

তখন মহাদেব বলেই ফেললেন, 'জানো এবার কিন্তু আগের মতন জমাটি আপ্যায়ন পাবে না তুমি। বেশিরভাগ পুজো কমিটিই কিন্তু সরকারি অনুদানের টাকাটা এবার ফিরিয়ে দিচ্ছে। খাতির করার সেই জৌলুস থাকবে না দেখে নিও তুমি। বলছি ওই বলিউড টলিউড আর্টিস্টদের জলসার সেই জলুশ থাকবে না এবারে। তাই বলছিলাম এবার কৈলাসেই থেকে যাও।আর আমিও একটু নিশ্চিন্তে থাকি।' 

কিন্তু মা পার্বতী নাছোড় চট্ জলদি তিনি উত্তর দিলেন, 'পারবে তুমি শ্রীভূমি, সুরুচি সংঘ অথবা চেতলা অগ্রণীর মতো বুর্জ খলিফা, পদ্মাবত সিনেমার সেট আর লেবুতলা পার্কের মতো অযোধ্যার রাম মন্দির কৈলাসে নিয়ে আসতে?'

মহাদেবও হেরে যাবার পাত্র নন মোটেই। তিনিও বলে উঠলেন, 'আরে তুমি চাইলেই পুঁজিপতি কুবেরকে স্পন্সরার কোরে ইঞ্জিনিয়ার বিশ্বকর্মাকে দিয়ে আমি এখানে একটা হোয়াইট হাউস আর অ্যাক্রপলিস্ মল বানানোর ব্যবস্থা করতেই পারি! আর রম্ভা, উর্বশী, মেনকা, তিলোত্তমাদের দিয়ে নারদকে অ্যাঙ্কর করে ভূমি, লকডাউন, ইচ্ছে ডানা, ক্যাকটাস্ আর লক্ষীছাড়াদের থেকে ঢের ভালো একটা জলসার আয়োজন করে দেবো আমি।' 

তবুও মা পার্বতীর ওই একটাই কথা, 'না আমি এবারও মর্তে যাবোই। চারটে দিনই তো শুধু। আমার মেয়েদের দায়িত্ব  নিজেই নিতে পারি আমি। তুমি কি ভুলে গেলে নাকি আমি দশভূজা।' 

তখন মহাদেব আর কি করেন, অনিচ্ছা সত্ত্বেও মা

পার্বতীকে বললেন, 'যাও তবে খুব সাবধানে। আর ভুল করেও যেন পদ্মার ইলিশ খেও না। শুনেছি ঢ়াকা থেকে নাকি ফর্মালিন দেওয়া পঁচা ইংলিশ পাঠাচ্ছে ওরা। আদানীদের কাছ থেকে ধার করা বিদ্যুৎ এর দেনা শোধ করতে। তোমরা বিশেষ করে গনেশকে যেন একটু সামলে খাওয়া দাওয়া করতে বোলো। এখন তো শুনছি জাল ওষুধের দুষ্টু চক্রের  কল্যানে বাজারে ভেজাল ওষুধের রমরমা চলছে। এসব আমি ফেসবুকে দেখেছি। তবু আমি ভার্চুয়ালি উপস্থিত থেকে তোমাদের খেয়াল রাখবো।' 

অতএব মা পার্বতী মর্তে আসার গোছগাছ শুরু করলেন আর ওলা অ্যাপ এ 'দোলা'বুক করলেন। ও টি পি এসে গ্যাছে। পার্বতী মা লক্ষ্মী, সরস্বতী আর কার্তিক, গণেশের সাথে অসুর, সিংহ, ময়ূর, পেঁচা আর ধেড়ে ইঁদুরকে নিয়ে কৈলাসপুরীর দরজায় এসে দাঁড়ালেন দোলার অপেক্ষায়। 

মাঝেমাঝে পার্বতী মা মোবাইলে চেক করে চলেছেন দোলার লোকেশন স্ট্যাটাস্। চালকের কনফার্মেশন কল এসে গ্যাছে দোলা এই এলো বলে।

এরপর ভোরের দিকে আমার কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে গেল বাণী কুমারের অবিস্মরণীয় গ্রন্থনা ও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কণ্ঠের মহালয়া পাঠের মূর্ছনায়-'আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক মঞ্জীর; ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা; প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তা!' 

যাক তবে মা আসছেন, চারদিকে এত্তোসব দুর্নীতি, দুর্যোগ আর খারাপ খবরের মাঝেও এটাই তো একমাত্র আশার আলো মর্তবাসীর কাছে। মা যেন দুর করেন সব অন্যায়ের আর বিনাশ করেন সব অসুর বৃত্তির। সব নিরাশার অন্ধকার পার্বতী মা যেন তার আপন তেজোময় আলোকবর্তিকায় আশার আলোতে আলোকিত করে তোলেন। অবশ্য মহাদেব জেনে খুশি হবেন যে, এবার  মহালয়ার অনেক আগে থেকেই রাজ্যসরকারের তরফ থেকে বিসর্জনের কার্নিভালের বরাত দেওয়া হয়ে গ্যাছে। আর মা পার্বতী এবার কৈলাসে ফিরে যাবেন ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে। শাস্ত্রে বলে যার ফল হবে ছত্রভঙ্গ।

 

 

সন্ধ্যা নামার আগে 

সৈয়দ নূরুল আলম 
গতকাল আব্দুল মারা গেল। আবুলের অবস্থাও ভালো না। যে-কোনো সময় সংবাদ আসতে পারে। সিসিইউতে ভর্তি আছে। ডাক্তার বার্তা দিয়ে দিয়েছেন।

ইদানিং কবিদের মৃত্যু সংবাদ বেশি আসছে। আব্দুল এবং আবুল দুজনেই কবি। এর আগে কবি মতলব মারা গেলেন। তার আগে কবি আদনান মারা গেলেন। কবিরা কেন অকালে এভাবে চলে যাচ্ছেন তা কবি হাসান মাহমুদ আল কোরেশির মাথায় খেলে না।

আবুলের কবিতা: বোধের এবং সৌন্দর্যের- এতটুকু লিখার পর হাসান মাহমুদ আল কোরেশির কলম থেমে আছে। আর কিছু লিখতে পারছে না। নিজের মধ্যে শোকের আবহাওয়া আনতে পারছে না। মনের মধ্যে শোকের ছায়া না থাকলে শোকের কথা আসে কী? 

'কবি আবুল হচ্ছেন অনেকটাই ত্রিকালদর্শী মানুষ। তিনি অতীতকে দেখেন ইতিহাসে, কিংবদন্তিতে, কাহিনিতে, সাহিত্যে, নাটকে, সিনেমায় এবং তার সঙ্গে যোগ হয় তার আপন অতীতভেদী দৃষ্টি। কবি আবুল দেখেন বর্তমান। আর দশজন মানুষ যা দেখেন তিনি তা দেখেন। কিন্তু তিনি দেখেন আরো বেশি। সাধারণ মানুষ বর্তমানের বাহ্যিক রূপটাই মূলত দেখেন কিন্তু কবি আবুল লক্ষ করতেন নিবিড় পর্যবেক্ষণের মেধা ও মন নিয়ে। তিনি অতীতের সঙ্গে বর্তমানের যোগসূত্রটি আবিষ্কার করেছেন, পুনঃস্থাপন করেছেন এবং প্রয়োজনে অতীতকে বর্তমান করে তোলেন সুচারু শৈল্পিকতায়। কবি আবুল সৃজনশীল মানুষ, তার সৃজনশীলতার মাপকাঠি আলাদা এবং বিচিত্র। কবি স্বপ্ন দেখেন এবং সে স্বপ্ন ওড়ে ভাবনার আকাশে।

আজ আমি প্রায়ত কবি আবুলের কবিতা নিয়ে আমার অনুভূতি ব্যক্ত করতে বসেছি। সাহিত্য, সংগীত, প্রেম, রাজনীতি, সমাজনীতি, ধর্ম, ইতিহাস, কিংবদন্তি প্রতিটি বিষয়ে তিনি গভীর অভিজ্ঞানের অধিকারী ছিলেন।প্রতিটি বিষয় তার সেই গভীর জ্ঞানের ফসল। কবিতা নিয়ে নানা ধরনের মতবাদ ও মতভেদ প্রচলিত আছে। তথাপি আমি আবুলের অভিমতকেই সমর্থন করি, একজন কবি বা লেখক সবখানি ও সবটুকু নিজের জন্য লেখেন না, যেমনভাবে গান করে বনের পাখি। পাখির কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না কিন্তু কবি বা কথাশিল্পীকে পাঠকের কথা মনে রাখতেই হয় কম অথবা বেশি। কবি আবুল কবিজীবনের শুরু থেকেই সমাজের প্রতি, মাটি এবং মানুষের  প্রতি  চোখ রেখে পথ চলেছেন। আলোকিত সমাজ বিনির্মানের  দিকে রেখেছেন তার দৃষ্টি ও হৃদয়। সেই সমাজ, সেই স্বপ্ন, আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কবিরা হতাশায় ভেঙে পড়েন না। কারণ তিনি সমাজের অগ্রসর মানুষ, কবি আবুলকেও এমন অবস্থানে দেখতে পাওয়া যায় তার লেখায়, তার সৃষ্টিকর্মে।' 

এমন সময় হাসান মাহমুদ আল কোরেশির কাছে সহজ বাংলা পত্রিকা অফিস থেকে ফোন আসে, 'কোরেশি ভাই, শুনছেন বোধ হয় কবি হরকতউল্ল্যা গত রাতে মারা গেছেন। আপনি তো উনার কাছের বন্ধু ছিলেন। উনার উপর একটা লেখা দেন, আমরা আগামী কালকের প্রথম পাতায় ছাপতে চাই। প্লিজ না করবেন না।' 

হাসান মাহমুদ আল কোরেশি শব্দ করে 'ইন্না-লিল্লাহে অ-ইন্না ইলাহি রাজেউন' পড়েন। তারপর ইতঃস্তত করে বলেন, মামুন সাহেব আমি তো কবি আবুলকে নিয়ে.....

কথাটা মুখ থেকে ফস করে বের হয়ে যায়। তাড়াতাড়ি মুখের কথা চাপা দিয়ে, গলার স্বর পাল্টে বলেন,  এত অল্প সময়ে কী লিখব বলেন। তাছাড়া এখন হরকতউল্ল্যার মরদেহ  দেখতে যাব। তা এখন মরদেহ কোথায়, বাসায়, না হাসপাতালে? 

'কোরেশি ভাই, একটা কথা বলি মনে কিছু নেবেন না। কবির লাশ হাসপাতালে রাখা আছে। ওর ছেলে অস্ট্রেলিয়া থেকে আসার পর দাফন হবে। আপনার আর আসার দরকার নেই, আপনি বাসায় বসে আমাদের পত্রিকার জন্য লেখাটা তৈরি করে দেন। কাল প্রথম পাতায় ছাপা হলে, হাসপাতালে আসার চেয়ে বেশি কভারেজ হবে।' 

মামুনের কথা কোরেশির মনে ধরে। তাছাড়া অর্ধেক লেখা তো তৈরি করা আছেই। শুধু আবুলের জায়গায়, হরকতউল্যা বসিয়ে দিলে হবে।

হাসান মাহমুদ আল কোরেশি লেখেন, 'হরকতউল্যা বাংলাদেশের বিভিন্ন সাহিত্য আন্দোলন বিষয়ে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কবি। নিবিড়ভাবে খেয়াল করলে দেখা যায়, হরকতউল্যা গভীর দৃষ্টিসম্পন্ন একজন কবি। তিনি জীবনকে দেখেন আর দশজন মানুষের মতোই। কিন্তু সেখানেই শেষ হয়ে যায় না তার অবলোকন।'

আর লিখতে মন বসে না। হাসান মাহামুদ আল কোরেশী কী যেন ভাবেন। নিজের মৃত্যুর কথা কি? তিনি ওতো কবি; যেভাবে কবিদের অকাল মৃত্যু হাতছানি দিচ্ছে।


 

নীতু

রুমানা নাসরীন 

এই নীতু, নীতু! কিরে কি হলো তোর!

শুভ্রার ডাকে চমকে তাকালো নীতু। অনেকগুলো উৎসুক দৃষ্টি তার দিকে। অস্ফুট স্বরে পানি চাইল একবার। প্রাণপনে দৌড়ে এসেছে বলে সাংঘাতিক হাঁপিয়ে উঠেছে। এখনও ভয়ে আর উৎকন্ঠায় সারা শরীর হিম হয়ে আছে। দীর্ঘদিনের চাপাপড়া ভয়গুলো যেন হুড়মুড়িয়ে বেড়িয়ে আসতে চাইছে। ওই অসভ্য লোকটার বিশ্রি চাহনির কথা ভেবে গা গুলিয়ে আসছে নীতুর। ভীষণ বমি বমি ভাব হচ্ছে।

-এই নে পানি খা। 

সাবিহার হাত থেকে পানির বোতলটা ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে এক নিঃশ্বাসে শেষ করে ফেললো। না, আর নয়, এবার বন্ধুদের সাথে বিষয়টি আলোচনা করতেই হবে। সদ্য শৈশবের গন্ডি পেড়িয়ে কৈশোরে পা দেয়া নীতু বরাবরই খুব ভীতু আর লাজুক প্রকৃতির। প্রায় পঁচিশ সদস্যের একান্নবর্তী পরিবারে নীতুর জন্য একটা আলাদা ভালোবাসা বরাদ্দ আছে সে পড়াশোনায় তুখোড় বলে। শুধু ওই একজন!  উফ! ভাবতে পারে না নীতু। ছোটবেলা থেকেই কেমন ভয় ভয় লাগতো তাকে নীতুর। প্রায়ই নীতু ঘরে একা থাকলে গণিত দেখিয়ে দেবার অজুহাতে এসে হাত ধরতে চায়, শরীরের সাথে সেঁটে বসতে চায়। খুব ভয় হয় নীতুর। কিন্তু কেউ যদি ভুল বোঝে এই ভয়ে কাউকে বলতে পারে না। তবু্ও ভয়ে ভয়ে একদিন মাকে বলেছিলো, 'মা, আমি শাহীন ভাইয়ের কাছে পড়তে চাই না, আমার ভালো লাগে না।'

মা ধমকে বলে উঠেছিলেন, 'কেনো? শাহীন পড়াশুনোয় কতো ভালো,  বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। যে কদিন বাড়িতে আছে গণিতটা একটু এগিয়ে নে। শুধু ফাঁকিবাজি!' 

আর কথা বাড়ায়নি নীতু। 

এবার ক্লাস সেভেনে উঠেছে সে। অনেক পড়াশোনা,  কিন্তু মন দিতে পারছে না। শুনেছে শাহীন ভাই এবার বেশ কিছুদিন থাকবে ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস নেই বলে। কি হবে নীতুর! আজ না হয় বেঁচে গেছে।  কিন্তু আবার যদি---?

নীতুদের বাড়ি থেকে একটু দূরে একটা ঝোপ আছে যেখানে সন্ধ্যা হলেই জোনাকিরা আলো আঁধারির খেলায় মেতে উঠে।  আজ সকালে হেঁটে হেঁটে স্কুলে আসার সময় কে যেন হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে ঝোপের ভিতরে টেনে নিয়ে গেলো।  তাকিয়ে দেখে শাহীন ভাই। নীতু চিৎকার করার আগেই শক্ত করে মুখ চেপে ধরলো। একমনে সৃষ্টিকর্তাকে ডেকে গেছে সে। হঠাৎ যেন দানবের শক্তি পেয়ে গেলো সে। সর্বশক্তি দিয়ে শয়তানটার হাতে কামড়ে দিয়ে উর্ধশ্বাসে ছুটতে লাগলো,  পিছু ফিরে তাকায় নি একবারও। 

ফুঁপিয়ে কাঁদছে নীতু। পরম ভালোবাসা আর নির্ভরতায় পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে প্রিয় বন্ধু শুভ্রা আর সাবিহা। কি বলে সান্ত্বনা দেবে ওরা বুঝতে পারছে না। হঠাৎ সাবিহার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেলো। আগামীকাল ওরা দুজন কিছুটা আগে স্কুলে এসে ঝোপের একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকবে।  সেই সাথে একটা আত্মরক্ষার কৌশল শিখিয়ে দিলো নীতুকে।

পরেরদিন সকালে খুব ভয় ভয় করে নীতু হেঁটে যাচ্ছে একই পথধরে। সাবিহার কথা মত রান্নাঘর থেকে শুকনো মরিচের গুড়ো টিস্যুতে মুড়িয়ে নিতে ভুলে যায়নি। নীতু হাঁটছে আর নিজেকে সাহস দিচ্ছে-আমাকে পারতেই হবে! ঝোপের কাছে পৌঁছামাত্র একই ঘটনা ঘটল। শাহীন ভাই টেনে নেয়া মাত্র বাম হাতের তালুতে লুকিয়ে রাখা মরিচ গুড়ো ছিটিয়ে দিলো শয়তানটার চোখে। শাহীন আহ... বলে আর্তনাদ করা মাত্রই নীতু উল্টোদিকে ঘুরে দৌড় ছুটল।

একবুক বিজয়ের আনন্দ নিয়ে ছুটছে নীতু। সাথে জুটলো প্রিয় বন্ধুরা। নীতু দৌড়াচ্ছে পিছে ফেলে সব ভয়, হতাশা আর জড়তা। আপন মনে বলছে, 'আমি পেরেছি, আমি পেরেছি নিজেকে রক্ষা করতে, আমি পেরেছি।' 

 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন