https://www.prothomalony.com/

11026

foundation

ফাউন্ডেশন 

সম্পাদকীয়

জাতিসংঘে বাংলাদেশ : প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০২:৪৮

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৯তম অধিবেশন। সেখানে একত্রিত হবেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা, যেখানে রাজনৈতিক সংকট, বিশ্ব অস্থিরতা, অর্থনৈতিক মন্দার নানা বিষয়ের সমাধানে চলবে বাগ্‌বিতণ্ডা। আলোচনা হতে পারে গাজা ও ইউক্রেন যুদ্ধের মতো চলমান যুদ্ধগুলো নিয়ে। জাতিসংঘের অধিবেশন উপলক্ষে বরাবরের মতোই জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে সদস্য দেশগুলোর পতাকা উড়ানো হয়েছে। আর বাংলাদেশের পতাকাটি উড়ছে সবার আগে। এ যেনো নতুন বাংলাদেশকে স্বাগত জানানোর অন্য রকম আয়োজন। বাংলাদেশের অন্তবর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই অধিবেশনে এমন এক সময়ে যোগ দিচ্ছেন যখন দেড় দশকের স্বৈরতন্ত্র হঁটিয়ে ছাত্র-জনতা বাংলাদেশে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। ফলে অধিবেশনে ড. ইউনূসের যোগদান এবং যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে প্রবাসীদের প্রত্যাশার কোনো শেষ নেই। ফলে এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য একটা ভিন্ন পরিস্থিতিতে হচ্ছে। বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়া এবং ছাত্র-জনতার সমন্বয়ে নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর বাংলাদেশ এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিচ্ছে। এর আগে মানবাধিকার ও গণতন্ত্র ইস্যুতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা অনেক দেশের সাথে বাংলাদেশের একপ্রকার টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বাংলাদেশের পরিস্থিতির কড়া সমালোচনা করে আসছিল। ফলে এই সম্মেলনকে বাংলাদেশের জন্য ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের একটি প্রেক্ষাপট হিসাবে বিশ্লেষকদের অনেকেই দেখছেন। এবারের অধিবেশন দেশের জন্য 'বিশ্বসভায় নতুন পদচারণা' এবং বিশ্ব দরবারে নতুনভাবে বাংলাদেশকে তুলে ধরার বিশাল একটা সুযোগ। বাংলাদেশে জাতিসংঘের সদস্যপদ প্রাপ্তির ৫০ বছর পূর্ণ হওয়ায় এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।  একই সাথে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের জায়গা, বিভিন্ন সংস্কারের কৌশলগত বা টেকনিক্যাল দিকে সাপোর্ট, বিদেশে টাকা পাচার, অত্যাচার-নির্যাতন নিয়ে চলমান তদন্ত, এসব বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহযোগিতার পথ সুগম হবে। বাংলাদেশ অর্থনীতির যে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে বৈদেশিক সাহায্য ও বিনিয়োগ আনতেও এবারের সম্মেলনটিকে কাজে লাগানো হতে পারে। বাংলাদেশের দরকার এখন আর্থিক সহায়তা এবং সহযোগিতা। ফলে ক্ষয়ক্ষতি থেকে উত্তরণে এবং একটা টেকসই আর্থিক উন্নয়নে ড. ইউনূস বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোর কাছে সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা করবেন। উন্নয়ন, ঋণ বা আর্থিক সহায়তার মতো বিষয়গুলো কমিটি পর্যায়ের আলোচনায় আসবে এবং বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল সেখানে কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারবে তাঁর উপর নির্ভর করবে বাংলাদেশের জন্য এবারের পরিষদ কতদূর ফলপ্রসূ হবে। গত বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের মানবাধিকার ও গণতন্ত্র ইস্যু জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনসহ পশ্চিমা দেশগুলোর অন্যতম উদ্বেগর জায়গা ছিল। সেখানেও বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের কর্মকর্তারা পরিবর্তিত চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করবেন বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা, মানবাধিকার এমন বিষয়গুলোও তাদের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব সহকারে আসবে। বর্তমানে যে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে, সেটা তারা তুলে ধরতে চাইবেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার পর আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে শুভেচ্ছা পেয়েছেন। বিশ্বপরিসরে খ্যাতির কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তিনি বাংলাদেশের জন্য একটা ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারবেন বলে বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন। প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক পরিচিতি এবং একরকম বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের জায়গা থাকায় তাঁর বক্তব্য একটা বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে শোনা হবে। অর্থনীতির বাইরে প্রযুক্তিগত দিক, তরুণ প্রজন্মের অংশিদারিত্ব, রাজনৈতিক সহযোগিতা পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে সদিচ্ছার মতো দিক নিয়ে আলোচনাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।জাতিসংঘের যেসব অগ্রাধিকারের যেসব জায়গা রয়েছে সেগুলো বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।  প্রতিনিধিদল সেসব ইস্যু সংক্রান্ত ইভেন্টে সক্রিয়ভাবে অংশ নেবে। এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোকে বিস্তৃত ও সুদৃঢ় করবে বলে আশাবাদ সকালের। ২৭ তারিখ বক্তব্যে যে বিষয়গুলো উঠে আসবে তার একটি ধারণা দেয়া হয়েছে।সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের বিবরণ, জনগণকেন্দ্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু ইস্যু, শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবস্থান, উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে সম্পদ পাচার প্রতিরোধ, নিরাপদ অভিবাসন, প্রযুক্তির টেকসই হস্তান্তর, ফিলিস্তিন–এমন বিভিন্ন বিষয় আসতে পারে বলে জানানো হয়েছে। মুহাম্মদ ইউনূস আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৯তম অধিবেশনে বক্তব্য রাখবেন। সেখানে তিনি দেশে জুলাই-আগস্টে সংঘটিত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপট এবং ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের বীরত্বগাথা তুলে ধরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্র মেরামতের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার গৃহীত সংস্কার কার্যক্রম বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করবেন।শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দিচ্ছেন নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। চেনা পরিবেশে নতুন পরিচয়ে জাতিসংঘ অধিবেশনে ভাষণ দেবেন তিনি। দীর্ঘদিনের পরিচিতজনদের সামনে তুলে ধরবেন তার নতুন দায়িত্ব, নতুন বাংলাদেশকে। বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের দর্শন বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করবেন অধ্যাপক ইউনূস। নিজেদের গর্বিত ও মর্যাদাশীল দেশের জনগণ হিসেবে বিশ্ব পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ কীভাবে নিজেদের তুলে ধরবে, সেটিই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানাবেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি ভূরাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হতে উদাত্তভাবে আহ্বান জানাবেন। অন্তর্বর্তী সরকার দেশ গঠনে নতুন চ্যালেঞ্জ হাতে নিয়েছে। নতুন সরকার দেশবিদেশে সমানতালে কাজের মাধ্যমে নিজেদের জানান দিতে চায়।প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিশ্বজুড়ে খ্যাতি রয়েছে। বিশ্বের প্রায় সব প্রান্তেই তার সুনাম রয়েছে এবং তার ভাবমূর্তি খুব উজ্জ্বল। ড. ইউনূসের ভাবমূর্তি কূটনীতিকরা ব্যবহার করতে পারলে দেশের অনেক উপকার হবে। বিশ্বের সাতজন ব্যক্তি নোবেল শান্তি পুরস্কার, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেশনাল গোল্ড মেডেল পেয়েছেন। তিনি সেই সাতজন ব্যক্তির মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশি। ড. ইউনূসের দেখানো পথেই যুক্তরাষ্ট্রের সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জন্য কাজ করছে গ্রামীণ আমেরিকা। তার দর্শনের ভিত্তিতে ৪০০ কোটি ইউরো ব্যয়ে প্যারিস ২০২৪ অলিম্পিক ভিলেজ তৈরি হয়। এর আগে ব্রাজিলের রিও অলিম্পিকেও তার সরব উপস্থিতি ছিল।এ বছর জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্কের প্রতিপাদ্য হলো- ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়: বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শান্তি, টেকসই উন্নয়ন ও মানবিক মর্যাদার অগ্রগতির জন্য একযোগে কাজ করা।’ বিশ্বব্যাপী আস্থার সংকট, বহুপাক্ষিকতা এবং আলোচনার পথ উপেক্ষা করার ফলে সৃষ্ট সংকট থেকে সংঘাত, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির পাশাপাশি উদ্ভূত নানারকম বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়ন বাস্তবায়নে কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপের অনুপস্থিতি – ইত্যাদি প্রেক্ষাপটে এবারের প্রতিপাদ্যটি অত্যন্ত অর্থবহ। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠকটি দুই দেশের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক গঠন ও উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের কল্যাণে তাদের নিবেদনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইডলাইনে বাংলাদেশের সরকার প্রধানের সঙ্গে এ ধরনের বৈঠক বিরল ঘটনা। এ বৈঠক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সস্পর্ককে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করবে। এটি আমাদের জন্য সুখবর। এ বছর বাংলাদেশ জাতিসংঘের সঙ্গে সম্পর্কের ৫০ বছর উদযাপন করছে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যখন আমরা আবার তরুণদের কণ্ঠকে গুরত্বের সঙ্গে শোনার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৯তম অধিবেশনে যোগদান, ভাষণ প্রদান এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টসহ বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বৈঠক বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার অনেক দ্বার খুলে দেবে। বাংলাদেশের অনেক বিপক্ষ শক্তি জানবে বাংলাদেশ একা নয় এবং বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশকে যারা চাপে ফেলতে চায় তাদের কাছেও এই বার্তা যাবে যে, বাংলাদেশের পাশে বৃহৎ শক্তি এবং শান্তিকামীরা আছেন। সর্বোপরি দেশের অর্থনৈতিক সচলায়তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এই সফর। 

ফাউন্ডেশন  থেকে আরো পড়ুন