https://www.prothomalony.com/
18192
north-america
লন্ডনের ব্রিকলেন। ল্যাম্পপোস্টগুলো লাল-সবুজে রাঙানো। রাস্তার দুই পাশে বাংলা অক্ষর, দোকানের সাইনবোর্ড, মানুষের কোলাহল। কোথাও সিলেটি উচ্চারণ, কোথাও লন্ডনের ইংরেজি, কোথাও আবার দুই ভাষার অদ্ভুত মিশেল। দাঁড়িয়ে আছি ব্রিকলেনের পথে, অথচ আমার চোখ বারবার চলে যাচ্ছে আটলান্টিকের ওপারে—নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে। চার্চ-ম্যাকডোনাল্ডের মোড়। কুইন্সের জামাইকা। জ্যাকসন হাইটস। ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টার। এই নামগুলো আমাকে তাড়া করে।
নিউইয়র্কের বাংলাদেশিদের আদি ঠিকানা ব্রুকলিন, ম্যানহাটনের সিক্সথ স্ট্রিট। হাজার হাজার মাইল পাড়ি দেওয়া অজেয় আমাদের অভিবাসীদের গল্প লুকিয়ে আছে এসব এলাকার আনাচে-কানাচে। কোথাও দোকানের শাটারে, কোথাও পুরোনো অ্যাপার্টমেন্টের সিঁড়িতে, কোথাও কোনো বৃদ্ধ মানুষের চোখে।
ব্রিকলেন আর ব্রুকলিন—দুই মহাসাগরের দুই পারে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি ঠিকানা। দুটি রাস্তার মোড়। অথচ দুটোই যেন একই কথা বলে— আমরা এসেছিলাম। আমরা থেকে গেছি। আর এই শহর এখন আমাদেরও। কিন্তু দুই গল্পের শুরু এক নয়। শেষটাও হয়তো এক হবে না।
ব্রিকলেনের গল্প অনেক পুরোনো। সত্তর বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশি অভিবাসীরা এখানে থিতু হয়েছেন। গড়ে উঠেছে কারি হাউস, মাছের দোকান, মিষ্টির দোকান, কাপড়ের দোকান। কিন্তু তারও আগে ছিল সমুদ্রের গল্প। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জাহাজে কাজ করা দক্ষিণ এশীয় লস্কররা টেমসের তীরে এসে নেমেছিলেন বহু আগেই। তাঁদের পদচিহ্ন ছিল নীরব। কোনো লাল-সবুজ ল্যাম্পপোস্ট ছিল না। কোনো বাংলা সাইনবোর্ডও নয়।
তারপর এল ষাটের দশক। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল থেকে মানুষ আসতে শুরু করলেন লন্ডনে। কাজের সন্ধানে। আত্মীয়ের ডাকে। ভাগ্যের টানে। ইস্ট লন্ডনের টেক্সটাইল কারখানায় কাজ মিলল অনেকের। ইহুদি মালিকানাধীন কারখানাগুলোর শ্রমবাজার বদলাচ্ছিল, পুরোনো বাসিন্দারা ধীরে ধীরে শহরের অন্য প্রান্তে সরে যাচ্ছিলেন। তাঁদের ফেলে যাওয়া ঘরগুলোতে এসে উঠলেন সিলেটের মানুষ।
একদিন যে ঘরে অন্য এক অভিবাসী পরিবার বাস করত, সেখানে আরেক অভিবাসী পরিবার এসে উঠল।
ইতিহাস কখনো কখনো এভাবেই ঘর বদলায়। ১৯৭৬ সালে একটি ভবন, যার অতীত ছিল গির্জা এবং পরে সিনাগগ, হয়ে উঠল লন্ডন জামে মসজিদ। একই ভবনের দেয়ালে তিন ধর্মের তিন অভিবাসী অধ্যায়ের ছাপ।
একটি ভবন। তিন ধর্ম। তিন প্রজন্মের অভিবাসন। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন গল্প খুব বেশি নেই। যে ঢেউ ব্রিকলেনকে আজকের ব্রিকলেন বানিয়েছে, সেটি এসেছিল আরও পরে। আর সেই ঢেউ শুধু অর্থনীতির ছিল না—ছিল সংগ্রামেরও।
১৯৭৮ সালের ৪ মে। আলতাব আলী কাজ শেষে বাড়ি ফিরছিলেন। সেন্ট মেরিস পার্কের কাছে তাঁকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। বয়স মাত্র চব্বিশ। ১৯৬৯ সালে বাংলাদেশ থেকে লন্ডনে এসেছিলেন। পোশাকশ্রমিক ছিলেন। দশ দিন পর, ১৪ মে, হাজার হাজার বাঙালি তাঁর কফিনের পেছনে হেঁটেছিলেন হাইড পার্ক হয়ে ডাউনিং স্ট্রিটের দিকে। একজন তরুণ শ্রমিকের কফিন তখন শুধু একজন মানুষের কফিন ছিল না। সেটি হয়ে উঠেছিল একটি কমিউনিটির ভয়, ক্ষোভ এবং অস্তিত্বের ঘোষণা।
আমরা এখানে আছি।
আমরা এখানেই থাকব।
১৯৯৮ সালে সেই পার্কের নাম রাখা হয় আলতাব আলী পার্ক। লন্ডনে একজন বাঙালির নামে পার্ক। কোনো রাজনীতিবিদের নামে নয়। কোনো ধনকুবেরের নামে নয়। একজন পোশাকশ্রমিকের নামে। অভিবাসনের ইতিহাসে এর চেয়ে বড় স্মৃতিফলক আর কী হতে পারে?
নিউইয়র্কের অগ্নিপরীক্ষা এসেছিল অন্যভাবে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ার ভেঙে পড়ার পর নিউইয়র্কের আকাশ শুধু ধোঁয়ায় ঢেকে যায়নি, অনেক মানুষের পরিচয়ের ওপরও নেমে এসেছিল সন্দেহের ছায়া। মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের ওপর বিশেষ নিবন্ধন, নজরদারি, আটক ও ডিপোর্টেশনের ভয়—সেই সময়ের স্মৃতি অনেক পরিবারের কাছে আজও অস্বস্তিকর এক অধ্যায়।
ব্রিকলেনের ভয় ছিল অনেকটা রাস্তায় দৃশ্যমান। নিউইয়র্কের ভয় ছিল কখনো কখনো অদৃশ্য—একটি ফাইল, একটি তালিকা, দরজায় কড়া নাড়ার আশঙ্কা। লড়াইয়ের চেহারা আলাদা ছিল। কিন্তু ভয়ের গন্ধ ছিল একই।
আর তারপরও মানুষ টিকে থাকে।
ব্রিকলেনের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হয়ে উঠল একটি রান্নাঘর। কারখানা বন্ধ হলো। বেকারত্ব বাড়ল। মানুষ নিজের রেস্তোরাঁ খুলল। রান্নাঘর হয়ে উঠল অভিবাসীর কর্মসংস্থান, আত্মমর্যাদা এবং ভবিষ্যতের সিঁড়ি। আজ যুক্তরাজ্যের বিপুলসংখ্যক তথাকথিত ‘ইন্ডিয়ান’ রেস্তোরাঁর মালিক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। নামটি রয়ে গেল ‘ইন্ডিয়ান’। কারণ রেস্তোরাঁগুলো যখন গড়ে উঠছিল, বাংলাদেশ তখনও সদ্য জন্ম নেওয়া এক দেশ—বিশ্বের খাদ্যবাজারে ‘বাংলাদেশি খাবার’ নামে আলাদা কোনো পরিচিতি তখন তৈরি হয়নি।
নিজের হাতে রান্না করে অন্যের নামে পরিবেশন করা। অভিবাসনের এর চেয়ে নিখুঁত রূপক আর কী হতে পারে?
নিউইয়র্কে মেরুদণ্ডটা ছিল অন্যরকম। স্টিয়ারিং হুইল। দোকানের ক্যাশবাক্স। হলুদ ট্যাক্সি। গ্রোসারি। নিউজস্ট্যান্ড। তারপর রিয়েল এস্টেট, হোম কেয়ার, ফার্মেসি, নানা ধরনের ছোট ব্যবসা। প্রায় চল্লিশ বছর আগে শহীদ উল্লাহ ও প্রয়াত আবদুল কাশেম ব্রুকলিনের কেনসিংটনে এশিয়ান ওরিয়েন্টাল গ্রোসারি খুলেছিলেন। ছোট্ট কিন্তু দ্রুত বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য হালাল মাংস, দেশি সবজি, মসলা—সবকিছুর এক আশ্রয়।
একটি দোকান। তারপর একটি পাড়া। এভাবেই তো অভিবাসীরা শহর বানায়। সংখ্যার হিসাবে আজ দুই কমিউনিটিই বড়। কিন্তু সংখ্যার ভেতরেও গল্প থাকে। সরকারি পরিসংখ্যান আমাদের যতটুকু বলে, বাস্তব কমিউনিটি তার চেয়ে অনেক বড় হতে পারে। অনিবন্ধিত মানুষ, হিসাবের বাইরে থাকা পরিবার, প্রজন্মের পর প্রজন্মের পরিবর্তন—সবকিছু সরকারি সংখ্যায় ধরা পড়ে না। তবু একজন সাংবাদিকের কাছে যাচাইযোগ্য সরকারি হিসাবই সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
ইস্ট লন্ডনের এক সভায় অগ্রজ সাংবাদিক নাহাস পাশা জানতে চেয়েছিলেন—বিশ্বের দুই প্রান্তে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি অভিবাসী সমাজের অগ্রযাত্রার তুলনা কোথায়?
প্রশ্নটি সহজ নয়। আমাদের সভা-সমিতিতে সাধারণত বেশি সময় নিয়ে কথা বলার সুযোগও হয় না। সময় ধরে কথা বলতে হয়, আবার শুনতেও হয়। কিন্তু সেই প্রশ্নটি মাথায় থেকে যায়। কারণ ব্রিকলেন আর ব্রুকলিনকে পাশাপাশি দাঁড় করালে শুধু দুই শহরের গল্প পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় বাংলাদেশি অভিবাসনের দুই ভিন্ন গতিপথ।
ব্রিটেনে রাজনৈতিক দৃশ্যপটের পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে আগে দৃশ্যমান হয়েছে। ২০১০ সালে রুশনারা আলী ব্রিটিশ পার্লামেন্টে নির্বাচিত প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সদস্য হন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে টিউলিপ সিদ্দিক, রুশনারা আলী, রূপা হক ও আপসানা বেগম—চার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী ব্রিটিশ পার্লামেন্টে নির্বাচিত হন।
টাওয়ার হ্যামলেটসে বাংলাদেশি জনসংখ্যার ঘনত্বও কম নয়। পূর্ব লন্ডনের রাজনীতিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাউন্সিলর, মেয়র, স্পিকার—সব মিলিয়ে একটি নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক উপস্থিতি তৈরি হয়েছে। লুৎফুর রহমান শুধু টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র নন, মোস্তাক আহমেদ শুধু একজন স্পিকার নন—তাঁরা অভিবাসী সমাজের দীর্ঘ পথচলার দৃশ্যমান মাইলফলক।
আমেরিকায় সেই ঘড়ি হয়তো একটু পরে চলেছে। কিন্তু ঘড়ি থেমে নেই। ২০২১ সালে ব্রুকলিনের কেনসিংটনে বেড়ে ওঠা শাহানা হানিফ নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলে নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন প্রথম মুসলিম নারী এবং প্রথম বাংলাদেশি-আমেরিকান কাউন্সিল সদস্য। ২০২২ সালের ১৬ অক্টোবর তাঁর উদ্যোগে চার্চ ও ম্যাকডোনাল্ড অ্যাভিনিউর মোড়ের নাম দেওয়া হয় ‘লিটল বাংলাদেশ’।
সেদিন একটি সাইনবোর্ড বসানো হয়েছিল। কিন্তু আসলে সেখানে শুধু রাস্তার নাম লেখা হয়নি।
লেখা হয়েছিল কয়েক দশকের অভিবাসনের ইতিহাস। সন্দ্বীপ, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের নানা অঞ্চল থেকে আসা মানুষ, যারা কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে ব্রুকলিনে এসে আরও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলেন—সেই সংগ্রামের একটি স্বীকৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল নামটি।
আর ভাষা? এখানেও গল্প আছে। নিউইয়র্কের মতো বহুভাষিক নগরে বাংলা এখন সরকারি নির্বাচনী ব্যালটে ব্যবহৃত ভাষাগুলোর একটি। যে মানুষটি হয়তো একদিন কাঁপা হাতে লটারির খাম খুলেছিলেন, যে মানুষটি ইংরেজিতে একটি সরকারি ফরম পূরণ করতে ভয় পেতেন—তার ভাষা আজ এই শহরের নাগরিক জীবনের দৃশ্যমান অংশ।
লন্ডনে তো আরও দৃশ্যমান। ইস্ট লন্ডনের স্টেশনে বাংলা লেখা দেখা যায়। দোকানে বাংলা। রেস্টুরেন্টে বাংলা। রাজনীতিতে বাংলা। ঘরের ভেতর সিলেটি ভাষাও টিকে আছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। দেশের বাইরে বিশ্ববাংলার এই বিস্তার কোনো একদিনে হয়নি। এর পেছনে আছে সেই মানুষগুলো—যারা ছেঁড়া স্যুটকেস নিয়ে এসেছিলেন, রাতের শিফট করেছেন, ট্যাক্সি চালিয়েছেন, রেস্তোরাঁয় দাঁড়িয়েছেন, দোকান খুলেছেন, অপমান সহ্য করেছেন, ভয় পেয়েছেন, আবার পরদিন সকালে কাজে বেরিয়েছেন।
তবে দুই গল্পের ভবিষ্যৎ এখন ধীরে ধীরে আলাদা হতে শুরু করেছে। ব্রিকলেন নিজের সাফল্যেরও যেন এক ধরনের শিকার। ভাড়া বেড়েছে। জেন্ট্রিফিকেশন পুরোনো পাড়ার চেহারা বদলে দিচ্ছে। একে একে বন্ধ হচ্ছে অনেক কারি হাউস। নতুন প্রজন্ম বাবার রেস্তোরাঁয় দাঁড়াতে চায় না। তারা ডাক্তার হতে চায়, ব্যারিস্টার হতে চায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে চায়, পার্লামেন্টে যেতে চায়।
এটাই তো অগ্রগতি। কিন্তু অগ্রগতির ভেতরেও এক ধরনের বিষণ্ণতা থাকে। যে জায়গাটি আপনাকে দাঁড়াতে শিখিয়েছিল, উঠে দাঁড়ানোর পর একদিন হয়তো দেখবেন—সেই জায়গাটিতে আপনার আর কাজ নেই।
উন্নতির সবচেয়ে নিষ্ঠুর রসিকতা বোধহয় এটাই।
নিউইয়র্ক এখনো সেই বাঁকে পুরোপুরি পৌঁছায়নি। এখানে এখনো নতুন দোকান খুলছে। ভবন কেনা হচ্ছে। নতুন পাড়া তৈরি হচ্ছে। কুইন্স থেকে ব্রঙ্কস, ওজোন পার্ক থেকে লং আইল্যান্ড—বাংলাদেশি উপস্থিতির মানচিত্র প্রতিদিন একটু একটু করে বদলাচ্ছে। নতুন মানুষও আসছেন। নতুন স্বপ্ন নিয়ে।
ব্রিকলেনের অভিজ্ঞতা তাই নিউইয়র্কের জন্য শুধু ইতিহাস নয়, হয়তো একটি আয়না। কারণ কমিউনিটির আসল পরীক্ষা প্রথম প্রজন্মে নয়। প্রথম প্রজন্ম বাঁচে সংগ্রামে। দ্বিতীয় প্রজন্ম বাঁচে প্রতিষ্ঠায়।
তৃতীয় প্রজন্মের সামনে প্রশ্নটা অন্য— তারা কি মনে রাখবে কোথা থেকে এসেছিল?
যেদিন ছেলেমেয়ে আর বাংলা বলবে না, যেদিন দোকানের সাইনবোর্ড থেকে বাংলা অক্ষর মুছে যাবে, যেদিন পুরোনো রেস্তোরাঁর জায়গায় নতুন কোনো ব্র্যান্ডের দোকান উঠবে—সেদিনও কি ‘বাংলাদেশ’ নামটি শুধু একটি সাইনবোর্ডে থাকবে? নাকি থাকবে মানুষের স্মৃতিতে?
ব্রিকলেন থেকে ব্রুকলিন—দূরত্ব সাড়ে তিন হাজার মাইলের মতো। কিন্তু দূরত্বটা আসলে মাইল দিয়ে মাপা যায় না। এক প্রান্তে লাল-সবুজ ল্যাম্পপোস্ট। অন্য প্রান্তে ‘লিটল বাংলাদেশ’ লেখা সবুজ সাইনবোর্ড। দুই শহরের দুই মোড়ে দাঁড়িয়ে মনে হয়, আমাদের মানুষগুলো আসলে শুধু শহরে আসেনি। তারা শহরের ভেতরে নিজেদের জন্য একটি জায়গা বানিয়েছে।
শুরুতে ছিল একটি ঘর। তারপর একটি দোকান। তারপর একটি মসজিদ। একটি রেস্তোরাঁ। একটি ট্যাক্সি।
একটি ভোট। একটি রাস্তার নাম। একটি পার্লামেন্টের আসন। এভাবেই অভিবাসী ইতিহাস একদিন শহরের ইতিহাস হয়ে যায়। আমাদের প্রথম প্রজন্মের মানুষগুলো এসেছিলেন প্রায় শূন্য হাতে। অচেনা ভাষা, অচেনা আবহাওয়া, পকেটে অল্প টাকা, বুকের ভেতর এক পৃথিবী স্মৃতি।
কেউ রেস্তোরাঁ খুলেছেন। কেউ ট্যাক্সি চালিয়েছেন। কেউ রাতের শিফট শেষে হেঁটে বাড়ি ফিরেছেন। কেউ সেই হেঁটে ফেরার পথেই খুন হয়েছেন। তাঁদের সন্তান-নাতি-নাতনিরা আজ পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেয়, সিটি কাউন্সিলে আইন করে, রাস্তার নাম বদলে দেয়।
এই জায়গায় এসে ব্রিকলেন আর ব্রুকলিনের গল্প যেন আবার এক হয়ে যায়। শুধু ঘড়ির কাঁটা দুটো আলাদা সময় দেখাচ্ছে। লন্ডনের ঘড়িতে প্রশ্ন—আমরা যা গড়ে তুলেছি, তা কীভাবে ধরে রাখব? নিউইয়র্কের ঘড়িতে প্রশ্ন—আমরা আর কতদূর যেতে পারি?
দুটো প্রশ্নই জরুরি। কিন্তু ব্রিকলেনের এক লাল-সবুজ ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে, আটলান্টিকের ওপারে ব্রুকলিনের ‘লিটল বাংলাদেশ’-এর কথা মনে পড়লে আমার মনে হয়, এর চেয়েও গভীর একটি প্রশ্ন আছে।
একটি কমিউনিটি ঠিক কখন প্রতিষ্ঠিত হয়? যেদিন তার নামে রাস্তা হয়? যেদিন তার ভাষা শহরের ব্যালটে উঠে আসে? যেদিন তার সন্তান পার্লামেন্টে গিয়ে দাঁড়ায়? নাকি তারও পরে—যেদিন তার সন্তানকে আর কেউ জিজ্ঞেস করে না, তুমি কোথা থেকে এসেছ? হয়তো সেদিনই অভিবাসনের সবচেয়ে বড় জয়। যেদিন মানুষকে আর নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে হয় না। শহর তখন তাকে শুধু গ্রহণ করে না—তার গল্পেরও অংশ করে নেয়।
ব্রিকলেনের বাতাসে দাঁড়িয়ে তাই আমার মনে হয়, আমাদের অভিবাসনের গল্প আসলে কোথাও গিয়ে শেষ হয় না। এক প্রজন্ম একটি দরজা খুলে। পরের প্রজন্ম সেই দরজা দিয়ে ভেতরে ঢোকে। তার পরের প্রজন্ম হয়তো একদিন বুঝতেই পারে না—দরজাটা খুলতে কত রাত, কত অপমান, কত একাকিত্ব, কত অশ্রু লেগেছিল।
সেই ভুলে যাওয়ার মুহূর্তটিও হয়তো প্রতিষ্ঠারই একটি চিহ্ন। কিন্তু ইতিহাসের কাজ হলো—যারা দরজাটা খুলেছিল, তাদের নাম মনে রাখা।
ব্রিকলেন থেকে ব্রুকলিন। দুই মহাসাগরের দুই পারে দাঁড়িয়ে থাকা দুই ঠিকানা। আর মাঝখানে ছড়িয়ে থাকা আমাদের অজেয় অভিবাসীদের দীর্ঘ পদচিহ্ন। আমরা এসেছিলাম। থেকে গেছি।
এখন প্রশ্ন শুধু—আমাদের পরের প্রজন্ম কি মনে রাখবে, কেন এসেছিলাম?
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন