https://www.prothomalony.com/
18191
north-america
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৬:২৩
আমাদের ছোটবেলায় ‘পায়ের তলায় তিল’ খুব কাঙ্ক্ষিত একটা জিনিস ছিল। পায়ের তলায় এই বিশেষ চিহ্ন অর্জন করা নাকি যারপরনাই সৌভাগ্যের বিষয়। যার পায়ের তলায় তিল আছে, তার জীবন সমৃদ্ধশালী হবে এবং সে ঘন ঘন বিদেশ ভ্রমণ করতে পারবে—এই বিশ্বাসটাও খুব শক্ত ছিল।
প্লিজ, ডান পায়ে না বাম পায়ে তিল—এসব নিয়ে কেউ যেন আবার গোলযোগ পাকাবেন না। কারণ এমন একখানা তিল তৈরির চেষ্টা আমার শৈশবকালে বেশ খতরনাক হয়ে ধরা পড়েছিল। আমাদের যুগে আমরা আসলেই খুব সহজ-সরল ছিলাম কিনা… বোকাই বলা যায়।
যাই হোক, এত সুন্দর পৃথিবীটা, একটু নড়েচড়ে, ঘুরেফিরে না দেখেই চলে যাবো? সেটা কি ঠিক হবে? শুধু পায়ের তলায় তিল নেই বলেই বোহেমিয়ানের মতো ঘুরে বেড়ানোর শখটুকু কখনোই পূরণ হবে না?
আমার ছেলেরাও বেড়াতে খুব ভালোবাসে। ভ্রমণ প্রসঙ্গ এলেই আমি তাদের জোরালো সমর্থন পাই। তারা বলে, “অবশ্যই, মাদার, অবশ্যই বেড়াতে যাবে। তোমাদের এখন অফুরন্ত অবসর। যতদিন শরীরে শক্তি আছে, সুস্থ আছো, পৃথিবী ঘুরে দেখো। শরীরের যন্ত্রপাতি বিকল হতে শুরু করলে আর এমন সুযোগ পাবে না।”
আমার আব্বা খুব ভ্রমণপিপাসু মানুষ ছিলেন। কিন্তু মাথার উপরে বিশাল পারিবারিক বোঝা বইতে বইতে তিনি তাঁর শখ সেভাবে পূরণ করতে পারেননি। আমিও উত্তরাধিকারসূত্রে আব্বার শখটুকু পেয়েছি। কিন্তু একটা কথা আছে না, ‘বিধিবাম’, আমার বেলায়ও তাই। এমন একজন মানুষের সাথে জীবনযাত্রা শুরু করেছি, যাকে ‘ইনডোর প্লান্ট’ বললে অত্যুক্তি হবে না। তিনি ঘরে সতেজ থাকেন, বাইরে গেলেই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। সমঝোতা করতে গিয়ে নিজের সাধ-আহ্লাদকে বরাবরই জলাঞ্জলি দিতে হয়েছে। এখন বার্ধক্যে এসে পৌঁছেছি। আর তো সময়ও নেই। আর কত নিজের স্বপ্নকে জলাঞ্জলি দেওয়া যায়?
বড় ছেলে সুমিত ভাইকিং ক্রুজ কোম্পানিতে কাজ করে। অনেকদিন ধরেই সে বলছিল, ক্রুজ করে ইউরোপে একটা ট্যুর করতে। পরিবার হিসেবে আমরা সেখানে অর্ধেক মূল্যে ভ্রমণের সুযোগ পাবো। সুতরাং সুযোগ মিস করা বোকামি। ছোট ছেলে অমিতও উৎসাহিত করলো। কিন্তু সাগরভীতির কারণে আমি নিজেই একটু গড়িমসি করছিলাম। পানিতে দম আটকে মরতে আমার বড় ভয়। কেবলই মনে হয়, মৃত্যুকালে অন্তত চারদিক দেখেশুনে, নিঃশ্বাস ফেলে মরতে পারলে ভালো হয়। যেহেতু সাঁতার জানি না। আমার জন্য সাগর যা, পুকুরও তাই। দুটোই মৃত্যুকূপ। সুতরাং নিজেকে বোঝালাম, ‘ডরো মাত। কুছ নেহি হোগা। জিন্দেগি এক সফর কা নাম হ্যায়। জব সফর খতম হোগা, তুমকো চলে জানা হোগা। যা ‘সিমরান’, যা। জি লো, জিন্দেগি কো।’
সুতরাং জিন্দেগি জিনে কে লিয়ে জোরেশোরে সাগরযাত্রার আয়োজন শুরু হলো। প্লেন, জাহাজ, ইতালির বিশেষ শহরগুলোতে ইনক্লুডেড ট্যুর, রেস্তোরাঁয় ডিনার, সব ধরনের বুকিং শেষ করে, সমস্ত ভ্রমণ পরিকল্পনার খুঁটিনাটি, মাস, দিন, ক্ষণ একটা ছোট ডায়েরিতে লিখে আমাকে বুঝিয়ে দেওয়া হলো। আমরা নিউ ইয়র্ক থেকে রোম যাবো। রোম বিমানবন্দর থেকে ভাইকিংয়ের লোকেরা আমাদের পিকআপ করবে। জাহাজে তুলে নিয়ে যাবে ইতালির মোট পাঁচটা বিখ্যাত শহরে। আট দিনে আমরা পর্যায়ক্রমে নেপলস, মেসিনা, ক্রোটন এবং বারিতে যাবো। বারির পর আমরা যাবো ক্রোয়েশিয়ার উপকূলীয় শহর সিবেনিক। শেষ গন্তব্য ভেনিস। পরের দিন ভাইকিংয়ের নির্ধারিত বাস আমাদের এয়ারপোর্টে ড্রপঅফ করবে। গুডবাই জানাবে।
ইতালি ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে করতেই আমার মাথায় এলো, ‘যেহেতু ভেনিস পর্যন্ত যাচ্ছি, তাহলে ভেনিস থেকে আমরা কেন বিলেত পাড়ি দেই না? ইশ! আমার কৈশোরের লালিত স্বপ্নটা কীভাবে এতদিন, এই আটপৌরে জীবনের যাঁতাকলে চাপা পড়ে ছিল। একটু উসকে দিতেই জ্বালামুখ থেকে স্বপ্নরা ভুসভুস করে উদ্গীরণ শুরু করলো।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে শফিক রেহমানের ‘যায় যায় দিন’ কত আগ্রহ নিয়েই না পড়তাম। মঈন-মিলার ফোনালাপের সংলাপগুলো কী তুমুলভাবেই না আমাদের আলোড়িত করেছিল। এরশাদ আমলে ‘যায় যায় দিন’ বন্ধ হয়ে গেলো। মঈন-মিলাও হারিয়ে গেলো। বেশ কিছুদিন আগে সেই মঈন-মিলার কাহিনীকে উপজীব্য করেই একটি গল্প লেখা শুরু করেছিলাম। মঈন যেহেতু ঢাকা-বিলেত আসা-যাওয়া করতো, ইচ্ছে ছিল মিলাকেও বিলেতে নিয়ে, মঈনের মুখোমুখি করে গল্পের সমাপ্তি টানবো। কিন্তু নিজে সরেজমিনে বিলেত না দেখে বিলেতের দৃশ্য সাজানো একটু কঠিন। তাই বিলেত যাওয়ার প্রতীক্ষায় আমার গল্পটাও ওখানেই থেমে গিয়েছিল।
ছোটবোন সালমা দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনের বাসিন্দা। দুই সন্তান বিয়েশাদি করে নিজেদের মতো সংসার করছে। সালমারাও আমাদের মতোই এমটি নেস্টার। ইস্ট লন্ডনের বার্কিংয়ে ওদের তিন বেডরুমের বড়সড় বাড়ি। ও উৎসাহিত হয়েই আমন্ত্রণ জানালো। সুতরাং নো চিন্তা, ডু ফুর্তি। ভেনিস টু লন্ডনের টিকেটও কাটা হয়ে গেলো। বিলেতে আমরা থাকবো তিন সপ্তাহ! হুররে!
ভ্রমণ-আয়োজন কমপ্লিট। কেবল যাত্রার অপেক্ষা। হঠাৎ করেই ‘স্টার প্রিন্সেস’ নামক এক জাহাজে নোরোভাইরাস আউটব্রেকের খবরটা কানে এলো। ৪,৩০৭ জন যাত্রীর মধ্যে ১৪১ জন এবং ১,৫৬১ জন ক্রুর মধ্যে ৫২ জন ভাইরাসে আক্রান্ত। ভাবলাম, আচ্ছা, দেখাই যাক কী হয়! সবে মার্চ মাস। আমরা যাবো আগস্টে। এখনো ঢের দেরি।
খবরটা ধামাচাপা পড়তে না পড়তেই, জুন মাসে ‘রুবি প্রিন্সেস’ নামে আরেকটা ক্রুজে ব্যাপকভাবে ভাইরাস সংক্রমণের খবর চাউর হলো। সান ফ্রান্সিসকো থেকে আলাস্কা-কানাডা রাউন্ড ট্রিপের ক্রুজটিতে ৩,০৩২ জন যাত্রীর মধ্যে ১০২ জন এবং ১,১৪৪ জন ক্রুর মধ্যে ২৩ জন—মোট ১২৫ জন আক্রান্ত হয়েছে। উপসর্গ ছিল বমি ও ডায়রিয়া। ২৮ জুন খবরটি CDC-কে রিপোর্ট করা হয়। সেই একই ভাইরাস। মনটা দমে গেলো। তারপর জুলাই মাসে National Geographic Sea Bird জাহাজে পেটের ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার খবরে আমরা আসলেই নড়েচড়ে বসলাম। করোনা মহামারির ভয়াবহ স্মৃতি আমাকে আক্রান্ত করলো।
কনসেশন রেটে টিকিট কাটার পরও সব মিলিয়ে ডলারের অংকটা আমাদের জন্য খুব একটা কম ছিল না। প্রায় আট হাজার ডলারের ধাক্কা। বলাবাহুল্য, আমি একটু মুষড়েই পড়লাম। এতগুলো টাকা এবং জীবনের ঝুঁকি। ছেলেরা অভয় দিলো, “মা ভেবো না, সব ঠিক হয়ে যাবে। আগস্ট আসতে এখনো দেরি আছে। তাছাড়া পরিস্থিতি তেমন খারাপ হলে ক্রুজ কোম্পানি ট্যুর বন্ধ করে টাকা ফেরত দেবে। কিংবা ওরা ডিপোজিট ধরে রেখে পরিস্থিতি ভালো হলে নতুন করে বুকিং ইস্যু করবে।”
এদিকে, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজনরাও তাদের উৎকণ্ঠা প্রকাশ করতে লাগলেন। কেউ কেউ না যাওয়ার পরামর্শও দিলেন। আমার সহযাত্রীও না যাওয়ার টালবাহানা শুরু করলেন। এমনিতেই বেড়ানোর নামে তার গায়ে জ্বর ওঠে। এখন তো আরও ঢোলে বাড়ি।
এদিকে জুলাই আসতেই ‘ভাইকিং সি’ ক্রুজ কর্তৃপক্ষ ইমেল চালাচালি শুরু করে দিলো। তারা স্বাগত এবং শুভেচ্ছাবাণী পাঠাতে শুরু করলো। যাত্রার জন্য কী কী করণীয়, কী ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন, তা স্মরণ করিয়ে দিলো। স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কোনো বিধিনিষেধ থাকলে সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের সাজেশন, লেবেলকৃত অরিজিনাল প্যাকেটে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র, সাথে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন বহন করার নানাবিধ উপদেশ এবং রিমাইন্ডার এলো পরপর কয়েকটি ইমেইলে। পাসপোর্ট এবং প্রিন্ট করা ভিসা সাথে রাখার জরুরি পরামর্শ এলো। ক্রেডিট কার্ডের পাশাপাশি খুচরো ইউরো রাখার পরামর্শসহ এমন কোনো টুকিটাকি বিষয় বাকি রইলো না, যা ভাইকিংয়ের নজরদারি এড়াতে পারে। আমরা আশ্বস্ত, বিস্মিত এবং মুগ্ধ হলাম। জুলাইয়ের মাঝামাঝি আমাদের দুজনের লাগেজের জন্য লাল চামড়ার উপরে সাদা অক্ষরে ভাইকিং লেখা সুদৃশ্য ট্যাগ এবং নিজেদের বুকে লাগানোর জন্য নেইমট্যাগ এলো। রোমের এয়ারপোর্টে আমাদেরকে সহজেই যাতে শনাক্ত করা যায়, তার জন্য এই ব্যাপক আয়োজন।
দেখতে দেখতে জুলাইও শেষ হয়ে এলো। হাতে সময় খুব কম। মন থেকে সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে, সাত তাড়াতাড়ি বোনের পরিবারের জন্য কিছু উপহারসামগ্রী কিনলাম। অভিজাত একটা ক্রুজে যাবো, সেইমতো পোশাকআশাক প্রয়োজন। তাই নিজেদের জন্যও কিছু পোশাকআশাক কেনা হলো। সুমিত বললো, “ভাইকিং সি’র যাত্রীরা মোটামুটি ধনী এবং অভিজাত শ্রেণীর। যারা রুচিশীল, শান্ত পরিবেশে নির্বিঘ্নে, নিরিবিলিতে অবকাশ যাপন করতে চান, এমন মধ্যবয়স্ক এবং অবসরপ্রাপ্ত বুড়োবুড়ির সংখ্যাই বেশি। অন্যান্য বড় ক্রুজের মতো ওখানে ক্যাসিনো, ওয়াটার স্লাইড, ভিড়ভাট্টা, হট্টগোল থাকবে না। আশা করি তোমাদের জন্য যাত্রাটা আরামের এবং উপভোগ্য হবে।”
ছয় মাস আগেই টিকেট কাটা। সমস্ত পরিকল্পনা ইতোমধ্যেই কাগজের ডায়েরিতে, আইপ্যাডে টুকে রাখা। পরিকল্পনা মাফিক ফ্রিজের খাবারদাবার, বাজারসদাই প্রায় শেষ করে, ঘরদোর পরিষ্কার করে, সবকিছু গুছিয়ে আমরা এক মাসের ভ্যাকেশনের জন্য প্রস্তুত।
অমিতের ছুটি থাকায় আগের দিন সে আমাদের বাসায় চলে এলো। আমরা একসাথে ফেয়ারওয়েল ডিনার খেলাম। শেষবারের মতো চেকলিস্ট ধরে প্রয়োজনীয় সবকিছু নেওয়া হয়েছে কিনা, কোনো কিছু ভুল হলো কিনা পরীক্ষা করা হলো।
আগস্টের তিন তারিখ সকালে, ব্রেকফাস্ট সেরে, ঈশ্বরের নাম নিয়ে আমরা জেএফকে’র উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন