https://www.prothomalony.com/
10963
foundation
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০১:৫৩
বাংলাদেশ ইতিহাস দিয়ে রচিত। আন্দোলন-সংগ্রাম এ দেশের জনগণের শিরায় শিরায় বহমান। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। স্বাধীন দেশে যতবার কর্তৃত্বপরায়ণ শাসকের আবির্ভাব হয়েছে, ততবারই সেই সরকারের পতন নিশ্চিত করেছে জনতা গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে। ইতিহাস প্রতিটি গণ-অভ্যুত্থানের জয়গাথা লিখে রেখেছে। ব্যতিক্রম হলো না এবারো।৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কর্তৃক গৃহীত কর্মসূচি ‘মার্চ টু ঢাকা’ পালনে কারফিউ ভঙ্গ করে সর্বস্তরের মানুষ ঢাকা অভিমুখে যাত্রা করে, দেশের ক্ষমতাসীন সরকার তীব্র আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করে। দীর্ঘ ১৫ বছরেরও বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা 'স্বৈরাচার' সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে এক নতুন আশার জন্ম নেয়। গঠিত হয় নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। দীর্ঘদিন ধরে চলমান সকল প্রকার বৈষম্য ও সামাজিক অনিয়ম-অবিচার ও অসাম্য দূর করে একটি সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়গ্রহণ করার সময় এসেছে আজ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন প্রথমে কোটা-সংস্কার আন্দোলন হলেও পরবর্তীতে এটা দেশের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে ৫ই আগস্ট এক গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের টানা পনেরো বছরের শাসনামলের নিদারুণ পতন ঘটে। বর্তমানে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ পরিচালনা করছে। তাদের অভিষ্ট লক্ষ্য এখন রাষ্ট্র সংস্কার। এ লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বেশ কয়েকটি কমিশন গঠন করেছে। দেশের এ ক্রান্তিলগ্নে এ ধরনের সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সব সংস্কারই সফলভাবে করতে পারবে- এটা নিয়ে সংশয় থাকা মোটেও অমূলক নয়। চাকরিকালীন প্রশিক্ষণ না দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থা চাকরিমুখী অর্থাৎ যুগোপযোগী তথা প্রয়োজনমুখী করা আবশ্যক। চাকরি ক্ষেত্রে আন্তঃক্যাডার বৈষম্য দূর করতে হবে। আইনশৃংখলা বাহিনী- বিশেষ করে পুলিশকে যেকোনো মূল্যে দেশের সেবক, কঠোর নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগকারী করতে তাদের দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। পুলিশ বাহিনী ভালো হলে দেশের অর্ধেক সমস্যা এমনিতেই দূর হয়ে যাবে। স্থানীয় সরকারব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। উচ্চশিক্ষিতের সংখ্যা বৃদ্ধি না করে নির্ধারিত বিষয়ের আসন বিন্যাস নির্ধারণ করতে হবে। গবেষণা ও ব্যাবহারিক শিক্ষার উপর জোর দিতে হবে। শুধুমাত্র মানহীন, অসৎ, লোভী ও অমানবিক হওয়ায় প্রায় ১৮% উচ্চশিক্ষিত ছেলে-মেয়ে বেকার থেকে যাচ্ছে দেশে। এজন্য দেখা যাচ্ছে- দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা বাধ্য হয়ে বিদেশিদের নিয়োগ দিতে বাধ্য হচ্ছে এ ক্ষেত্রে। শুধু চাকরির জন্য উচ্চশিক্ষাগ্রহণ নিরোৎসাহিত করে উদ্যোক্তা ও গবেষক তৈরি করতে হবে। গ্লোবালাইজেশন-এর যুগে দেশ ও বিদেশের চাহিদা মোতাবেক নতুন নতুন বিভাগ চালু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ শিক্ষিত শ্রেণি গড়ে তুলতে হবে। কৃষিখাত বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের সব চেয়ে বড়ো ব্যয়ের খাত। সমবায়ের মাধ্যমে কৃষিব্যবস্থা আধুনিক করে এর প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বিনামূল্যে এলাকাভিত্তিক বিতরণ করতে হবে। কৃষকদের নিয়মিত প্রযুক্তি ব্যবহার ও নতুন পদ্ধতির প্রয়োগ সম্পর্কে বিনামুল্যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। স্বল্প শিক্ষিত উদ্দোক্তাদের ব্যাপক ট্রেনিং ও ব্যাংক-ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। আন্দোলনের ফসল নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। প্রথমত, আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আহতদের চিকিৎসার দায়-দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। এখনো আহত-গুলিবিদ্ধদের অনেকে মারা যাচ্ছে। প্রত্যেকের চিকিৎসার জন্য আর্থিক নিশ্চয়তার ব্যবস্থা করতে হবে। দরকার হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, আহতদের মধ্যে যারা কর্মক্ষমতা হারিয়েছে তাদের এবং নিহতদের পরিবারের দায়িত্ব নিতে হবে। সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ হবে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গ্রুপ, আন্তর্জাতিক লবি, সিভিল ও মিলিটারি ব্যুরোক্রেসির স্বার্থ রক্ষা করা। তিন শক্তিই চাইবে তাদের স্বার্থ রক্ষা হোক, এটা সরকারকে মোকাবিলা করতে হবে নিজেদের সদিচ্ছা, সক্রিয়তা দিয়ে। সবচেয়ে বড় বিষয় হবে তারা মোকাবিলা করতে চায় কিনা বা কীভাবে চায়। সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জনগণ। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জায়গা তৈরি করতে পারলে মানুষ এই সরকারের পাশে থাকবে। রাতারাতি সব করে ফেলা সম্ভব নয় কিন্তু সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়গুলো আছে, সেগুলোর সূচনাটা তো এখনই করতে হবে। পরে পর্যায়ক্রমে সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যারা বৈষম্যহীনতার জন্য লড়াই করে, তাদের অবস্থান দুর্বল। কিন্তু যারা সবল, সেই রাজনৈতিক দলগুলোর কেউ ধর্মের নামে, কেউ জাতীয়তাবাদের নামে, কেউ মুক্তিযুদ্ধের নামে বৈষম্যবাদী রাজনীতি করে। রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের স্বার্থকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারছে না। রাজনৈতিক দলগুলোর বড় সংস্কার দরকার। তাদের উচিত কর্মীদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি কার্যকর করা, দলীয় পদ বাণিজ্য বন্ধ করা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবারের আন্দোলনে পরিলক্ষিত হয়েছে যে এসব রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরেও একটি শক্তি আছে বা উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে যেটি খুবই ইতিবাচক। যারা আসলেই বৈষম্যবিরোধী, তাদের এই শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে কাজ করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থা কেমন চাই, স্বাস্থ্যখাত কেমন হবে, রাজনৈতিক পরিবেশ কেমন হবে, রাষ্ট্রব্যবস্থায় কী পরিবর্তন চাই, সংবিধান কেমন চাই—এগুলো নিয়ে ব্যাপক আলোচনার মধ্য দিয়ে জনগণের মত এবং শক্তি তৈরি করতে হবে। যেসব শিক্ষার্থীরা রক্ত দিয়ে বৈষম্যবিরোধী সমাজের জন্য আন্দোলন করেছে, তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে সচেষ্ট থাকবে হবে। তাই সরকারকে প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বসে সমাধান বের করতে হবে। একমাস অনেক কম সময় অনেক কম কিন্তু নির্দেশ দেওয়ার জন্য তো একমাস কম সময় না, সূচনা তো করতেই হবে। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার পালাবদল, সরকার পতনের আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী গণ-আন্দোলন, বিভিন্ন দাবিতে রাজপথে মিটিং–মিছিল, রাজনৈতিক হত্যা—এসবের সাক্ষী হয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। শুধু তা–ই নয়, দেশের মানুষ সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করেছে ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ। কিন্তু সাম্প্রতিক গণ–অভ্যুত্থান ও তার পূর্বাপর ঘটনাপ্রবাহ এতটাই দ্রুততার সঙ্গে ঘটে গেছে যে অনেকেই এত কিছু একসঙ্গে নেওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন না। সংগত কারণেই এক অস্থিতিশীল সময় পার করছে দেশ। আমাদেরকে খুব দ্রুত বিভিন্ন পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হচ্ছে। এই পরিবর্তনগুলো অনেক ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলছে আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক আচরণে। এমনকি তা প্রভাবিত করছে আমাদের পেশাগত জীবন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আচরণকে। অস্থিতিশীল এই সময়ে মানসিকভাবে ভালো নেই অনেকেই। আন্দোলনের দিনগুলোতে যারা স্বজন হারিয়েছেন, বিভিন্ন সহিংসতা আর বীভৎসতার শিকার হয়েছেন কিংবা প্রত্যক্ষ করেছেন, তাদের এই ট্রমা কাটিয়ে উঠতে এমনিতেই অনেক সময় লাগবে। প্রতিদিনই যেন দাবি আদায়ের নতুন নতুন পটভূমি রচিত হচ্ছে। প্রতিটি দিন যেন এখনো নতুন নতুন ঘটনার জন্ম দেখার অপেক্ষা। পরিবর্তনের এই সময়ে প্রয়োজন প্রচুর ধৈর্য, সহিষ্ণুতা আর পরিণত আচরণ। অসতর্ক ও অসহিষ্ণু আচরণের ফাঁক গলে সুযোগসন্ধানীরা এরই মধ্যে তাদের স্বার্থ চরিতার্থ করার তৎপরতা শুরু করে দিয়েছে। সেই সুযোগসন্ধানীদের যেকোনো প্রকারে থামাতে হবে। একমাত্র জাতীয় ঐক্যই পারে সেই চেষ্টাকে রুখে দিতে। দ্বিধাবিভক্ত হয়ে নিজেদের মধ্যে হানাহানি করলে আমরা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পড়ব এবং আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে কখনোই পৌঁছাতে পারব না। ছাত্রজনতার রক্তে আগুন লাগা বাঁধভাঙ্গা শ্রোতে গত দেড় যুগ অথবা অর্ধ শতাব্দীতে জমা সব জঞ্জাল ভেসে যাচ্ছে। স্বাধীনতা মূল্যহীন নয়, এটি কেউ এমনি এমনি দিয়ে দেয়না। এর জন্য মুক্তিপাগল মানুষকে অনেক মূল্য চুকাতে হয়। যে রাজনৈতিক-সামাজিক -অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ১৯৬৯ সালে ছাত্রজনতার গণঅভুত্থান ঘটেছিল এবং তারই পথ ধরে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে লাখো মানুষের প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল, স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী পেরিয়ে এসে দেখা গেল, দেশের শাসক গোষ্ঠি স্বাধীনতার সেই লক্ষ্য থেকে অনেক আগেই বিচ্যুত হয়ে গেছে। স্বাধীন। মুক্তিযুদ্ধ যে কোনো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ ও সংহত করতে পারে। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মতভিন্নতা সৃষ্টি হওয়াও অস্বাভাবিক নয়।নতুন প্রজন্ম অতীতের ব্যর্থ রাজনীতির পথ পরিহার করে রাজনীতির নতুন বন্দোবস্ত কায়েম করতে চায়। জাতির এ সন্ধিক্ষণে উন্মত্ততা ও প্রতিহিংসার পথ পরিহার করে সহাবস্থান ও সম্প্রীতির নতুন রূপরেখায় দেশকে এগিয়ে নেয়াই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। গণঅভ্যুত্থানের যে শক্তি, তার ওপর ভিত্তি করেই অনেক কাজ করা যায়। আজকের এই নতুন বাংলাদেশ রচনার গৌরব কিন্তু আমাদের সকলের। আমাদের সামান্য অসতর্ক আচরণে তা যেন ম্লান না হয়ে যায়, থাকতে সদা সতর্ক।
ফাউন্ডেশন থেকে আরো পড়ুন