https://www.prothomalony.com/
10887
foundation
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০১:৫৩
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স। অধিক বেতন, উন্নত কর্মপরিবেশ ও জীবনযাপনের আশায় মানুষ নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি জমায়। এসব প্রবাসীর পাঠানো রেমিট্যান্স একটা দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করে। রেমিট্যান্স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের মাথাপিছু আয় এবং মোট জিডিপিও বৃদ্ধি পায়। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রবাসী আয়ের অর্থ দেশের দারিদ্র্যমোচন, খাদ্যনিরাপত্তা, শিশুর পুষ্টি ও শিক্ষার ক্ষেত্রেও অবদান রাখছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রবাসীদের রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে তুলছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি সচল রাখতে সবচেয়ে বড় অবদান প্রবাসীদের। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরছে প্রতিনিয়ত। তবে কোটা সংস্কার আন্দোলনের কারণে ব্যাংক ও ইন্টারনেট বন্ধসহ বেশ কিছু কারণে ধস নেমেছিল রেমিট্যান্সে। ছাত্র-জনতার অভাবনীয় গণঅভ্যুত্থানের সময় রেমিট্যান্স যোদ্ধারা ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে দমন-পীড়নের প্রতিবাদে বিগত সরকারের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে প্রবাসীরা বৈধ পথে রেমিট্যান্স না পাঠানোর ঘোষণা দেন। ছাত্র আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে ‘রেমিট্যান্স শাটডাউন’ নামক কর্মসূচি দিয়েছিলেন প্রবাসীরা। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকার কয়েকটি দেশে ছাত্রদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে প্রবাসীরা সমাবেশ ও বিক্ষোভ প্রদর্শনও করেন। বিক্ষোভের অভিযোগে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৫৭ বাংলাদেশিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়ার বিষয়টিরও রেমিট্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। সবকিছু মিলে রেমিট্যান্স প্রবাহের নিম্নগতি পরিলক্ষিত হয়।
ঐ সময় কেউ টাকা জমিয়ে রেখেছিলেন আবার কেউ বেছে নিয়েছিলেন হুন্ডির পথ। ছাত্র গণঅভ্যুত্থান সফল হওয়ার পর দেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হলে নতুন সরকারকে শক্তিশালী করতে প্রবাসীরা বেশি রেমিট্যান্স পাঠানোর ঘোষণা দেন। দেশ গঠনে বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠানোর বিষয়ে অনেক প্রবাসী ক্যাম্পেইন শুরু করেন।
রেমিট্যান্স পাঠাতে মালয়েশিয়া, কুয়েত ও ইতালিসহ বিভিন্ন দেশের এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোয় প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভিড় ছিল লক্ষণীয়। মানি এক্সচেঞ্জগুলোর কর্মকর্তাদের ভাষ্য, চলতি সপ্তাহে আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছে ইতালিপ্রবাসী বাংলাদেশিরা। গত চলতি বছরের এপ্রিল, মে ও জুন মাসে টানা দুই বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে। জুনে তা কমে ফের দুই বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যায়। জুলাই মাসে রেমিট্যান্সের গতি কমার পেছনে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে প্রবাসীরা বৈধ পথে না পাঠানোর কথা জানিয়েছিলেন।
পাশাপাশি তারা ছাত্রদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা। এতে হঠাৎ কমে যায় রেমিট্যান্সের গতি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর হু হু করে বাড়ছে বৈধপথে রেমিট্যান্স আসার পরিমাণ। চলতি আগস্টের প্রথমদিকে রেমিট্যান্স আসা থমকে গেলেও পরে তা বেড়েছে বহুগুণে, পুরো মাসে তা ফের দুই বিলিয়ন (২২২ কোটি ডলার) ডলার ছাড়িয়ে যায়। তবে এবার রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে দেশ। চলতি মাস সেপ্টেম্বরে প্রতিদিন গড়ে ১১ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স আসছে। গত বৃহস্পতিবার একদিনেই এসেছে প্রায় ১৩ কোটি (১২.৮০) ডলার বা ১ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা। যা দেশের জন্য এক নতুন রেকর্ড। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি মাস সেপ্টেম্বরের প্রথম চারদিনে প্রায় ৪৪ কোটি (৪৩৬ মিলিয়ন) ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা। বাংলাদেশি মুদ্রায় (প্রতি ডলার ১২০ টাকা হিসাবে) যার পরিমাণ ৫ হাজার ২৩২ কোটি টাকা। আর প্রতিদিন গড়ে এসেছে প্রায় ১১ কোটি বা ১ হাজার ৩০৮ কোটি টাকার বেশি। গত বছরের সেপ্টেম্বরের প্রথম চারদিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার। সে হিসাবে গত বছরের সেপ্টেম্বরের চারদিন সময়ের চেয়ে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় বেড়েছে ২৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার। চলতি মাস সেপ্টেম্বরের শুরুর মতো এভাবে রেমিট্যান্স আসার ধারাবাহিতা থাকলে মাস শেষে ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। যা দেশের ইতিহাসে হবে নতুন এক রেকর্ড। চলতি সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে দেশ। চলতি মাস সেপ্টেম্বরে প্রতিদিন গড়ে ১১ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স আসছে। গত বৃহস্পতিবার এক দিনেই এসেছে প্রায় ১২ দশমিক ৮০ তোটি ডলার বা ১ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা। যা দেশের জন্য এক নতুন রেকর্ড। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম চার দিনে প্রায় ৪৪ কোটি (৪৩৬ মিলিয়ন) ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। বাংলাদেশি মুদ্রায় (প্রতি ডলার ১২০ টাকা হিসাবে) যার পরিমাণ ৫ হাজার ২৩২ কোটি টাকা। আর প্রতিদিন গড়ে এসেছে প্রায় ১১ কোটি বা ১৩০৮ কোটি টাকার বেশি। গত বছরের একই সময় সেপ্টেম্বরের প্রথম চার দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার। সে হিসাবে গত বছরের সেপ্টেম্বরে চার দিন সময়ের চেয়ে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় বেড়েছে ২৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার। চলতি মাস সেপ্টেম্বরের শুরুর মতো এভাবে রেমিট্যান্স আসার ধারাবাহিতা থাকলে মাস শেষে সোয়া ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে, যা দেশের ইতিহাসে হবে নতুন এক রেকর্ড। চলতি সেপ্টেম্বরের শুরুতেই যেভাবে রেমিট্যান্স আসার গতি রয়েছে এ ধারা অব্যাহত থাকলে নতুন রেকর্ড গড়বে দেশ। সোয়া ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে রেমিট্যান্স। তবে এ জন্য আরও কয়েক দিন দেখতে হবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। রেমিট্যান্স বেশি আসার পেছনে সচেতনতা কাজ করছে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া প্রবাসীদের কাছে পৌঁছানো আর ডলারের দরবৃদ্ধিতে হুন্ডি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন তারা। এসব কারণে বাড়ছে রেমিট্যান্স আসার পরিমাণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশের ইতিহাসে একক মাসে সর্বোচ্চ ২৬০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল ২০২০ সালের জুলাই মাসে। বছরওয়ারি হিসাবে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসে ২০২০–২১ অর্থবছরে। ওই অর্থবছরে মোট রেমিট্যান্স আসে ২৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৪৭৮ কোটি ডলার। আর চলতি বছরের জুন মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে মোট ২৫৪ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় দেশে এসেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ২৯ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা। এটি এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, সদ্য বিদায়ী আগস্ট মাসের পুরো সময়ে দেশে বৈধপথে রেমিট্যান্স এসেছে ২২২ কোটি (২.২২ বিলিয়ন) ডলার। যা তার আগের বছরের (আগস্ট-২০২৩) একই সময়ের চেয়ে ৬২ কোটি ডলার বেশি এসেছে। গত বছরের আগস্ট মাসে এসেছিল প্রায় ১৬০ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে দেশে ১৯০ কোটি মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স আসে। এছাড়া জুন মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৫৪ কোটি ১৬ লাখ মার্কিন ডলার। তার আগের মাস মে মাসে আসে ২২৫ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। এছাড়া এপ্রিলে ২০৪ কোটি ৪২ লাখ, মার্চে ১৯৯ কোটি ৭০ লাখ, ফেব্রুয়ারিতে ২১৬ কোটি ৪৫ লাখ এবং জানুয়ারিতে ২১১ কোটি ৩১ লাখ মার্কিন ডলার পাঠান প্রবাসীরা। দেশের সংকটময় অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স বেশি পরিমাণে আসার সংবাদ নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। দেশের অর্থনীতিকে চাঙা করতে প্রবাসীদের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স পাঠানোর এই আগ্রহ ধরে রাখতে হবে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির এক বিরাট শক্তি। এই শক্তির সঠিক ব্যবহারেই ভবিষ্যৎ আরও নিরাপদ ও সুন্দর হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বব্যাংকের মতে, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন, স্কুল-মাদ্রাসা, মসজিদ, হাসপাতাল স্থাপনসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে এ অর্থ ব্যয় হয়। রেমিট্যান্স আয়ের প্রায় ৬৩ শতাংশ দৈনন্দিন খাতে খরচ হওয়ায় পরিবারগুলোর দরিদ্রতা দূর হচ্ছে। দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের অন্যতম অনুঘটক হিসাবে বিবেচ্য। রেমিট্যান্স যোদ্ধারা দেশের অর্থনীতির ভিত মজবুতসহ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ করছেন। বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারিকালে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রবাসী আয়ের ব্যাপক ভূমিকা কারও অজানা নয়। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের প্রধান উৎস রপ্তানি খাত হলেও রেমিট্যান্সের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি কার্যকর বলে অর্থনীতিবিদদের ধারণা। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের পুরোটাই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি রিজার্ভ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। তাই প্রবাসীদের জন্য যত সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হবে, দেশে তত রেমিট্যান্স আসবে। আর রেমিট্যান্স প্রবাহ সচল থাকলে তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। কাজেই রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলে পরিচিত প্রবাসী রেমিটেন্স যোদ্ধাদের অবদানের কথা বলতেই হয়। এদের কঠোর পরিশ্রমের ফসলেই বাংলাদেশ শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। তবে, এসব প্রবাসী যোদ্ধাদের অনেকেই যখন দেশে ফেরেন, তখন তাদের প্রতি সঠিক সম্মান ও মানবিক আচরণ না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে, মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের গৃহীত কিছু উদ্যোগ প্রবাসী কর্মীদের জন্য আশার আলো নিয়ে এসেছে। দেশকে নতুনভাবে গড়ার অঙ্গীকার প্রবাসীদের। দুর্নীতিমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে আহ্বান জানিয়েছেন তারা। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে অর্থ দেশে পাঠাচ্ছে সেটা যেন পাচার না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখার জোর দাবি জানান রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের।
ফাউন্ডেশন থেকে আরো পড়ুন