https://www.prothomalony.com/
10535
foundation
বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিংবা সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের জন্য কারফিউ জারি করা নতুন কোন বিষয় নয়। সহিংসতা যখন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে যায় তখন তা নিয়ন্ত্রণের সর্বশেষ উপায় হিসেবে কারফিউ বিবেচনা করে সরকার।
সর্বশেষ কারফিউ জারি করার ঘটনা ঘটেছিল ২০০৭ সালে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়। সেটিও হয়েছিল ছাত্র বিক্ষোভ দমনের জন্য। ১৫ জুলাই মঙ্গলবার থেকে শুরু করে শুক্রবার পর্যন্ত দেশজুড়ে নজিরবিহীন এই সংঘাত শুধু তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে। প্রতিদিনই বেড়েছে মৃত্যুর সংখ্যা।
কারফিউ এমন এক সময়ে জারি করা হলো যখন পুলিশ, র্যাব এবং বিজিবির সাথে বিক্ষোভকারীদের রক্তাক্ত সংঘাত হয়েছে টানা চারদিন ধরে। নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কি এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়েছে? তবে এক অর্থে তো হয়েছেই ব্যর্থ।
যদিও আইনমন্ত্রী আনিসুল হক মনে করছেন, রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যর্থ হয়নি। চলমান সহিংসতা থামানো এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষা করার জন্য সরকার কারফিউ দিতে বাধ্য হয়েছে।
কোটা বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এবার অভাবনীয় এক পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, সহিংসতা যখন কয়েকটি জায়গার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে তখন পুলিশের জন্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়। কিন্তু সংঘাত যখন বিভিন্ন জায়গায় এবং অলিগলিতে ছড়িয়ে যায়, তখন সেটির মোকাবেলা করা পুলিশের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে। শুক্রবার ঢাকার আকাশে ক্রমাগত হেলিকপ্টার চক্কর দিয়েছে। যেসব এলাকায় বিক্ষোভের তীব্রতা বেশি ছিল সেসব জায়গায় হেলিকপ্টার থেকে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করা হয়েছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন। বিক্ষোভ দমনের জন্য কারফিউ জারি করে সেনাবাহিনী নামানো সর্বশেষ পদক্ষেপ। এরপর আর কোন পদক্ষেপ বাকি থাকে না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হলে যারা সহিংসতা করতে চায় তাদের ওপর সেটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব তৈরি করে।
অতীতে যখন কারফিউ জারি করা হয়েছিল, তখন দেখা গিয়েছিল যে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও সেটি ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করা হয়। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, চরম সংঘাতময় পরিস্থিতিতে কারফিউ জারি করা হলে সেটি সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তা বোধ তৈরি করে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি নির্ভর করছে সাধারণ মানুষ বিষয়টিকে কীভাবে গ্রহণ করে তার ওপর।
কোটা সংস্কার আন্দোলনে সহিংসতায় এ পর্যন্ত কত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, এর সঠিক সংখ্যা এখনও অজানা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত সোমবার পর্যন্ত ১৫০ জনের প্রাণহানির তথ্য নিশ্চিত করলেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলো, নিহতের সংখ্যা অন্তত ২৬৬। অন্যদিকে একটি মানবাধিকার সংগঠনের ধারণা, নিহত ২৫০ জনের কম নয়।
কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে ৩০ জুলাই মঙ্গলবার পর্যন্ত ঢাকায় ২৭০টি মামলায় দুই হাজার ৮৯১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মধ্যে দুই হাজার ২৮৪ জনেরই কোনও রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া যায়নি, যা মোট গ্রেপ্তারের ৮৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ। অর্থাৎ, কোনও দলের সঙ্গে তাদের কোনও সংশ্লিষ্টতা নেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাদের বেশির ভাগই শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষ।
৩০ জুলাই 'রক্ত লাল’ প্রতিবাদে সরব হয়েছিল পুরো দেশ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে এই প্রতিবাদ চলেছে অনলাইন ও অফলাইনে। মূলত, কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্বিচারে গুলিতে বহু হতাহতের ঘটনায় প্রতিবাদ জানাতে সরকার দেশব্যাপী শোক পালনের সিদ্ধান্ত নেয়, ঠিক তখন লাল রঙে প্রতিবাদে শামিল হতে ভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন সমন্বয়ক।
লাল রঙের কাপড়ে মুখ ও চোখ বেঁধে ছবি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক প্রোফাইলে দেয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। শিক্ষার্থীদের এ আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, রাজনীতিক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিক, লেখক, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ।
ইন্টারনেট বন্ধ এবং দেশের গণমাধ্যমগুলোতে বাংলাদেশের সংঘাত-সংঘর্ষ ও হত্যা-নিপীড়নের প্রকৃত চিত্র না এলেও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে ভয়াবহ সচিত্র খবর প্রচার হচ্ছে। বাংলাদেশে কারফিউর মধ্যেই আন্দোলনসহ চলমান পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জার্মানি, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশ। এ ছাড়া জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন নজরদারির মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। জাতিসংঘ জানিয়েছে, বাংলাদেশে চলমান ছাত্র আন্দোলনে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ ও মানবাধিকার লংঘনের বিশ্বাসযোগ্য তথ্যপ্রমাণ পেয়েছে। মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরাঁর মুখপাত্র স্টিফেন ডুজাররিক সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, যেকোনো পরিস্থিতিতে প্রয়োজন হলে জাতিসংঘ মহাসচিব তার ম্যান্ডেট অনুসারে বাংলাদেশের ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। কোটা আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, নিরস্ত্র মানুষকে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সরাসরি গুলি, কারফিউয়ে সেনাবাহিনীর টহলে জাতিসংঘের লোগোযুক্ত যানবাহন ব্যবহারসহ বিভিন্ন কারণে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নজরদারি বাড়িয়েছে।
রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে, নিবিড় পরিচর্যায় আজ যে গভীর ক্ষত দ্রুত সারানো জরুরি। হত্যা, সহিংসতার দায় কার? রাষ্ট্র তো এই দায় এড়াতে পারবেনা। এই দায় নিয়ে পারস্পরিক দোষারোপের রাজনীতিতে দেশ যে আজ কোথায় দাঁড়িয়েছে, জনগণের মাঝে একধরনের অস্বস্তি। সরকারের ইন্টারনেট ব্ল্যাক আউটের কারণে অর্থনীতির সব ক্ষেত্রে যে পরিমাণ ক্ষতি তা কি পূরণ হবে? আইটি খাতে ফ্রি লেন্সিং এ অজপাড়াগাঁ থেকে শুরু করে শহরে তরুণরা যে অভাবনীয় সফলতা দেখিয়েছিলো তাদেরকে আজ হতাশাজনক অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। সারা বাংলাদেশ আজ এক প্রশ্নের সম্মুখীন, উত্তর কোথায় মিলবে, আদৌ কি মিলবে? এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ভূ-রাজনৈতিক হুমকির সম্ভাবনাও আমলে রাখতে হবে।
কোটা বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভকারীদের সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কর্মীদের নজিরবিহীন সংঘাত যেন থামছেই না। কোন আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এতো কম সময়ের মধ্যে এতো বেশি মানুষ নিহত হবার ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনো ঘটেনি।
সময় যতো যাচ্ছে ছাত্র আন্দোলনের সাথে শিক্ষক, পেশাজীবি, অভিভাবক, সাধারণ মানুষের একাত্মতা বাড়ছে। এর শেষ কোথায়? এর উত্তর হয়তো ভবিষ্যৎ ই বলে দিবে। আজ শুধু স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সেই গানটাই যেনো সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য মানুষের মনে বাজছে, "রুখবে তাদের কারা, আজ রুখবে তাদের কারা"।
ফাউন্ডেশন থেকে আরো পড়ুন