https://www.prothomalony.com/

10376

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত্য

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৪ ০২:৫০

ডাকা

আবু তাহের মুহাম্মদ 


আমাকে ডেকে নিয়ে যাও 

ফালি ফালি আগুনকে বরফ ভেবে

দোকানিকে দিও কিছু 

তোমার আঁচল ছিটকে কিছু বরফ

মেঘমালা হয়ে তোমাকে ছুঁয়ে দিলে

পলেস্তারা খসা বারান্দায় দাড়িও খোঁপা ভাঙতে ভাঙতে। 
 

আমাকে ডেকে নিয়ে যাও 

আমি সেই দ্বীপের লতানো পুরুষ 

নাভিমূল ভিজিয়ে অরণ্য গাঙে

ডেবিট কার্ডের পিন খুলে  দিয়ে 

ফতুর হলে পরে

একটি কলম কিনে দিও 

যে কলমের নিব দিয়ে শুধু লেখা যায়

ডেকে-নিয়ে যাও। 

 

 

 

মধুমিতা 

সারমিন চৌধুরী 
 

মধুমিতার চোখে কাজল ছিল 

চৈত্রের তীব্র রোদজ্বলা পিচ পুড়া কালো প্রলেপ

তার কপালে টিপ হয়ে হাসতে থাকলো 

পাতাশূন্য ন্যাড়া গাছ সবে জানান দিয়ে গেছে 

শীত আসছে নিয়ে শুষ্ক শূন্যতার হাহাকার

মধুমিতার কর্ণিয়াতে জমাট বাঁধছে শুভ্র বেদনা। 

মধুমিতা নীলরঙা বারোহাত শাড়ি পড়তো

কিন্তু কখনো খোপায় ফুল গুঁজতো না,  

শখে নাকি কিছু লুকোতে চোখে কাজল দিতো? 

ডাগর সে চোখে থাকতো যেন রাজ্যের যত কথা!

আচ্ছে সুখের জন্য কেনো খুঁজো ভালোবাসা- 

ভালোবাসার জন্য সুখ বরাদ্দ কেন নয়? 

আমি নাদান কভু সেই ভাষা বুঝে উঠতে পারিনি

মধুমিতা আমার প্রথম প্রেমিকা ছিল না

তবে আমিই তার সখের পুরুষ ছিলাম।  

মধুমিতা বোধহয় বুঝতে পেরেছিলো ক্রমে 

পরনারীতে আমার আসক্ততা;

যাকে স্বর্গের সমস্ত সুখ এনে দেবার কথা ছিল

আমি তাকে নরকের দুয়ারে ঠেলে দিয়েছি

আজ মধুমিতার মৃত্যুবার্ষিকী, আর- 

আমি মৃত্যুর ভিক্ষা চাইছি মুক্তির আশায়।

 

 

নীলাঞ্জনা

অঞ্জন ব্যানার্জ্জি
 

নীলাঞ্জনা, চেয়ো নাকো অমন করে

অন্য কোনো পুরুষের চোখে

তাকাও আমার চোখে আয়ত নয়নে

হাত রেখো ভালবেসে আমার হাতে

যে কম্পন সুর তোলে শারদের কাশফুলে

বসন্ত হাওয়ায় নদীর  ঢেউয়ে

নীল আকাশে ভাসা পাখির ডানায়

বিদ্যুৎ চমকানো  ঝর্ণা ধারায়

সে  কম্পনে বিগলিত করো হৃদয় আমার

তোমার অমোঘ ভালবাসার ছোঁয়ায়।

 

 

 

অনুভূতি ও চেতনা

সীমান্ত সরকার
 

ঘরবাড়ির চালে জড়তাগুলো শুকান ছিল

ছাদের দুধারে যত্নে গুটিশুটি সুখ, দুঃখ, ঘৃণা।

যখন জ্ঞানের মেঘে টপটপানি প্রেম ঝরল,

ছাদের দুধার থেকে টিনের চাল ধুয়ে পড়ল গ্লানির গঙ্গা

নিয়ে মিশিয়ে দিলো অচলায়তন মেঘনায়।

মুক্তাকী চেতনার জন্ম তখনই - কে আমি?
 

অনুভূতির জঞ্জাল স্রোতস্বিনীর আঁচলে

যেখানে পথিক হয় কস্তুরিরা,

প্রেম নিবেদনে উদগ্রীব সাজে কস্তুরি ফুল শ্যামলিমা

নৌকা বা মাছের কলরবে হয় আবেগের লেনদেন।

পদ্মা হয়ে চাঁদপুরে মেশে হতাশা, উদ্বিগ্নতা, লজ্জাবোধ;

মেঘনা ছুটে চলে মোহনায়–
 

যখন শিরার সাথে শিরায়, কোষের ভেতর কোষে

কথা হয় হরমোনে একাত্মায়–

সেই মোহনায় দেখি জঞ্জালে জঞ্জালে পদ্ম

চেতনার শরীরে বেড়ে ওঠা অনুভূতির জীবন।

 

 

 

নিজেকে নমুনারূপে গড়তে

তোফায়েল তফাজ্জল 
 

নিজেকে নমুনারূপে গড়তে 

মুখ হয়ে গেলে ব্যর্থতার বাংলা পাঁচ 

জ্ঞানী হয়ে লাভ নেই শিশির বিন্দুও। 

তবে, যে অন্যকে দেখে, নিচে পড়াদের 

উপরে উঠাতে হাত প্রসারিত করে, টেনে তোলে 

তিনি উঁচু দরোজার। 

তার লাভ কেজি কেজি, অমূল্য রতন। 

তেমন মানুষ গড়তে 

তাঁর সৃষ্টির ঝিনুক জুড়ে আছে প্রেরণার মুক্তো ।
 

আর যে বা যারা কেউ পাশের জনকে 

মুরগি বানিয়ে গা ঢাকা দেয়

এরা কাপুরুষ, না-মানুষ। 

দিনশেষে সবাই যেহেতু 

কাফনের বাইরে দু'টি হাত রাখা আলেকজান্ডার     

তাহলে কী লাভ  

বাঁকা পথের পথিক হয়ে, বাঁহাতের উপার্জনে ?

তাঁর একাধিক প্রশ্ন ছড়িয়ে দিয়েছে 

লাল বাতি জ্বলে ওঠা তেমন সংকেত।

 

 

 

আপনি কি বুঝতে পারেন 

আল মামুন রিটন 
 

আপনার সাথে আমার দেখা হলেই, আপনি সরাসরি 

আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকেন

যেন রবি তার সমস্ত তেজ নিয়ে আমাকে গ্রাস করছে। 

আমি তখন কাপুরুষ হয়ে যাই

আতঙ্কিত হয়ে ভাবতে থাকি ডুবে- না যাই

ডুবে গেলে সাঁতরে উঠতে যদি না পারি? 

ওই অথইয়ে সব ছেড়ে শেষে যদি ডুবে মরি?

 

আপনার দিকে ভয়ে না তাকালেও ঠিকই বুঝতে পারি, 

সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের পবিত্র কিছু-করবির মত ঝুঁকে 

আছে আমার দিকে-তাকিয়ে গিলছে আমাকে

আমার পালাবার পথ ও শক্তিরা মহাবিশ্বের ব্ল্যাকহোলে

ভ্যানিশ হলেও, আমি আপ্রাণ মুক্তি খুঁজি

আপনি তখনও আমার দিকেই তাকিয়ে থাকেন

আমি যতক্ষণ না নত হয়ে ঝুঁকে পড়ি 

আপনার স্বচ্ছ কাচের মত অস্তিত্বের অতলে।

 

আপনি কি বুঝতে পারেন একটা ছেলে জমে যাচ্ছে 

একটা ছেলে গলে যাচ্ছে? 

একটা ছেলে ক্রমশ আপনার অনন্তে ডুবে যাচ্ছে?

 

 

 

স্মৃতিশোক

আবির হাসান
 

ঝুমঝুম বৃষ্টির শব্দে একটা নির্জন উদ্ভিদের 

ছায়ায় আশ্রয় নেয় যাযাবর মন, যেখানে 

অজস্র ঝরা পাতার শরীরে প্রেমহীনতার 

ক্ষতচিহ্ন দেখে অরণ্যে নিভে যায় রঙিন দীর্ঘশ্বাস!

অথচ হলদে বিকেলের জীর্ণ পালকে ভর করে 

উড়তে চেয়েছিলো কতো প্রেমহীন চোখ, যারা বহু 

বসন্ত ধরে বিরহের সাদাকালো পোশাক পরে আছে!
 

তুমুল বৃষ্টিতেও যে পাখি বসে থাকে বৈদ্যুতিক তারে,

তার কি কোথাও যাওয়ার নেই? নাকি স্বপ্নের নীড় 

ভেঙে গ্যাছে আক্রোশের জরদ বাতাসে, জানিনা! 

তবুও এই বৃষ্টিভেজা দুপুরে জীবনকে তার মতো 

অসহায় লাগে!

 

 

 

অমল চোখে ভোরের চাঁদ 

বশির আহমেদ 

 

ঘুমের ছন্দ কেটে গিয়ে অমল চোখে আটকে গেছে 

ভোরের চাঁদ,

অর্জুন গাছের ডালে রাত জাগা পাখি ফিরে পেয়েছে 

নতুন প্রাতঃকাল।

তৃপ্তির নিদ ছেড়ে অজনা অম্বরে ডানা ঝাপটায় 

এক ঝাঁক দ্বিপদী পাখি। 

প্রকৃতির মিহি বাতাসে দুলে স্বপ্নের বাগান বিলাস 

বাড়ির আঙ্গিনায় শান্ত জলপতি জাগিয়ে তোলে

বুভুক্ষু মাছের চোখ!

 

 

 

চুপিচুপি বিদায়

হাবীব ইমন

 

এ আমার শেষপত্র কিনা জানি না। হয়তোবা শেষ, হয়তোবা নয়।দোয়াতের কালি শুকিয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে—দুঃসময়ের দিনলিপি আটকে যাচ্ছে। রোগ-কষ্ট-হতাশাকে সঙ্গে নিয়ে যে লড়াই, তাকে বার বার দেখি—অকালবৈকল্যের বেদনাময় উপস্থিতি যেন সরোবর।

না, ডাকবো না আর তোমাকে।

বৃষ্টি হচ্ছে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। থামার কোনো নাম নেই। শোবার ঘরে, জানালার দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে দেখি, কান পেতে শুনি—টিনের চালে বৃষ্টির অনবরত শব্দ—কাওয়ালি আওয়াজ নেই। বাতাসে ভাসছে দুঃখ-জাগানিয়া জলের সৌরভ।

কোনো কোনো রাতে আমি কাওয়ালি শুনতাম, বুকের ভেতর আনন্দ নৃত্য হতো। কোনো এক পূর্ণিমা সন্ধ্যায় তুমি এলে। এ এক অন্য কাওয়ালি—জীবনের মানে, জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়েছি এতদিনে। নতুন প্রাণে আমিতোমার নেশাতুর হলাম। তুমিও হয়েছিলে।

ভুলে গেলে তুমি সেসব দিনের কথা? মনে পড়ে সেদিনের কথা—বৃষ্টিমাতাল এক বিকেল ছিল। আমি অপেক্ষায় কাঁটাবনের ঢালে, পাঠক সমাবেশে বই নাড়ছি। তুমি এলে খানিকটা বিলম্বে, লাল পাড়ের শাড়িতে, স্মিত হেসে, খোঁপায় বেলিফুলের মালা। আমার হাতে একটি বই তুলে দিলে ‘চলতে চলতে’। তারপর! তারপর তুমি-আমি আশ্রয় নিলাম শিল্পকলা একাডেমির গাছের ছাউনিতে। গাছটি ছিল কৃষ্ণচূড়া। কোকিল ডাকছে। প্রকৃতিও যেন সেজেছে নতুন আবেগে। আর আমি ‘বিজয়ফুল’ হাতে হাঁটুমুড়ে তোমার বশ্যতা স্বীকার করলাম।

তুমি আমার শাসনভার নিলে—আমার হাতটা ধরলে। এটা কেবল হাত ছিল না, ছিল একটা আশ্রয়। একটা নতুন ঘর দিলে আমাকে—ভালোবাসার কুসুম ঘর। আমি তোমাকে বলেছিলাম এক সলতে জ্যোৎস্না ফোটাবো ওই ঘরে। বেহেশতসমান একটা ছোট্ট সংসার হবে আমাদের। তুমি বলেছিলে, ‘কিছু বৃষ্টি দাও অনিমেষ, তোমার চোখে স্বপ্ন ফিরিয়ে দিব, চলো ফের হারিয়ে যাই’। একদিন ভোরের আলো ফোটবার আগে তুমিই সে ঘর ভেঙে দিলে। 

আমার ভেতর ক্রন্দন—অবিরাম আঁখিজল। অনল বাতাসে উড়ে যাওয়া নতুন ধূপ। 

স্বপ্ন বুনে স্বপ্ন কেড়ে নিলে। একটা ঘর ভেঙে দিলে। কী সহজ তাই না! যদি জানতে আমার পেরিয়ে আসা দিনগুলো কত কঠিন ছিল! আগুনের ছরা লেগে কুহুকের বুক পুড়ে গেছে, রাতের অন্ধকারে অন্তরীণ হয়েছিল তীক্ষ্ণ পুরুষের চোখ, আর পশ্চাতে বয়ে বেরিয়েছি কত দুমুখো ছবি। গুলতির কাঠি বার বার বিঁধেছে আমায়, আঘাত আর আঘাতে। আমার অন্ধচোখ বেরিয়েছিল দিক-নিশানা আর নির্দয় হয়ে দূর থেকে তুমি হেসেছ বার বার, যন্ত্রণাদায়িনী হয়ে এ কেমন সুখ তোমার!

একদিন বিশ্বাস মানে বুঝেছিলাম ভরসা, আস্থা।

এখন আর কাওয়ালি হয় না। গজল হয় না। বিরহগীত বেজে ওঠে, চোখের ভেতর বৃষ্টি পড়ে, পাতা আর নড়ে না। নিস্প্রভ সেই দৃষ্টি চেয়ে থাকে বিদীর্ণ আকাশের দিকে। এ কেমন তোমার আলোড়ন! কতটা মিনতি রেখে গেলে তোমাকে পাওয়া যায়! কতটা কঠিন হলে হৃদয় ছিঁড়ে যায়। সুগন্ধি ফুরিয়ে গেলে বিষণ্ন সকাল যেন ট্রেসিং পেপার, আমি তার নিচে ছবি হয়ে আছি। যেন বৃন্ত থেকে ছিঁড়ে নেওয়া নিহত গোলাপ।

অন্তহীন অমাবস্যা—মানুষের তৈরি নন-স্টপ বর্বরতা—ধনধান্যে পুষ্পে ভরা বঙ্গভূমে আজ শ্মশানকালির উলঙ্গ নাচ। অথচ নোনাজলে ভাসে আমার খাঁচাবন্দী শহর। একটা ক্ষয়ে যাওয়া ক্রিসেনথিমাম। কী আকুল সেই শহরে, যে শহর এখন আর জাদু দেখায় না। মননে চিন্তা খেলে না, দুর্বোধ্য কেবল ছন্দহীন সুরের আবেশ। মরেবেঁচে ওঠা আমার সেই শহর এখন প্রতিরাতে, প্রতিভোরে অকূলে কেঁদে যায়। সেই কান্নাভরা বৃষ্টি কেবল লাল জলে দিকে ছুটে, স্নান করে। শবের মিছিলে যাত্রার ধ্বনি কী শুনতে পাও প্রিয়তমা! যদি জানতে কত গোপনরাত্রি নাগাল না পাওয়ার আক্ষেপ আমাকে কবি করে তুলেছে। আমি মানুষ হতে চেয়েছিলাম, আর হতে চেয়েছিলাম একজন প্রবল প্রেমিক। 

সুখদুঃখ সাফল্য-ব্যর্থতা মান-অভিমান সব কিছু নতমস্তকে বিসর্জন দিয়ে যা একমাত্র বলা যায় তা হলো—‘চুপিচুপি বিদায়’। দেখো, বিচ্ছেদের দাগা আমার আঙুল স্পর্শ করছে।

 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন