https://www.prothomalony.com/
10124
literature
তীর্থ
আলতাফ শাহনেওয়াজ
বাসনার সব তীর্থ এলোমেলো,
শান্ত সন্ধ্যার তৃষ্ণায় অতর্কিতে ঘনিয়ে এসেছে
কেউ—যেন দুটো পাখি—
তারা শব্দের ধারণাহীন কোনো জগতে, না হয়
শব্দ থেকে দূরে
আকাশের তীব্র কোলাহলে একদিন
দুদণ্ড জিরিয়ে নিয়েছিল একে অপরের দেহের ভেতর;
কামনার কলস কতটা ভরল তাতে?
এ ভরা বিপাশা-সভ্যতায় দেহে দেহে পাখি ডাকে
ফুলের প্রহারে
তার রেণু কম্পমান, ফুলেল পাপড়ি আর তোমার নিশ্বাস
কতটা দূরত্বে থাকলে থির থির কাঁপতে পারে পরস্পর?
ধীর স্বরে গাঢ় হও, কাঁটা ও ফুলের ব্যাভিচার
তোমায় শেখাবে দেহ মেলে কীভাবে সুরের গন্ধে
দীর্ঘ হয় গান;
হে অযৌন কাম, হে লাজুক! বাতাসের মতো অন্ধকার
এই রাতে, ফুল ও কাঁটার নিচে, পাহাড়ের ধারণা কি পেতে পারে সামান্য মানুষ?
মায়ার চাদর
শেখর ভট্টাচার্য
তেরশত নদী, পুষ্প রথের মতো পানসি নৌকো,
জলের ওপরে কতো কতো ছবি, দাঁড়ের তুলি দিয়ে
এঁকে যাচ্ছে শাহ করিমের মহাজন।
টল টল জল, উদাসী বাউলের চোখ ছল ছল,
জলের সাথে মন ছুটে যায়,
নিস্তব্ধ আকাশের কোণে কোণে।
এতো মায়া,
পাখির ছায়াতে মায়া, বৃক্ষের চোখের ভেতর মায়া,
শিশুর কান্নাতে মায়া, সবুজ ঘাসের ভেতর মায়া
মায়ার ঘোর থেকে মুক্তি মেলেনা।
জলের ভেতরে জাগে বোধি বৃক্ষ,
বাউলেরা ধ্যানমগ্ন হয়,
অশ্রু কণা নদীর জলের সাথে মেশে
মুক্তির পথ খুঁজে,
মায়ার চাদরে আবৃত্ত স্বপ্নের জাল ছিন্ন হয় হয়না,
কুয়াশার মতো ঘিরে রাখে মায়ার ছায়া।
আলো আঁধারির মাঝে বাউলের কাতর কণ্ঠস্বর,
“আমি অপার হয়ে বসে আছি...পারে লয়ে যাও আমায়”
তবুও
শঙ্খশুভ্র পাত্র
তবুও৷ ভুয়ো তো নয়, 'দুয়ো' বলে কুয়ো খোঁড়ো যদি!
খড়ের কি এসে যায়? খড়ি হাতে আমি পড়ি-মরি,
কিছু যে লিখব, আহা, নিচু হয়ে দেখি সেই নদী
আপন খেয়ালে বয়— তার বুকে ছোট এক তরী—
কালো রঙে আঁকা, যেন ঘনঘোর শ্রাবণের মেঘ
ঈশানে দিয়েছে শান, তুমি তাকে ভাবো ঠিক দিশা৷
টলটলে ঢেউ, জলে কুচি-কুচি রোদের আবেগ
মিশে আছে, মরমিয়া— নক্ষত্রখচিত যেন নিশা৷
তবুও কথার দানে কবুতর নতুবা সে তাঁবু
সাদাকালো চিত্রে স্থির—শান্তিদূত, অস্থায়ী শিবির.
এই ভালো সহজিয়া—সহজে কে হতে চায় কাবু!
সাহসই তো শেষকথা, উৎসাহ, আশ্লেষ নিবিড়৷
পৃথিবী ঘূর্ণায়মান—দিনমণি, নীবিবদ্ধ, স্থির৷
দু'চোখ মুদ্রিত করি—হে সমুদ্র, তুমি জানো তীর...
ছায়া ও মেঘ
দর্পণ কবীর
ছায়াটির নিজস্ব কোন রঙ ছিল না।
একটি ঘাসফড়িং বিকেল এসে
ছায়াটির সামনে আয়না হয়ে দাঁড়ালো যেই,
পার্পল রঙের মুখচ্ছছবি দেখতে পেলাম।
আমি বিহবল কন্ঠে বললাম, এমন একটি বিকেল
হয়ে তোমাকে হিরণ্ময় করে দেবো একদিন।
তুমি হেসে বললে, যে ছায়ায় তুমি
রঙ মাখা মুখ দেখছো, ওটা মুখ নয়। ও তো
দীর্ঘশ্বাসের মেঘপুঞ্জ!
আমি ফুসফুস পেতে আছি
জয়িতা চট্টোপাধ্যায়
কখনো লিখিনি বিবস্ত্র ঘরের কথা
যেখানে মারাত্মক নীল রোদে কবোষ্ণ শরীর
অগ্রবিন্দু থেকে নেমে আসা বাসনার মতো
জ্বর ও অসুখ, নদীতে ঝড়ের উত্তাল তরঙ্গ,
অপর্যাপ্ত রাত, তবু তার ও তো একটা দাবী থাকে
তাই কালো আকাশ, সাজানো হয় হৃদয় নক্ষত্র দিয়ে
একক কবিতায় লেখা হয় বিনা চিকিৎসার মৃত্যুর কথা
সমস্ত কাটাকুটির পরও হিসাব মেলে না
অত্যন্ত দুর্বোধ্য প্রতিধ্বনি
শব্দের মতো বাজতে থাকে সন্ধ্যে থেকে মধ্যরাত
নিরন্তর জ্বেলে রাখা অসম্ভব চোখের ছোটাছুটি
মরণান্ত পথের শরীর,
যেখানে প্রেম ঢুকে যায়, সময় পূর্ণ হওয়ার আগেই...
ছোট্ট তমাল
ইশতিয়াক রুপু
হাঁটা পথে ঘাস দেখি না,
স্মৃতির খেরো খাতা!
পথের পাশে রথ দেখি না
সদ্য ঝরা সবুজ পাতা।
রাত জুড়ে বৃষ্টি গান
দেহে জমে অভিমান
মনের কোনে গল্প কথা
কে খুঁজে গো সাত আসমান!
সাঁতার কাটে শিশু বেলা
শান বাঁধানো পুকুর ঘাট
পুকুর পাড়ের লেবুর ঝাড়
পেরিয়ে গেলে খেলার মাঠ।
ভর দুপুরে ঝোঁপের কোনে
জোড়া তালের শব্দ পতন
বালক ছুটে দখল নিতে
তালের পিঠায় স্বাদের যতন।
সুরমা নামের ভরা নদী
ঘুম স্বপনে আসতো যদি
কার ছোঁয়ায় ভোর সকাল
মা ডাকে, সোনা আমার-
ছোট্ট তমাল!
বাঁশির রাখাল
লুনা রাহনুমা
যেমন প্রতিযোগিতা আছে ভালোবাসার
তেমনি প্রতিযোগিতা আছে ভুলে যাওয়ার,
অবহেলা, তাচ্ছিল্য আর ঘৃণার।
একদিন ভালোবাসা দিয়ে যে আনন্দ পাওয়া গিয়েছিল,
অবজ্ঞা দেখিয়ে ঢের বেশি পাচ্ছে তারা আজকাল।
চোখ ভরে দেখি অবিচার আর মুচকি হাসির আড়াল;
নয়া পাঞ্জাবি, নাগরা জুতা আর কাঁধে ভাঁজ ফেলা শাল
উদ্দীপক খোশবু ছড়ায় ইতর আতর, কেউ যেন শাসায়,
মন থেকে মুখ উসখুস করে, দুর্গন্ধ, দমবন্ধ লাগে, বাল!
অন্তর্যামী ছিলেন যে একদিন তিনি আমার,
এখনো প্রভাব রয়ে গেছে হয়তো কিছুটা তার।
কুশল জানতে না চেয়ে প্রশ্ন করলেন সমান্তরাল:
আচ্ছা, আপনি কি আমাকে কিছু বলবেন আর?
দূরত্বের সাগরে খাবি খেতে খেতে ইতস্তত করি,
আহাম্মকের মতো শোনায় যদিও, গলা উঁচু করেই বলি:
নতুন কিছু না জনাব, সেই একই প্রস্তাব রাখছি আবার,
আমি হই বাঁশের বাঁশরী আর আপনি হন আমার রাখাল!
জীবন এক গ্রন্থিত গল্পমালা
নূরুন্নাহার নীরু
উপন্যাস রচনার ধৈর্য নেই—
নেই পঞ্চকোষ পাঠে নিবিষ্টতা,
ঠিক তখনি যেন আমিই হয়ে গেলাম উপন্যাসের নায়িকা,
কী ভীষণ মিল গল্পে আর বাস্তবে৷
হাসি-কান্না, বিরহ-ভালোবাসা, দেয়া-নেয়া অর্থহীন,
বোধের বিলাপে বুকের জমিনে নতুন শস্যের চাষাবাদ৷
বাঁক ঘোরে প্রত্যাবর্তনের মোড়ে৷
নুয়ে আসে হৃদ-মাথা-অবয়ব বিনম্র সেজদায়৷
গড়ে ওঠে পর্ব থেকে পর্বের উপাখ্যান ,
জীবন আটকে যায় গহীন গল্পকথার গ্রন্থিত বন্ধনে৷
মায়ের জন্য গাঁথামালা
মৃধা আলাউদ্দিন
মা—পৃথিবীর মধুরতম ডাক। ছোট্ট এ শব্দের ভেতরে লুকানো থাকে গভীর স্নেহ, মমতা আর পৃথিবীর সবচেয়ে অকৃত্রিম ভালোবাসা। শৈশব থেকে আনন্দ-বেদনা-ভয় কিংবা উদ্দীপনা- প্রতিটি মানবিক অনুভূতিতে জড়িয়ে থাকে মায়ের নাম। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল মা নামের ওই মমতাময়ী নারীর আঁচল।
প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার পালন করা হয়বিশ্ব মা দিবস। এ হিসাব অনুযায়ী, রোববার ১২ মে সারা বিশ্বে পালন করা হয়েছেমা দিবসটি। এই দিনটি মাকে বিশেষভাবে ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা জানানোর দিন। বিশেষ এই দিবসটি কীভাবে এলো তা হয়তো অনেকেরই অজানা। ইতিহাস বলছে, অনেক পথ পেরিয়ে এই দিবসটি নতুন রূপ পেয়েছে। ধারণা করা হয়, মাদিবসের সূচনা প্রাচীন গ্রিসের মাতৃরূপী দেবী সিবেলের এবং প্রাচীন রোমান দেবীজুনোর আরাধনা থেকে। এ ছাড়া ইউরোপ ও যুক্তরাজ্য অনেক আগে থেকেই মায়েদের এবং মাতৃত্বকে সম্মান জানানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট দিন রোববারকে বেছে নিয়েছিলেন। ষোড়শ শতকে এটি ইংল্যান্ডে মাদারিং সানডে বলে পরিচিতি লাভ করে। অনেকেই ক্যাথলিক পঞ্জিকা অনুযায়ী এটিকে লেতারে সানডে যালেন্টের সময়ে চতুর্থ রোববারে পালন করতে শুরু করে। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, জুলিয়া ওয়ার্ড হোই রচিত ‘মাদার্স ডে প্রক্লামেশন’ বা ‘মা দিবসের ঘোষণাপত্র’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মা দিবস পালনের গোড়ার দিকের প্রচেষ্টাগুলোর মধ্যে অন্যতম। ১৮৭০ সালে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পৈশাচিকতার মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে শান্তির প্রত্যাশায় জুলিয়া একটি ঘোষণাপত্র লেখেন। এরপর যুদ্ধ শেষে পরিবারহীন অনাথদের সেবায় ও একত্রীকরণে নিয়োজিত হন মার্কিন সমাজকর্মী আনা রিভিজ জার্ভিস ও তার মেয়ে আনা মেরি জার্ভিস। এ সময় তারা জুলিয়া ওয়ার্ড ঘোষিত মা দিবস পালন করতে শুরু করেন। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে আনা রিভিজ জার্ভিস ১৯০৫ সালের ৫ মে মারা যান। মায়ের মৃত্যুর পর আনা মেরি জার্ভিস মায়ের শান্তি কামনায় ও তার সম্মানে সরকারিভাবে মা দিবস পালনের জন্য প্রচারণা চালান। তিন বছর পর ১৯০৮ সালের ১০ মে পশ্চিম ভার্জিনিয়ার আন্দ্রেউজ মেথডিস্ট এপিসকোপাল চার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম মা দিবস পালন হয়। এরপর ১৯১২ সালে এই দিবসটিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ব্যাপক প্রচার শুরু হয়। এই প্রচারধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ কানাডা, মেক্সিকো, চীন, জাপান, দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকায়। এই প্রচারের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯১৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে মা দিবস ও জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর থেকেই প্রতিটি দেশে মায়েদের সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানোর জন্য এই দিনটি উৎসর্গ করা হয়। দেশে দেশে পালন করা হয় বিশ্ব মা দিবস।
২.মা কথাটি খুবই ছোট্ট কিন্তু এর গুরুত্ব অপরীসিম। আমরা সবাই এই দুনিয়ার আলো দেখতে পাই এই মায়ের জন্য। একটা মা যে কতো কষ্ট করে তার সন্তানকে মানুষ করেন তার কোনো হিসাব বা তুলনা নেই। আমার মা মারা গেছেন প্রায় দেড় বছর। আমি মাকে খুব মিস করি। বাবা ছিলেন না, আমাদের দুটি ভাইবোনের জন্য মা অনেক কষ্ট করেছেন। হে আল্লাহ, ওপারে তুমি আমার মাকে ভালো রেখো- প্রতিনিয়ত এই কামনা করছি।
আমার মা সময় পেলেই জানা-অজানা অনেক গল্প শোনাতেন। পীর-আউলিয়াদের গল্প শোনাতেন। রান্না করতে ভালোবাসতেন। ছোটো না, বাজারের বড়ো ইলিশটা এনে দিলে- বাড়িতে রান্নার একটা ধুম পড়ে যেতো। আর ইলিশ আনলে আমাদের বাড়িতে কচু তরকারিও আনতে হতো। যাক সে কথা, আজ বলবো, মায়ের কাছে অনেক গল্প শোনার একটি করুণ গল্প। আমার মনে হয় গল্পটা অনেকেরই জানা- তবুও আমি আমার মায়ের কাছে শোনা গল্পটা এখন বলবো। গল্পটা দিয়েই আজ আমার ‘মা’ দিবসের লেখা শুরু করবো- গল্পটা হলো এই রকম- এক স্বামীহারা ভদ্র মহিলা তার সন্তানকে অনেক কষ্ট- মানুষের বাড়িতে ঝিঁয়ের কাজ করে। হাঁস-মুরগি পালন করে। ডিম-মুরগি বিত্রি করে সেই মা তার ছেলেটাকে- কামরুলকে লালন-পালন করতে থাকেন। কামরুল দিনে দিনে বড় হয়। স্কুলে যায়। মা প্রতিদিন তাকে স্কুলে দিয়ে আসতেন। নিয়ে আসতেন। কিন্তু সেই মায়ের একটি চোখ ছিল না। মা ছিলেন অন্ধ। তিনি এক চোখে দেখতেন। স্কুলের অন্য ছাত্ররা তাই কামরুলকে তিরষ্কার করে বলতো- তোর মা অন্ধ। এতে করে কামরুল খুব অপমানিত বোধ করতো। শেষ পর্যন্ত মা যেনো স্কুলে না আসেন কামরুল তা-ই চাইতো। এভাবে ধীরে ধীরে মায়ের প্রতি কামরুলের ঘৃণা জন্মাতে থাকে। কালেকালে তা প্রকট আকার ধারণ করে।
৩.অনেক দিন পর কামরুল পড়ালেখা শেষ করে বিদেশে চলে যায় চাকরির সন্ধানে। ভিটে-বাড়ি, ধানের জমি বিক্রি করে মা-ই তাকে বিদেশ পাঠান। কিন্তু কামরুল মায়ের সঙ্গে আস্তে আস্তে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। কোনো যোগাযোগই রাখে না কামরুল। এভাবে দিন যায়, মাস যায়- বছরের পর বছর পেরিয়ে যায়। কামরুল রেঙ্গুন গিয়ে ভালো চাকরি করে। বিয়ে করে এবং তার সন্তান হয়। বউ-বাচ্চা নিয়ে বেশ সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে থাকে এই অকৃতজ্ঞ কামরুল। মায়ের কোনো খোঁজখবর রাখে না। জানেও না, মা বেঁচে আছেন না মারা গেছেন।
৪.মায়ের মন অবুঝ। তিনি সন্তানের জন্য পাগল হয়ে যায়। রেঙ্গুন থেকে আসা মানুষজনের কাছে জানতে চায়, তার কামরুল কেমন আছে। কোথায় আছে এবং অনেক দিন পর মা অনেক কষ্ট করে কামরুলের ঠিকানা জোগাড় করে। সেই ঠিকানা মতো জাহাজে করে মা চলে যান রেঙ্গুন। ছেলের বাসায় যায়। মা যখন ছেলের বাড়িতে যায়, দরোজা নক করে, তখন তার নাতি-নাতনি দরজা খুলে দেয় এবং একজন অন্ধ, বুড়ো মহিলাকে দেখে তারা হাসাহাসি করতে থাকে। ঠিক এই মুহূর্তে কামরুল অফিস থেকে ফিরে তার বাসায়। এক চোখে বৃদ্ধ মা ছেলেকে দেখে দৌড়ে যায় ছেলের কাছে। কামরুল কোনো কিছু দিস করতে না পেরে, হুট করে পকেট থেকে বেশ কিছু টাকা বের করে মাকে দিয়ে বলে, তুমি এখান থেকে চলে যাও। আর এ বলাটা ছিল- অনেকটা তিরষ্কার। এক নিঃশ্বাসে এতোগুলো কথা বলে আমার মা একটু দম নিলেন। চোখ মুছলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর আবার বলতে লাগলেন। এতে করে সেই অন্ধ মা খুব কষ্ট পান। চলে যান যেদিকে চোখ যায়। মায়ের হাঁটার কোনো দিক ছিলো না। ডান ছিলো না। বাম ছিলো না এবং এভাবে ঘুরে ঘুরে মা একদিন চলে আসেন তার নিজের ঠিকানায়। স্বামীর ভিটায়।
৫.
তারও বহু বছর পর কামরুল জমি বিক্রি না কী যেন এককাজে তার জন্মভূমিতে যায়। তখন সেই এলাকার লোকজন কামরুলকে বলে, এতোদিনে এলে- কিছুদিন আগে তোমার মা মারা গেছেন। মারা যাওয়ার আগে তোমাকে একটা চিঠি লিখে গেছেন। যা আমাদের খুলতে নিষেধ করেছিলেন। বলেছেন, যদি তুমি কখনো দেশে ফিরে আসো- আমরা যেনো এই চিঠি তোমাকে দেই। সেই চিঠিটা কামরুলহাতে নিয়ে পড়ে আর অনুশোচনা করতে থাকে। কান্না করতে থাকে। চিঠিতে লেখা ছিল… ‘কামরুল, আমি তোমার বাসায় গিয়েছিলাম তুমি কেমন সুখে আছো এটা দেখতে নয়; মনের টানে। আমার খুব ভালো লেগেছিল, তুমি ভালো আছো এটা দেখে। আমার মনে কোনো দুঃখ নেই। তবে বাবা কামরুল, তোমাকে একটা কথা আমি জানানো প্রয়োজন মনে করছি। খুব ছোটবেলায় গাছ থেকে পড়ে, একটা মারাত্মক দুর্ঘটনায় তুমি একটা চোখ হারিয়েছিলে। তোমার একটা চোখ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আমি আমার একটা চোখ দিয়ে দেই তোমাকে। তুমি ফিরে পাও তোমার দুটি আঁখি।… আমার ভাবতে খুব ভালো লাগছে, আমার একটা চোখ দিয়ে হলেও তুমি এই সুন্দর পৃথিবীটা দেখছো, উপভোগ করছো।এটাই আমার আনন্দ। এটাই আমার বেদনা। এটাই আমার সুখ।’
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন