https://www.prothomalony.com/
10054
literature
এই কী মানুষের জন্ম?
হাবীব ইমন
(১)
আব্বা কোনোদিন আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেননি। তিনি স্বপ্ন দেখতেন তার অন্য ছেলেমেয়েদের নিয়ে। আমাকে নিয়ে স্বপ্ন না দেখাটা তার ভুল ছিল না। কিংবা অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপারও ছিল না। আমার জীবন এত অতিশয় অপ্রধান আর এতটা অনিশ্চিতে ভরা, সেখানে আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখাটা ভীষণ দুর্লভ চিন্তাই বটে। আমি বাঁচবো-কী মরবো, তারই তো কোনো ঠিক-ঠিকানা ছিল না। এই মরে যাচ্ছি, এই বেঁচে উঠছি। কত বেঁচে-মরার গল্প আছে।
কয়েক দিন আগের কথা, মিরপুর পল্লবীতে নোয়াখালী জিলা স্কুল প্রাক্তন ছাত্র ফোরামের সভা হলো। যার বাসায় দীর্ঘ সময়ে চলা ওই সভায় ছিলাম, তাকে আমি চিনতাম না, তিনিও আমাকে চিনতেন না। সভা শেষ হওয়ার পর তিনি আমার পরিচয় জানলেন। সঙ্গে সঙ্গে ডা. আহমেদ করিম বললেন, 'তুমি সেই ছেলে! পিজি হাসপাতালে যার অ্যানেসথেসিয়া আমি করেছি। তুমি জানো সেদিন বাঁচতে না। তোমাকে বাঁচানোটা মুশকিল ছিল।' জাস্ট এ কথা বলে তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, আবেগে আপ্লুত হলেন। আমি নিজেও কিছুটা সময় অনুভূতিহীন ছিলাম। তিনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে তার স্ত্রীর কাছে গেলেন। পরিচয় করালেন। তখন তার চোখ জ্বলজ্বল করছে।
তিনি আবার সবাইকে দেখাচ্ছেন, 'দেখো, ওর মাথায় যে দাগটা দেখছো, এটা সেই অপারেশনের দাগ।' কেউ যখন এ দাগের কথা জিগ্যেস করতো, আমি খুব মজা করে বলতাম, এ দা দিয়ে কোপানো দাগ। তিনি আরও যে কথা বললেন—'এ ব্রেইনে চলাফেরা কঠিন। কিন্তু ও পারছে। কিভাবে পারছে আমি জানি না।'
আব্বার মতো করে আমি হতে পারিনি। কার মতো হয়েছি আমি? কারোর মতোই হতে পারিনি। এমনকি আমি আমার মতোও হতে পারিনি। আমাকে নিয়ে আব্বা গৌরববোধ করতেন না। আমি তাকে সেই সুযোগটা দিতে পারিনি। আমি আমার অন্য ভাইবোনদের মতো আভিজাত্য-ঐশ্বর্যময় জীবন তাকে দিতে পারিনি।
(২)
আমার জীবনের শুরুটা এক বিষণ্ন বিকেলে। সেইকালে জন্ম, যে কালে অত্যাবশকীয়ভাবে একটা পুত্র সন্তান জন্ম নেওয়া মানে অনেক বড় ব্যাপার। অনেক আনন্দের ব্যাপার। সেখানে একটি প্রভাব-প্রতিভূ পরিবারে নেমে এলো সারাজীবনের বিষাদ। এ কারণে আমার আম্মাকে নানা যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে, নানাজনের নানা কটু কথা শুনতে হয়েছে। একটা প্রতিবন্ধী সন্তান জন্ম দেওয়া একটা মায়ের বড় অপরাধ, জীবনের নানা বাঁকে বাঁকে তাকে অসহায় হতে হয়েছে।
জীবনের নানা অলিগলিতে বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত পার করে আমি 'হাবীব ইমন' হয়েছি খুব ছোট করে। নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ আমার ছিল না। কোথাও কোনো জায়গায় স্থির হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। আমার কোনো উড়াউড়ি স্মৃতি নেই, আমার কোনো শৈশব-কৈশোর নেই, যে আনন্দের কথা আমি খুব একটা বলতে পারি না।
ভীষণ সংকুচিত আমার জীবন—থেমে থেমে চলা এ জীবন। একটু এগোচ্ছি, কিন্তু পিছিয়ে পড়ছি তার চেয়ে বেশি। সমস্যা আর সংকটের ভেতর দিয়ে আমার প্রতিনিয়ত কেটেছে, যাচ্ছে। আমার এক একটা রাত স্বপ্নহীন, এক একটা ঘুম স্বপ্নহীন। আজকাল ঘুমের মধ্যে আমি ভীষণ আঁতকে উঠি। কাঁপুনি ধরে। স্বপ্ন দেখতে, বড় হতে কলিজা লাগে, আমার সেই কলিজা নাই। পাথরকুচির মতো দুঃখগুলো কেবল এখানে-ওখানে ছড়িয়ে যাচ্ছে অনবরত।
আমার চারপাশে এত মানুষ, এত মানুষ; কিন্তু আমি বড্ড একা। আমার নিজের মতো কোনো মানুষ নাই। আমার কোনো লাবণ্য নেই, যার প্রভায় আমি বিকশিত হতে পারি বা পারবো। আমি সেই মানুষ, যাকে মাথায় তুলে আছাড় মারা যায়। যার মধ্যে ভালোবাসার গন্ধ ছড়িয়ে প্রত্যাখান করা যায়। যাকে অনবরত কষ্ট দেওয়া যায়। যেমন খুশি তেমন সাজোর মতো আমাকে নানা পাত্রে সাজিয়ে আঘাত করা খুব সহজ। অপমান করা আরও সহজ। মাঝে মাঝে খুব অবাক হই, কিভাবে বেঁচে আছি। এ বেঁচে থাকাটা কি জরুরি? কেনইবা জরুরি? কেন মানুষের এমন নির্মম আচরণ বয়ে চলতে হবে? কোনো একক মানুষের প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। অভিযোগ যদি থাকে, তবে আমার জন্মের প্রতি বিস্তর অভিযোগ। কেনইবা আমার জন্ম হলো?
আজকাল আমি নিজেকে মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতে কুণ্ঠাবোধ করি, বড্ড সংকোচবোধ করি। এতদিন একলা লড়াই করা আমি আর পারছি না। আমাকে করুণভাবে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। করুণা নিয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। এটা যে কত বড় লজ্জা আর গ্লানির, তা হয়তো ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝবে না। কবে নিঃশেষ হবো, তার জন্য অধীর অপেক্ষা করছি। যেদিন আমি সত্যি ক্ষয় হয়ে যাবো, মাটিতে আমার কংকালসার মিশে যাবে, তখন হয়তো নিখিলেশ এসে দেখে যাবে আমাকে, তার মনে নিশ্চয় এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে—এই কী মানুষের জন্ম?
ছোটনের ঈদ
ফারুক আহম্মেদ জীবন
একেবারে নিঃস্ব, গরীব, অভাবি, সহায়সম্বলহীন স্বামীহারা এক বিধবা নারী সকিনা বানু। সে তার ছয় সাত বছরের একমাত্র ছেলে ছোটনকে নিয়ে থাকে যশোর ঝিকরগাছার কপতাক্ষ নদের পশ্চিম পাড়ের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা একটা পল্লীগাঁয়ে। স্বামীর রেখে যাওয়া টালির ছাউনির ভাঙ্গাচুরা ছ্যাঁবড়ানো ছোট্ট একটা মাটির ঘর তার। সেই ঘরেই ছেলে ছোটনকে নিয়ে থাকে সে। জায়গা জমি অর্থ সম্পদ বলতে তার কোনো কিছুই নেই। মৃত স্বামীর শতক দুই মতো ভিটে-টুকুই তার একমাত্র সম্বল। স্বামী মারা যাওয়ার পর ছেলে ছোটনকে নিয়ে বিধবা সকিনা সেই ভিটেটুকু আঁকড়ে ধরেই পড়ে আছে।
সে, গাঁয়ের গৃহস্থদের বাড়িতে কাজ করে যেটুকু পায় তা দিয়েই ছেলে ছোটনকে নিয়ে দু'বেলা দু'মুঠো খেয়ে-পরে কোনো রকমে বেঁচে আছে। আসলে সত্যিকার অর্থে কোনো মানুষের এভাবে বেঁচে থাকাকে বাঁচা বলে না। সমাজে অনেক বিত্তশালী লোক আছে। ইচ্ছা করলে তারা কমবেশি সহায়তা করতে পারে। কিন্তু কে-বা-কার জন্য মরে?
এইতো কয়দিন আগে সকিনার ঘরের চালের রো-বাটাম গুলো সব খসে খসে পড়ছিল। বৈশাখ জ্যোষ্ঠের এমন ঝড়বৃষ্টির মাসে বসবাসের একেবারে অনুপযোগী হয়ে উঠেছিল তার ঘরটি। আর না হয়েইবা- করবে কি? মাখন মারা যাওয়ার পর যে এই কয়বছরে একবেরের জন্যও ঘরটা মেরামত করা হয়নি। এবছর অনেক কষ্টে সকিনা ঝাড়ের একটা বাঁশ নিয়ে তার ঘরটা মেরামত করেছে।
ছোটনের বাপা মাখন বেঁচে থাকতে তাদের অবশ্য এতোটা কষ্ট ছিলো না। পরের ক্ষেতে দিনমজুর খেটে গরীবানা হালে বেশ ভালোই চলতো ওদের ছোট-খাটো সংসারটা।
কিন্তু কথায় আছে না, কপালে যদি দুঃখ থাকে, তবে যে সুখ ছেড়ে যায় তাকে! আর তাইতো এক অন্ধকার রাতে গাঁয়ের বাজার থেকে বাড়ি ফিরার সময় বিষধর সাপের কামড়ে অকালেই প্রাণটা হারিয়ে বউ আর এক বছরের ছেলে ছোটনকে চিরতরের জন্য দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে মাখন চলে গেলো পরপারে। তারপর থেকে প্রায় সময় সকিনা খেয়ে না খেয়ে অনেক কষ্টে এপর্যন্ত ছেলেটাকে বড় করেছে। এখন পুরো একটা বছরেও মাংস ওদের ভাগ্যে জোটে কিনা তার ঠিক নেই। আগে যখন বয়লার কিম্বা পোল্ট্রির মাংসের দাম আশি, একশো থেকে একশো বিশ টাকা ছিল, আর গরুর মাংসের দাম ছিল দুইশো ষাট থেকে দুইশো আশি টাকা, তখন অল্প হলেও কষ্ট করে মাঝেমধ্যে ওরা মাংস কিনে খেতে পারতো।
কিন্তু এখন আর হয় না। এখন মাংস কেনা যে ওদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। ওসব এখন শুধুই কল্পনা। মাংসের যে লাগামহীন চড়া দাম। আর তাইতো মা, ছেলে সারাটা বছর অপেক্ষায় থাকে কবে আসবে সেই কুরবানির ঈদ! ঈদ এলেই যে ধনীদের গরু ছাগল কুরবানির বন্টন করা মাংস পেয়ে তারা একটু পরাণ ভরে খাবে।
এইতো কয়েকদিন আগের কথা, ছোটন ওর মায়ের সাথে বাজারে গিয়েছিল। মাংসের দোকানের পাশ দিয়ে আসার সময় হঠাৎ মাংসের দিকে নজর গেলো ছোটনের। নজর যেতেই মাকে ডেকে বললো, মা! ঐ দেখ গরুর গোশত ঝুলছে। কতোদিন মাংস খাই না, একটু মাংস কিনবে?
কিছুদিন আগে থাকার ঘরটা ঠিক করে সকিনার হাত এখন খালি। কিভাবে সে মাংস কিনে ছোটনকে খাওয়াবে? ছেলের মুখে অমন কথা শুনে সকিনার অন্তর কেঁদে উঠে। তার দু,চোখ ভরে যায় জলে। আড়ালে শাড়ির আঁচল দিয়ে দু,চোখের জল মোছে সকিনা। তারপর ছোটনকে কোলে টেনে নেয়। ছোটনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, বাবা ছোটন, এইতো আর মাত্র কয়েকদিন পরেই কুরবানির ঈদ। বড়লোকদের কাছ থেকে গরুর মাংসের বন্টন পাবো। তখন তুমি পেট ভরে খেও, এখন বাড়ি চলো আমার লক্ষ্মীসোনা।
ছোট হলেও মায়ের চোখের জল, অসহায় মুখ দেখে ছোটন বুঝতে পারে, তার মায়ের কাছে টাকা নেই। সে হেসে বলে, আচ্ছা মা! তারপর পেট দেখিয়ে বলে, ঈদে মাংস পেলে তুমি আর আমি পেট ভরে খাবো। সকিনা বললো, আচ্ছা খেও। তারপর ছোটন আড়চোখে বারবার গরুর মাংসের দিকে তাকাতে তাকাতে মায়ের হাত ধরে বাড়ি ফিরে আসে।
কয়েকদিনের মধ্যে দেখতে দেখতে ঈদ চলে এলো। ছোটন পাড়ার ছেলেমেয়েদের সাথে খেলতে গিয়ে ওদের বলতে শোনে গাঁয়ে কারা কারা গরু ছাগল কুরবানি দিবে। শুনে মনে মনে ছোটন খুশি হয়।
রাত পোহালেই ঈদের দিন। কাল মাংস খাবে সেই আনন্দে ছোটনের দু'চোখে যেন ঘুম নেই। রাতে মাকে বলে, মা, কাল সারাদিন আমি কুরবানির বন্টনের মাংস তুলে বেড়াবো। ছেলের মুখে আনন্দের উচ্ছ্বাস দেখে মনে মনে সকিনাও খুশি হয়। সকালে ছোটনের ঘুম ভাঙ্গতেই দ্রুত দাঁত মেজে মায়ের কাছে চলে আসে। সকিনা ছেলেকে গোসল করিয়ে পুরোনো জামা-কাপড় টুপি আর জুতা পরিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে দেয়। তারপর বিশ টাকার নোটটি হাতে দিয়ে বলে, এটা রাখো বাবা, ঈদের মাঠে গিয়ে মিষ্টি কিনে খেও। ছোটন খুশিতে মায়ের মুখে ছোট্ট করে চুমু খায়।
ছোটন ঈদের নামাজ পড়তে ঈদগাহে চলে যায়। নামাজ শেষে মিষ্টি কিনে। নিজে খেয়ে মায়ের জন্যও মিষ্টি নিয়ে আসে বাড়িতে। তারপর মায়ের হাতে রান্না করা ফিরনী সেমাই খেয়ে কুরবানির বন্টন করা মাংস আনতে বের হয়। গাঁয়ের বিভিন্ন
জায়গায় গরু ছাগল জবাই করে কাটাকুটি চলছে। দেখে ছোটনের যেন মনে আর আনন্দ ধরে না। সেসব ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে ছোটন। একসময় অপেক্ষার পর মাংস বন্টন শুরু হলো। ছোটনের হাতে জুটলো কয়েকটা বন্টন। সেগুলো নিয়ে হাসি মুখে বাড়ি এসে মায়ের হাতে দিলো। বলল, মা, দেখো, কতো মাংস! তাড়াতাড়ি রান্না করো। আজ আমরা পেট ভরে মাংস দিয়ে ভাত খাবো। সকিনার ছেলের খুশিতে আবারো চোখ ভিজে উঠে।
কুরবানির বন্টন করা মাংস রান্না হলো। গন্ধে চারদিক মৌ মৌ করছে। ছোটন যেন আর সইতে পারছে না, কখন খাবে! সকিনা দুটো প্লেটে করে ভাত আর গরুর মাংস নিয়ে এলো। মা ছেলে আজ পেট ভরে মামস খাবে।
ছোটন গোগ্রাসে খেতে শুরু করলো। সকিনা থালায় হাত থামিয়ে দিয়ে ছেলের দিকে থাকিয়ে আছে। এতো তৃপ্তি নিয়ে ছেলেকে গত এক বছরে খেতে দেখেনি সকিনা। আহা! ঈদ যদি কয়দিন পর পর আসতো! সকিনার চোখ আবারো জলে ভরে উঠলো।
ঈদ হোক মায়ের হাসি
কাজী আলম ভূঁঞা
এইতো আর মাত্র ক'দিন, দেখতে দেখতেই চলে আসছে উৎসব মুখর হাসি খুশির পবিত্র ঈদুল আযহার দিন। সন্ধ্যা হলেই দেখতে পাচ্ছি সেই বাঁকা চাঁদের লাবণ্য হাসি।এই হাসি তোমার আমার একার জন্য নয়, সারা পৃথিবীতে জ্যোৎ্স্না ছড়ানো হাসি। শুধু তাই নয়,তার চেয়েও অনেক বেশি হাসি লুকিয়ে আছে, কোথায় জানেন? যাক আপনাকে ভাবনায় ফেলে সময় নষ্ট করতে আমি একদম রাজি নই, আমিই বলে দিচ্ছি, সেই হাসিটা হলো পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে সন্তানের কাছে পাওয়া মায়ের মুখের হাসি।
মার্কেট গুলিতে আর প্রবেশ করতে পারছি না, শুধু ভিড় আর ভিড়। হয়তো প্রশ্ন আসছে, মূল্যস্ফীতি এত বৃদ্ধি পেয়েছে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালের বাহিরে, তাহলে কিসের এত ভিড়? সন্তানের কান্না থামানোর ভিড়, স্বজনদের চাহিদা মিটানোর ভিড়, স্ত্রীর বিলাসিতা ক্রয়ের ভির। ধার করো, ঋণ করো, লোন তুলো, জমি বন্ধক দাও নতুবা অন্য কিছু বিক্রি করো, তবু কোরবানির পশু কিনতে ভিড় করো। শুধু চাহিদা নেই নিজের আর মায়ের।
অফিস- আদালত, ব্যাংক, শিল্প, কল কারখানায় কেমন যেন ঝুলন্ত তালা আর সিল লাগার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। শহর এলাকা শব্দ দুষণের কবল থেকে রেহাই পেয়ে নিস্তব্ধ হয়ে আছে। কাঁচা বাজারে হাতেগোনা কয়েকজন! কারণ?
কারণ একদম দুধের মতো পরিস্কার। ঐযে, বছর ঘুরেই এসেছে ঈদ। কে না চায়, মা-বাবা,স্ত্রী-সন্তানের সাথে ঈদ উদযাপন করতে। হ্যাঁ, ইচ্ছে থাকলেও অনেকে পরিবারের সবার সাথে দুটি ঈদ উদযাপন করতে পারেনা।
দেশ রক্ষায় নিয়োজিত স্বাধীনতার পতাকা পাহারাদার বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা। আমিও ২৫ বৎসর যাবত এর অন্তর্ভুক্ত। এবার আমি ও নাড়ির টানে বাড়ির পানে সুযোগ পেয়েছি। এইতো লঞ্চঘাট, বাস স্টেশন, রেল স্টেশন কোথাও ভিড়ের কোন কমতি নেই। তেমনি সড়কে চাঁদাবাদি ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ও কমতি নেই।প্রতিটি জায়গায় জায়গায় হয়রানি।প্রতিটি লঞ্চ-ষ্টিমার,জাহাজ,বাস ট্রেন থেকে শুরু করে প্রায় সকল প্রকার গাড়িতে অতিরিক্ত যাত্রী বহন। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের অভাব নেই। আর দুর্ঘটনা?এর প্রতিযোগিতা বরাবরের মতো কোন কমতি নেই। আহত, নিহত, এটাতো বাংলাদেশের অনেকটা কালচারে পরিণত। আর নিরাপদ সড়ক চাই এর চেয়ারম্যান, চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন,তার প্রাণপ্রিয় জীবন সঙ্গীকে সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়ে নিরাপদ সড়কের আন্দোলন করেই যাচ্ছে! তেমনি বোবা কান্নায় নীরবে প্রতিবাদ করে যাচ্ছে ঈদ যাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনায় কবলিত সন্তান হাড়া মায়েরা।
হয়তো আমার মতো কপাল পোড়া অনেকেই আছে যাদের মা নেই, বাবা হাড়া তাদের ঈদ উদযাপন নিয়ে আর কি বলবো! বলার ভাষা হাড়িয়ে ফেলছি। এইতো গত কোরবানি ঈদে প্রাণ প্রিয় মাকে দু'পায়ে যখন সালাম করি, তখন মা মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করেন। সেই দোয়া নিয়ে ঈদের জামাতে অংশগ্রহণ করি। জামাত শেষে কোরবানির পশু জবাই করে প্রতিবেশীর মাঝে বিতরণ করি।এবং মাকে নিয়ে একসাথে পরিবারের সবাই বসে খাবার খেয়েছি।কতো আনন্দ ভোগ করেছি। মা বারবার না করার পরও শাড়ি না কিনে পারলাম না। কারণ মা বলে কথা।মায়ের কাপড় না কিনে কোন আদর্শ সন্তান ঈদ উদযাপন করতে পারে কি? নিশ্চই না। যাক দেখতে দেখতে ঈদ এসেছে, পশু থেকে শুরু করে সব কেনাকাটা ও হয়েছে। শুধু মায়ের কাপড় ছাড়া।
এইতো ঈদের জামাতে যাব চোখ যেন অন্ধ হয়ে আসছে, বোবা কান্নার জ্বলে ঘরের মেঝেতে আষাঢ় মাসের বন্যায় ঈদ আনন্দ ভেসে যাচ্ছে! তবু্ও ঈদের জামাতে দোয়া করে, মা-বাবার কবর জিয়ারত করে মনে হলো, যেন তারা জান্নাতে বাস করছেন। তাই বলি, প্রত্যেকের ঈদ হোক মায়ের হাসি।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন