অভিমত

স্ট্রোকে প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ: লক্ষণ চিনুন, দেরি নয়

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ০২:১৩

হঠাৎ কথা জড়িয়ে গেল। মুখের এক পাশ বেঁকে গেল। ডান হাতটি ঠিকমতো উঠছে না। পরিবারের মানুষ ভাবলেন, হয়তো একটু দুর্বল লাগছে, কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কয়েক মিনিটের এই অপেক্ষাই কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হয়ে যেতে পারে।

 ২৯ অক্টোবর বিশ্ব স্ট্রোক দিবস। এ বছরের মূল বার্তা খুব সহজ—স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিট মূল্যবান। দ্রুত চিকিৎসা শুরু হলে অনেক রোগীর জীবন বাঁচানো, পক্ষাঘাত কমানো এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সম্ভাবনা বাড়ানো সম্ভব।

স্ট্রোক হয় যখন মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায় অথবা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়। মস্তিষ্কের যে অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, শরীরের সেই কাজটি হঠাৎ ব্যাহত হতে পারে। কারও কথা বলতে সমস্যা হয়, কারও হাত-পা দুর্বল হয়ে যায়, কারও চোখে কম দেখা শুরু হয়, আবার কারও ভারসাম্য নষ্ট হয়ে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়।

স্ট্রোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—লক্ষণগুলো সাধারণত হঠাৎ শুরু হয়।

মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, হাসতে গেলে মুখ অসমান দেখা, এক হাত বা পা অবশ বা দুর্বল হয়ে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, অন্যের কথা বুঝতে অসুবিধা, হঠাৎ চোখে ঝাপসা বা কম দেখা, মাথা ঘোরা, হাঁটতে গিয়ে ভারসাম্য হারানো কিংবা কোনো কারণ ছাড়া তীব্র মাথাব্যথা—এসবকে কখনো অবহেলা করা উচিত নয়।

স্ট্রোকের লক্ষণ মনে রাখার একটি সহজ পদ্ধতি হলো FAST।

F—Face: মুখের এক পাশ বেঁকে গেছে কি?
A—Arm: দুই হাত তুলতে বললে একটি হাত নিচে নেমে যাচ্ছে কি?
S—Speech: কথা জড়িয়ে যাচ্ছে বা অস্পষ্ট শোনাচ্ছে কি?
T—Time: সময় নষ্ট নয়; দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিন।

কিছু ক্ষেত্রে উপসর্গ কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেরে যেতে পারে। অনেকে তখন ভাবেন, বিপদ কেটে গেছে। কিন্তু এটি হতে পারে TIA বা ক্ষণস্থায়ী ইসকেমিক অ্যাটাক, যাকে সাধারণভাবে “মিনি-স্ট্রোক” বলা হয়। এটি বড় স্ট্রোকের আগাম সতর্কবার্তা হতে পারে। তাই উপসর্গ চলে গেলেও চিকিৎসকের মূল্যায়ন জরুরি।

স্ট্রোক সন্দেহ হলে প্রথম কাজ হলো রোগীকে দ্রুত জরুরি চিকিৎসার আওতায় নেওয়া। উপসর্গটি কখন শুরু হয়েছে, অথবা রোগীকে শেষ কবে স্বাভাবিক অবস্থায় দেখা গেছে—এই সময়টি লিখে রাখুন। এটি চিকিৎসকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

রোগীকে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যেতে দেবেন না। সম্ভব হলে জরুরি পরিবহন ব্যবহার করুন। রোগীর গিলতে অসুবিধা থাকতে পারে, তাই মুখে পানি, খাবার বা ট্যাবলেট দেবেন না। নিজে থেকে অ্যাসপিরিন বা রক্ত পাতলা করার ওষুধও দেওয়া উচিত নয়। কারণ সব স্ট্রোক রক্ত জমাট বাঁধার কারণে হয় না; কিছু স্ট্রোক মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে হয়। ভুল ওষুধ তখন ক্ষতি বাড়াতে পারে।

স্ট্রোক প্রতিরোধের বড় অংশ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান ঝুঁকি। তাই রক্তচাপ নিয়মিত মাপা, প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ নিয়মিত খাওয়া এবং লবণ কমানো জরুরি। ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা, ধূমপান ত্যাগ করা, অতিরিক্ত অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম করা এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

হার্টের অনিয়মিত স্পন্দন, বিশেষ করে অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশন, স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। হৃদ্‌স্পন্দন অনিয়মিত লাগলে, বুক ধড়ফড় করলে বা আগে থেকে হৃদ্‌রোগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

স্ট্রোক শুধু একজন মানুষের অসুখ নয়; এটি একটি পরিবারের জীবন বদলে দিতে পারে। পক্ষাঘাত, কথা বলার অসুবিধা, স্মৃতিশক্তির সমস্যা এবং দীর্ঘ পুনর্বাসনের প্রয়োজন—সবকিছুই রোগী ও পরিবারের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করে। তাই প্রতিরোধ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দ্রুত লক্ষণ চিনে ব্যবস্থা নেওয়াও জীবন রক্ষার অংশ।

শেষ কথা একটাই—মুখ বেঁকে গেলে, হাত দুর্বল হলে বা কথা জড়িয়ে গেলে অপেক্ষা করবেন না। কয়েক মিনিট পরে ভালো লাগলেও অবহেলা করবেন না। স্ট্রোকে সময় মানেই মস্তিষ্ক। দ্রুত সিদ্ধান্তই জীবন ও কর্মক্ষমতা বাঁচাতে পারে।

তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), World Stroke Organization, Centers for Disease Control and Prevention । 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন