https://www.prothomalony.com/
18539
north-america
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ ০২:০২
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন যতটা আলোচিত, মধ্যবর্তী নির্বাচনও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস বলছে, প্রেসিডেন্টের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ক্ষুব্ধ ভোটাররা প্রায়ই ক্ষমতাসীন দলের ওপর আস্থা হারানোর বার্তা দেন। কখনো সেই বার্তা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলে দেয়, কখনো আবার দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
২০২৬ সালের নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনেও তেমন পরিস্থিতির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। জনমত জরিপ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। তবে রিপাবলিকানরা শেষ পর্যন্ত নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে আলোচনা।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ১৮৭৪ ও ১৮৯৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন ছিল বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত। ১৮৭৪ সালে অর্থনৈতিক সংকট ও দুর্নীতির অভিযোগে চাপে থাকা রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ইউলিসিস এস গ্র্যান্টের দল প্রতিনিধি পরিষদে ৯০টির বেশি আসন হারায়। এর ফলে গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন কর্মসূচি দুর্বল হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে দক্ষিণাঞ্চল থেকে কেন্দ্রীয় সেনা প্রত্যাহার এবং কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিক ও ভোটাধিকার সংকুচিত হওয়ার পথ তৈরি হয়।
১৮৯৪ সালের নির্বাচন ছিল ডেমোক্র্যাটদের জন্য আরও বড় বিপর্যয়। অর্থনৈতিক মন্দা ও শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ডের দল প্রতিনিধি পরিষদে ১০০টির বেশি আসন হারায়। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কক্ষটির নিয়ন্ত্রণ নেয় রিপাবলিকানরা। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে দলটির দীর্ঘমেয়াদি আধিপত্যের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
আধুনিক যুগেও মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের বড় পরাজয়ের একাধিক নজির রয়েছে। ১৯৪৬ সালে হ্যারি ট্রুম্যান, ১৯৫৮ সালে ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার, ১৯৬৬ সালে লিন্ডন জনসন, ১৯৭৪ সালে জেরাল্ড ফোর্ড, ১৯৯৪ সালে বিল ক্লিনটন, ২০১০ সালে বারাক ওবামা এবং ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে ক্ষমতাসীন দল প্রতিনিধি পরিষদে অন্তত ৪০টি আসন হারায়।
তবে এসব নির্বাচনের পরিণতি সব প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে এক ছিল না। ট্রুম্যান, ক্লিনটন ও ওবামা রাজনৈতিক কৌশল পরিবর্তন করে পরবর্তী নির্বাচনে জয়ী হয়ে দ্বিতীয় মেয়াদ নিশ্চিত করেন। অন্যদিকে ফোর্ড ও ট্রাম্প পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত হন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের কারণে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া জনসনও পরবর্তী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার সিদ্ধান্ত নেন।
২০২৬ সালের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনেই ভোট হবে। বর্তমানে রিপাবলিকানদের আসনসংখ্যা ২১৮, আর ডেমোক্র্যাটদের ২১২। সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পেতে ডেমোক্র্যাটদের মাত্র পাঁচটি আসন নিজেদের দখলে আনতে হবে। ট্রাম্পের নিম্নমুখী জনসমর্থন, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের অসন্তোষ ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাবনাকে জোরালো করছে।
এবার ডেমোক্র্যাটরা হাউজের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলে দলটির নেতা হাকিম জেফরিস স্পিকার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে তিনি হবেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ হাউজ স্পিকার। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা যদি বর্তমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারে, তাহলে তা মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের আসন হারানোর দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ধারার ব্যতিক্রম হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৮২৬, ১৮৫৮, ১৮৭৪, ১৮৯৪, ১৯১০, ১৯৩০, ১৯৪৬, ১৯৬৬, ১৯৯৪ ও ২০০২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন বিশেষভাবে প্রভাবশালী হিসেবে বিবেচিত। এসব নির্বাচনের কোনোটি দাসপ্রথা নিয়ে রাজনৈতিক বিভক্তিকে আরও গভীর করেছে, কোনোটি অর্থনৈতিক সংকটের পর ক্ষমতার পালাবদল ঘটিয়েছে, আবার কোনোটি কংগ্রেসে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটিয়েছে।
তবে ২০০২ সালের নির্বাচন ছিল প্রচলিত ধারার ব্যতিক্রম। ৯/১১ হামলার পর জাতীয় ঐক্যের পরিবেশ এবং প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রচারণার প্রভাবে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদে ছয়টি এবং সেনেটে দুটি আসন বাড়ায়। ১৯৩৪ সালের পর কোনো প্রেসিডেন্টের প্রথম মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের আসন বাড়ানোর এটি ছিল দ্বিতীয় ঘটনা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচন তাই কেবল কংগ্রেসের আসনসংখ্যা নির্ধারণের লড়াই নয়; এটি প্রেসিডেন্টের নীতি ও কর্মকাণ্ডের ওপর ভোটারদের মূল্যায়নেরও গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। ২০২৬ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা হাউজের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবে, নাকি রিপাবলিকানরা ইতিহাসের প্রচলিত ধারাকে উল্টে দেবে—তার উত্তর মিলবে মার্কিন ভোটারদের রায়ে।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন