পৃথিবীতে বিভিন্ন ভাষায় সব চেয়ে বেশি উচ্চারিত ও ব্যবহৃত শব্দটির নাম ‘মা’। একটি শিশু তার কথা বলার শুরু থেকেই মা শব্দটির সাথে পরিচিত। আর মৃত্যুর মুহূর্ত পর্যন্তই এটি উচ্চারণ করে, ব্যবহার করে। পৃথিবীর বিচিত্র ভাষার মাঝেও এ শব্দটি বড়ই মিষ্টি, মধুর, কোমল, মমতায় জড়ানো। একজন মানুষ ছেলে বা মেয়ে যে-ই হোক না কেন, দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত তার জীবনে লালন-পালন, মায়া-মমতা, স্নেহ-ভালোবাসা, প্রেম-প্রীতি, আদর-সোহাগ সব মায়ের কাছেই পায়। মায়ের পাশাপাশি প্রিয় শব্দ— বাবা। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্নভাবে ডাকা হলেও শব্দটি এতই পরিচিত, প্রীতিময়, মধুর যে তার সাথে পৃথিবীতে আর কিছুরই তুলনা হয় না।
কথিত আছে, এক দরবেশের মা বিছানায় শুয়ে ঘুমানোর আগে ছেলেকে এক গ্লাস পানি দিতে বলেছিলেন। দরবেশ ছেলে পানি নিয়ে এসে মাকে ঘুমে দেখতে পান। কখন মায়ের ঘুম ভাঙে আর পানি চান, এ অপেক্ষায় বিছানার পাশে হাতে পানির গ্লাস নিয়ে সারারাত কাটিয়ে দেন।
আমাদের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) হালিমার দুধ খেয়েছিলেন বলে তিনি হয়েছিলেন তার দুধমা। সেই দুধমাকে সম্মান জানাতে হজরত মুহাম্মদ (সা.) তার চাদর মোবারক বিছিয়ে দিয়েছিলেন মাটিতে। আর আমাদের জানা— হজরত ইসমাইল (আ.) তার পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর তরবারির নিচে সানন্দে মাথা রেখেছিলেন কোরবান হওয়ার জন্য।
১. পবিত্র কুরআনে এরশাদ হচ্ছে, “ইবাদত করো আল্লাহর, শরিক করো না তার সাথে অপর কাউকে, পিতা-মাতার সাথে সদয় ও সদ্ব্যবহার করো।” (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৩৬)
২. সূরা বনি ইসরাইলে উল্লেখ আছে, “তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাকে ছাড়া আর কারো ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়ই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাদেরকে ‘উফ’ শব্দটি বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ো না। তাদের সাথে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বলো। তাদের সামনে ভালোবাসার সাথে, নম্রভাবে মাথা নত করে দাও এবং বলো, হে পালনকর্তা, তাদের উভয়ের প্রতি রহম করো, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।” (আয়াত: ২৩, ২৪)
৩. “আমি মানুষকে তার মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহারের জন্য জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো দু বছরে হয়; নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমার নিকটই ফিরে আসতে হবে। তোমাদের পিতা-মাতা যা বলবেন তাই করবে, তারা তো অবশ্যই তোমাদের ভালো বলবেন, খারাপ কিছু বলবেন না। তোমরা তাদের কথা মানবে এবং দুনিয়াতে তাদের সাথে সুসম্পর্ক রেখে অবস্থান করবে। যে আমার অভিমুখী হয়, তার পথ অনুসরণ করবে। অতঃপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন আমারই দিকে এবং তোমরা যা করবে, আমি সে বিষয়ে তোমাদেরকে জ্ঞাত করব।” (আল-কুরআন, সূরা লোকমান, আয়াত: ১৪)
কুরআনে করিমের অত্র আয়াতের বিবরণ থেকে আমরা বুঝতে পারি যে আল্লাহ তায়ালার স্বীয় এবাদত ও বন্দেগির পর পরই পিতা-মাতার হক। এ সম্পর্কিত বিবরণ দানের মাধ্যমে ইঙ্গিত করেছেন যে, প্রকৃতপক্ষে সমস্ত নেয়ামত ও অনুগ্রহ একান্তই আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে। কিন্তু বাহ্যিক উপকরণের দিক দিয়ে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আল্লাহর পর মানুষের প্রতি সর্বাধিক এহসান বা অনুগ্রহ থাকে পিতা-মাতার। সাধারণ উপকরণসমূহের মাঝে মানুষের অস্তিত্বের পেছনে পিতা-মাতাই বাহ্যিক কারণ। তা ছাড়া জন্ম থেকে যৌবন প্রাপ্তি পর্যন্ত যে সমস্ত কঠিন বন্ধুর পথ ও স্তর রয়েছে, তাতে বাহ্যত মাতা-পিতাই তার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখেন। তার প্রতিপালন ও পরিবর্ধনের জামিনদার হয়ে থাকেন। সেই জন্যেই কুরআনে করিমের এসব জায়গায়/আয়াতে পিতা-মাতার হকসমূহকে আল্লাহর এবাদত ও আনুগত্যের সাথে যুক্ত করে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ তার নিজের এবং প্রত্যেক ছেলে-মেয়েকে তাদের পিতা-মাতার হক আদায় করতে বলেছেন।
পবিত্র কুরআন শরিফের ব্যাখ্যায় হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর বাণী/হাদিস অসংখ্য। তার বাণীসমূহে যেমন পিতা-মাতার আনুগত্য ও তাদের সাথে সদ্ব্যবহারের তাগিদ করেছেন, তেমনিভাবে তার সীমাহীন ফজিলত ও সওয়াবের কথা উল্লেখ করেছেন।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) এরশাদ করেছেন, তার নাক ধুলিসাৎ হোক, তার নাক ধুলিসাৎ হোক, তার নাক ধুলিসাৎ হোক। তাকে প্রশ্ন করা হলো— হে আল্লাহর রাসূল (সা.), কার নাক? তিনি বললেন, যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে বৃদ্ধাবস্থায় পেয়েছে, তাদের একজন অথবা উভয়জনকে, তথাপি সে বেহেশতে প্রবেশ করেনি। (মুসলিম)
রাসূল (সা.) আমাদের উদ্দেশে ওসিয়ত করেন যে, আমরা যেন আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক না করি, যদিও সে জন্য আমাদেরকে অগ্নিদগ্ধ করা হয়। তিনি আরও বলেছেন, আমরা যেন নিজ পিতা-মাতার মনে কষ্ট না দিই, যদিও এমন নির্দেশ হয় যে, আমাদের পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদ ত্যাগ করতে হয়। আমাদের জানা আবশ্যক যে, আমাদের পিতা জান্নাতের দরজা। আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টির মধ্যে আর আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টির মধ্যে। আমাদের নবী (সা.) বলেন, যে সন্তান পিতা-মাতার দিকে দয়া ও ভালোবাসা সহকারে দৃষ্টিপাত করে, তার প্রত্যেক দৃষ্টিপাতের বিনিময়ে সে একটি মকবুল হজের সওয়াব পায়। সাহাবিরা তখন আরজ করেন— সে যদি দিনে একশত বার এভাবে দৃষ্টিপাত করে? তিনি জবাবে বলেন, একশত বার এভাবে দৃষ্টিপাত করলেও প্রত্যেক দৃষ্টির বিনিময়ে এ সওয়াব পেতে থাকবে। এতেই মনে হয় আল্লাহর দরবারে কোনো কিছুরই অভাব নেই।
আসলেই পিতা-মাতা সন্তানের জন্য যা করেন, তার সামান্যতম ঋণও শোধ করা সন্তানদের পক্ষে সম্ভব নয়। সে জন্য নবী করিম (সা.) বলেছেন, পিতা-মাতাই বান্দাদের দোজখ-বেহেশত।
এক ব্যক্তি নবী করিম (সা.) কে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল (সা.), আমি আমার আম্মাকে সুদূর ইয়েমেন থেকে নিজের পিঠে বহন করে কাবাঘর তাওয়াফ করিয়েছি। সাফা-মারওয়া পাহাড়ে সায়ি করিয়েছি। তাকে বহন করে আরাফাতে গিয়েছি। আবার সে অবস্থায় তাকে বহন করে মুজদালিফায় গিয়েছি এবং মিনাতে গিয়ে পাথর নিক্ষেপ করেছি। আমার মা খুবই বৃদ্ধ এবং একেবারে চলচ্ছক্তিহীন—এ জন্য আমি তাকে পিঠে বহন করে এ সমস্ত অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেছি। তার হক কি আমি আদায় করতে পেরেছি?
হুজুর (সা.) বললেন, না, মায়ের হক আদায় হয়নি। সে ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, কেন? নবী করিম (সা.) বললেন, কারণ তোমার আম্মা তোমার শৈশবকালে সব রকম দুঃখ-কষ্ট তোমার জন্য সহ্য করেছেন এ আশা নিয়ে যে, তুমি ভালোভাবে বেঁচে থাকো এবং দুনিয়াতে তোমার যেন কোনো অসুবিধা না হয়, তোমার পরবর্তী দিনের জন্য দোয়া করেছেন; আর তুমি তোমার আম্মার জন্য যা করেছ তা এ আশা নিয়ে যে, তিনি তো মারা যাবেন— তাই তার জন্য কিছু করি।
অন্য একটি হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, হুজুর (সা.) একদা খুতবা দেওয়ার জন্য মিম্বারের সিঁড়িতে উঠতে গিয়ে তিনবার “আমিন” বললেন। সাহাবিরা প্রশ্ন করলে তিনি জবাবে বললেন, “হজরত জিবরাইল (আ.) আমাকে এইমাত্র সংবাদ দিলেন যে, যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতা বা তাদের কোনো একজনকে পেয়ে তাদের সেবা করে বেহেশতে যেতে পারল না, সে ধ্বংস হোক। তখন প্রথম সিঁড়িতে ওঠার সময় আমি বললাম— ‘আমিন’। তারপর জিবরাইল (আ.) বললেন যে, যে ব্যক্তি পবিত্র রমজান মাস পেয়েও তার গুনাহ মাফ করতে পারল না, সে ধ্বংস হোক; তখন দ্বিতীয় সিঁড়িতে ওঠার সময় আমি বললাম— ‘আমিন’। অতঃপর জিবরাইল (আ.) বললেন যে, যে ব্যক্তি আপনার নাম শোনার পর আপনার ওপর দরুদ পাঠ করল না, সে ধ্বংস হোক; তখন আমি তৃতীয় সিঁড়িতে ওঠার সময় বললাম— ‘আমিন’।”
রাসূল (সা.) বলেছেন, সমস্ত গুনাহর শাস্তির ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা যেগুলোই হোক কেয়ামত পর্যন্ত পিছিয়ে নিয়ে যান। কিন্তু মাতা-পিতার হক নষ্টকারীর শাস্তি এবং তাদের সাথে অবাধ্যতার শাস্তি পরকালের পূর্বে পৃথিবীতে দেওয়া শুরু হয়।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলল— হে আল্লাহর রাসূল (সা.), কোনো ব্যক্তি আমার কাছে সর্বাধিক সদ্ব্যবহারের হকদার? তিনি বললেন, “তোমার মা”। লোকটি বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, “তোমার মা”। আবার লোকটি বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, “তোমার মা”। পুনরায় লোকটি বলল— তারপর কে? হুজুর (সা.) বললেন, “তোমার পিতা”।
অত্র হাদিসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, মা তার সন্তানের জন্য যে তিনটি কষ্ট বেশি করেন, তা তার পিতার দ্বারা সম্ভব নয়। তিন দফা কষ্ট মাকে বেশি করতে হয়: ১) প্রায় ১০ মাস ১০ দিন গর্ভে ধারণের কষ্ট, ২) সন্তান প্রসবের সময় বেদনা, ৩) প্রসবের পর দুধ পান করানোর কষ্ট। এ ছাড়া প্রস্রাব-পায়খানার কষ্ট তো রয়েছেই। প্রচণ্ড শীতে যখন সন্তান তার মায়ের কোলে প্রস্রাব-পায়খানা করে দেয়, তখন বারবার মাকে কঠিন ঠান্ডা পানিতেও গোসল করতে হয়।
যে পর্যন্ত জেহাদ ফরজে আইন হয়ে না যায়, সে পর্যন্ত পিতা-মাতার অনুমতি ছাড়া সন্তানের জন্য জেহাদে যোগদান করা জায়েজ নয়। জনৈক ব্যক্তি একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কাছে উপস্থিত হন এবং আরজ করেন যে, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি দিন। রাসূল (সা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার পিতা-মাতা জীবিত আছেন কি? সে লোকটি বলল, জি, আছেন। হুজুর (সা.) বললেন, তাহলে তুমি তাদের সেবা-যত্ন করো, এতেই জেহাদের সওয়াব পেয়ে যাবে। অন্য লোক কোনো এক জেহাদে তার বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে বাড়িতে ক্রন্দনরত রেখে উপস্থিত হলে রাসূল (সা.) খবর পেয়ে লোকটিকে এই বলে ফেরত দিলেন— যাও, যাদের ক্রন্দনরত রেখে এসেছ, তাদের হাসাও। অর্থাৎ বৃদ্ধ মাতা-পিতার অনুমতি ব্যতিরেকে জেহাদে অংশগ্রহণ করা ঠিক হবে না। ছেলে-মেয়েদের আচরণে মাতা-পিতা সামান্যতম ব্যথা মনে পেলেই আর রক্ষা নেই। দুনিয়া ও আখেরাতে তাকে ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতেই হবে।
ইসলাম এমনই এক পাক-পবিত্র ধর্ম। এ ধর্মে কোনো অবস্থাতেই মাতা-পিতাকে অবহেলা বা তাদের মনে সামান্যতম ব্যথা দেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়নি। বলা হয়েছে, বেহেশত মা-বাবার পদতলে। অর্থাৎ তাদের খেদমত করতে পারলে, তাদের খুশি করতে পারলে বেহেশতে যাওয়া কঠিন নয়—সহজ। মাতা-পিতার ব্যাপারটা কুরআন, হাদিসে ব্যাপকভাবে স্থান পেয়েছে। পৃথিবীর বুকে নিজের অস্তিত্বের একমাত্র মাধ্যম মাতা-পিতা। তাদের সাথে কথা বলার সময় মনে রাখতে হবে—আমরাও একদিন তাঁদের মতোই পিতা-মাতা হব, বৃদ্ধ হব; তখন আমাদের ছেলে-মেয়েরা আমাদেরকে কীভাবে দেখবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে মাতা-পিতার অনুগত হয়ে জীবন যাপনের তৌফিক দান করুন— আমিন।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
অভিমত থেকে আরো পড়ুন