https://www.prothomalony.com/

18305

opinion

অভিমত

প্রশ্ন করতে ভয় পাওয়া সমাজের ভবিষ্যৎ কী?

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:১৩

শুটি হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, "এটা এমন কেন?" বড় কেউ হয়তো বললেন, "এত প্রশ্ন করো কেন? যা বলা হয়েছে, তাই করো।" শিশুটি চুপ করে গেল। কয়েক বছর পর শ্রেণিকক্ষে সে উত্তর জানে না, কিন্তু হাত তুলল না। আরও পরে কর্মক্ষেত্রে একটি সিদ্ধান্ত তার কাছে অযৌক্তিক মনে হলো, তবু প্রশ্ন করল না। একদিন নাগরিক হিসেবে কোনো সিদ্ধান্তের কারণ জানতে চাইলেও মনে হলো, প্রশ্ন করলে যদি বিপদ হয়?

এই ছোট ছোট নীরবতার যোগফলই একসময় একটি সমাজের চরিত্র তৈরি করে।

প্রশ্ন মানুষের চিন্তার স্বাভাবিক দরজা। শিশুর প্রথম 'কেন' থেকে জ্ঞানের যাত্রা শুরু হয়। বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে প্রশ্ন করে এগোয়, দর্শন প্রশ্নের ভেতর দিয়ে সত্যের সন্ধান করে, সাহিত্য প্রচলিত বাস্তবতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানুষটিকে খুঁজে ফেরে। গণতন্ত্রও শেষ পর্যন্ত নাগরিকের প্রশ্ন করার অধিকার ও ক্ষমতার কাছে জবাবদিহির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।

তাহলে যে সমাজে মানুষ প্রশ্ন করতে ভয় পায়, সেই সমাজের ভবিষ্যৎ কী?

প্রশ্নটি আসলে শুধু স্বাধীন মতপ্রকাশের নয়; এটি একটি সমাজ কতটা চিন্তাশীল, আত্মসংশোধনক্ষম ও ভবিষ্যৎমুখী— তারও প্রশ্ন।

প্রশ্ন থেকে ভয় পর্যন্ত

মানুষ জন্মগতভাবে প্রশ্নকারী। কিন্তু বড় হতে হতে সে অনেক সময় শিখে যায়—কোন প্রশ্ন করা যাবে, কোনটি যাবে না; কাকে প্রশ্ন করা যাবে, কাকে নয়।

পরিবারে শিশুকে বলা হয়, "বড়দের কথার ওপর কথা বলবে না।" বিদ্যালয়ে কখনো কখনো মুখস্থ উত্তরকে কৌতূহলের চেয়ে বেশি মূল্য দেওয়া হয়। কর্মক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতনকে প্রশ্ন করাকে কেউ কেউ অবাধ্যতা হিসেবে দেখেন। সমাজে প্রচলিত বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন করলে মানুষকে অশ্রদ্ধাশীল বা বিচ্ছিন্ন বলে চিহ্নিত করার প্রবণতাও আছে।

এভাবে প্রশ্নের জায়গা দখল করে নেয় ভয়।

প্রথমে থাকে ভুল বলার ভয়। তারপর অপমানিত হওয়ার ভয়। এরপর সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয়, সুযোগ হারানোর ভয়, সামাজিকভাবে একঘরে হওয়ার ভয়। শেষ পর্যন্ত মানুষ হয়তো নিজের কাছেই প্রশ্ন করতে ভয় পায়।

এখানেই বিপদটি সবচেয়ে গভীর।

কারণ মানুষ যখন বাইরের প্রশ্ন হারায়, তখন একসময় নিজের বিশ্বাসকেও পরীক্ষা করার অভ্যাস হারাতে পারে।

প্রশ্ন মানেই অবমাননা নয়

অবশ্য প্রশ্ন করার স্বাধীনতাকে প্রশ্নহীন স্বাধীনতা হিসেবে দেখা যাবে না। প্রশ্ন মানে কাউকে অপমান করা নয়। সমালোচনা মানে শত্রুতা নয়। সন্দেহ মানে বিদ্বেষ নয়। ভিন্নমত মানে বিশ্বাসঘাতকতা নয়।

একটি সুস্থ সমাজে প্রশ্নেরও নৈতিকতা থাকে। প্রশ্ন হতে পারে কঠিন, কিন্তু তার ভাষা দায়িত্বশীল হতে পারে; মতভেদ তীব্র হতে পারে, কিন্তু যুক্তি ও প্রমাণের প্রতি সম্মান থাকতে পারে।

বরং সমস্যার শুরু তখনই, যখন যুক্তিসংগত প্রশ্নকে অশ্রদ্ধা হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়।

কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, মত বা সিদ্ধান্ত—কিছুই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। আবার কোনো প্রশ্নও সত্যের ঊর্ধ্বে নয়। প্রশ্নের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সত্যকে আরও স্পষ্ট করা, মানুষকে হেয় করা নয়।

এই পার্থক্যটি ভুলে গেলে প্রশ্নের সংস্কৃতিও বিশৃঙ্খলায় পরিণত হতে পারে।

শিক্ষার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

প্রশ্ন করার অভ্যাস তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা শিক্ষা। অথচ শিক্ষার সাফল্য যদি শুধু পরীক্ষার নম্বর, মুখস্থ উত্তর ও সনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে শিক্ষার্থী হয়তো অনেক উত্তর জানবে, কিন্তু উত্তরটির পেছনের কারণ নিয়ে ভাববে না।

আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও প্রশ্ন করার সঙ্গে শেখার সম্পর্কটি গুরুত্ব পেয়েছে। এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা কোনো বিষয় বুঝতে না পারলে নিয়মিত প্রশ্ন করার প্রবণতা তাদের শেখার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত; সমালোচনামূলক চিন্তাকেও সেখানে প্রাথমিক বিশ্বাসকে প্রশ্ন করা, নতুন তথ্য বিবেচনা করা এবং নতুন সিদ্ধান্তের যুক্তি যাচাই করার সক্ষমতা হিসেবে দেখা হয়েছে।

অন্যদিকে শ্রেণিকক্ষ-সংক্রান্ত সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, ভালো প্রশ্ন শুধু তথ্য মনে করিয়ে দেয় না; শিক্ষার্থীকে বিশ্লেষণ, সংশ্লেষণ, যুক্তি দেওয়া ও অনুমান করার মতো উচ্চতর চিন্তায় নিয়ে যায়।

অর্থাৎ শিক্ষক শুধু উত্তর দেওয়ার মানুষ নন; তিনি এমন পরিবেশও তৈরি করতে পারেন, যেখানে শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে নিরাপদ বোধ করে।

তাই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি মৌলিক প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমরা কি পরীক্ষার জন্য উত্তর তৈরি করছি, নাকি জীবনের জন্য চিন্তাশীল মানুষ তৈরি করছি?

প্রশ্নহীন প্রতিষ্ঠান নিজের ভুল দেখতে পায় না

একটি প্রতিষ্ঠান যত বড়ই হোক, তার ভেতরে প্রশ্নের জায়গা না থাকলে তার ভুলগুলো সহজে দৃশ্যমান হয় না।

কেউ যদি বলতে না পারেন, "এই সিদ্ধান্তের ভিত্তি কী?", "এই তথ্যটি কি যাচাই করা হয়েছে?", "এখানে অন্য কোনো পথ কি ছিল?", তাহলে ভুল সিদ্ধান্তও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে।

প্রশ্ন তাই শুধু বিরোধিতার অস্ত্র নয়; এটি প্রতিষ্ঠানের আত্মসংশোধনের একটি পদ্ধতি।

বিজ্ঞান এ কারণেই এগোয়—একটি ব্যাখ্যা যত প্রতিষ্ঠিতই হোক, নতুন প্রমাণ তাকে প্রশ্ন করতে পারে। গবেষক নিজের ধারণাকেও পরীক্ষার সামনে দাঁড় করান। জ্ঞানকে স্থির সত্যের তালিকা না বানিয়ে অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার কারণ এখানেই।

যে সমাজে প্রশ্নকে সমস্যা হিসেবে দেখা হয়, সেখানে ভুল স্বীকার করার চেয়ে ভুল আড়াল করা সহজ হয়ে যায়। আর ভুল আড়াল করার সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানকেও দুর্বল করে।

ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা কেন জরুরি

ক্ষমতার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ক্ষমতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা যেমন থাকে, তেমনি ভুল সিদ্ধান্তের প্রভাবও অনেক বড় হতে পারে।

কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে নাগরিকের প্রশ্নের অর্থ এই নয় যে প্রতিটি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে হবে। বরং নাগরিক জানতে চাইতে পারেন—কেন সিদ্ধান্তটি নেওয়া হলো, তার ভিত্তি কী, এর প্রভাব কী হতে পারে এবং ভুল প্রমাণিত হলে সংশোধনের পথ কী।

জবাবদিহি মূলত এই প্রশ্ন করার সংস্কৃতিরই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।

তাই প্রশ্নকে ভয় পাওয়া শুধু ব্যক্তির সমস্যা নয়। এটি ধীরে ধীরে এমন এক সামাজিক পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যেখানে ক্ষমতার কাছে উত্তর চাওয়ার পরিবর্তে মানুষ উত্তর মেনে নেওয়াকেই নিরাপদ মনে করে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন বিপদ

ডিজিটাল যুগে মনে হতে পারে, মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রশ্ন করছে। প্রতিদিন অসংখ্য মন্তব্য, বিতর্ক ও মতামত দেখা যাচ্ছে। কিন্তু মতামতের বিস্ফোরণ আর গভীর প্রশ্ন এক জিনিস নয়।

আমরা অনেক সময় এমন তথ্যই খুঁজি, যা আমাদের আগের বিশ্বাসকে সমর্থন করে। নিজের মতের বিপরীত তথ্য দেখলে যাচাই করার পরিবর্তে তা প্রত্যাখ্যান করি। ফলে প্রশ্ন করার বদলে নিজের অবস্থানকে আরও শক্ত করার প্রবণতা তৈরি হয়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে:
তথ্যের প্রাচুর্য চিন্তার স্বাধীনতার নিশ্চয়তা নয়।

প্রশ্ন করার প্রকৃত অর্থ হলো নিজের বিশ্বাসকেও পরীক্ষার সামনে দাঁড় করাতে প্রস্তুত থাকা।

ভবিষ্যৎ আসলে কোথায় নির্ধারিত হয়?

একটি সমাজের ভবিষ্যৎ শুধু তার অর্থনীতি, প্রযুক্তি বা অবকাঠামো দিয়ে নির্ধারিত হয় না। নির্ধারিত হয় তার মানুষ কতটা স্বাধীনভাবে ভাবতে পারে, ভুল স্বীকার করতে পারে এবং নতুন প্রশ্ন তুলতে পারে—তার ওপরও।

প্রশ্ন করতে পারে এমন শিশু ভুল করলে শিখতে পারে। প্রশ্ন করতে পারে এমন গবেষক নতুন জ্ঞান তৈরি করতে পারেন। প্রশ্ন করতে পারে এমন সাংবাদিক অদৃশ্য বাস্তবতাকে সামনে আনতে পারেন। প্রশ্ন করতে পারে এমন নাগরিক প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির মধ্যে রাখতে পারেন।

আর প্রশ্ন করতে ভয় পাওয়া মানুষ?

সে হয়তো নিরাপদ থাকতে শিখবে, কিন্তু সবসময় স্বাধীনভাবে ভাবতে শিখবে না।

আমাদের তাই শুধু প্রশ্ন করার অধিকার নিয়ে কথা বললে হবে না; প্রশ্ন করার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। পরিবারে শিশুর 'কেন'কে বিরক্তি নয়, কৌতূহল হিসেবে দেখতে হবে। শিক্ষায় ভুল উত্তরকে অপমানের কারণ না করে শেখার সুযোগ হিসেবে নিতে হবে। কর্মক্ষেত্রে ভিন্নমতকে বিদ্রোহ না ভেবে উন্নতির সম্ভাবনা হিসেবে দেখতে হবে। আর সমাজে যুক্তিসংগত প্রশ্নকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে নেওয়ার অভ্যাস কমাতে হবে।

শেষ পর্যন্ত একটি সমাজের শক্তি কতগুলো প্রশ্নের উত্তর তার কাছে আছে, শুধু তা দিয়ে মাপা যায় না। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো—সে সমাজ কতটা নিরাপদে প্রশ্ন করতে পারে এবং ভুল উত্তর পেলে কতটা সাহসের সঙ্গে তা বদলাতে পারে।

কারণ ভবিষ্যৎ কখনো শুধু উত্তর দিয়ে তৈরি হয় না। ভবিষ্যৎ তৈরি হয় সেইসব প্রশ্ন দিয়ে, যেগুলো আজ করার সাহস আমরা দেখাই।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, কক্সবাজার, বাংলাদেশ।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন