https://www.prothomalony.com/
18268
opinion
আমাদের সমাজে মা হওয়ার সংকটময় যাত্রা নিয়ে এখন তবুও কিছু কথা হয়, কিন্তু বাবা হওয়ার সংকটময় যাত্রা নিয়ে প্রায় কেউ কথা বলেন না। বাবা মানেই শক্ত, বাবা মানেই ভরসা, বাবা মানেই সব সামলে নেওয়া। বাস্তবে অনেক বাবাও সন্তান জন্মের পর অনেক মায়ের মতো সুখী অনুভব করেন না। তাদেরও ঘুম উড়ে যায়, তারাও ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েন, বিরক্ত হন, নিজেকে ব্যর্থ মনে করেন। এবং যেহেতু সমাজ বলে বাবাদের কাঁদতে নেই, তাই তারা চুপ করে থাকেন। এই চুপ করে থাকা অবস্থাটির একটি নাম আছে: প্যাটার্নাল পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন।
প্যাটার্নাল পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন আসলে কী?
এটি হলো সন্তান জন্মের প্রথম বছরের মধ্যে বাবার মধ্যে দেখা দেওয়া বিষণ্নতা। এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য মানসিক স্বাস্থ্য অবস্থা। মেয়ো ক্লিনিক তাদের ওয়েবসাইটে স্পষ্ট বলেছে, গবেষণায় দেখা গেছে নতুন বাবারাও পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন অনুভব করতে পারেন। তাদেরও দুঃখ, ক্লান্তি, অভিভূত লাগা, উদ্বেগ বা খাওয়া ঘুমের পরিবর্তন হতে পারে, যা মায়েদের মতোই লক্ষণ।
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশ বলছে, পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন শুধু বেবি ব্লুজ নয়, এটি কয়েক সপ্তাহ বা মাস স্থায়ী হতে পারে এবং দৈনন্দিন কাজ ও বাচ্চার যত্ন নেওয়ার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। বাবাদের ক্ষেত্রেও একই রকম গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কতজন বাবা আক্রান্ত হন?
এটি বিরল নয়। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক এর মনোবিজ্ঞানী মনোবিজ্ঞানী অ্যাডাম বোরল্যান্ড বলেছেন, জার্নাল অফ দ্য আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন- এ প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী প্রায় ১০ শতাংশ বাবা সন্তান জন্মের আগে বা পরে বিষণ্নতা অনুভব করেন।
ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিনের ফ্রি মেডিকেল গবেষণা ভাণ্ডার পিএমসি- তে প্রকাশিত 2023 সালের একটি প্রোগ্রাম ইভালুয়েশন পেপারে বলা হয়েছে, প্যাটার্নাল পিপিডি প্রায় ৮ থেকে ১৩ শতাংশ বাবাকে প্রভাবিত করে বলে ধারণা করা হয়, এবং মা যখন এই সঙ্কটে ভুগছেন তখন বাবার আক্রান্ত হওয়ার হার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বাবাদের লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে শুরু হয় এবং জন্মের ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
এটি কেন হয়- তার কারণ একটা নয়, কয়েকটি বিষয় একসাথে কাজ করে। যেমন-হরমোনের পরিবর্তন, মনোসামাজিক চাপ, ঘুমের অভাব এবং সম্পর্কের টানাপোড়েন।
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের ডা. বোরল্যান্ড ব্যাখ্যা করেছেন, বাচ্চা আসার পর বাবাদের টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়ার প্রমাণ আছে। গবেষকরা মনে করেন এটি বাবাকে বাচ্চার সাথে বন্ধন তৈরিতে সাহায্য করার একটি বিবর্তনীয় পরিবর্তন, কিন্তু কম টেস্টোস্টেরন বিষণ্নতার লক্ষণের মতোই অনুভূতি তৈরি করতে পারে। একই নিবন্ধে বলা হয়েছে, নতুন ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা, পরিবারের ভরণপোষণের চাপ, সমাজের প্রত্যাশা যে বাবা সবসময় খুশি থাকবে, তার ফলে অপরাধবোধ তৈরি হয়।
এছাড়া, রাতের পর রাত না ঘুমানো মস্তিষ্কের মুড নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে সরাসরি দুর্বল করে দেয়। সন্তান কেন্দ্রিক হয়ে যাওয়ায় দম্পতির সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হলেও ঝুঁকি বাড়ে।
মায়েদের ক্ষেত্রে কান্না, মন খারাপ বেশি দেখা গেলেও বাবাদের ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো অনেক সময় ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক বলছে, বিষণ্নতায় থাকা পুরুষদের প্রায়ই রাগী, খিটখিটে বা আক্রমণাত্মক মনে হতে পারে, যা অনেকেই বিষণ্নতা বলে বুঝতে পারেন না।
সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:
বিরক্তি ও হতাশা: অল্পতেই রেগে যাওয়া, সবকিছুতে সিনিক্যাল লাগা।
আগ্রহ হারানো: আগে যে কাজ ভালো লাগত, সেগুলোতে আর আনন্দ না পাওয়া, কাজে বেশি সময় দেওয়া যাতে বাড়ি এড়ানো যায়।
প্রত্যাহার: পরিবার ও বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যাওয়া, বাচ্চার সাথে বন্ধন তৈরিতে সময় লাগা বা অনীহা।
শারীরিক লক্ষণ: কম শক্তি, ক্লান্তি, মনোযোগ দিতে না পারা, ঘুম ও খাওয়ার পরিবর্তন।
ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ: অ্যালকোহল বেশি খাওয়া, জুয়া বা অন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়ানো।
গুরুতর ক্ষেত্রে: নিজের বা অন্যের ক্ষতি করার চিন্তা।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
মেয়ো ক্লিনিক জানিয়েছে, যারা কম বয়সী বাবা, যাদের আগে বিষণ্নতার ইতিহাস আছে, যাদের সম্পর্কে সমস্যা চলছে বা আর্থিক চাপে আছেন, তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। পিএমসি-রিভিউতে আরও কয়েকটি ঝুঁকির কারণ উল্লেখ করা হয়েছে: মানসিক রোগের ইতিহাস, মায়ের পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব, কম শিক্ষা, অপরিকল্পিত গর্ভধারণ এবং ঘুমের ব্যাঘাত।
এটি শুধু বাবার সমস্যা নয়। মেয়ো ক্লিনিক বলছে, বাবার পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন পার্টনার সম্পর্ক এবং শিশুর বিকাশের উপর মায়ের ডিপ্রেশনের মতোই নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বাবা যখন বিষণ্ন থাকেন, তখন শিশুর সাথে খেলা, কথা বলা, সাড়া দেওয়া কমে যায়, যা শিশুর আবেগ ও ভাষা বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে। মা যদি ইতিমধ্যে বিষণ্ন থাকেন, তাহলে বাবার বিষণ্নতা তার অবস্থাকে আরও খারাপ করতে পারে।
কী করবেন, কীভাবে সাহায্য পাবেন?
ভালো খবর হলো, এটি চিকিৎসাযোগ্য। মায়েদের মতোই বাবাদেরও ওষুধ, থেরাপি এবং সেলফ কেয়ার দিয়ে মনের স্বাস্থ্য ভালো করা যায়।
'ইপিডিএস' নামে ১০ প্রশ্নের একটি স্কেল মায়েদের জন্য ব্যবহার করা হয়, গবেষণায় দেখা গেছে এটি বাবাদের জন্যও নির্ভরযোগ্য। পিএমসি পেপারে বাবাদের জন্য কাট অফ স্কোর ৮ বা তার বেশি অথবা আত্মহত্যার চিন্তা থাকলে পজিটিভ ধরা হয়েছে।
আপনার অনুভূতি সম্পর্কে পার্টনার, পরিবার বা বিশ্বস্ত বন্ধুর সাথে খোলামেলা কথা বলাও উপকারী হতে পারে। ডা. বোরল্যান্ডের মতে, এটি নিজের ও পরিবারের যত্ন নেওয়ার সবচেয়ে ভালো পদক্ষেপ।
এছাড়াও, ভালো খাওয়ার অভ্যাস, হালকা ব্যায়াম, সুযোগ পেলে ঘুমিয়ে নেওয়া, অ্যালকোহল ও জুয়ার মতো বিষয়গুলো এড়ানো-ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক এই বিষয়গুলোর উপর জোর দিয়েছে।
মেয়ো ক্লিনিক পরামর্শ দেয়, পার্টনার যদি গর্ভাবস্থায় বা জন্মের পর বিষণ্নতা বা উদ্বেগ অনুভব করেন, তবে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সাথে কথা বলা উচিত। এবং যদি লক্ষণ ২ থেকে ৩ সপ্তাহের বেশি থাকে, দৈনন্দিন কাজে বাধা দেয়, বাচ্চার যত্ন নিতে কষ্ট হয়, তাহলে প্রাথমিক চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন।
যদি কখনো নিজের বা বাচ্চার ক্ষতি করার চিন্তা আসে, এটি জরুরি অবস্থা। একা থাকবেন না। বাচ্চাকে নিরাপদ জায়গায় রেখে কাছের মানুষকে ডাকুন। বাংলাদেশে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান, অথবা যুক্তরাষ্ট্রে থাকলে ৯৮৮ নম্বরে কল বা টেক্সট করে Suicide and Crisis Lifeline এ যোগাযোগ করুন। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক এই জরুরি সহায়তার কথা উল্লেখ করেছে।
রাতে পায়ের কামড়ানি, মোচড়ানি, ঘুমাতে না পারা: কারণ ও প্রতিকার
দিনের ক্লান্তি শেষে বিছানায় শরীর এলিয়ে দেওয়ার পর যখন এক ফালি নিশ্চিন্ত ঘুমের অপেক্ষা, ঠিক তখনই যদি পায়ের ভেতর শুরু হয় তীব্র অস্বস্তি, মোচড়ানি কিংবা চিনচিনে কামড়ানি—তবে রাতের ঘুম রূপ নেয় নিদারুণ যন্ত্রণায়। অনেকেই বিছানায় শুয়ে পা স্থির রাখতে পারেন না; মনে হয় পায়ের পেশির ভেতরে কিছু একটা হেঁটে বেড়াচ্ছে, শিরা টান টান হয়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে অথবা কেউ ভেতর থেকে পা মুচড়ে দিচ্ছে। পা না নাড়ালে এই অস্বস্তি কোনোভাবেই কমে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতির প্রধান দুটি কারণ হলো রেস্টলেস লেগস সিন্ড্রোম এবং রাতে পেশির অস্বাভাবিক সংকোচন বা নকটার্নাল লেগ ক্র্যাম্পস।
কেন হয় এই অস্বস্তি?
আন্তর্জাতিক চিকিৎসা গবেষণা সংস্থা যেমন মেয়ো ক্লিনিক এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ-এর তথ্য অনুযায়ী, রাতে পায়ের এই তীব্র অস্বস্তির পেছনে মূলত স্নায়বিক ও দৈহিক কিছু জটিলতা কাজ করে:
•পুষ্টি উপাদান ও আয়রনের ঘাটতি: মস্তিষ্কে স্নায়ু সঞ্চালনকারী রাসায়নিক 'ডোপামিন'-এর ভারসাম্য বজায় রাখতে আয়রন অপরিহার্য। রক্তে হিমোগ্লোবিন বা আয়রনের মাত্রা (বিশেষ করে ফেরিটিন) কমে গেলে স্নায়ুর স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যাহত হয়, যা রেস্টলেস লেগস সিন্ড্রোমের অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়া ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন বি-১২-এর ঘাটতি পেশির শিথিলতা নষ্ট করে।
•পানিশূন্যতা ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা: সারা দিনে পর্যাপ্ত পানি পান না করা এবং অতিরিক্ত ঘামের ফলে শরীর থেকে সোডিয়াম ও পটাসিয়াম বের হয়ে গেলে রাতে পায়ের পেশি আকস্মিক সংকুচিত বা শক্ত হয়ে তীব্র মোচড়ানি সৃষ্টি করে।
•রক্ত সঞ্চালনের সমস্যা: দীর্ঘক্ষণ একটানা দাঁড়িয়ে বা এক জায়গায় পা ঝুলিয়ে বসে কাজ করলে পায়ের শিরায় রক্ত প্রবাহের স্বাভাবিক গতি ধীর হয়ে যায়। ভেরিকোজ ভেইন বা পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ থাকলে এই সমস্যা বহুগুণ বেড়ে যায়।
•অতিরিক্ত ক্লান্তি বা কায়িক শ্রমের অভাব: দিনের বেলা অতিরিক্ত ভারী কাজ করলে যেমন পেশি ক্লান্ত হয়ে রাতে বিদ্রোহ করে, তেমনই সারা দিন একদমই শারীরিক নড়াচড়া না করলেও স্নায়ুগুলো সংবেদনশীল হয়ে পড়ে।
কার্যকর প্রতিকার ও করণীয়:
চিকিৎসকদের নির্দেশিত কিছু সহজ ঘরোয়া পরিচর্যা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন রাতে পায়ের এই অস্বস্তিকর যন্ত্রণা অনেকাংশেই দূর করতে পারে:
•উষ্ণ ও ঠান্ডা সেঁক: ঘুমানোর ঠিক আগে কুসুম গরম পানিতে ১০-১৫ মিনিট পা ডুবিয়ে রাখলে বা গরম পানির ব্যাগ ব্যবহার করলে রক্তনালী প্রসারিত হয়ে পেশি শিথিল হয়। তবে তীব্র জ্বলুনি বা ক্র্যাম্পে বরফের সেঁক তাৎক্ষণিক আরাম দেয়।
•হালকা স্ট্রেচিং ও ম্যাসাজ: বিছানায় যাওয়ার আগে পায়ের কাফ মাসল (ডিম) এবং ঊরুর পেশি টেনে হালকা স্ট্রেচিং করুন। কুসুম গরম সরিষার তেল বা অলিভ অয়েল দিয়ে পায়ের নিচ থেকে ওপরের দিকে আলতো ম্যাসাজ করলে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে।
•পা সামান্য উঁচুতে রাখা: ঘুমানোর সময় পায়ের গোড়ালির নিচে একটি মাঝারি নরম বালিশ রেখে পা দুটিকে হৃৎপিণ্ডের উচ্চতা থেকে সামান্য উঁচুতে রাখুন। এতে পায়ে রক্ত জমে থাকার প্রবণতা কমে।
•পরিমিত খাদ্যাভ্যাস ও পানি: দৈনিক অন্তত আড়াই থেকে তিন লিটার পানি পান করুন। খাদ্যতালিকায় কলা, ডাবের পানি, কাঠবাদাম, সবুজ শাকসবজি এবং দুধের মতো খনিজসমৃদ্ধ খাবার রাখুন।
যদি ঘরোয়া পরিচর্যার পরও সমস্যাটি নিয়মিত চলতে থাকে, তবে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রক্তের সিরাম ফেরিটিন ও ইলেক্ট্রোলাইটের মাত্রা পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া জরুরি।
শিশুর স্ক্রিন টাইম সীমিত করার কার্যকর কৌশল
ডিজিটাল প্রযুক্তির এই যুগে স্মার্টফোন, ট্যাব কিংবা টেলিভিশন শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। খাওয়ার টেবিলে শান্ত রাখা থেকে শুরু করে অবসর সময় কাটানো—সব কিছুতেই স্ক্রিন যেন এক জাদুকরী সমাধান। অথচ অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুর শারীরিক বিকাশ, মস্তিষ্কের পরিপক্বতা, চোখের দৃষ্টি এবং সামাজিক যোগাযোগের দক্ষতায় মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সন্তানকে প্রযুক্তির ভালো দিকগুলো শিখিয়ে কীভাবে অপ্রয়োজনীয় স্ক্রিন আসক্তি থেকে মুক্ত রাখা যায়, তা আজকের প্রতিটি অভিভাবকের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
স্পষ্ট পারিবারিক নিয়ম নির্ধারণ: হুট করে শিশুর হাত থেকে ডিভাইস কেড়ে নিলে জেদ বা আক্রমণাত্মক আচরণ দেখা দেয়। তাই শাস্তির বদলে নিয়ম চালু করতে হবে।
নির্দিষ্ট সময়সীমা দিন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য কোনো স্ক্রিন টাইম নয় এবং দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সীদের জন্য দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা ভালো মানের কনটেন্ট দেখার সুযোগ দেওয়া উচিত।
খাবার টেবিল ও শোয়ার ঘরকে সম্পূর্ণ 'স্ক্রিন-মুক্ত' ঘোষণা করুন। ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে যেকোনো ধরনের নীল আলো ছড়ানো পর্দা বন্ধ করা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
বিকল্প আনন্দের জোগান দিন: শিশুর হাত থেকে স্ক্রিন সরিয়ে নিলে তার মনে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা আনন্দদায়ক কোনো কাজের মাধ্যমে পূরণ করতে হবে। শিশুরা কেবল একঘেয়েমি দূর করতেই বেশিরভাগ সময় স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তাই বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করতে পারেন। শৈশব থেকেই আকর্ষণীয় ছবিযুক্ত গল্পের বই, কমিকস বা ধাঁধার বই উপহার দিন। রাতে ঘুমানোর আগে সন্তানকে গল্প পড়ে শোনানো স্ক্রিনের চেয়ে অনেক বেশি কল্পনাশক্তি বাড়ায়।
সৃজনশীল খেলাধুলা যেমন-রংতুলি, ক্লে মডেলিং, ব্লক তৈরি, কাগজ কাটার কারুকাজ বা বোর্ড গেমের মতো কাজে শিশুকে যুক্ত করুন। এগুলো মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ও মনোযোগ বৃদ্ধি করে।
শিশুকে প্রতিদিন বিকেলে খোলা মাঠে দৌড়াদৌড়ি, সাইকেল চালানো বা প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে যান। শারীরিক ক্লান্তিতে রাতের ঘুম যেমন দ্রুত আসে, তেমনি পর্দার প্রতি আগ্রহও কমে।
রোল মডেল হন: শিশুরা অভিভাবকের মুখের কথার চেয়ে তাদের কাজ দেখে বেশি শেখে। মা-বাবা নিজেরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সামাজিক মাধ্যমে সময় কাটালে শিশুকে স্ক্রিন থেকে দূরে রাখা অসম্ভব। সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় নিজের ফোনটি দূরে রাখুন এবং তার সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলুন। একাকী সময় না কাটিয়ে তার দৈনন্দিন চিন্তাভাবনা শুনুন।
সচেতন ব্যবহার ও ইতিবাচক অভ্যাস গড়ে তোলা: প্রযুক্তি ব্যবহারেও বুদ্ধিমত্তা জরুরি। একসাথে দেখুন, একা ছেড়ে দেবেন না। শিশুর পাশে বসে কনটেন্ট দেখুন এবং তাকে প্রশ্ন করুন, এতে দেখা শেখায় পরিণত হয়। স্ক্রিনকে পুরস্কার বা শাস্তি হিসেবে ব্যবহার করবেন না, এতে আসক্তি বাড়ে। বাড়িতে একটি চার্জিং স্টেশন তৈরি করুন যেখানে রাতে সব ডিভাইস থাকবে, শোয়ার ঘরের বাইরে। সপ্তাহে একদিন পুরো পরিবারের জন্য স্ক্রিন মুক্ত দিন ঘোষণা করুন, যেখানে সবাই মিলে রান্না, বাগান বা গল্পের আসর করবেন। ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে শিশুর ভালো আচরণের প্রশংসা করুন, সময় মেনে চললে ছোট উপহার বা পারিবারিক ভ্রমণের প্রতিশ্রুতি দিন, এতে ইতিবাচক অভ্যাস গড়ে উঠবে। মনে রাখবেন, পরিবর্তন একদিনে আসে না, ধৈর্য ধরুন।
মনে রাখবেন, স্ক্রিন টাইম সীমিত করার এই যাত্রায় শিশুর ওপর কোনো সিদ্ধান্ত জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। বরং খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে তাকে বুঝিয়ে বলুন—কেন দীর্ঘক্ষণ পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা তার চোখ, মস্তিষ্ক ও মনের ক্ষতির কারণ হচ্ছে। মা-বাবার ধৈর্য, বোঝাপড়া আর ধারাবাহিক সান্নিধ্যই পারে শিশুকে স্ক্রিনের মোহমুক্ত করে একটি সুস্থ, সুন্দর ও প্রাণবন্ত শৈশব উপহার দিতে।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন