https://www.prothomalony.com/
18300
opinion
সময় পর্ব: ১৯৬৪-৬৫। সবে উৎপলকুমার বসুর দ্বিতীয় কাব্য ‘পুরী সিরিজ’—কবিতাকে মোচড় দিয়ে আবির্ভূত হয়েছে। শঙ্খ ঘোষ বলেছেন, বইটিতে বাংলা কবিতার চিহ্নমাত্র নেই। পৃথিবীর সাহিত্যের ইতিহাসে একমাত্র আর্তুর র্যাঁবোর ‘নরকে এক ঋতু’-এর সঙ্গে তুলনীয়। এই সময় পর্বের অন্য পিঠে চলছিল হাংরি কবিদের ধরপাকড়। মলয় রায়চৌধুরী, শক্তি, সুনীলদের সঙ্গে ‘পুরী সিরিজ’-এর কবি উৎপলকুমার বসুর বিরুদ্ধেও জারি হলো গ্রেফতারি পরোয়ানা। উৎপল তখন সবে জিওলজিতে এম.এসসি. করে যোগমায়া দেবী কলেজের প্রভাষকের দায়িত্বে। হাংরিতে কবিতা লেখার অভিযোগে একদিকে পুলিশি জেরা, অন্যদিকে যোগমায়া দেবী কলেজ কর্তৃপক্ষ কবির উপর প্রিয়রঞ্জন সেন, শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়দের দিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কবিকে কমিটির সামনে ছ’মাস ধরে হাজির হতে বলা হয়। কর্তৃপক্ষ জানায়—“The service of Sri U.K. Bose... is [to be] terminated with effect from this day (19.5.65).” হাংরিতে কবিতা লেখার অভিযোগে উৎপলকে কর্মচ্যুত করা হল। ‘কবির উত্থান’ কবিতায় তাই হয়তো বললেন—
“সবুজ অন্তর ফেটে শৈবালের সন্তানের মতো যাঁর জন্ম ছিল—
তাঁরই বার্তা উন্মার্গের গোধূলিতে এখন উঠেছে।”
এই বার্তা গোধূলির কোলে নিমজ্জিত হল। উৎপলকুমার বসু অনিশ্চিত জীবনের পথে বাড়ালেন পা, লিখলেন—“এর চেয়েও বরঞ্চ দুরূহ এবং অনিশ্চিত পথে যাওয়া ভাল এবং সেটাই চৈতন্যের কাছাকাছি পৌঁছানোর রাস্তা। জীবনের পথ কুসুমাকীর্ণ নয়। এবং যতক্ষণ... হাতে কলম আছে ততক্ষণ আমি দুঃসাহসী।” এই অভিঘাতে উৎপল বাংলা কবিতাকে বিদায় জানিয়ে দীর্ঘ ১৩ বছরের প্রবাসজীবন বেছে নিয়েছিলেন। সেখানে কবিতাকে বাদ দিয়ে প্রায় সবরকমের কাজ করলেন। অগাধ পাশ্চাত্য সাহিত্য পাঠ, পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনের কাজ, সিনেমা মুভমেন্টেও জড়ালেন নিজেকে। ওদিকে বাংলাদেশে তখন মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। চুপিচুপি। কবি তাঁদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কারণে তাঁর লন্ডনের বাসায় পুলিশি তল্লাশিও চলেছিল। বিদেশে ক্ষুণ্নিবৃত্তির জন্য নানা সময়ে করেছেন নানা কাজ—স্প্রে পেইন্টিং, অ্যাসিস্ট্যান্ট আর্কিটেক্ট, লাইব্রেরিয়ানের কাজ। এমনকি ট্রাক ড্রাইভারের লাইসেন্সও বের করেছিলেন তিনি—“এমনই অনিশ্চিত ছিল জীবন তখন।”
হয়তো কবিতার প্রাসঙ্গিকতা বা সমাজের উপর ভরসা হারিয়ে বিরত ছিলেন কবিতা লেখা থেকে। দীর্ঘ ১৩টি বছর। ‘পুরী সিরিজ’-এর শেষ কবিতায় তাই তিনি লিখলেন—“আমার ব্যক্তিগত লিখনভঙ্গিমা আমি হারিয়েছি বাদামপাহাড়ে।” তাঁর এই দীর্ঘ ১৩ বছরের জীবনসংগ্রামের ইতিহাস আজও গোপন থেকে গেছে। সে খবর আমরা কতজন রেখেছি! আত্মআক্ষেপ আর সামাজিক অভিক্ষেপ কবিকে কতটা কবিতা-বিমুখ করেছিল, সে কথা জানালেন অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তকে—
“আপনি জানেন যে বাংলা কবিতায় আমার উৎসাহ বর্তমানে খুবই কম—প্রায় নেই বললেই চলে।... বাংলা কবিতা বলতে যা বোঝায় তার ভেজাল ও অসারতা লক্ষ্য করেছি।”
বাংলা কবিতার সঙ্গে বৃহৎ অর্থে দেশ-সমাজের যে যোগাযোগ গড়ে উঠছে না, সে বিষয়টি উৎপল অনুধাবন করেছিলেন। এই সমাজই কবিতা লেখার অপরাধে কবিকে কর্ম থেকে বহিষ্কার করেছিল! সে সময়ের সমাজ মলয়, সমীর বা উৎপলদের কবিতাকে দেখেছিল বাঁকা চোখে। যার অভিঘাত মলয় বা সমীর রায়চৌধুরীদের মতো উৎপলের কবিজীবনেও আছড়ে পড়েছিল। শক্তি চট্টোপাধ্যায় যাঁর উদ্দেশ্যে অনেক পরে বলেছিলেন—
“উৎপল একা পুরীর মন্দির সারাবার হাতচিঠি পেয়েছিল—তবু হাত হতাশ হয়েছে!”
এই দীর্ঘ ১৩ বছর কবিতার ক্ষেত্রে উৎপলকুমার বসুর জীবনের এক কালো অধ্যায়। বাংলা কবিতার বাঁক বদলের কাব্য ‘পুরী সিরিজ’-এর কবরে সমাহিত হওয়ার কালপর্ব। যে কাব্যে কবিতাকে দিকে দিকে সম্প্রসারিত করার আধুনিক চিন্তা-চেতনার ফসল সমাহিত ছিল। ছিল কবিতার ফর্ম, ভাব, ভাষায় এক চূড়ান্ত ভাঙাচোরার আয়োজন।
সময় পর্ব: ১৯৭৭-পরবর্তী। উৎপলকুমার বসু কলকাতায় ফিরলেন। প্রায় ১৩ বছর পার। ‘চিত্রবাণী’তে কাজ নিলেন প্রজেক্ট অফিসারের। নন্দন ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সহসভাপতির দায়িত্ব ছাড়াও সম্পাদনা করলেন ‘বইয়ের কাগজ’, ‘দরগা রোড’ প্রভৃতি পত্রিকা। কৃত্তিবাসের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে স্মারক গ্রন্থের মূল ভূমিকায় তিনিই ছিলেন। ততদিনে পুরনো আক্ষেপ অনেকটাই প্রশমিত হয়েছে। কবি হাত দিয়েছেন ‘আবার পুরী সিরিজ’ থেকে ‘হাঁস চলার পথ’-এর অভিনব বাকবিভূতিতে, কাব্যাঙ্গিকে। ‘ধূসর আতাগাছ’ থেকে ‘সদাভ্রাম্যমাণ’-এর গদ্য খেলায়। আর নব নব অনাবিষ্কৃত অঞ্চল আবিষ্কারে।
উৎপল কবিতাকে করে তুললেন ভ্রাম্যমাণ, সম্প্রসারণশীল, কথকতা-গল্প-গান-নাটক। ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমানকে সমাহিত করলেন সময়-সমাজ-মানুষকে। সমপরিমাণে পাঠককে করলেন সচেতন ও সক্রিয়। কখনও কবিতার ফর্ম, বাক্য, শব্দ নিয়ে মাতলেন অভিনব খেলায়। যেখানে লিপ্ত হয়ে আছে Multidisciplinary, Multidimensional কবিতা ম্যাজিক। সেখানে গদ্য-পদ্যের প্রাচীর ভেঙে কবিতা হয়ে উঠেছে Audio-Visual Effect সহযোগে চলৎশক্তিসম্পন্ন। বা জয় গোস্বামীর ভাষায়—“এমন সব ফর্ম তাঁর হাতে এসেছে, যা তাঁর আগে বাংলা কবিতা কল্পনা করেনি কখনও।”
কবিতাকে বিসর্জন দিয়েও উৎপল শেষে কবিতার কাছেই আত্মসমর্পণ করেছিলেন। ওই ১৩ বছরের সাহিত্যিক বনবাস না নিলে হয়তো বাংলা কবিতা আরও নতুন তালুকের সন্ধান পেত! তবুও আমরা যেটুকু পেয়েছি, সেটুকুই বা কম কি? যা প্রতিটি পাঠক, তরুণ কবিদের কাছে সমপরিমাণে উদ্দীপক ও শিক্ষণীয়। যা জীবনানন্দ-পরবর্তী বাংলা কবিতার নতুন অধ্যায় সূচনা করতে পারে। বা অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের ভাষায়—
“কমলকুমার তখন বাংলা গদ্যে যে বিপ্লব সাধন করেছিলেন, বাংলা কবিতায় খুব সম্ভব উৎপলের মাধ্যমেই সেই ক্রান্তি সংঘটিত হয়েছিল।”
সেই ‘ক্রান্তি’ বা উৎপল-চর্চা, বিসর্জনের পর আবাহনে এনে দিয়েছিল বাংলা কবিতার নানা রূপ—অঙ্গ সৃজনে, সমন্বয়করণে, কবিতায় সমগ্র সাহিত্য মাধ্যমকে একত্রীকরণে।
ড. শিবশঙ্কর পাল, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন