https://www.prothomalony.com/

9985

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত্য

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৪ ১১:২৪

উত্তরের সাহিত্য-বাবা দিবস সংখ্যা 

পিতৃত্বের মহিমা উদযাপনে আসে বাবা দিবস। বাবা দিবস শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি আমাদের জীবনে বাবার অবদান এবং ত্যাগকে সম্মানিত করার একটি বিশেষ দিন। বাবা হলেন আমাদের আশ্রয়স্থল যেখানে আমরা নিরাপত্তা খুঁজে পাই, বাবা হলেন সেই শক্তির উৎস যা আমাদের সাহস যোগায়, বাবা সেই নিরলস পরিশ্রমী যিনি আমাদের ভালো থাকার জন্য সব কিছু করেন। এই বিশেষ দিনে আমরা প্রয়াত বাবাদের জীবনের সেইসব মুহূর্তগুলিকে স্মরণ করি, যেখানে তারা আমাদের পাশে ছিলেন, আমাদের সমর্থন দিয়েছেন এবং আমাদের জীবনের পথে বৃক্ষের মতো ছায়া দিয়ে আমাদের জীবনকে এত সুন্দর ও সফল করেছেন। 

-এইচ বি রিতা। 

 

 

পিতৃকথা 

কাকন রেজা
 

 

 

হুমায়ূন আহমেদ তার লেখা 'বিদায় বন্ধু'তে নিজ বাল্যকালের বর্ণনা দিতে গিয়ে বাবার কথা বলেছেন। অসম্ভব ভালো লাগার সে কথা। তার পিতা অত্যন্ত ভাগ্যবান একজন মানুষ, যার সন্তান তাকে এতো ভলোবাসায় স্মরণ করেছিলেন। হুমায়ূন বাবা সম্পর্কে বলতে গিয়ে ক্লাস সিক্সে তার ফেল করার ঘটনা বর্ণনা করলেন। বললেন,' ফেল করার সংবাদ বাসায় কীভাবে দেব, এই আতঙ্কে অস্থির হয়ে কাঁদছি। বাবা কিছু বলবেন না আমি জানি। তিনি তাঁর সমগ্র জীবনে পুত্র-কন্যাদের গায়ে হাত তোলা দুরে থাকুক, ধমকও দেননি। কিন্তু মা অন্য জিনিস। তিনি মেরে তক্তা বানিয়ে দেবেন।' কী ভালোবাসা বাবার প্রতি, পিতার প্রতি। কী চোখ ভেজানো বর্ণনা। অবশ্যই হুমায়ূন আহমেদের বাবা একজন ভাগ্যবান মানুষ। হুমায়ূন আহমেদ নিজেও ভাগ্যবান।তাকেও স্মরণ করে তার সন্তানেরা ভালোবাসায়, ভালো না বাসার কারণ থাকা সত্বেও।

আমার বাবার কথা বলি। সাংবাদিকতা শুরু করেছি। নিজেকে সামলানোর যথেষ্ট বয়স হয়েছে। মাঝে-মধ্যে রাতে বাসায় ফিরতে দেরি হয়। একদিন বেশ দেরি হলো। বাসার সামনে আসতেই দেখি, রাস্তায় বাবার অস্থির পায়চারি।বললাম, বাইরে কেনো? বললেন, খাবার পর একটু হাঁটাহাঁটি করছেন। হঠাৎ বুকে জড়িয়ে ধরলেন। পিঠ ভিজে উঠলো ক্ষণিকেই, কান্না ঠেকাতে পারছিলেন না আমার হাঁটাহাঁটি করা আব্বু। আহারে পিতা, আহারে ভালোবাসা।

 আমার আব্বুও ভাগ্যবান, আমি তাঁকে স্মরণ করছি, তাঁরই মতো ভিজে চোখে, ভালোবাসায়। আব্বু কখনো গায়ে হাত তোলেননি। মার কথা বলতে গেলে হুমায়ূন আহমেদের মতন বলতে হয়, তিনি অন্য জিনিস। ছোটবেলায় মা'র মার খেয়েছি, বাবা সান্ত্বনা দিয়েছেন। মা'র মারের বিষয়টি যেমন ভয়ের ছিলো, আনন্দেরও ছিলো। মায়ের মার মানেই বাবার কাছ থেকে প্রাপ্তি। খাবার থেকে শুরু করে কলম, বই, শখের জিনিস, একটা না একটা কিছু থাকবেই।'পেটে খেলে পিঠে সয়', বাবার কাছ থেকে প্রাপ্তি পিঠের কষ্ট সইয়ে দিত।

হুমায়ূন আহমেদ সিগারেট ছেড়েছিলেন আমেরিকায় গিয়ে। আমি দেশে থেকেই ছেড়েছি। আমার খুব পছন্দের একজন মানুষ ডাক্তার ইন্দ্রজিৎ। ড. ইন্দ্রজিৎ প্রসাদ, দেশসেরা এন্ডোক্রাইনোলজিস্টদের একজন। ডাক্তার হিসেবে নয়, নিজের অনুজ হিসাবে তাকে পছন্দ করি, তারচেয়ে বেশি করি একজন সত্যিকার ভালো মানুষ হিসেবে। তার চেম্বারে কথা হচ্ছিল। হুট করে বলে ফেললাম, সিগারেট ছেড়ে দিচ্ছি। হুমায়ূন আহমেদ দিনে ত্রিশটা সিগারেট খান শুনে, ডাক্তার এমন ভাবে তাকিয়েছিলেন, যেন তিনি ছিলেন জন্তু বিশেষ। আমার তোলাগতো দু'প্যাকেট। অন্তত এদিক দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের চেয়ে এগিয়েছিলাম। ইন্দ্রজিৎ শুনে বিস্মিত হয়েছিলেন, তবে এটা নিশ্চিত আমাকে জন্তু ভাবেননি। সম্ভবত আমার উপর তার ভরসা ছিলো বলেই।

যা হোক, আব্বু জানতেন আমি সিগারেট খাই। ছেড়ে দেবার কথাও জানলেন মা'র কাছ থেকে। সেদিন থেকে নিজেও ছেড়ে দিলেন। যদিও তিনি খুব কম খেতেন, তবুও ছেলে ছেড়ে দিয়েছে বলে কথা, ছেলের সম্মানে তিনিও ছাড়লেন।তখন কেবল রিপোর্টিংয়ের সরে-অবসরে কলাম লেখা শুরু করেছি। প্রকাশও পাচ্ছে। আব্বু তখন অসুস্থ। একদিকে হার্টে রিং পরানো, তারপর ফুসফুসে ক্যান্সার। তবুও আমার লেখা প্রকাশ পেলেই তাঁর ম্রিয়মাণ চোখ আনন্দে জ্বলে উঠতো। আশেপাশের একে-ওকে ডেকে দেখাতেন, পড়াতেন। গর্ব করেব লতেন, 'দেখো ও আমাকেও ছাড়িয়ে গেছে।' আব্বু, আমিও চাই আমার সন্তান আমাকে ছাড়িয়ে যাক। আমি কী অতটা ভাগ্যবান হবো, আমার সন্তানও কী স্মরণ করবে আমায় ভেজা চোখে। কী জানি।

 আব্বু ভুল ছিলেন, তাঁকে ছাড়িয়ে যাওয়া আমার পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। মানুষ হিসাবে তো নয়-ই। বৃথা ভেবে সে চেষ্টাও করি না। শুধু তাঁর পদছাপ অনুসরণে হেঁটে চলার চেষ্টা করি, চলি। ভালো থেকো আব্বু ওপারে। আমি এপারে থাকি ভাগ্যহীন।

ফুটনোট : আমার আব্বু সত্যিকার অর্থেই ভাগ্যবান ছিলেন, অন্তত তিনি তার সন্তানকে তাঁর রাস্তায় চলতে দেখে গিয়েছিলেন। দেখে গিয়েছিলেন নিজের মিরর ইমেজ। কিন্তু এই আমি, পিতা হিসেবে ভীষণ রকম দুর্ভাগা, যে তার মিরর ইমেজকে হারিয়ে ফেলেছে। ফুটনোটের উপরে অংশটি লেখা হয়েছে পাঁচ বছর আগে। যখন লিখেছিলাম তখন আমার সন্তান ইহসান ইবনে রেজা ফাগুনও সাংবাদিকতায় পা রেখেছে। দ্রুত নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করছে তার কাজ দিয়ে। আমিও একে-ওকে বলতে শুরু করেছি, 'এ ছেলে আমায় ছাড়িয়ে অনেকদূর যাবে'। তাই পাঁচ বছর আগেএ লেখার সময় গর্ব গোপন করেই বলেছিলাম, আমার যোগ্য সন্তান কি আমাকে স্মরণ করবে, আমার মতন, আমি যেমন আমার পিতাকে স্মরণ করছি। কিন্তু ওই যে দুর্ভাগ্য, এই লেখার দু'মাস পরেই আমার সন্তান, যোগ্য সন্তান, আমার মিরর ইমেজ, প্রথমে গুম পরে খুন হন। গর্ব পরিণত হয় আজীবনের শোকে। পাঁচ বছরেও যে গুম-খুনের প্রকৃত কারণ জানতে পারিনিএবং নিজে একজন গণমাধ্যমের মানুষ হয়েও। এখন দুর্ভাগা এই আমি আমার পিতাকে ঈর্ষা করি, তিনি তার মিরর ইমেজ রেখে যেতে পেরেছেন এই ভেবে। 

 

 

বেঁচে আছি তাঁর সত্তাতে

জেবুন্নেছা জোৎস্না

 

 

কষ্টকে ভুলে থাকতে কিছু সত্যকে আমরা এড়িয়ে যাই সঙ্গোপনে। যে সত্য মনে হলে সমগ্র পৃথিবী দোলে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের পেন্ডুলামে! আর প্রতিবারই অস্তিত্বের অতল হতে এক না-বোধক আর্তচিৎকার আসে সত্যকে মেনে নিতে!  বোধ বলে, "সত্য তো এই, যাকে তুমি দেখছো না, যার সাথে পারছো না কথা বলতে, তোমরই আদলে নিত্য তাঁহার ইচ্ছা -অনিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ, তুমি তাঁর প্রতিনিধি হয়ে এখনও হাঁটছো এই পৃথিবীর পাড়ে।" 

আমাকে যে সার্বক্ষণিক গড়েছে সে আমার পিতা! শিক্ষার প্রতি ছিল তাঁর অদম্য নেশা। আমার নানা এবং দাদাবাড়ির প্রতিটা মানুষের শিক্ষার দেখ-ভাল করেছেন তিনি। তাঁর চাকুরির সুবাদে যশোর শিক্ষা বোর্ডের অধীনস্ত স্কুল - কলেজের মাস্টার্স- প্রফেসররা আমাদের বাসায় মেহমান হতেন। আর ছোট থেকে অনেক ভালো শিক্ষকের শিক্ষা এবং নোটে প্রভাবিত হয়েছি আমি। দ্বিতীয় শ্রেণীতে স্কুল পরির্বতনের সময় ভর্তি পরীক্ষায় খুব ভালো করায় আমাকে দ্বিতীয় থেকে একধাপে চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি করা হয়। এমন ধাক্কাও সহ্য করে গেছি যখন পাড়ার এক ক্লাস ওপরের ভাব নেয়া দুই সিনিয়র বন্ধুর সাথে আমিও একই বই পড়ি। 

ছোটবেলায় আম্মা যখন তাঁর পড়াশুনা, মেহমানদারী আর সংসারের কাজে ব্যস্ত, তখন আমাদের ভাই-বোনদের দেখভাল আব্বাই করেছে! সবার জামা-প্যান্ট আয়রন করা, জুতা ক্লিন রাখা, এমনকি তাঁর লাঞ্চের সময় বাসায় এসে আমাদের শাক, উচ্ছে, মাছ দিয়ে ভাত খাওয়া শেখানোর কাজটাও ছিল আব্বার.. দুপুরে খাওয়ার সময় তাই আমাদের ভাই-বোনদের চোখের পানি, নাকের পানি এক হয়ে যেত। ছোটবেলায় বিকেলে আব্বার সাথে ঘুরতে যাওয়া ছিল আমার নিত্য রুটিন। আব্বার অফিসে প্রতিবার স্পোর্টসের সময় আব্বা বেশ কয়েকটা প্রাইজ নিয়ে আসতো, সাথে আমিও। আব্বার কাছ থেকেই শিখেছি ফুল গাছ লাগানো, আম্মা যদিও এখনও কেবল ফলের গাছ লাগাতে পছন্দ করে। আমার আম্মার কাজ ছিল পড়া বাদ দিয়ে যেন আমি গল্পের বই না পড়ি আর ছবি না আঁকি সেই খেয়াল করা, আর আব্বা ছিল আমার লেখা কবিতা এবং ছবি আঁকার প্রথম মুগ্ধজন! বাসায় আর্ট শেখার মাস্টার রেখে দিয়েছেন! সবাই যখন বাইরে টাইপিং শিখতে যেত, আমাকে তখন মেশিন সহ বাসায় এসে টাইপ শিখিয়ে যেতো! কম্পিউটার বের হওয়ার পর যখন শুধু শহরের বিশেষ সেন্টারগুলোতে কম্পিউটার ছিল, তখন আমাদের জন্য তিনি কম্পিউটারও কিনে দিয়েছেন! আব্বা আমার শিক্ষার জন্য কোনো কার্পণ্য করেননি, আগলে রেখেছেন আমাকে কড়া শাসক হয়ে। আমার প্রেমিকদের খারিজ করেছেন শক্ত হাতে! 

প্রবাসী আমি কখনও হতে চাইনি, আর প্রবাসে বিয়ের প্রস্তাব এলে এতো অল্প বয়সে বিদেশ পাঠাতে আব্বা-নানার প্রচন্ড আপত্তি যে আমাকে তাঁরা দেখতে পাবে না!  এক অচেনা মানুষকে বিয়ে করি এই শর্তে যে আমার মাস্টার্স শেষ না হওয়া অবধি আমি বিদেশে যাবো না! বিয়ের পর আমার হৃত স্বাধীনতা আমি পাই ফিরে! 

আব্বাকে শেষ দেখেছি ২০১৪ সালে! তখন তিনি বলেছিলেন, এই হয়তো শেষ দেখা। তারপর তাঁর দুইটা কিডনি নষ্ট হলো, অনেক বছর ডায়ালাইসিস করেছেন, প্রবাসে আমার ফুলটাইম পড়ালেখার জন্য আমি তাঁকে দেখতে যেতে পারেনি। যখন যাওয়ার সময় হলো, তখন কোভিডের মহামারি! তাঁর হার্টএট্যাক হলো! আইসিইউ থেকে সুস্থ হয়ে ফিরে এসে আমাদের সাথে কথা বললেন! পরেরদিন আবার ডায়ালাইসিস করতে যেয়ে তিনি নিভৃতে চলে গেলেন। তাঁর চলে যাওয়া আমি মনে করতে চাইনা, করলেই আমার চোখ  জলে ভরে যায়। শুনতে খুব হাস্যকর, তবু কখনও মনে হয় আমাদের বিড়াল, জুকো'র চোখে আব্বা যেন তাকিয়ে থাকে আমার দিকে! জুকো'র হাঁটা-বসা আমার খুব পরিচিত লাগে! সন্দেহ হয়, আব্বা বুঝি আমার আশেপাশেই আছেন, কারণ আত্মার তো বিনাশ নাই, শরীর পঁচে গেলেও রুহু কোথাও না কোথাও থাকে। 

 

 

বাবার কথা, বাবাকে নিয়ে কথা

কাজী ইসলাম

 

 

বাবার কথা মনে হলেই মনে পড়ে, উনি চেয়েছিলেন পড়ালেখা শেষ করে আমি আমাদের শহরেই থিতু হই। উনার কাছে থাকি। তরুণ কালেজীবনের বৃহত্তর বিস্তারের মোহে সেটা হয়নি।আজ শেষবেলায় এসে মনে হয় জীবনের কথিত অর্জনের চাইতে অনেক মূল্যবান হতো তখন যদি ফিরে যেতাম উনার কাছে! 

ঝাঁপ খুললেই স্মৃতিরা জলোচ্ছ্বসের মতো ধেয়ে আসে। মনে পড়ে শৈশবের জন্মদিনের কথা। জন্মদিনের আমাকে সাইকেলের রডে বসিয়ে বেড়াতে নিয়ে যেতেন আশেপাশের গ্রামে। দুর্গাপুরের কাঁচা রাস্তা, দুধারে জলাশয় কচুরিপানার রঙিন ফুলে আলোকিত। নরম রোদ উঠতো, গৃহস্থের আঙিনাগুলো জাগতো। হাঁসেরদল ছাড়া পেয়ে ছুটতো জলাশয়ে, ঝাঁপিয়ে পড়তে। জলাশয়ে কখনো ধ্যানমগ্ন বক।আকাশে কবুতরের ঝাঁক। কখনো শিবপুরের দিকে, ছোট যমুনার ধার বেয়ে রাস্তা। শ্রাবণের ভরা নদী। দুয়েকটি নৌকা কুলে বাঁধা। কোথাও ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে যেত একঝাঁক সবুজ টিয়ে। চতুর্দিকে যেন আনন্দ। আনন্দ রৌদ্রকিরণে, আনন্দ আকাশের জলভরা মেঘে, বর্ষার ভেজা বাতাস আনন্দের সৌরভ মাখিয়ে দিত আমার অঙ্গে। ফেরার পথে আব্বা ঠাকুরের দোকান থেকে সন্দেশ কিনে দিতেন। কলাপাতায় মোড়ানো, মহার্ঘ বস্তুর মতো দুহাতে কতো যত্নে, কতো কায়দা করে নিয়ে সাইকেলের রডে বসতাম।

তখন আমার কিশোর বেলা। এক বিকেলে মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি আমি আর আব্বা। হঠাৎ একটা প্রাইভেট গাড়ি উল্টোদিক থেকে হুড়মুড়িয়ে এসে প্রায় আমাদের চাপা দেয় আর কি!  কিছু বোঝার আগেই দেখি আমি ছিটকে যেয়ে আব্বার পেছনে লুকিয়েছি।গাড়িটা শেষ মূহুর্তে জোড়ালো ব্রেক কষে সামলে নেয়। পরমূহুর্তে আমি লজ্জাবোধ করি, অমনভাবে নিজেকে বাঁচাতে পিতার আড়ালে লুকোবার জন্য। আজ বুঝি লজ্জার কিছু ছিলোনা। প্রকৃতিই পিতাদের সন্তানের ঢাল হিসেবে রাখে। পরবর্তী জীবনে, এমনকি প্রৌঢ় বয়েসেও জীবনের নিদাঘ খরতাপ থেকে রক্ষা পাবার জন্য কতবার যে পিতার ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছি! এখন আর সে ছায়া নেই, সামনে আড়াল করে থাকা ঢালের মতো পিতা নেই। জীবনের কন্টকময় সময়গুলোয় অভাববোধ করি পিতার ছায়ার।অস্তাচলের দিকের যাত্রায় সূর্যের দগ্ধানো খররৌদ্র পশ্চাতে দীর্ঘ করে নিজেরই ছায়া, কিন্তু সে ছায়াতো নিজের জন্য নয়! অবুঝ শিশুর মতো খুঁজি সামনে পিতার ছায়া!

শেষের দিক। আব্বা নওগাঁ হাসপাতালে। আচ্ছন্ন হয়ে শুয়ে আছেন হাসপাতালের বেডে। একটা টুল নিয়ে পাশে বসে আছি। চোখ খুললেন। ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করলাম," আব্বা কোনো কষ্ট হচ্ছে?" পরিষ্কার উচ্চারণে বললেন," আমার ছেলে আমার পাশে থাকলে আমার কোন কষ্ট হয় না।" যে কয়দিন নওগাঁ হাসপাতালে ছিলেন, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে থাকতাম উনার পাশে। অদ্ভুত ব্যপার, খিদে- তেষ্টাও পেতো না। ঢাকা এসে কর্পোরেট হাসপাতালের চক্করে পড়লাম। যেখানে ICU-র মানবিকতার স্পর্শহীন যান্ত্রিক পরিবেশে উনার শেষের দিনগুলি কাটে। মৃত্যুর দুদিন আগেও বলেছিলেন, "এখানকার স্টাফেরা বড় খারাপ ব্যবহার করে রে।" এখনো বড় বিষাদ অনুভব করি আত্মজনদের সান্নিধ্য ও ভালোবাসার স্পর্শের মাঝে উনাকে বিদায় দিতে পারি নি। পারিনি অনন্তের পথের যাত্রায় চোখের জলকে শেষ সময়ের পাথেয় হিসেবে দিতে। 

মাঝে মাঝে উনার সমাধির পাশে যেয়ে বসে থাকি।পরম মমতায় স্পর্শ করি সমাধির মৃত্তিকা। মনেমনে বলি,"এখনো তোমার পাশে তোমার ছেলে বসে থাকলে তোমার কষ্ট কম হবে বাবা?" উত্তর পাইনা। আমার আর বাবার মাঝে এখন নিরেট মৃত্তিকার দেয়ালের বাধা। যখন সে বাধা থাকবেনা তখন যদি  দেখা হয় জীবন নদীর ওপারে, যেকথা মুখফুটে বলা হয়নি কখনো, বলবো "তোমাকে ভালবাসি বাবা, বড় ভালোবাসি! কখনো আর তোমাকে ছেড়ে যাবো না কোথাও! দয়াময় যদি বেহেস্ত নসীব করেন, তোমাকে ছাড়া এমনকি সে বেহেস্তেও যাবোনা!" দেখা হবে কি জনক আবার কখনো জীবনের সীমানা পেরিয়ে! 

 

 

একবার যদি ফিরে আসতে আব্বা

এইচ বি রিতা 

 

 

২০০৫ সাল। শেষবার আব্বাকে দেখতে দেশে যাই ১৯ দিনের জন্য। দুটো কিডনি নষ্ট হয়ে তিনি তখন ডায়ালেসিসে। পানি পান করা নিষেদ ছিল। কথা বলতে পারতেন না। রাতভর দুই পা দুইদিকে মেলে আব্বাকে মাঝখানে বসিয়ে রাখলাম বুকের উপর ঠেস দিয়ে। পিঠ, মাথা, ঘাড়, পা নাড়িয়ে জানাতেন, চুলকাতে হবে। চার চারবার এমপি পদে মনোনিত শহরের গরীবের নেতা, সিংহপুরুষ যাকে আজকের দিনেও শহরের মানুষ বুকের ভেতর লালন করেন তার রাজনৈতিক নীতি, কার্যক্রম, নৈতিকতা ও মানুষের প্রতি স্বার্থহীন ভালোবাসায়; সে মানুষটা বিদায়কালে কেমন নিশ্চুপ হয়ে গেল। আমার চোখে শোকের সেই শেষ দেখা থেকে আজও প্রতি মুহূর্তে চলমান। 

মাত্র ৬০ বছর বয়সে কেন চলে যেতে হলো আব্বা? তোমার কাছে শিখেছি, নৈতিকতা, মানবিকতা। শিখেছি কেবল নিজের জন্য নয় অন্যের জন্যও বাঁচা যায়, শিখেছি ভাগাভাগি করে কোনো কিছু উপভোগ করায় কত আনন্দ! যদি একবার ফিরে আসতে, অনেক কিছু শেখার বাকি ছিল! 

আব্বাকে দেখেছি, প্রচণ্ড শীতে সংসদ অধিবেশন ছেড়ে কাঁথা গায়ে দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতেন বটতলে। সঙ্গী হতো তার রেলস্টেশনের দিনমজুর, রিকশাওয়ালা। বেহালা হাতে তাদের নিয়ে নিজ লেখা গানে সুর তুলতেন। তাদের কথা শুনতেন। নিজে রান্না করে খাওয়াতেন। এই দারিদ্র শ্রেণীর বন্ধুরাই তাকে বার বার নিজ ঘামে উপার্জিত অর্থ খরচে শহরের এমপি হিসাবে নির্বাচন করেন। আব্বা ছিলেন ভয়ানক রকমের মানুষপ্রেমী-পশুপ্রেমী। তাঁর একটা  মিনি চিরিয়াখালা ছিল। কুকুরদের ফিডারে করে ডানো দুধ খাওয়াতে খাওয়াতে আমাদের বলতেন, 'মানুষ-পশুদের এককাতারে ভালোবাসবি।' আর তাই হয়তো আজ মেইনস্ট্রিটের গৃহহীনরা হয়ে উঠে আমার বন্ধু, কখনো আমার দুপুরের ভোজনসঙ্গী। 

বিশাল এক লাইব্রেরি ঘর ছিল আব্বার। বই পড়ুয়া আব্বার সেক্সপিয়ার থেকে আধ্যাত্মিক ও দর্শনীয় লেখক উইলিয়াম ব্লেক, মহাভারত থেকে শুরু করে পরশুরাম, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, জীবনানন্দ দাস, আরো অনেকের বই ভর্তি ছিল তাঁর সেল্ফে। আব্বা ছিলেন, একজন গীতিকার, সুরকার, লেখক, নাট্যশিল্পী এবং বিশ শতকের একজন কবি। জীবদ্দশায় পাঁচ হাজারের বেশি কবিতা, গল্প, গীতি নাট্য, প্রবন্ধ, নাটক ও গান রচনা করে গেছেন। তথ্য কাব্য এবং মরমি সঙ্গীত রচনা ছিল আব্বার প্রিয়। অধ্যাত্ব সাধনা ও সাহিত্যচর্চা ছিল তাঁর অন্তরের বস্তু। তাঁর থেকেই আজকের আমি, লেখক কবি হিসাবে যতটাই অর্জন, তার সবটাই আব্বার দিয়ে যাওয়া অবশিষ্টাংশ। 

আমি গর্বিত যে আমার আব্বা ছিলেন ১৯৭১-এর একজন পরোক্ষ মুক্তিযোদ্ধা। রাতের আঁধারে খাদ্য, অস্ত্র সরবরাহ, শারীরিক সেবা দিয়ে তিনি সাহায্য করেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের। 

আমার বিড়াল অগি, তার মাঝে আমি খুঁজে পাই আব্বার বহু স্বভাব, চাহনি, আবদার, জেদ, ব্যক্তিত্ব। ঠিক আব্বা যেমন করে ইশারায় গা টিপে দিতে, চুলকিয়ে দিতে বলতেন, অগি ঠিক অনুরূপ। তাই, অগিকে আমি আব্বা বলে ডাকি। 

আব্বা! সেই যে ছোটবেলা মাঝরাতে ঘুম ভাঙ্গিয়ে তুমি রমিজউদ্দিনের পরোটা আর খাশির রেজালা মুখে তুলে খাওয়াতে আর বলতে, 'খেয়ে নে! কে জানে কেউ কখনো এমন করে খাওয়াবে কিনা'-আসলেই এমন করে আর কেউ খাওয়ায়নি। কেন চলে গেলে! তোমার জেদ আর আদর্শ ধরে রেখে আজও লড়ছি। কিন্তু এ লড়াই বড্ড কঠিন। আমার একটু ছায়া দরকার। শীতল হাওয়ার পরশ দরকার। তুমিই সেই ছায়া! সেই শীতল পরশ! একবার যদি ফিরে আসতে!

 

 

বাবা রোদনভরা বসন্ত 

রিজোয়ান মাহমুদ 

 

 

"এক ব্যাগ নিঃশ্বাস ফেলেছি,অশান্ত  বাবার কবরে। যাইনা অনেকদিন সে নির্জনতায়। সেখানে এখন ডর লাগে। আমি গেলে বুকের পাড়ার গুচ্ছঘাম নড়ে ওঠে। দু'একটি নাম না জানা পাখির আয়াত কানের পাশ ছুঁয়ে উড়ে যায়। বাবা বলে ;  এরাই তো আমার কবর রক্ষক। যেকোনো চোখের কঙ্কাল শেষ 'র' বর্ণের  ধারাপাত বুকে এসে টুপ করে লাগলে শীত - শীত  লাগে। এই বনবাসে আছি তো অনেকদিন...তুই তো জানিস আমার গৃহ কাতরতা খুব বেশি, কোথাও গেলে দুই - তিন দিন বাদে ফিরে আসি তোর মা'র কাছে। ফিরে আসার মধ্যে কোনও লজ্জা নেই, আছে ঘ্রাণযুক্ত পিপাসা। অথচ, এখানে যারা আছে, সবাই নিজের মতো, সবাই স্বার্থপর এক -একজনকে নিয়ে সংসার, একাকিত্ব, নীরবতা। আর কতদিন থাকতে হবে, জানি না! এখানে সকাল আসে না। দুপুর - বিকেলের রঙ চেনা যায় না। এখানে কেউ -কাউকে খেতে ডাকেনা, এমনই আজিব দুনিয়া। সবারই নাক মুখ চোখ ঊর্ধ্বমুখী। কারো কোনো জিজ্ঞাসাবাদ নেই। তুই এখন আসিস না। তোর ছেলে-মেয়েদের প্রথমে একটি মানতাসা গ্রাম কিনে দিস। অফুরন্ত চিনি আর ময়দা নিয়ে যেদিন সুবর্ণ কবরগাঁ হবে, সেদিন আসিস - ৭১ বছর ৩ মাস ৩ দিন পর! সব কবর একেকটা বাজপাখি জীবিত জীবন খোঁজে চেয়ে থাকে কাদামাটি বুকে কে কখন চোখ বুজে!"

বাবার প্রস্থানের পরে কোনো এক শুক্রবার কবর জেয়ারত করতে গিয়ে এ রকম তীক্ষ্ণ অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির সম্মুখীন হই। কবর আমার কাছে প্রচণ্ড ভীতির নাম। একটা মানুষ মাত্র সাড়ে তিন হাত মাটি নিয়ে শুয়ে থাকবে অনন্তকাল।  মা'কে বলতাম, বাবা কে ডাক না কেন। দেখতাম, আমাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে মা দু'ফোটা জল গড়িয়ে দিতেন। কারণে অকারণে বাবার প্রসঙ্গ এলে মা'র কৈছালি দেখেছি। অথচ বাবা শারীরিকভাবে অদৃশ্য হবার ৩০ বছর পর উপরোক্ত গদ্য কবিতাটি লিখেছি। এতটা বছর আমি তাহলে কী করেছি!  উত্তর একটা, বাবা ছিল আমার কাছে জীবন্ত ছায়ার মতো। মন বলত কোথাও কাজে আছে। এটাও হিপ্নোটিজমের মতো অনেকটা। অস্তিত্ব বিপন্ন হতে দেখলে বাবাকে স্মরণ করেছি, বিপদ থেকে উদ্ধারও পেয়েছি তড়িৎ। বাবা একটা সবুজ জমিন আমার চোখে। একটা পারিবারিক ও সামাজিক আশ্রয়। আমার মধ্যবিত্ত বাবাকে ঘিরে আমার স্বপ্ন বড় হতে চেয়েছিল। শেষ পর্যন্ত আমি বড় হলেও স্বপ্ন বড় হতে পারেনি। বাবা আমাকে অমীমাংসিত রেখে চলে গেল। 

আমার বাবা ছিল সরকার অধীনস্থ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকুরিজীবী। চট্টগ্রাম বন্দরের হেড বিল সুপারিন্টেনডেন্ট। অন্য ও বন্য নাম হেড বিল ক্লার্ক। অনেকের প্রিয় বদরাগী মানুষ আমার বাবা সাহিত্যমোদী মানুষ ছিলেন। সরল সোজা; জমির দলিলে বাবার স্বাক্ষর নিয়ে জ্যাঠাত ভাইয়েরা ভুয়া দলিল করে বাবা-কে বঞ্চিত করছে কৌশলে। আমার দাদী মা'র সম্পত্তি হাতিয়ে নিচ্ছে একজন আইনি ওয়ারিশানের স্বাক্ষর নিয়ে। আমাদের হিস্যা বেহাত হয়েছে বাবার স্বাক্ষরের  কারণে। সারল্য ও সংবেদনশীলতা তাঁর বড় গুণ সেটা আরও লক্ষ্য করেছি মীর মোশারফ হোসেনের বিষাদ সিন্ধু ও  মোজাম্মেল হক এর জোহরা উপন্যাস পড়তে দেখে। যেই শুনেছে আমি লিখি অমনি তাঁর শিশুর মতো অপার আনন্দ। একদিন আমাকে ডেকে বলল, বাংলায় লিখিস কেন? ইংরেজিতে লিখবি। তাহলেই আমি একসাথে দুটি বিষয় পাব, ইংরেজিতে গল্প এবং কবিতা, আর তুই ইংরেজিতে কতটা দক্ষ ও  সঙ্গতিপূর্ণ বোঝা যাবে। ইংরেজি ঔপনিবেশিক বিজাতীয় ভাষা। এসব ঔপনিবেশিকতা প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বৈ ভালো কিছু নয়। বাংলা ভাষা থাকতে কেন ইংরেজি অভ্যাস করবো?  

সেসবের কিছুই না বলে সেদিন হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেছি সংকোচে ও লজ্জায়। বাবা বঙ্কিমচন্দ্র পড়তেন বেশি। বুঝতেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। আমি মৃত মানুষ দেখেছি। চোখের সম্মুখে কারো মৃত্যু দেখিনি। চাক্ষুষ করেছি বাবার মৃত্যু। মা চামচে পানি পান করাচ্ছে। কলেমা তৈয়ব পড়ছেন। আমি পাশের ঘর থেকে উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখলাম একটা মানুষ হঠাৎ স্থির হয়ে গেল। নড়চড় নেই। মা রোদনভরা কণ্ঠে বললেন, নেই মনে হয়। সব্বাই আরও একবার কলেমা পড়। 

আমার ভালো মন্দ অনেক স্মৃতির মধ্যে বাবার গভীর বাস। বাবা ছিল আমার নির্ভরতা ও বিশ্বাস। প্রকৃত ভালোবাসার অন্য নাম বাবা। বাবা মানে কান ধরে ওঠবস করা আমার ছেলেবেলা। বাবা রোদনভরা বসন্ত।    

 

 

আমার বাবা-বাতাসের সঙ্গে যিনি মিশে আছেন

দীপংকর গৌতম

 

 

আমার বাবা আমার দেখা একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ। সব সময় এত ব্যস্ত থাকতেন যে, বাইরে গেলে বাড়ির পোশাক, জুতা বদলাতে ভুলে যেতেন। আমাদের এলাকার স্কুল কলেজ তৈরি, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেকে ন্যাপ -কমিউনিস্ট পার্টিও কার্যক্রম নিয়ে বাবার একটা বিশেষ ভূমিকা ছিলো। পেশাগত জীবনে চিকিৎসক ছিলেন। স্কুল, কলেজের ম্যানেজিং কমিটির মিটিং থেকে নাটকের রিহার্সাল সবখাইেন বাবা সার্চের বিস্কুট রঙা পাঞ্জাবি, ধুতি ও চামড়ার স্যান্ডেল বা রূপসা হাওয়াই চপ্পল পায়ে দিয়ে চলতেন। পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে তাঁর মাথা ব্যথা ছিলো না।

সন্ধ্যায় বাবার আসার শব্দ শুনলে আমরা দ্রুত পড়তে বসতাম। আমাদের নির্ভরতা মায়ের উপরেই ছিলো। তবুও বাবার সঙ্গে কথা হতো। আমাদের এলাকার স্কুল-কলেজ গঠনে বাবার যেমন একটা ভুমিকা ছিলো, মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই আমাদের এলাকার পুরো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মূলকেন্দ্র ছিলো আমাদের 'বৈঠক ঘর'। এখানে কীর্তন পালা থেকে যাত্রা নাটক এমনকি ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়নের কর্মকাণ্ডের একটি কেন্দ্র ছিলো। সংগঠনের নেতা -কর্মীরা সব সময় আসতেন আমাদের বাড়িতে। আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধে একটি বিশেষ ভূমিকায় ছিলেন। আমাদের বাড়িতে দুটো ট্রেঞ্চ ছিলো। উপজেলা পরিষদ আমাদের বাড়ির কাছে হওয়ার কারণে আক্রমন আমাদের বাড়ি থেকেই ওপেন করা হতো। সেকথা কোথাও লেখা নেই। ১৯৭৩ সালে  ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি- ছাত্র ইউনিয়নের চার নেতা-কর্মী লেবু-কমলেশ-বিষ্ণু-মানিককে হত্যার পরে বাবা সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। তবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চলতো। বাবাকে আমাদের উপজেলার অধিকাংশ মানুষ মনে রেখেছেন আজও। তিনি নেই কিন্তু তার নামে তাকে জানেন অনেকেই। আমাদের এলাকার ঝামেলা, গোলমাল হলে বাবা-দুপক্ষকে কিছু বললে সবাই মেনে নিতেন।এখনও বাবার নামে সবার অসীম শ্রদ্ধা আমাকে আপ্লত করে। 

বাবার জীবনটা অনেক কষ্টের। মাত্র দশ বছর বয়সে তার বাবা মারা যাওয়ার পর তার জীবনসংগ্রাম শুরু। আমার ঠাকুরমা বাবা ও তার একমাত্র বোন ইন্দুমতিকে নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটাতেন। ধীরে ধীরে তার বড়ো হয়ে ওঠার গল্প আমরা শুনেছি। কিন্তু অল্প বয়সেই সততা, নিষ্ঠা ও সত্যনিষ্ঠ হওয়ার  কারণে মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন তিনি। এলাকার দরিদ্র মানুষের অনুরোধে বাবা একবার ইউপি সদস্য ভোটে নির্বাচন করে বিপুলভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু অল্পদিন পরেই ইস্তফা দেন। বাবা বুঝেছিলেন এই কাজ তার নয়। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পরে বাবা যেন অল্প দিনে বুড়িয়ে গেলেন। একদম বদলে গেলেন। সেই দ্রুত গতি তার কমতে শুরু করেছিলো। বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিলো অনেক নিবিড়। পড়াশুনার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বাবার সঙ্গে কথা হতো- সেটা স্টালিন থেকে ক্রুশ্চেভ, সিপিএম- সিপিআই, কংগ্রেস সংকট। সুধীর লাল চক্রবর্তী, মানবেন্দ্র থেকে তারাপদ চক্রবর্তী। জগদীশগুপ্ত, কালকূট থেকে পরশুরাম হয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পর্যন্ত। গভীর রাত পর্যন্ত পড়তেন তিনি। সকালে উঠে বাবা যে বই যতটুকু পড়েছেন ওখান থেকে আমিও পড়তাম।আমার বই পড়াটা বাবার কারণেই হয়েছে। আমি বাজারে গিয়ে বাবার সঙ্গে বসে চা খেতাম, আমি গোপালগঞ্জ পড়ার সময়ে আমার বন্ধুদের ডেকে বাবা প্রাত্যহিক খবর নিতেন। বাবা একদিন আমাকে খুব সিরিয়াসলি জিজ্ঞেস করলেন, আমি কি করতে চাই। আমার ইচ্ছা তিনি আমার বড়দা-মেজদাকে জানাবেন। আমি সাংবাদিকতা করার কথা বললে তিনি বড় বড় সাংবাদিকদেও উদাহরণ টানলেন। তাদের জ্ঞানের কথা বলার সঙ্গে অর্থ সংকটের কথাও বললেন। আমি সব শুনে আমার সিদ্ধান্তেই থাকলাম। 

শীতে আমার বাবা খুব কাতর ছিলেন- সেই শীতেই বাবা আমাদের সব ভাই-বোনদেও ডাকলেন।  তিনি অসুস্থ জানালেন। কিন্তু তার কোন অসুখ আছে এমন নয়। রাতে আমি আমার বড়দা এক খাটে ঘুমালাম-বাবা আমাদের ঘুমাতে যেতে বলছিলেন। আমার বোনেরা ঘুমাতে যাননি। তারা বাবার কাছেই ছিলেন।এক সময় বড়দা আমাকে ডাকলেন- সেই থেকে আমার আর কেউ রইলো না।

এখনও শীত আসে। হু হু করে বাতাস বয়। তিনি যেন বাতাসের সঙ্গে মিশে গেছেন। তাই বাতাসের অবিরাম গতিতে বাবার মুখটাই ভেসে ওঠে। মানুষের জন্য কতটা নিবেদিত থাকা যায়। আমার বাবা তার সাক্ষর।

 

 

বাবা ছাড়া জীবন যেন তুচ্ছ 

মাহমুদুল চৌধুরী

 

 

আব্বা ছিলেন আমার জীবনে মহহীরুহের মতো। ঝড়ঝাপটায় আশা ভরসার স্থল। আব্বাকে নিয়ে ছোটবেলায় আমার মূহুর্তগুলো স্বপ্নের মতো। ৬৪/৬৫ সালে সিলেট-ঢাকা মেইলে গ্রীষ্মের কাঠফাঁটা রোদে আমাদের নিয়ে ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনে পৌঁছান আব্বা। হৈ হুল্লোড়ের ভীড়ে যে কোনো মুহূর্তে আব্বার হাত ফসকে হারিয়ে যেতে পারতাম। রঙ-বেরঙে সাজানো ঘোড়ার গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে ছিল রাস্তায় যেন পঙ্খিরাজ। স্টেশনের পাশে কাঁঠালের বড় স্তূপ নিয়ে বসে আছে আড়তদার। আব্বা বিরাট সাইজের কাঁঠাল কিনলেন ভাগিনার বাসায় নেবেন। আমার এক ফুফাতো ভাই ৪৭ সালে শিলং থেকে সোজা এজিবি অফিসে বদলি হয়ে আসেন। পলাশী ব্যারেকে থাকেন। ভাইবোন ও আম্মাকে নিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে চেপে বসলেন আব্বা সেই বাড়ির উদ্দেশ্যে। সেকি আনন্দ। 

আমাদের মফস্বল শহরে মুক্তি পেয়েছে কোনো সিনেমা। রিকশায় মাইক লাগিয়ে হিন্দি গান বাজিয়ে ঘোষণা দিচ্ছে মহাসমারোহে মুক্তি পেয়েছে রূপালী পর্দায়। আমি কাঁদতে কাঁদতে অস্থির। বায়না ধরেছি বাইস্কোপ দেখবো। আব্বা শত প্রবোদ দিলেন। আমি নাছোড়বান্দা। সন্ধ্যায় আব্বা কাঁধে তুলে সুরমা নদীর পাড় ঘেঁষে একটু হেঁটে আবার বাসায় ফিরে আসলেন। ততক্ষণে নদীর পাড়ে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি। আব্বা বললেন, ঘুমিয়ে থাকায় অর্ধেক সিনেমা দেখার পর চলে এসেছেন।

আম গাছ থেকে পড়ে আমার হাত ফ্রেকচার। কোনো বকা না দিয়ে হসপিটালে নিয়ে যান। স্নেহের পরশে আগলে রাখতেন আমাদের। আব্বা দূরের শহরে বদলি হয়ে যাওয়ায় একবার গ্রামের বাড়িতে সবাইকে রেখে আসেন।  কয়েকমাসের জন্য প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হলো আমাকে। আমার সে কি কান্নাকাটি। ইংল্যান্ডের হারকিউলিস বাইসাইকেল কিনে আনলেন। আমার চেয়েও বড়। গ্রামের মেঠো পথে অনেক সময় নিয়ে সাইকেল চালানো শেখালেন। গ্রামের মেলায় ষাঁড়ের লড়াই দেখতে গিয়েছি আব্বার সাথে। 

কিছুদিন পরেই ছোট নানা আম্মাকে নানাবাড়িতে নিয়ে আসেন। আব্বা খাগড়াছড়ি, পার্বত্য চট্টগ্রাম, ফরিদপুর, দিনাজপুর বদলি হয়ে গেলে মাসখানেক পর ফিরে আসতেন। আব্বাকে পেয়ে রাজ্যের আনন্দে মেতে উঠতাম। তিনি ছিলেন আমাদের জীবনের স্পন্দন।

আমাদের পরিবারে ভয়াবহ বজ্রপাত নেমে আসে একদিন। হাছন নগরের বাসায় চমৎকার দিনগুলো হেসেখেলে পার হচ্ছিল। পাশে প্রতিবেশী ম্যাজিস্ট্রেটের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আমাদের সখ্যতা গড়ে উঠে। আম্মাও নতুন বান্ধবী পেয়ে যান। আমাদের মামা বাসায় আসলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠতাম। মামা পকেটে হাত দিয়ে যত টাকা পেতেন সব আমাদের ভাইবোনদের দিয়ে দিতেন। আম্মাও যখনতখন রিকশার চতুর্দিকে কাপড় পেঁচিয়ে আমাদের নিয়ে বাপের বাড়ি রওয়ানা।  

আম্মা ডেলিভারি জনিত সমস্যায় আকস্মিক পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন। আব্বা ট্যুরে। টেলিগ্রাম করে আনা হলো। 

আম্মা ছাড়া আব্বার জীবন ছন্নছাড়া হয়ে উঠে। ঢাকা থেকে বড় খালা তিনমাস পরে এসে আব্বার কাছ থেকে আমাদের নিয়ে যান ঢাকায়। খালা ছিলেন হাছন রাজার পুত্রবধূ। অসাধারণ ব্যক্তিত্বে শহরে সবাই তাঁকে ভীষণ সম্মান ও সমীহ করতেন। খালাতো ভাই-বোনেরা আমাদের আপন করে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা। আইসক্রিম কিনে দেন। সিনেমায় নিয়ে যান। নির্জন মূহুর্তে আম্মা ও আব্বার স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে আসতো। ভুলা মনে কখনো মনে হতো আব্বা হয়তো আম্মাকে নিয়ে আসবেন। নুতন আম্মা আসলে বড় খালার রাগ প্রশমিত হয়। তখনি আমরা তিন ভাই আব্বার কাছে যাওয়ার অনুমতি পাই। দুই ছোট বোন থেকে যায় ঢাকায়।

আব্বা আর্লি রিটায়ার্ড করেন ৬৯ সালে। দেশে স্বাধিকার আন্দোলনে অগ্নিগর্ভ অবস্থা। ৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় শহর ছেড়ে দূরে গ্রামে নানাদের আত্মীয়ের বাড়িতে আব্বা আমাদের নিয়ে যান। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা শহরে ফিরে আসি। দুর্বিসহ অতীতকে পিছনে ফেলে ভবিষ্যতের স্বপ্নে এগোতে লাগি। সেসময় রাজধানীর ভয়াবহ পরিস্থিতি স্বপ্নগুলোকে তালগোল পাকিয়ে দেয়। আমার স্ত্রী ও আব্বাকে খিলগাঁওয়ের বাসায় রেখে ৮৯-তে আমেরিকায় চলে আসি। কল্পনাও করিনি আব্বার সঙ্গে আর কোনোদিন দেখা হবে না। ভয়ানক মৃত্যু সংবাদটি হাজার মাইল দূর থেকে মূহুর্তে আমাকে নিস্তেজ ও বাকরুদ্ধ করে দেয়। আব্বাকে হারিয়ে জীবন তুচ্ছ হয়ে যায়।

 

 

অমলিন ফ্রেমে আব্বা

সোহানা নাজনীন

 

 

গতবছর ঢাকায় বেড়ানোর কয়টা দিন আব্বার শোবার ঘরেই ছিলাম। মশারীর ভিতর শুয়েই দেখতাম আব্বার হাত-ছড়িটা দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। আলমারিতে নিখুঁতভাবে ভাঁজ করে রাখা পাঞ্জাবী-সোয়েটার। ওয়ারড্রবের উপরে ইনহ্যালার, চিরুনি, চিকণ সিজার, একটা ডায়েরিতে যাবতীয় ফোন নাম্বার, ঠিকানা। চার বছর যাবত আব্বা নেই, অথচ ব্যবহৃত সবকিছু সাজানো চারিদিক। কাপড়গুলো আবডালে শুঁকে দেখছি, যদি আব্বাকে একটু খুঁজে পাওয়া যায়। উনি পছন্দ করতেন উজ্জ্বল রংচঙা কাপড়, বয়সকালেও সাজগোজে কমতি ছিল না। আমরা আড়ালে লুকিয়ে আব্বাকে ডাকতাম 'দেবানন্দ'। 

আব্বা। সাদা দাড়িতে আর ইস্ত্রি করা নিখুঁত ভাজের পাঞ্জাবিতে তোমাকে আমার মনে পড়ে না। স্টিলের লাঠিতে ভর দিয়ে নুইয়ে পড়া আশি ছুঁই ছুঁই এক বৃদ্ধ হিসাবে আমি তোমাকে ভাবতেই পারি না। মনে পড়ে সেই তোমাকে, যখন আমরা মোহাম্মাদপুরের আট নাম্বার বিল্ডিঙের ফ্ল্যাটে থাকতাম। আশির দশকে তোমার শ্যামবর্ণ চেহারা, লম্বাটে মুখটায় কালো ফ্রেমের মোটা চশমা, লুঙ্গির উপরে সাদা স্যান্ডো গেঞ্জিতে ঘরোয়া পরিবেশে সেই প্রাণখোলা হাসি, ওই চিত্রই আমার মনে "আব্বা" হিসাবে গেঁথে আছে। আমাদের মধ্যবিত্তের সংসারে শুক্রবারে তোমার বাজার করাটাই একটা পরম আনন্দের ব্যাপার ছিল। মোহাম্মাদপুর বাজার থেকে খুঁটে খুঁটে সেরা সব্জিটা কেনার মধ্যেই তুমি পরিতৃপ্ত হতে। সুখী হতে তখন খুব বেশি আয়োজন দরকার পড়তো না। ছকে বাঁধা নিয়মের শাসনে একটা ছোট্ট সুখী পরিবার ছিল আমাদের। ওই একহারা চেহারার আব্বা'কেই আমি পঁচিশে ডিসেম্বরে ঢাকা এয়ারপোর্টে ফেলে রেখে এসেছিলাম। তুমি চোখের পানি লুকাতে লুকাতে আমাকে বলছিলে, "যাও মা, তোমার স্বামীর কাছে নিজের সংসারে যাও।" আমি সেই থেকে পঁচিশ বছর তোমার থেকে দুরেই রয়ে গেছি। ২০১৭ সালে কেনেডি এয়ারপোর্টে তোমাকে নামিয়ে দিয়েছিলাম, ওটাই ছিল তোমার সাথে আমার শেষ দেখা। তোমার ঠোঁট কাঁপছিলো, গলার নিচে কুঁচকে ঝুলে যাওয়া চামড়ায় আমি হাত বোলাচ্ছিলাম। ওটাই শেষ। 

প্রবাসের প্রথম দিকের কথা,  মিলেনিয়ামের বছরে, পেন্সিলভেনিয়ার ছোট্ট এক শহরে বিপুল শীতের রাতে দ্বিপ্রহরের পর ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। পানির তেষ্টায় কিচেন কেবিনেট খুলতেই একটা খবরের কাগজে মোড়ানো গরম মশলার পুঁটলি পেয়েছিলাম। তখন বাজারে সুলভ মুল্যের প্যাকেট আসেনি। মোহাম্মাদপুর বাজার থেকে কিনে এনে আব্বা বলেছিলেন, "বিদেশে বিরিয়ানী রান্না করে খেও।" বাড়ি ভাড়া হইবে জাতীয় বিজ্ঞাপন লেখা কাগজের প্যাকেটটা নাকের কাছে ধরে চোখ বন্ধ অবস্থায় জোরে শ্বাস নিয়েছিলাম। ঐ গন্ধটাই ছিল আমার আব্বা, ঐ ছেড়া কাগজটাই যেন আমার বাংলাদেশের মানচিত্র, ঐ ভাষাই আমার বাংলা ভাষা। আবার কখনোবা হেমন্তের প্রথম পাতা ঝরা দেখে মনে হয়েছিল আমিও ঐ ঝরা পাতার মতো। বাবা-মা নামক বৃক্ষ থেকে ছিঁড়ে উড়তে উড়তে কোন দূর প্রবাসে এসে পড়েছি। এখন আমি নিজেই এক বৃক্ষ, শেকড় গভীরে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি শত পল্লবে সজ্জিত হয়ে। 

দুই হাজার কুঁড়ি সালে আব্বা চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। তার ক'দিন পর করোনাকালীন লকডাউন শুরু হল নিউইয়র্কে। আমরা ঘরবন্দী, পুরো পৃথিবী স্তব্ধ। আমি বাজ পড়া গাছের মতো উত্তাপহীন ভাবে হেঁটে বেড়াই, সাতদিনের বাজার একদিনে সারি। করোনার জীবাণুকে ভয় পাইনি, তবে আব্বাকে হারানোর কষ্টে দুমড়ানো ছিলাম। এক সন্ধ্যায় গ্রোসারি সেরে এভিন্যুউ পার হয়ে গলিতে ঢুকেছি। সবেমাত্র সন্ধ্যা তখন, রাস্তায় বাতি জ্বললেও আকাশে তখন ক্ষয়ে যাওয়া আলো। নীরব এক ভৌতিক শহর, ভোজবাজীর মতো লোকজন সব উধাও। কঙ্কাল সদৃশ কিছু ল্যাম্পপোষ্ট দাঁড়িয়ে। হটাৎ কি মনে হল, আমি বাচ্চাদের মতো আব্বা বলে ডেকে উঠলাম। যেন কবেকার পিপাসিত মন ঐ ভর সন্ধ্যায় জন-মানবহীন ফুটপাথে আব্বাকে ডাকবে বলে অপেক্ষায় ছিল। একচোখ পানিতে সাঁতরে নিয়ে দুহাতে আনাজপাতির ব্যাগ ঝুলিয়ে আমি ডেকেছিলাম, "আব্বা, আব্বা তুমি কেমন আছ?" 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন