https://www.prothomalony.com/

18014

literature

সাহিত্য

হুমায়ুন কবিরের আমাদের গল্প: সাহিত্যিক পর্যালোচনা

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ ০৪:৫০

বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্রমবিবর্তন, যৌথ মূল্যবোধ এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে উপজীব্য করে রচিত অনন্য স্মৃতিকথামূলক সংকলন ‘আমাদের গল্প’। কোভিড-১৯ এর বৈশ্বিক লকডাউনে জন্ম নেওয়া এই গ্রন্থটি একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ইতিহাসের সাথে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ তথা স্বাধীন বাংলাদেশের সমাজ-রাজনীতি ও মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তনের এক প্রামাণ্যচিত্র। গ্রন্থটির মূল চেতনা গ্রথিত পারিবারিক বন্ধন ও নস্টালজিয়ায়। পিরোজপুরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সাত ভাইবোন করোনাকালের অন্তরীণ সময়ে স্মৃতিচারণ লেখার যে উদ্যোগ নেন, তারই সুবিন্যস্ত রূপ এই সংকলন। সমকালীন বাংলা সাহিত্যে এটি ডায়াসপোরা সাহিত্য ও যৌথ স্মৃতিকথার চমৎকার উদাহরণ। অলঙ্কৃত শব্দচয়ন, রূপকের ব্যবহার এবং সাবলীল গদ্যশৈলীর কারণে গ্রন্থটি সাধারণ পাঠক ছাড়াও সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছে।

 

গ্রন্থটির মূল রচয়িতা হুমায়ুন কবির এবং তাঁর পরিবারের অন্য ছয় সদস্য। গ্রন্থটি ২০২৩ সালে প্রথম মুদ্রণাকারে প্রকাশ করে জাগতিক প্রকাশনী; প্রচ্ছদ এঁকেছেন শিল্পী আবু হাসান। পরবর্তীতে ২০২৪/২০২৫ সালে এর ডিজিটাল (ই-বুক) সংস্করণ আত্মপ্রকাশ করে। মুদ্রণ সংস্করণে পরিবারের সাত সদস্যের বিভিন্ন স্মৃতিচারণ স্থান পেলেও ই-বুক সংস্করণে কলেবর সংহত রাখতে হুমায়ুন কবিরের রচিত মূল এগারোটি গল্পকে সন্নিবেশিত করা হয়েছে, যা সমগ্র সংকলনটির প্রধান সাহিত্যিক মেরুদণ্ড।

 

হুমায়ুন কবিরের এগারোটি গল্পের সংক্ষেপ: 

 

১. শৈশব: পিরোজপুরের নতুন বসতবাড়িতে পদার্পণ এবং ষাটের দশকের নিম্ন-মধ্যবিত্ত জীবনের চিরায়ত টানাটানি দিয়ে গল্পের সূচনা। শানবাঁধানো বেঞ্চ, পুকুরের টলটলে কালো জল আর মায়াময় গ্রামীণ নিসর্গ মধ্যবিত্তের নিজস্ব গৃহকোণ অর্জনের পরম আনন্দকে ফুটিয়ে তোলে। শৈশবের দুরন্তপনা, সকালে পান্তাভাত কিংবা চা-মুড়ির সরল আহার এবং মাত্র দশ-এগারো বছর বয়সেই পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার বাস্তব চিত্র এখানে মূর্ত। বড় বোনের ওপর তথাকথিত ‘জিন’ ভর করার ট্র্যাজিক-কমিক অধ্যায়টিতে তৎকালীন গ্রামীণ কুসংস্কার ও লোকজ বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটেছে। শেষে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও একাত্তরে নিজেদের বাড়ি পুড়ে ছাই হওয়ার নির্মম সত্যে গল্পের সমাপ্তি।

 

২. মামাবাড়ি: নদীমাতৃক বাংলার ধীরগতির চিরায়ত রূপকে ধারণ করেছে এই গল্প। পাঁচ মাইলের পথ পাড়ি দিতে রিকশা, লঞ্চ ও নৌকাযোগে দীর্ঘ সাড়ে তিন ঘণ্টার সেই যাত্রা আজ প্রায় বিলুপ্ত। কচা নদীর উত্তাল তরঙ্গে মায়ের তীব্র জলভীতি এবং হামিদ মাঝির নৌকা দুলিয়ে ভয় দেখানোর স্মৃতিময় কৌতুক পাঠককে আলোড়িত করে। পরবর্তীতে জানা যায়, এই হামিদ মাঝি ছিলেন মায়ের শৈশবের সহপাঠী, যিনি ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ মাঝি। নদীর কূলে বক, ঘাসফড়িং আর মাছের চঞ্চলতা উপভোগ শেষে টোনা বাজার পার হয়ে মামাবাড়িতে পৌঁছানোর পর এক আনন্দঘন অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে গল্পটি প্রকৃতির সাথে মানুষের আত্মিক বন্ধন রচনা করে।

 

৩. ’৭১-এর কিছু দিন: গ্রন্থের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল। মুক্তিযুদ্ধের রক্তঝরা দিনগুলোতে পিরোজপুর ছেড়ে ‘খাঁ বাড়ি’ নামক মামাবাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার শ্বাসরুদ্ধকর আলেখ্য এটি। পাকিস্তানি সেনা ও তাদের দোসর শান্তি বাহিনীর নারকীয় তাণ্ডব, পরিচিতজন—বাচ্চুদা, মনটু ও ফজলু ভাইয়ের আত্মত্যাগ যুদ্ধের নির্মমতাকে উন্মোচিত করে। একাধারে কিশোরদের কাদার ঢালে পিছলে পড়ার আনন্দ, অন্যদিকে নদীতে ভেসে ওঠা কঙ্কালসার লাশ ও বোমাবর্ষণের বিভীষিকা—এই বৈপরীত্যকে লেখক অসাধারণ দক্ষতায় তুলে ধরেছেন। গোপনে মুক্তিযোদ্ধা ভাইয়ের সাথে দেখা করা, পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক বাবার বন্দিদশা এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলা বেতারের গান শুনে বাগেরহাটের ভাঙা ব্রিজে অস্ত্রহাতে মুক্তিযোদ্ধাদের দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার দৃশ্যটি মহান মুক্তিযুদ্ধের এক অমূল্য ঐতিহাসিক দলিল।

 

৪. সাইকেল:  আমেরিকার ডালাসে বসে ঝরে পড়া ম্যাপল পাতা দেখে লেখকের মনে পড়ে যায় কিশোরবেলার অকৃত্রিম বন্ধু ‘সাদ্দু’ এবং মিউনিসিপ্যালিটির মাঠে সাইকেল শেখার সেই অপ্রতিরোধ্য জেদ। সাইকেল চালাতে গিয়ে তারকাঁটায় ক্ষতবিক্ষত হওয়ার ঘটনাটি লেখককে এক গভীর দার্শনিক উপলব্ধিতে পৌঁছে দেয়—জীবনকে যতই ভারসাম্যে রাখার চেষ্টা করা হোক না কেন, পতন অনিবার্য। শৈশবের নিষ্পাপ বিশ্বাস কীভাবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে জাগতিক স্বার্থপরতায় রূপ নেয়, গল্পটি তারই এক প্রতীকী রূপ।

 

৫. প্রতারক চিঠি: চিঠির যুগ এবং কৈশোর-তারুণ্যের মনস্তাত্ত্বিক দোলাচলে এক চিত্তাকর্ষক বিবরণ। প্রাইমারি স্কুলের বন্ধুর চিঠি থেকে শুরু করে বরিশাল বিএম কলেজে পড়ার সময় মায়ের হাতে বন্ধুর লেখা কাল্পনিক প্রেমপত্র ধরা পড়ার রসঘন স্মৃতি এখানে স্থান পেয়েছে। একই সাথে সত্তরের দশকের ‘পেন-পাল’ সংস্কৃতির জোয়ারে ময়মনসিংহের এক কাল্পনিক রূপসী ‘জাকিয়া’র পেছনে দুই বছর মিথ্যে স্বপ্ন বোনা এবং শেষমেশ প্রতারণা উন্মোচনের পর তরুণ মনের তীব্র আত্মগ্লানি চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক গভীরতায় ফুটে উঠেছে।

 

৬. বড় ভাইয়া, নিয়তি এবং আমরা: সবচেয়ে দীর্ঘ ও বেদনাবিধুর ট্র্যাজেডি। বড় ভাই পারভেজ দিলু - শৈশব থেকেই বিস্ময়, গান, নাটক, আবৃত্তি, দাবা-ক্যারমে অপরাজেয়। কিন্তু বাস্তবে চরম ব্যর্থ। উড্ডয়নের স্বপ্নে মুরগির খামার, নারিকেল তেলের ব্যবসা, ‘প্রাণায়াম’ চিকিৎসার ফ্যান্টাসি, পরিবার থেকে বারবার টাকা ধার, সাভার বা সাউথ পল্টনে অবাস্তব ক্লিনিকে কবিরাজের সাথে পার্টনারশিপ, শেষে চট্টগ্রামের হোটেলে কঙ্কালসার অবস্থায় আটকে থাকা থেকে উদ্ধার - এক অপার সম্ভাবনাময় জীবনের ট্র্যাজিক বিলুপ্তির সমাজতাত্ত্বিক দলিল।

 

৭. শরতের শুভ্র আঁচল: তীব্র মানবিক বেদনার গল্প। শরতের মেঘলা পটভূমিতে রচিত এক যুগল ট্র্যাজেডি। প্রসববেদনায় কাতর ছোট বোন ‘কাঁদুনী’কে বাঁচাতে ট্রলারে করে ছুটে চলার সময় লেখকের সাথে পরিচয় হয় এক নিঃস্ব বাবার, যার কোলেও ছিল এক মুমূর্ষু কন্যা। নিয়তির নির্মম পরিহাসে একই রাতে কাঁদুনীর সদ‍্যজাত ছেলে সন্তান এবং সেই অচেনা বাবার কন‍্যা সন্তান—উভয়েই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। শরতের শুভ্র মেঘের মতোই মানবজীবন ও স্বপ্ন যে কতটা ক্ষণভঙ্গুর, এই আখ্যান সেই বেদনাকেই স্পর্শ করে।

 

৮. দেখা হলে শুনে নেব: বিদেশ থেকে দেশে ছুটে যাওয়া, বড় আপার ব্রেস্ট ক্যান্সার, শেষ মুহূর্তে ভাই বোন মিলে হাসপাতালে সঙ্গ দেয়া...তারপর অকালপ্রয়াণ! লেখকের ভেতরের গভীর শূন্যতা ও হাহাকারের গল্প। বড় বোনের জীবনের অন্তিম মুহূর্তের স্মৃতিচারণ অত্যন্ত সংবেদনশীল ভাষায় উপস্থাপিত হয়েছে। সম্পর্কের না-বলা কথা এবং অপূর্ণ অনুভূতির চিরন্তন আর্তি গল্পটিকে এক অনন্য গভীরতা দিয়েছে। 

 

৯. সারেং বৌ: নদীমাতৃক উপকূলীয় অঞ্চলের পটভূমিতে রচিত এক নারীর আত্মমর্যাদার আখ্যান। দীর্ঘ সময় নদীর উত্তাল তরঙ্গে ভেসে থাকা নির্ভীক সারেং স্বামীর জন্য স্ত্রীর অন্তহীন অপেক্ষা, সামাজিক কুটিলতা এবং সংসারের জটিল বাস্তবতার মাঝে নারীর নীরব সহনশীলতা ও আত্মিক শক্তির চমৎকার চিত্রায়ণ ঘটেছে এতে।

 

১০. মা কৈলে, তয় যা, উড়াই যা: আঞ্চলিক ভাষার সংলাপে সমৃদ্ধ এই গল্পটি মাতৃস্নেহের অতল গভীরতা এবং প্রবাসে সন্তানদের বিদায় জানানোর চিরন্তন বেদনা নিয়ে রচিত। নিজের শেকড় ও মায়ের কোল ছেড়ে দূর প্রবাসে পাড়ি জমানোর দ্বান্দ্বিক অনুভূতি—যেখানে একদিকে রয়েছে ভবিষ্যৎ গড়ার আনন্দ, অন্যদিকে পেছনে ফেলে আসা মায়ের শূন্য চোখের জল—তা অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

 

১১. এল সময় রাজার মতো: গ্রন্থের সার্থক ও দার্শনিক সমাপ্তি। সময় মহাকালের রাজার মতোই পরম প্রতাপে আগমন করে মানুষের সব সঞ্চয় ও সম্পর্ককে গ্রাস করে নেয়। বাবা-মায়ের শারীরিক প্রস্থান এবং একটি সোনালি প্রজন্মের বিদায়ের মধ্য দিয়ে যে নিদারুণ শূন্যতার সৃষ্টি হয়, গল্পটিতে তারই এক বৈরাগ্যময় ও গভীর জাগতিক সারসংক্ষেপ টানা হয়েছে। এই পর্বের আকর্ষণ হল-লেখক খুব দক্ষতার সাথে তার অবচেতন মনের দ্বার খুলে দিয়ে বিভ্রমকে বাস্তবতার তুলিতে এঁকেছেন। কোলনোস্কোপির চেতনানাশক প্রভাবে সৃষ্ট হেলুসিনেশনের ঘোরে লেখক দেখতে পান এক অপার্থিব দৃশ্য। নিদ্রা আর জাগরণের সীমারেখা ভেঙে একে একে স্মৃতির আঙিনায় এসে ভিড় করেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষেরা—প্রয়াত বাবা, মা, ছোট ভাই, বড় আপা এবং ভাগ্নে।

 

 

যা আমাকে মুগ্ধ করেছে: 

'শৈশব’ গল্পে মায়ের রুটি সেঁকার দৃশ্য বা ‘মামাবাড়ি’ গল্পে নৌকার দুলুনিতে মায়ের ভয় পাওয়া — এগুলো আমি পড়িনি, দেখেছি। লেখকের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ডিটেইল। তিনি নদীর পাড়ে ঘাসফড়িং আর বকের ওড়াউড়ি বাদ দেন না, আবার মায়ের ‘জিন’ ভর করার লোকজ বিশ্বাসটাকেও হাসির খোরাক বানান না। এই সম্মানটা বিরল।

‘বড় ভাইয়া, নিয়তি এবং আমরা’ গল্পে পারভেজ দিলুর মতো মানুষ আমরা সবাই দেখেছি — প্রতিভাবান, স্বপ্নবাজ, কিন্তু বাস্তবে ব্যর্থ। লেখক এখানে মেলোড্রামা করেননি। ভাইকে তিনি ‘ভিলেন’ বা ‘দেবতা’ বানাননি। বরং একটা অপার সম্ভাবনার ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাওয়াকে দেখিয়েছেন চোখের সামনে। এটা সমাজতত্ত্বের চেয়েও বেশি কিছু — এটা জীবন।

’৭১-এর গল্পে লেখক কোথাও বন্দুক উঁচিয়ে ধরেননি। তিনি দেখিয়েছেন ভয়। কাদায় পিছলে পড়া, রেডিওতে স্বাধীন বাংলা বেতার শোনার চাপা উত্তেজনা, আর লাশের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার অসহায়ত্ব। এই ‘অ্যান্টি-হিরোয়িক’ বয়ানটাই একাত্তরকে আমার কাছে বেশি সত্যি করে তুলেছে। এখানে কোনো বীর নেই, আছে শুধু বেঁচে থাকার আকুতি।

সবথেকে বেশি ভেতর নাড়িয়েছে হুমায়ুন কবির যখন  "দেখা হলে শুনে নেব"- গল্পে লিখেন, "মৃত্যুর যন্ত্রণা কার বেশি? যারা চলে যায় আপনজনকে সাক্ষী রেখে? নাকি যারা সাক্ষী হয়ে বেঁচে থাকে? আমার তো মনে হয় যারা চলে যায়, তারা তো চলেই যায়। যারা এই চলে যাওয়াকে প্রত্যক্ষ করে তাদের কষ্ট অনেক।" মনে হল, এতো আমারই অন্তরের চিরন্তন প্রশ্ন, আমারই দীর্ঘদিনের লালিত অব্যক্ত বেদনা।

 

মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক বিস্তার: 

'আমাদের গল্প’ কেবল স্মৃতির রোমন্থন নয়, এর মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক বিস্তৃতি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। কোভিড-১৯ মহামারির বন্দিদশা যখন বিশ্বজুড়ে মানুষকে অস্তিত্বের সংকটে ফেলেছিল, তখন লেখক হুমায়ুন কবির লেখার মাধ্যমে এক গভীর মানসিক নিরাময় খুঁজে নিয়েছিলেন। শৈশব ও ফেলে আসা একান্নবর্তী জীবনের স্মৃতি তাঁর জন্য নিঃসঙ্গতা কাটানোর আশ্রয় হয়ে উঠেছিল। এই অর্থে লেখা এখানে কেবল সৃজনশীলতা নয়, বরং টিকে থাকার অবলম্বন, যাকে আমরা বলতে পারি থেরাপিউটিক এস্কেপ।

একই সাথে গ্রন্থটি হারিয়ে যাওয়া যৌথ সংস্কৃতির এক প্রামাণ্য পুনর্নির্মাণ। ষাট ও সত্তরের দশকের মধ্যবিত্ত পরিবারের যে ভ্রাতৃত্ববোধ, একে অপরের বিপদে পাশে দাঁড়ানো এবং সামান্য আহার ভাগাভাগি করে নেওয়ার সৌন্দর্য, তা বর্তমান ব্যক্তিকেন্দ্রিক, নগরকেন্দ্রিক সমাজে প্রায় অনুপস্থিত। আধুনিক নিঃসঙ্গ জীবনে হারিয়ে যাওয়া সেই যৌথ পারিবারিক মূল্যবোধকে গ্রন্থটি নতুন করে অনুধাবনের সুযোগ করে দেয়। এটি তাই কেবল অতীতের জাবর কাটা নয়।

পাশাপাশি, এটি তৃণমূল ইতিহাসের এক নির্মোহ বয়ান। রাষ্ট্র বা তত্ত্বের দৃষ্টিতে নয়, বরং সাধারণ মধ্যবিত্তের চোখে দেখা মুক্তিযুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি এবং যুদ্ধোত্তর সংকটের যে চিত্র লেখক তুলে ধরেছেন, তা প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসের চেয়েও অধিক মানবিক ও বিশ্বাসযোগ্য।

 

 

পাঠক হিসেবে কিছু জিজ্ঞাসা: 

বইটির নাম ‘আমাদের গল্প’ এবং শুরুর পাঠক-প্রতিক্রিয়া থেকে জানা যায় এটি সাত ভাইবোনের সম্মিলিত উদ্যোগ। সেই হিসেবে একজন সাধারণ পাঠক হিসাবে আমার মনে হয়েছে, ১১টি গল্পের সবকটাই শ্রদ্ধেয় হুমায়ুন কবিরের কণ্ঠে বলা হওয়ায় ‘আমাদের’ শব্দটির পরিধি নিয়ে আরেকটু ব্যাখ্যার অবকাশ ছিল। হয়তো বাকি সদস্যদের অনুভূতি বা পাঠক-প্রতিক্রিয়ার অংশটুকু আরও একটু পরিমার্জিত হলে বইটির যৌথ চরিত্রটি আরও পূর্ণতা পেত। এটি নিতান্তই একজন পাঠকের ব্যক্তিগত অনুভব।

 

আবার কৌতূহলী মন জানতে চায়— মা যখন রুটি সেঁকতেন, তখন তাঁর মনে কী ভাবনা খেলা করত? বড় আপা যখন শেষ সময়ে ছিলেন, তাঁর শেষ ইচ্ছাটুকু কী ছিল? ‘সারেং বৌ’ যে দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকে, সেই অপেক্ষার ভেতরে কি রাগ ছিল, নাকি নীরব অভিমান? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো লেখকের পরিকল্পনায় ছিল না, তাই আমরা জানতে পারি না। ফলে একান্নবর্তী পরিবারের যে ‘যৌথ কোরাস’ শোনার আগ্রহ জন্মেছিল, সেখানে একজন গুণী কথকের একক কণ্ঠই প্রধান হয়ে উঠেছে।

 

লেখক শৈশবকে অত্যন্ত মহৎ ও মমতায় এঁকেছেন, যা পড়ে আমি মুগ্ধ হয়েছি। একজন পাঠক হিসাবে কেবল নিজের কৌতূহল থেকে মনে হয়েছে, গ্রামীণ জীবনের কিছু অসঙ্গতি, পারিবারিক টানাপোড়েন বা অর্থনৈতিক সংকটের মতো বাস্তব দিকগুলো হয়তো আরও একটু ছুঁয়ে গেলে ছবিটা আরও সম্পূর্ণ হতো। অবশ্য কী লিখবেন বা কী এড়িয়ে যাবেন, সেটা সম্পূর্ণভাবে লেখকের নিজস্ব অধিকার ও শৈল্পিক সিদ্ধান্ত। 

আরেকটি ছোট্ট কৌতূহল— বাবার চাকরি ও বদলির প্রসঙ্গটি বইয়ে এসেছে। কোন ডিপার্টমেন্টে ছিলেন, কোথায় কোথায় বদলি হয়েছিলেন, সে সম্পর্কে আরেকটু স্পষ্ট ধারণা পেলে আমাদের মতো নতুন প্রজন্মের পাঠকদের বুঝতে আরও সুবিধা হতো। একইভাবে, একান্নবর্তী পরিবারের হাল যিনি ধরে রেখেছিলেন সেই মায়ের নিজস্ব মনস্তত্ত্ব, তাঁর ক্ষোভ, তাঁর স্বপ্নগুলো নিয়েও ভবিষ্যতে আরও বিস্তারে জানার আগ্রহ রইল। এই অপ্রাপ্তিটুকুই হয়তো পরবর্তী কোনো লেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা বাড়িয়ে দেয়।

 

পরিশেষে বলা যায়, ‘আমাদের গল্প’ সমকালীন বাংলা সাহিত্যে এক মূল্যবান সংযোজন। এটি নিঃসন্দেহে একটি দরকারি বই। যে প্রজন্ম ’৭১ দেখেছে, যৌথ পরিবার দেখেছে, নদী আর নৌকায় বড় হয়েছে— তাদের জন্য এটি এক প্রামাণ্য দলিল। আর আমার মতো যে প্রজন্ম সেই সময়টা দেখেনি, তাদের জন্য এটি এক টাইম মেশিন।

 

এবং স্বীকার করতেই হয়, লেখকের গদ্য-নির্মাণ এই বইয়ের অন্যতম বড় সম্পদ। তিনি খুব ভালো করেই জানেন কীভাবে পাঠকের অন্তরে প্রবেশ করতে হয়। তাঁর ভাষা অলংকৃত কিন্তু ভারী নয়, আবেগপ্রবণ কিন্তু মেদহীন। সহজ শব্দে গভীর চিত্রকল্প আঁকার যে সহজাত দক্ষতা, তাতে গ্রামীণ দৃশ্য, নদী-নৌকার শব্দ, রান্নাঘরের গন্ধ পর্যন্ত পাঠকের ইন্দ্রিয়ে ধরা দেয়। কোথাও তিনি স্মৃতিকে কবিতা করে তোলেন, কোথাও আবার নির্মোহ সাংবাদিকের মতো সত্য তুলে ধরেন— এই দ্বৈততাই তাঁর গদ্যকে স্বতন্ত্র ও হৃদয়গ্রাহী করেছে। এই সংকলন তাই প্রতিটি সংবেদনশীল পাঠককে তার নিজস্ব ফেলে আসা দিন, মা-মাটি এবং যৌথ পারিবারিক বন্ধনের পরম আশ্রয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন