https://www.prothomalony.com/

18011

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত‍্য

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ ০৪:৪৪

 

বৃষ্টি ও বর্ণিল সময়

শেখর ভট্টাচার্য

 নৈঃশব্দ্য ভেঙে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামে দেয়ালের 

আকাশ জুড়ে

তন্দ্রালু চোখে স্মৃতির পালক ঝরে পড়ে তুষারের 

মতো অবিরাম

জলজ মনে জবুথবু পাখি, রঙিন ডানা ঝাপটায় কী 

এক উল্লাসে

সায়াহ্নের রঙে ইজেল ডুবিয়ে, ধ্যানী চিত্রকর ছবি 

আঁকে সোল্লাসে

 

স্যাঁতসেঁতে দিন উজ্জ্বল হয় চাল ধোয়া আলোর উচ্ছ্বাসে

সহস্র বছরের প্রাচীন স্মৃতির কূপ থেকে উষ্ণ হাওয়া 

ভেসে আসে

আমাদের ইতিহাস বৃষ্টি হয়ে দেয়ালে দেয়ালে ফুল ফোটায়

দৃশ্যমান পৃথিবী স্পর্শসুখে বিভোর হয় নিষ্কাম প্রেমের মায়ায়

 

বর্ণিল সময়ের প্রান্তরে নিদ্রারত একজোড়া পাখি ওঠে জেগে

দেয়ালের আকাশে হিরণ্ময় মায়াবী দরজা মুখ লুকিয়ে 

হেসে যায়,

বৃষ্টির প্রতিটি বিন্দুতে জন্ম নেয় আমাদের অনন্ত প্রত্যাবর্তন,

নৈঃশব্দ্যে অপরাজিতা ফোটে, ভালোবাসা ওড়ে হাওয়ায় হাওয়ায়।

 

 

 

বুকটান-ফরোয়ার্ড 

আশরাফ হাসান 

ঘিরে ধরেছে কামাখ্যা-সন্ত্রাস

মাঝে মাঝে ইজ্জতভুক কালচারাল ডিজঅর্ডার...

বানরের মতো হেঁচকা টানে

ছিঁড়ে ফেলে বাপ-দাদার আব্রুর চাদর

 

আগুনের তুফানের মতো

পেঁচার চোখ থেকে ঠিকরে পড়ে

আদমখেকো ক্ষুধার্ত রেডিয়েশন

যেন তাগড়া জোয়ান-জিন্নাত

 

কমান্ডো অপারেশন...

যেন যুগের ইতর-ইসাবেলা

ড্রাগনের মতো লহমায় শুষে নেয়

আবেদ আলীর ঝরঝর ঘাম, লোহিত কণিকা

মগজের নিউরন, তাবৎ সিগন্যাল

 

বাতাসে ওড়ে শবপিয়াসী শকুন

তরবারির ধারের মতো আবেদ বুকটান-ফরওয়ার্ড

 

 

 

অপেক্ষার আগরে  

জেবুন্নেছা জোৎস্না 

এখনও আগুন জ্বলছে —

উত্তাপের খোঁজে ছুটছে মানুষেরা!

যারা আপন অস্থির বিজুরি আড়াল করে

অসংলগ্ন কোষের দলায়— মসৃণ কলার ত্বকে—

নক্ষত্রের নথ খসে অঙ্কুরিত পৃথিবীর দেহে

তারা তাবৎ সিন্ধুর মাঝে বিন্দু খোঁজে

প্রশস্ত ললাটে অপেক্ষার চন্দ্রবিন্দু এঁকে—

 

অন্তহীন চড়াই-উতরাই দেশে

গৃহহীন বৃক্ষ গতরে সময় লেখে

সওদার বাজারে বায়োস্কোপের রঙিন রিলে

স্বপ্নওয়ালা স্বপ্ন ফেরি শেষে

স্বপ্নের আগর পোড়ানো অনুভূতির

শূন্য ঘরে আসে ফিরে—

 

অপেক্ষার তপস্যা— ভুলের মনস্তাপে, তারা

মসজিদ-মন্দির-গির্জা-প্যাগোডায় শান্তি খোঁজে!

শুঁড়িখানার ঝাপসা হলুদ বাতির অন্ধকারে—

নিজেকে ভোলাতে দেখে এক অরুন্ধতী জাগে—

কেউ কেউ আলখাল্লার আড়ালে তখন

পুরোনো কাঠের টেবিলে— সস্তা গ্লাসে ডোবে।

 

 

 

অন্তিম উন্মোচন 

মো. রেজাউল করিম

শব্দের প্রাচীর তুলে আড়াল করতে চাই নিজেকে,

ভেবে নিই চলমান প্রবাহই জীবনের মূল পরিচয়;

অথচ আড়ালে জমে আছে শত অমীমাংসিত প্রশ্ন

যার মুখোমুখি হতে চিরন্তন সংশয়— ভয় হয় ভয়।

 

মৃত্যু মানুষকে মুছে দেয় না—মুছে দেয় তার সব অভিধা;

তখন নীরবতাই হয়ে ওঠে জীবনের একমাত্র ভাষ্য।

যে সত্য ভাষায় প্রকাশযোগ্য নয়, সে-ই দাঁড়াবে সম্মুখে;

মানুষ তখন নিজের কাছেই হয়ে উঠবে প্রথম পাঠ।

 

শেষ স্পর্শে খসে পড়বে মুখোশ, স্তব্ধ হবে তাবৎ আত্মপ্রবঞ্চনা।

ইতিহাস গলে স্পষ্ট হবে কেবল অনন্ত আঁধারকালো।

জীবনের হিসাব-নিকাশ, সকল কোলাহল থামে যেখানে;

শূন্যতাই করে তখন উন্মোচন এক ঘন অজানার দুয়ার।

 

 

 

চিল  

আবদুল বাতেন 

দগদগে দুঃখের কারণে দুঃখ কোরো না, প্রিয়জন

নকলে নাকাল

ভেজালের ভিড়ে

মিথ্যার মুকুট

সম্রাটের শিরে

দুঃখ শুধু খাঁটি, তোমার প্রাণের চেয়ে আপনজন

দুঃখ-দোজখে তুমি, দুঃখ কোরো না, প্রিয়জন।

 

ইতরের কবজায়, সমতল থেকে মেঘমায়া হিল

লোভের নখর

রেটিনায় বোনা

মগজে হিসহিস

হিংসার ফণা

অহংকার-অসুখে ভোগা মানুষ, কী কিলবিল!

দুঃখ-দোহারে তুমি, টোটালি থাকো চিল।

 

 

 

ভাগ্য ক্ষয়

ফারজানা ইয়াসমিন 

নীল আকাশের নিচে যারা নিঃস্ব মানুষ পথের বাঁকে

নিশীথের অন্ধকারে হতাশাকে সঙ্গী করে নির্ঘুম 

রাত কাটায়,

তারাই একমাত্র জানে জ্যোৎস্না ফুটেছিল

হিজল বনের বুকের খাঁচায়,

নীল আকাশের বুকের ওপর লেপ্টে ছিল হাজারো 

দুঃখ তারায় তারায়।

কালোবাজারে হাট বসে, নিলাম হয় সার্টিফিকেট,

ক্লান্ত যুবকের বুকপকেটে ফাঁসি হয় স্বপ্নগুলোর।

জীবনের কারিগর পুরোনো ঘড়ির কাঁটার মতো

ধুলোময়লা ছাপিয়ে অস্পষ্ট তাকিয়ে,

অদৃষ্টের কারাগারে বন্দি মহাকাল যেন ধ্বংসের অপেক্ষাতে।

নদীর পাড়ভাঙা জীবন যাদের নিত্য হারায় নীল নকশায়,

কী লাভ তাদের অঙ্ক কষে যাদের খাতায় প্রতি মুহূর্তে 

হয় ভাগ্যক্ষয়?

 

 

নৈঃশব্দ্যের ঋণপত্র

মেশকাতুন নাহার 

যদি কোনো অনিবার্য প্রলয়ের ন্যায়, হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে 

যায় আমার অন্তঃস্থলে প্রজ্বলিত শেষ দীপশিখাটি,

তবে অনুশোচনার কুয়াশাচ্ছন্ন প্রান্তরে

আমার নামের কোনো প্রতিধ্বনি খুঁজো না।

 

ভাবনার অস্থির প্রহরে নিজেকে বলো না—

"আরও কিছু সাধ্য ছিল,

আরও একটুখানি নিকটে এসে স্পর্শের সেতু রচনা 

করা যেত।"

 

হয়তো অনুভব হবে, তোমার একটিমাত্র কঠোর উচ্চারণ

আকাশ নামিয়ে এনেছিল ঘন অন্ধকারের মেঘমালা;

তোমার অবহেলার শীতল ছায়ায় একটি অঙ্কুরিত স্বপ্ন

অকালেই হারিয়েছিল তার সূর্যালোকের অধিকার।

 

তখন নিজেকে অপরাধের ভারে নত কোরো না

মানুষের চেতনা তো কখনোই পূর্বাহ্নে জানে না

কোন শব্দটি কার অন্তর্জগতে

চূড়ান্ত শলাকার ন্যায় বিদ্ধ হয়ে থাকবে।

 

অতএব আমি না থাকলে

শোকের প্রদীপ দীর্ঘকাল প্রজ্বলিত রেখো না;

কারণ চূড়ান্ত বিদায়ের পর অনুতাপ উচ্চারণ করলেও

কিছু কিছু দ্বার আর কখনো উন্মুক্ত হয় না।

 

 

স্তব্ধতার প্রত্নতত্ত্ব 

এইচ বি রিতা

আমাদের ক্লান্তি আর ইতিহাসের সংক্ষুব্ধ তটে

তুমি এনে দাও এক স্মৃতিচিহ্ন, দূর এলিয়টের গান;

যেখানে ট্রয়ের ছাই আর সমকালীন নাগরিক জটিলতা

একাকার হয়ে খোঁজে অস্তিত্বের দ্বান্দ্বিক সমাধান।

 

মিছিলের চড়া সুর, রক্তে ভাসে ভাঙা কাচ, বিবর্ণ পোস্টার,

আমরা কি তবে কেবলই ক্ষতের সমষ্টি, বিচ্ছিন্ন দ্বীপ?

শ্রেণি আর চেতনার ক্রান্তিকালে স্থির হেঁটে যায় যে-মনন

সে জানে বৈদগ্ধ্যই ভাঙবে এই অবক্ষয়ের প্রলেপ।

 

নৈঃশব্দ্যের জ্যামিতিতে গড়ে ওঠে নতুন স্থাপত্য,

যেখানে ব্যক্তি ও সমাজ মেলে অনুভবের গভীর বৃত্তে;

ধূসর খাতার পাতায় আজ আর অন্ধ বিষাদ নয়—

চেতনার শাণিত আলো জ্বলে আদিগন্ত রক্তের নৃত্যে।

 

 

 

দায়িত্বের বৃক্ষ

আলিফা তাবাচ্ছুম শিখা

রামের শেষ প্রান্তে একটি ক্ষুদ্র নদী বহিয়া যায়। নদীর তীরে একটি পুরাতন বটবৃক্ষ। সেই বৃক্ষের ন্যায় এক ব্যক্তি গ্রামে বাস করেন, তিনি মইফুলের বাবা।

তিনি কথা অল্প কহেন, কিন্তু তাঁহার কর্মের শব্দ দূর পর্যন্ত পৌঁছায়। গ্রামের লোকেরা তাঁহাকে সৎ মানুষ বলিয়াই চেনে।

 

মইফুলের বাবা পেশায় একজন সরকারি কর্মচারী এবং কৃষক। তিনি পরিশ্রমী। প্রত্যুষে ফজরের আজানের সহিত তাঁহার দিন আরম্ভ হয়, আর নিশীথে এশার নামাজের পর তাঁহার বিশ্রাম। তাঁহার কপালের ঘাম আর আল্লাহর রহমতে যেমন মাঠের ফসল বৃদ্ধি পায়, তেমনি তাঁহার সততায় সংসারে বরকত বৃদ্ধি পায়। 

 

তাঁহার সংসার বৃহৎ। ঘরে বৃদ্ধ পিতা-মাতা, পত্নী, দুই পুত্র-কন্যা। গ্রামে দুই ভ্রাতা ও এক ভগিনী বাস করে। আত্মীয়-স্বজনের সংখ্যাও নিতান্ত অল্প নহে।

 

অনেকে কহে, এত লোকের দায়িত্ব কেমন করিয়া পালন করেন?

মইফুলের বাবা হাসিয়া বলেন, দায়িত্ব পালনই তো ইবাদত। একা জান্নাতে যাওয়া যায় না।

 

তাঁহার জীবনখানি এক বৃহৎ বৃক্ষের ন্যায়। মূলে রহিয়াছেন জনক-জননী, শাখায় ভ্রাতা-ভগিনী, পত্রে আত্মীয়-স্বজন, এবং ছায়ায় স্ত্রী-পুত্র-কন্যা।

তিনি সেই বৃক্ষের মালী। প্রতিদিন জল দেন, পরিচর্যা করেন, যেন কোনো শাখা শুষ্ক না হয়।

 

প্রতি মাসের প্রথমে বেতনের অর্থ হস্তে পাইয়াই তিনি মাতার হস্তে কিছু অর্থ প্রদান করেন। বলেন, মা, ইহা আপনার। হিসাব দিতে হইবে না। পিতার ঔষধ তিনি নিজে আনিয়া দেন। বৃদ্ধ পিতা একদিন বলিলেন, বাবা, তুই আমাকে এত যত্ন করিস কেন?

তিনি উত্তরিলেন, আব্বা, আপনি আমাকে ছোটবেলায় কোলে লইয়া বড় করিয়াছেন। এখন আমার পালা আপনাকে কোলে লইয়া বাঁচাইবার।

 

কনিষ্ঠ ভ্রাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, তাহার বেতন ও পুস্তকের ভার মইফুলের বাবার। ভগিনীর বিবাহের জন্য তিনি প্রতি মাসে কিছু অর্থ সঞ্চয় করেন। ভগিনী একদিন আবদার করিল, ভাইজান, আমার একটি শাড়ি লাগিবে।

তিনি পরের দিনই বাজার হইতে শাড়ি কিনিয়া আনিলেন। বলিলেন, বোনের আবদার ফিরাইয়া দিলে আল্লাহও আমার দোয়া ফিরাইয়া দিবেন।

 

গৃহের বধূটি সারাদিন সংসারের কার্যে ব্যস্ত থাকেন। মইফুলের বাবা সপ্তাহে একদিন তাঁহাকে লইয়া নদীর পাড়ে বেড়াইতে যান। সন্তানদিগকে নিয়া মসজিদে যান। রাত্রে তাহাদিগকে নিয়া কুরআন পাঠ করেন। তিনি বলেন, ঘরের মানুষের সহিত সদ্ব্যবহারই সর্বোত্তম সদকা।

 

আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর প্রতি—ঈদ আসিলে তিনি সবাইকে টাকা পাঠান। কাহারো অসুখ হইলে খোঁজ লন। প্রতিবেশী বিধবা রমণীর গৃহে প্রতি মাসে এক বস্তা চাল পৌঁছাইয়া দেন। কেহ ঋণ চাহিলে সাধ্যমতো সাহায্য করেন। কিন্তু কখনো প্রচার করেন না। বলেন, ডান হস্তে দান করিলে বাম হস্ত যেন জানিতে না পারে।

 

একদা একজন বন্ধু বলিলেন, মইফুলের বাবা, তুমি এত ব্যয় করিয়া কী অবশিষ্ট রাখো?

তিনি কহিলেন, আমি ব্যাংকে অর্থ জমাই না। আমি মানুষের দোয়া জমাই। মাতার দোয়া, ভগিনীর হাসি, প্রতিবেশীর হক— ইহাই আমার সর্বশ্রেষ্ঠ সঞ্চয়, ইবাদত।

 

বৎসর আবর্তিত হয়। তাঁহার গৃহে ধন-সম্পদ বৃদ্ধি না পাইলেও, শান্তি বৃদ্ধি পায়। 

লোকে বলে, ওই গৃহে ঝগড়া নাই, কারণ গৃহকর্তা সৎ, পরিশ্রমী ও সকলের খোঁজ রাখেন।

মইফুল যৌবনে পদার্পণ করিয়া উপলব্ধি করিল, পিতা তাহাকে বাড়ি-গাড়ি দিয়া যান নাই; তিনি দিয়া গিয়াছেন একখানি চরিত্র। সেই চরিত্রের নাম— সততা, পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ ও সকলের প্রতি দয়া।

আর ইহাই হইল পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকার।

 

যে ব্যক্তি নিজের সুখ বিসর্জন দিয়া মাতা-পিতার সেবা করে, ভ্রাতা-ভগিনীর আবদার মেটায়, স্ত্রীর মর্যাদা রক্ষা করে, আত্মীয়ের বন্ধন অটুট রাখে, এবং গরিবের প্রতি সাহায্যের হস্ত প্রসারিত করে, সেই ব্যক্তির জীবনই সার্থক। কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন, "তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি, যে আপন পরিবারের নিকট উত্তম।"

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন