https://www.prothomalony.com/

9508

opinion

অভিমত

মে দিবস ও বাংলাদেশে সামাজিক শ্রম বিন্যাস

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৪ ০৯:৪৬

আসিতেছে শুভদিন, দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ! হাতুড়ি শাবল গাঁইতি চালায়ে ভাঙিল যারা পাহাড়, পাহাড়-কাটা সে পথের দু’পাশে পড়িয়া যাদের হাড়, তোমারে সেবিতে হইল যাহারা মজুর, মুটে ও কুলি… কুলি-মজুর কবিতায় কবি নজরুল এভাবেই করেন শ্রমজীবী মানুষের বন্দনা। মে দিবস বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে প্রতি বৎসর আমাদের সামনে হাজির হয়। হাজির হয় কর্ম বিরতি নিয়ে, জাতীয় ছুটি নিয়ে। আর! আর হাজির হয় শ্রমিকের অধিকারের বার্তা নিয়ে। হাজির হয় যাদের শ্রমে ঘামে তৈরি তৈরি এই মানবসভ্যতা তাদের মানবাধিকার নিয়ে।

বিশ্বে বর্তমানে মোট ২০৬ টি দেশ রয়েছে। অথচ শ্রমিকদের সম্মানে মে দিবসে জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে পালন করে বিশ্বের মাত্র ৮০টি দেশ। বিশ্বের ৯০টি দেশে সরকারিভাবে মে মাসের প্রথম দিনটিকে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। মিছিল, সভা, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালিত হয় মে দিবস।

শ্রমিকদের অধিকার ও দাবির প্রতি সম্মান দেখিয়ে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে মে দিবস পালিত হয়। স্বাধীনতার পর মে দিবস রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়।

প্রতি বছর কাজের পরিবেশ আরও ভালো করা এবং ট্রেড ইউনিয়নকে আরও শক্তিশালী করার দাবিতে বিশ্বজুড়ে এদিন নানা প্রতিবাদ কর্মসূচি হতে দেখা যায়। শুরুর দিকে এই দিবসটি বিভিন্ন সামাজিক ও সমাজতান্ত্রিক সংস্থা এবং শ্রমিক সংগঠনগুলো পালন করতো।

বাংলাদেশে দশ থেকে চব্বিশ বছর বয়সী তরুণ এখন মোট জনসংখ্যার শতকরা তিরিশ ভাগ। বাংলাদেশের জনসংখ্যা কাঠামোতে এমন পরিবর্তন এসেছে, যা অর্থনৈতিক উন্নতির সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা একে ‘জনসংখ্যার লভ্যাংশ’ বলেছেন।

বাংলাদেশে এখন অন্যের উপার্জনের ওপর নির্ভর করা মানুষের সংখ্যা কমে গেছে। প্রতি তিনজনের দুজনই উপার্জন করে। এ অবস্থা আরও তিরিশ বছর থাকবে। এ সময় যদি যুব জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্পন্ন বিনিয়োগ না করা হয় তা হলে জনসংখ্যার লভ্যাংশ থেকে বাংলাদেশ খুব বেশি লাভবান হবে না।

দেশকে ভেতর থেকে বদলাচ্ছেন শ্রমিক ও কৃষকরা। নিয়ন্ত্রণহীন পুঁজি প্রাকৃতিক ও সামাজিক সম্পদকে লুটপাট এবং দখল করে তছনছ করছে। দেশের অর্থনীতির ভারসাম্য ধরে রাখছেন শ্রমিকরা। পরিবর্তনের চালিকা হিসেবে ভূমিকা রেখে তারাই দেশের অর্থনৈতিক চিত্র বদলাচ্ছেন। দেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস পোশাক শিল্প। প্রায় ছত্রিশ লাখ শ্রমিক কাজ করছেন এখানে। শতকরা আশি ভাগের বেশি রপ্তানি আসে শুধু এ একটি খাত থেকে।

দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে যারা অবদান রাখছেন, তাঁরা প্রবাসী শ্রমিক। সাতষট্টি লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করছেন বিভিন্ন দেশে। তাঁদের পাঠানো আয়ের ওপর নির্ভর করে দেশে আর্থিক লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রয়েছে। গত বছর এ খাতে আয় হয়েছে এক হাজার চুরাশি কোটি ডলার। 

আর ষোলো কোটির দেশটিকে খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ করে রেখেছেন যারা, সেই কৃষকদের শ্রম বাঁচিয়ে দিয়েছে সরকারের অনেক বৈদেশিক মুদ্রা। অথচ শ্রমিকদের জীবনই এ দেশে সবচেয়ে বেশি বিপন্ন। স্বাস্থ্যহীনতার ঝুঁকি তো তাদের প্রায় নিয়তির মতো, সঙ্গে রয়েছে মৃত্যুঝুঁকি। প্রবাসী শ্রমিকরাও যথেষ্ট নিরাপদ নন। যেসব দেশে তাঁরা যাচ্ছেন, সে সব দেশের আইনকানুন ভালো করে বুঝে চলার মতো শিক্ষা তাদের অনেকেরই থাকে না। যে জন্য প্রবাসে প্রায়ই বিপদে পড়তে হয়।

এ বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবন ঝুঁকিমুক্ত না হলে সামনের সময়ে দেশের অর্থনীতিও ঝুঁকিমুক্ত হবে না। বাংলাদেশের সামনে এগিয়ে যাওয়ার যে ইতিবাচক সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে, তার গতি সচল রাখতে দেশের ভিত্তি যারা মজবুত করছেন, তাদের জীবনমান বাড়াতে না পারলে যত ভালো প্রতিবেদনই আসুক তা কাগুজে দলিল হয়েই থাকবে।

একুশ শতকের শুরু থেকে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ এ পরিবর্তনকে আরও স্পষ্ট করেছে। শারীরিক শ্রমের বড় এক অংশ দখল করে নিয়েছে প্রযুক্তি। অর্থনীতিতে উৎপাদনশীলতার জায়গায় সেবা খাতের ব্যাপক বিস্তৃতি মানসিক শ্রমের পরিসর বাড়িয়ে শ্রমিকের প্রচলিত সংজ্ঞায় বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে।

এসব পরিবর্তন সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসকে প্রভাবিত করে। যে মধ্য শ্রেণি অস্থির ও দোদুল্যমান এবং অব্যাহতভাবে ওপরের শ্রেণিতে ওঠা এবং নিচে নামার প্রক্রিয়ায় থেকে ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায় থাকে, সেই মধ্যবিত্ত শ্রেণির আকার এখন শ্রমিক শ্রেণির তুলনায় বিশাল।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার পঁয়ষট্টি ভাগের বয়স এখন পঁয়ত্রিশ বছরের নিচে। সামনের বিশ বছরে দেশকে ইতিবাচক পথে এগিয়ে নেওয়ার জনসংখ্যা সুবিধা ধারণ করছে এরা। পাশাপাশি এও বলেছিলেন, এ বিপুল তারুণ্য শক্তি মতাদর্শ বা মূল্যবোধের দিক থেকে বিভ্রান্তিতে জড়ালে এরাই ভয়ংকর ক্ষতির কারণ হতে পারে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর শতকরা ষাট ভাগ তরুণ কর্মহীন অথবা স্কুলবিমুখ। এদের চাকরির সম্ভাবনা ক্ষীণ, যে কাজ তারা করে তা খুবই নিম্নমানের। পঞ্চাশ কোটিরও বেশি তরুণ দিনে দুই মার্কিন ডলারের কম উপার্জন করে। বলা হয়েছে, তরুণরা যে দক্ষতা ও জ্ঞান অর্জন করবে, তা বর্তমান অর্থনীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বা প্রাসঙ্গিক হতে হবে।

শিক্ষা যেন তাদের উদ্ভাবক, চিন্তাবিদ বা সমস্যা সমাধানকারী হতে সক্ষম করে তোলে সেদিকে জোর দিতে হবে। বাংলাদেশে জনসংখ্যার লভ্যাংশ-এর তরুণদের সবাই কি এই শিক্ষা, দক্ষতা ও জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন? এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে।

স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের দেশে মে দিবস সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। দিবসটির প্রধান দাবি ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস, সরকারি  কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হলেও বেসরকারি খাতে এখনও ৮ ঘণ্টা কর্ম দিবসের সুফল পায়নি।

নিম্ন মজুরির ফাঁদে শ্রমজীবী মানুষকে আটকে ফেলা হয়েছে। শ্রমিকরা এখন বাধ্য হয় ওভার টাইম করতে। কারণ তা না করলে সংসার চালানো অসম্ভব। কার্ল মার্ক্স তাঁর ‘উদ্বৃত্ত মুল্যতত্ত্ব’ এ হিসাব করে দেখিয়েছেন, মালিকের মুনাফা বাড়ানোর পথ। শ্রমিকের শ্রম, সময় আর যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানো। ফলে কর্মঘণ্টা বাড়ছে, বাড়ছে উৎপাদন। আর তাঁর সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেকারত্ব। প্রতি বছর ২০/২২ লাখ তরুণের মাত্র দুই লাখের মতো কর্মসংস্থান রাষ্ট্র করতে পারে। কয়েক লাখ লোক পাড়ি জমায় বিদেশে। আর বাকিরা দেশে কোনোমতে কাজ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করে।

আমাদের দেশের ৬ কোটি ৩৪ লাখ শ্রমজীবীর ৩ কোটি কৃষিখাতে, ৫০ লাখ শ্রমিক গার্মেন্টসে, ৩০ লাখের বেশি নির্মাণ খাতে; ৫০ লাখ পরিবহন খাতে; ১০ লাখের বেশি লোক বিভিন্ন শ্রমে নিয়োজিত বলে জানা যায়।

প্রতি বৎসর আসে মে দিবস। আমরা সকলেই যেন দিবসটি পালন করি সরকারি ছুটি হিসেবে। শ্রমজীবী মানুষ, শ্রমিক সংগঠনসমূহ মিছিল ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে অনেকটা দায়সারাভাবে দিবসটি পালন করে থাকে। দেখে মনে হয় এ যেন উৎসব, অধিকার প্রতিষ্ঠার চেতনা এখানে বিরল।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন