https://www.prothomalony.com/
18172
opinion
একটি জাতি এত রক্ত, এত প্রাণ ও এত ত্যাগের বিনিময়ে যদি শেষ পর্যন্ত শুধু ঘৃণা, অশালীনতা, প্রতিহিংসা ও বিভাজনই অর্জন করে, তাহলে প্রশ্ন জাগে, সেই আত্মত্যাগের প্রকৃত শিক্ষা কোথায়?
সম্প্রতি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যেসব বক্তব্য, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য সামনে আসছে, তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। বিশেষ করে জনপ্রিয়তা ও ‘ভিউ’ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় যখন নারীর সম্মান ও ব্যক্তিগত মর্যাদার মতো বিষয়ও রাজনৈতিক বক্তব্যের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন সেটি শুধু রাজনীতির নয়, আমাদের সামাজিক রুচিরও অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয়।
সাংবাদিকতা হোক কিংবা রাজনীতি, মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে। তীব্র সমালোচনাও হতে পারে। কিন্তু কাউকে হেয় করা, বিশেষ করে নারীকে নিয়ে অশালীন ইঙ্গিত বা কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দেওয়া কোনোভাবেই সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না।
বিদেশে বসে দেশের রাজনীতি নিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য দেওয়ার প্রবণতাও নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। আন্দোলন, রাজনীতি কিংবা পরিবর্তনের কথা বলা সহজ; কিন্তু সেই বক্তব্যের প্রভাবে যদি সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণরা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে, তাহলে সেই দায় কে নেবে?
জুলাই আন্দোলনের সময় বহু তরুণ আহত হয়েছেন, কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। অনেক মা-বাবা তাদের সন্তান হারিয়েছেন, বহু নারী স্বামী হারিয়েছেন। অনেক পরিবার হারিয়েছে তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে। আজও অসংখ্য পরিবার সেই ক্ষত ও অনিশ্চয়তা নিয়ে বেঁচে আছে।
প্রশ্ন হলো, তাদের ভবিষ্যৎ কে দেখবে?
যারা আন্দোলনের সময় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন বা দূর থেকে মানুষকে আন্দোলনে উৎসাহিত করেছেন, তাদের কি আহত ও নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর কোনো দায় নেই? রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি তাদের বাস্তব জীবনের খোঁজ নেওয়াও কি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হওয়া উচিত নয়?
জুলাইয়ের সময় অনেক পুলিশ সদস্যও নিহত হয়েছেন। তাদের পরিবারের খবর কি আমরা নিয়েছি? তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কি কেউ ভেবেছি?
পুলিশের কোনো সদস্য অপরাধ করে থাকলে অবশ্যই তদন্ত ও আইনের মাধ্যমে তার বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু একজন সাধারণ কনস্টেবল কি রাষ্ট্রের সব সিদ্ধান্ত নেন? তিনি তো একটি নির্দিষ্ট ‘চেইন অব কমান্ড’ এর অধীনে কাজ করেন। তাহলে কোনো সহিংসতার ক্ষেত্রে শুধু নিচের সারির সদস্যদের জবাবদিহির আওতায় এনে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের ভূমিকা কি উপেক্ষা করা যায়?
যদি অভিযোগ থাকে যে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা গুরুতর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাহলে তাদের ভূমিকারও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। একইভাবে, কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা কর্মকর্তা যদি পরবর্তীতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে থাকেন, তাকে পালিয়ে যেতে কারা সুযোগ দিয়েছে, সেই প্রশ্নেরও উত্তর খোঁজা দরকার। ন্যায়বিচার কখনো বেছে বেছে হতে পারে না।
একইভাবে রাজনৈতিক অঙ্গনে আমরা একধরনের দ্বিচারিতাও দেখতে পাচ্ছি। যারা একসময় ৩২ নম্বরের মতো ঐতিহাসিক স্থাপনায় হামলা বা ভাঙচুরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তারাই এখন সেই ঘটনার বিচার দাবি করছেন। যারা মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে অবমাননাকর আচরণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের মধ্য থেকেও কেউ কেউ আজ নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে তুলে ধরছেন।
এখানে প্রশ্নটি কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রতি নয়, প্রশ্নটি নীতির।
নীতি কি সবার জন্য একই হবে, নাকি রাজনৈতিক অবস্থান বদলালে নীতির সংজ্ঞাও বদলে যাবে?
এনসিপি এবং জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত বিভিন্ন ব্যক্তিকে ঘিরেও একই প্রশ্ন রয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় বা মতের কারণে কাউকে 'স্বৈরাচারের দোসর' আখ্যা দিয়ে সামাজিকভাবে হেয় করা, বিশেষ করে নারীর সম্মানহানি করা কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অথচ কোনো ঘটনা যখন নিজেদের রাজনৈতিক পরিসরে আসে, তখন একই ধরনের আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে দেখা যায়।
এই দ্বৈত মানদণ্ডই আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম বড় সমস্যা।
অন্যের জন্য এক আইন, নিজের জন্য আরেক আইন; অন্যের ভুলে কঠোর প্রতিবাদ, নিজের পক্ষের ভুলে নীরবতা—এভাবে কি সত্যিই একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব?
রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য যদি মানুষের কল্যাণ হয়, তাহলে মানুষের জীবন নিয়ে রাজনীতি কেন?
‘ভিউ’, জনপ্রিয়তা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় থাকার জন্য উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য দেওয়া সহজ। কিন্তু সেই বক্তব্যের কারণে যদি কোনো তরুণ জীবন হারায়, কেউ পঙ্গু হয়, কোনো পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়, তখন সেই দায় কে নেবে?
তাই যারা বিদেশে বসে দেশের রাজনীতি নিয়ে বক্তব্য দেন, তাদের প্রতিও একটি সাধারণ প্রশ্ন আছে। সত্যিই যদি দেশের জন্য কাজ করার সাহস ও ইচ্ছা থাকে, তাহলে দেশের মাটিতে ফিরে এসে রাজনীতি করুন। জনগণের সামনে দাঁড়ান। নিজের বক্তব্যের দায় নিজে নিন। সাধারণ ছাত্র, পুলিশ কিংবা অন্য কোনো সাধারণ মানুষকে সামনে রেখে রাজনৈতিক লড়াই করবেন না।
আর যারা দেশে থেকে রাজনীতি করছেন, তাদের কাছেও একই আহ্বান, প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার রাজনীতি নয়, যুক্তির রাজনীতি করুন। ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, নীতির সমালোচনা করুন। নারীর সম্মান নিয়ে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য নয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার সমাধান নিয়ে কথা বলুন।
জুলাইয়ের রক্তের হিসাব আমরা যদি সত্যিই জানতে চাই, তাহলে শুধু কে মারা গেল তা-ই নয়, কেন মারা গেল, কার সিদ্ধান্তে পরিস্থিতি এত দূর গিয়েছিল এবং প্রকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা কারা ছিলেন, সেই প্রশ্নগুলোর উত্তরও খুঁজতে হবে।
একই সঙ্গে নিহত ও আহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাঁদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। কারণ একটি পরিবারের সন্তান হারানোর কষ্ট কোনো রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে পূরণ করা যায় না।
আমরা এমন একটি দেশ চাই না, যেখানে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ঘৃণা করবে, প্রতিটি ঘটনা রাজনৈতিক প্রতিশোধের অস্ত্র হবে এবং মানুষের দুর্ভোগও ‘ভিউ’ ও জনপ্রিয়তার উপকরণে পরিণত হবে।
আমরা এমন একটি দেশ চাই, যেখানে অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই বিচার পাওয়ার কারণ হবে। যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় অনুযায়ী ন্যায়বিচারের মানদণ্ড বদলাবে না। যেখানে নারীর সম্মান, মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা, সাধারণ মানুষের জীবন এবং রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সবার জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সবশেষে প্রশ্নটি আমাদের সবার জন্য:
এত রক্ত, এত মৃত্যু, এত পরিবার নিঃস্ব হওয়ার পরও যদি আমরা ঘৃণা, প্রতিহিংসা, অশালীনতা ও বিভাজনের রাজনীতিতেই আটকে থাকি, তাহলে জুলাইয়ের আত্মত্যাগ থেকে আমরা আসলে কী শিখলাম?
ইতিহাস শুধু বিজয়ের গল্প নয়, ইতিহাস আমাদের ভুল থেকেও শিক্ষা নিতে বলে।
তাই এখন সময় এসেছে থামার।
আর উসকানি নয়।
আর কুরুচি নয়।
আর ‘ভিউ’য়ের জন্য মানুষের জীবন নিয়ে খেলা নয়।
ন্যায়বিচার চাই, কিন্তু সবার জন্য।
জবাবদিহি চাই, কিন্তু পরিচয় দেখে নয়।
রাজনীতি চাই, কিন্তু মানুষের জীবনকে মূল্য দিয়ে।
কারণ শেষ পর্যন্ত একটি জাতির প্রকৃত বিজয় রক্তের সংখ্যা দিয়ে নয়, সেই রক্তের বিনিময়ে অর্জিত মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও সুস্থ সমাজ দিয়ে বিচার করা হয়।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন