https://www.prothomalony.com/
9008
literature
ভূমিকাঃ স্বাধীনতার মাস মার্চ। এ মাস একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত, ইতিহাসে অবিস্মরণীয় পরিস্থিতির একটি অংশ। এই মাসে, বাংলাদেশের মানুষ তাদের স্বাধীনতা প্রাপ্তির জন্য আত্মসমর্পণের সঙ্গে লড়াই করেন, নিজেদের দেশ এবং স্বাধীনতা অর্জনের জন্য হাজারো বিপর্যস্ততা এবং ঝুঁকির মুখোমুখি হয়ে প্রাণ বিনিয়োগ করেন। আত্মোৎসর্গীকৃত সকল মানুষ, বীরাঙ্গনা, শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আমাদের চির কৃতজ্ঞতা। এ সংখ্যায় যাঁরা লিখেছেন, সকলের প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। মহান স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা সবাইকে। -এইচ বি রিতা।
ছয়টি কাকের গল্প
কাজী জহিরুল ইসলাম
ছয়টি কাকের গল্প বলি - শীতে ওরা বসেছিল
টেলিফোনের ঝুলন্ত তারে, পিঠে রোদের সুমিষ্ট
হাত আস্তে আস্তে ঐতিহ্যের সুড়সুড়ি কাটছিল,
তখন দুপুর; বিকেলের দিকে মুখ রেখে তিষ্ঠ
কাকেদের সঙ্গে শাদা বাতাসের দুরন্ত বিবাদ।
বাতাসেরা পরাক্রম প্রকাশে মরিয়া ছিল খুব।
শূন্যের অভিভাবক কিছুতে নেবে না অপবাদ;
এ-কলহ নীলের ছায়ায় আজ হবে না এপ্রুভ।
শূন্যাধিপতি সহসা ডেকে আনে সুসজ্জিত কিছু
তীরন্দাজ, অশ্বারোহী, ও দুর্ধর্ষ পদাতিক দল।
মুহুর্মুহু জলবর্শা ধাওয়া করে বাতাসের পিছু
ঝড়ো আক্রমণ গড়ে তোলে জল-বিদ্যুৎ, প্রবল।
চলমান পথের ওপর থেমে পড়ি তাড়াতাড়ি
ওপরে তাকিয়ে দেখি ছয়টি কাকের দুই সারি।
স্বাধীনতার স্বপ্ন আঁকা চোখ
কাজী আতীক
যখোন পাদপ্রদীপে যুক্ত হলো কল্পনাতীত ইচ্ছে কোনো
আমি গড়তে চাইবো পৃথিবীকে সুরম্য এক আবাসস্থল,
অগ্রসর মানুষদের কারো মঙ্গল বাসের স্বপ্ন যেমন-
ইচ্ছে আমার- কালবোশেখির রুদ্ররোষ থামাতে চাই হাত ইশারায়
ইচ্ছে আমার বজ্রনিনাদ বিজলি চমক চোখের তারায়
জমিয়ে রাখার,
বেনোজলে ভাসবেনা আর কোনো মানুষ, আবাসস্থল,
ঝড় তুফানে পড়বেনা আর উপড়ে কোনো বাড়িঘর
লণ্ডভণ্ড হবে না আর জমির ফসল
আবাদ থাকবে উপকূল গাছপালা আর গ্রামাঞ্চল
ঠেকিয়ে রাখবো সকল তাণ্ডব, জলোচ্ছ্বাস, নদী ভাঙ্গন।
ফিরিয়ে দেবো সাগরকে তার সুনামি জল, ঝড়ের ঘুর্ণি চোখ।
আমি এক স্বপ্ন তাড়িত মানুষ, যদি স্বপ্ন কেবল বাস্তবানুগ,
আমি তাই স্বপ্ন দেখি অদ্ভুত, দেখি শুধু সব মানুষের সুখ।
দেখতেন যেমন বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা,
স্বপ্ন আঁকা চোখ।
এখানে, কারাবাসে
আলী সিদ্দিকী
এখানে-
কালো পীচে ছাপা পড়ে গেছে
প্রাণ নিংড়ানো লাল রক্ত
লালসার রঙে ধাঁধানো আজ
স্মৃতির ক্যানভাস
এখানে-
শকুন আর চিলের থাবায় বিক্ষত
বলিহারি চলছে হরিলুট
চারটি স্বপ্ন পড়েছে পাথরচাপা
স্বদেশে কারাবাস।
এখানে-
যতোসব হার্মাদেরা গেড়েছে ঘাঁটি
চুষে নিচ্ছে মন মনন মগজ
পরজীবি বুনিয়াদ সব শিকড়হীন
শূন্য অন্তসার
এখানে-
নালায়েকরা তুলেছে মাথায় মুকুট
মহাপ্রতাপে উড়ে বেড়ায় জনপদে
চাকচিক্যের বাহারি জেল্লা চারদিক
নিঃস্ব সারাৎসার।
মুমূর্ষু রোগী
রিজোয়ান মাহমুদ
আজ তাকে দেখলেও
সে আগের মতো নেই
তাকে শেষবার দেখেছি নদীর তীরে
দুপুরবেলায় গনগনে রোদে গোসল করতে
আমি ভীষণ আড়ালে না দেখার ভান করি
প্রকৃতি ও পাখির সাথে
জলকেলী মত্ত সে পুকুর পাড়ে
ম্যাড়ম্যাড়ে হলুদ যৌবন
একটা করুণ মহাকাব্যে চুমুপাঠ
দিতে না দিতে পৃষ্ঠারা সব এক গ্লাস অন্ধকারে
কেন সে যৌবনপোড়া রঙে লেখা অসার পোস্টার
আমি একটা পাখিও শিকার করি নি
ছায়া- মায়া নিয়ে আমার কুলীন বংশ পরম্পরা
একাত্তরে আমি নির্দ্বিধায় মানুষ শিকারে
রণাঙ্গনের সৈনিক দীপ্ত যোগী
আমাদের প্রাপ্তি নেই, আছে দায়
স্বাধীনতা আমার -ই মা, আজ মুমূর্ষু রোগী।
মার্চ
বেনজির শিকদার
মার্চ সেই মাস; যেমাসে আছে একটি অনির্বাণ সাত তারিখ।
যে সাতে বঙ্গবন্ধুর হস্তাঙুলে ছিল অনিবার্য স্বাধীনতার ডাক।
তার হিমালয়-সম তর্জনির আকাশবিদীর্ণ গর্জনে
অর্জিত হয়েছিল স্বাধীনতা।
মার্চ সেই মাস; যেমাসে আছে একটি অবগুণ্ঠিত পঁচিশ তারিখ!
যে পঁচিশের পৈশাচিক অন্ধকার-
অত্যোজ্জ্বল সূর্যকে আজও ঢেকে রাখতে সক্ষম।
কালো অধ্যায় হয়ে ঘৃণার্হের অমোঘ খেয়ালে
পঁচিশে-মার্চ আজও লেপ্টে আছে প্রতিটি জখমদেয়ালে।
অনুসন্ধিৎসু মনে মার্চ আমার প্রবল উদ্দামের নাম।
নিরীহ বাঙালির ওপর সশস্ত্র হামলা-
মার্চ মানেই ঘুরে দাঁড়ানো প্রবলতেজি মুক্তিসেনার ঘাম।
মার্চ স্বাধীনতার মাস; আমার জলবৎ শেকড়ের ভীত!
মার্চ এলেই মুক্তির স্বাদ পাই, স্মরি শহিদের আত্মদান;
আমি স্মৃতি ও প্রীতিকাতর বাঙালি—
বুকের সবটুকুজুড়ে দেদীপ্যমান অমূল্য অতীত।
একজোড়া চোখ
জেবুন্নেছা জোৎস্না
সে ছেলেটি চোখে দেখতো কম, তবু ছুটেছিল
রেসকোর্স ময়দান হতে কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্রে
স্বাধীনতার আলোয় দেখেছিল সে দেশমাতাকে!
অতঃপর জলেরা ভেসেছে আকাশগঙ্গার স্রোতে-
পাখিরা স্বাধীন হয় ডানায় পালক গজাতেই
ক্ষমতার ভাইরাসে শোষক স্বাধীনতা ভোগ করে
আরশোলায় যাপিত জীবন সাধারণ নাগরিকের!
সেই জোড়াচোখ, দেখতে পারাই আজ তার শোক।
অনিচ্ছার কাছে ইচ্ছায় কতোভাবে হেরে যায় রোজ।
কোটরের ফাঁক গলে, আগুনের আলো দেখে
চোখজোড়া ঢোকে নামী রেস্টুরেন্ট, ফো-গো-চাও'য়ে!
গ্রিল-বারবিকিউ, মাংস- মসলা মিলে, নাসারন্ধ্রে
অ্যাসফল্ট শিঙ্গল পোড়া, কার্তুজের গন্ধ ভরে।
সাদা পোষাকে স্বল্প আলোয় বেয়ারারা ঘোরে -ফিরে
স্লাইসে কাটে কচি পাঁঠার গর্দান; গরুর সমূহ রান,
অথবা রোস্টেড শুয়োরের কটি— আর এ সবই
ভোগ করে লুণ্ঠিত অর্থে দুর্নীতিগ্রস্ত মার্কসবাদী!
চোখজোড়া দেখে সর্বনাশ শান্তিকামী দেশে —
ঘানা, গিণি, সেনেগাল, লিবিয়া যে অভিশাপে
নির্ঘাত যাদের মৃত্যু লেখা জনতার ফাঁসির মঞ্চে-
হালাল সার্টিফিকেট তাদের পকেটে তৈরি থাকে!
রক্তে আঁকা প্রচ্ছদ
জহিরুল হক বিদ্যুৎ
শ্রদ্ধার অবগুণ্ঠনে কিছু প্রেম জমা রেখো
ওই মেঘেদের কাছে, ফুলেদের কাছে।
যদিও একদিন নিঃশব্দে ঝরে যাবে ফুল
ঝরে যাবে মেঘ রিমঝিম বৃষ্টির আর্তনাদে।
ওই ফুলেদের বুকে যা আছে জমা
ওই মেঘেদের কাছে যা আছে জমা
হোক তা হাজার বছরের প্রেম কিংবা দ্রোহ
ওরা ঠিক ছড়িয়ে দেবে আকাশে বাতাসে
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, পাতা ও ফুলের কাছে
ওই সুদূরে উড়ে চলা পেঁজা মেঘের ডানায়।
এই যে আশোক, পলাশ, শিমুল ফুলে
এখনো লেগে আছে আমার ভাইয়ের রক্ত,
এখনো কৃষ্ণচূড়ার বনে হিন্দোল তোলে
ঐতিহাসিক ৭ ই মার্চের অগ্নিঝরা ভাষণ,
সেই দ্রোহে পবিত্র রক্তমাখা পাপড়িগুলো
কী কভু ভুলতে পেরেছে ৫২ ও ৭১ এর কথা?
জারজ নই আমরা
ফরিদা ইয়াসমীন
ভালোবাসায় সিক্ত নয় তিক্ততায় জন্ম আমার
ভদ্র সমাজ ফিসফিস করে তকমা দেয় 'জারজ'
ধর্ষিতা রমণীর গর্ভে জন্ম আমার
আত্মহননে যার সমাপ্তি ঘটেছিল আমার জন্মেরও
বছর পরে
কানাডিয় উদ্যোগ বাঁচিয়েছিল যে প্রাণ, আজ
ক্ষুদ্ধ মনে প্রশ্ন জাগে, কী দোষ ছিল আমার কিংবা
প্রয়াত জননীর?
সুশীল সমাজের অন্ধ চোখ ভোগ করছো সবটাই
যার পিছনে ত্যাগ ও আত্মসমর্পণে রয়ে গেছে
শত শত জননীর ত্যাগ-তোমাদের সংজ্ঞায়
'জারজ শিশুরা'
বুকদর্পে বলি তবে শোন,
আমি-আমরা জারজ নই; আমরা যুদ্ধশিশু;
যাদের কৃপায় তোমাদের অস্তিত্ব টিকে আছে আজ
বাংলাদেশ নামক এক মানচিত্রে।
মা এখনো তাকে খোঁজে
রোকেয়া দীপা
৭'মার্চের ভাষণ ঘর ছাড়া করেছিল যাকে
সে ফিরে আসেনি
পঁচাত্তর বছরের জ্যোতি ক্ষয়ে যাওয়া চোখ দুটো
জানালার পর্দা সরিয়ে এখনো খোঁজে ফিরে আশা;
কবে ফিরসে সে ঘরে?
পিতাকে দেখার সুযোগ হয়নি
শোক-তাপ আর ক্ষুধার জ্বালায় মা'য়ের-
অশ্রু বিসর্জনের সবটাই দেখি
আক্ষেপ নিয়ে তাই নিত্য চাল ডালের হিসাব কষে যাই
পুঁজিবাদী সমাজ গদগদ করে গিলে খায়
গরিবের অধিকার
নেউরে কুকুরের মত লানা ফেলে সামনে এগোয় কেউ
অথচ জানালাটি খোলা আজ তিপ্পান্ন বছর
কেউ বসে আছে আশা নিয়ে-কবে ফিরবে সে ঘরে?
যুদ্ধ শিশু
সোহানা নাজনীন
প্রকৃতির সুন্দর বিজয়ের অদ্ভুত সঙ্গী তুমি
তোমার চোখে প্রজাপতির মতো দেশপ্রেম
দেশ থেকে দেশে সাহসের সাথে চোখ মেলে খুঁজে
জন্মদাত্রীর ঋণ
খুঁজে লাল সবুজে ওড়ন্ত পতাকার ইতিহাস।
বাধা-প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়ে তোমার চোখ
খুঁজে চলে রক্তাক্ত শত শত যোনী পথের সন্ধান
যেখানে মর্মপীড়ন দখল করে না অস্তিত্বের সঙ্কট
বরং প্রদীপ্ত মনোবল দেখে বিসর্জনের স্তুপ;
কতটা ভারী হলে পরে এখনো ওড়ন্ত পতাকা
বহন করে একটি স্বাধীন বাংলাদেশ।
নতশিরে শ্রদ্ধা-প্রণামে তুমি-ই সেই যুদ্ধশিশু।
খিদা লাগসে
এইচ বি রিতা
খিদা লাগসে। মনে অয় মাডি কামড়াই খাই। কতদিন ধোঁয়া উডা গরম ভাত দেহিনা চোক্ষে। লগে ইলিশ ভাজা।
আহা! আগে কি সুন্দর দিন কাডাইতাম। খাইতে বইলেই সকিনার বাপ হের পাতের থেইকা আমারে গরম ভাত,
মাছের ভাজা আর হুগনা মইস তুইলা দিতো। আইজ বহুত বছর আমারে কেউ এমুন কইরা বাইড়া খাওয়ায় না।
খিদার জন্যি ঘুম আহেনা। মাইঝ রাইতে ফেডো কামড়ানি দেয়।
মাইনষে আমারে খাওন দেয়না। কয়, জটওয়ালী ফাগলী। গতরে গন্ধ, মাতায় জট, আঁইষটা কাফড়। আমারে দেখলেই হগ্গলে ইটা লইয়া দৌড়ায়। গরম ভাতের মাড় ছুঁইড়া দেয় গতরে।
হেদিন, আমার সকিনারে রাজাকাররা ধইরা নিয়া তুইলা দিসিলো পাক সেনাগর হাতো। কইসিলাম, মা রে আল্লাহর নাম লইয়া যা। জীবন কোরবানি দে। দেশ স্বাধীন হোউক। মাইনষে আমারে হেইদিনই কইসিলো, তুই মা না, তুই ডাইনি।
তুমি ফাগল।
সকিনা আমার ফিরা আইসিলো লাশ হইয়া। ছিঁড়াবিড়া খাইসিলো হেরা আমার সকিনারে। আমি হেইদিনই ফাগল অইসিলাম। তয় সকিনায় মইরা গিয়া বাঁচাই দিসিল মীর্জানগরের বহুত মাইনষের পরাণ।
সকিনার বাপে গেসিলো যুদ্ধে। আর আইলোনা ফিরা।
ঘর গেলো, ভিটা গেলো, সোয়ামি-কইন্যা সব গেলো।
এক কাফড়ে হেরা আমারে গেরাম ছাড়া করলো। হেইদিন আমি, আবার ফাগল অইলাম।
যেইদিন শহর গেলাম, খাওন দিবো কইয়া এক স্যার আমারে রাইতের বেলা গাড়িতে কইরা তুইলা নিলো। সক্কালে আবার ছাইড়াও দিলো। খাওন দিলোনা। তয়, হারা রাইত আমারে খাইলো। আমি হেইদিনও পাগল অইসিলাম।
আইজ যহন দেহি, ক্ষমতায় বইসা রাজাকারের গলায়
ফুলের মালা, তহন আমি ফাগল অই। যহন দেহি, রাজাকারেরা বাংলার পতাকা হাতে ঘুইরা বেড়ায়, তহন ফাগল অই। যহন পাকিস্তানের খেলা দেইখা আমাগর পুলাপান, 'পাকিস্তান জিন্দাবাদ' কইয়া চিক্কুর দেয়, তহন আবার ফাগল অই।
খিদা লাগলেই ফাগল অই। হারা দিন-রাইত খালি ফাগল ফাগল লাগে। মইদ্ধে মইদ্ধে মুন চায়, চুরি করি এক থাল গরম ভাত। লগে ইলিশ ভাজা আর কয়ডা হুগনা মইচ।
ফেডো বড় খিদা। ফাগলেরও ভুখ লাগে-কেউ বোঝে না।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন