https://www.prothomalony.com/

8930

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত্য

প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২৪ ১০:৫৫

প্রজন্ম

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় 


হাসপাতালে গাড়িটা ঢোকার আগেই থেমে গেল। মা তখন যন্ত্রণায় ছটপট করছে। পেটের ভেতর নয় মাস আট দিনের অদ্রিজা গোত্তা দিয়ে যেন বলছে, মা আর কতক্ষণ জলে ভাসতে হবে? ডাঙা ছোঁবার আগে ওর বাবাই নামটা ঠিক করে দিয়েছে। মেয়ে যে হবে তা তারা জানে। হাত দেখে বলেছেন এক সাধু। গত বছর সাবুই মানে অদ্রিজার বাবা যখন পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে হরিদ্বারে কাজ করতে গিয়েছিল তখন এক দিনের ছুটি পেয়েছিল। একদিনে তো ঘর আসা যায় না। তার চেয়ে বরং গঙ্গাস্নান করে আসি এই ভেবে সাবুই গিয়েছিল। সাবুইয়ের বাড়িতে বাবা মা ছাড়াও এক ছোটো ভাই আছে। জমি নেই। মা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার আর বাবা বার্ধক্য ভাতা সবে মিলে রোজগার পনেরশো টাকা। রেশনের চাল পায়। দু - টাকা কেজি। ওতে কষ্ট হলেও কোনোরকমে চলে। কিন্তু বিল্লার পেট হতেই চিন্তায় পড়ে যায় সাবুই। ছেলে হলে ভালো স্কুলে ভর্তি করতে হবে। তার রোজগার কই! এদিকে গ্রামের স্কুলগুলোর যা অবস্থা। মাস্টার নেই, তার উপর রোজ একটা করে মাস্টার চলে যাচ্ছে। কী সব গোলমাল হয়েছে। কারো কাজ নেই, কেউ কাজ পেয়েও চলে যাচ্ছে। আহা রে ভাগ্য! পড়েই হবে কী বরং বাপের সাথে গতর খাটালে দু পয়সা আসবে। 

মেয়ে হলে অবশ্য সমস্যা নেই। গাঁয়ের স্কুলে ফ্রিতে ভর্তি করে দিতে পারলে হয়। পাশ ফেল নেই। কবে হাইস্কুলে উঠে যাবে।  উঠলে একটা সাইকেল আর পঁচিশ হাজার টাকা। বিয়েটা কোনো রকমে হয়ে যাবে। সাধুর মুখে ফুল চন্দন পড়ুক। সেদিন রাতেই বিল্লাকে ফোন করে নাম ঠিক করে ওরা। বিল্লা খুব খুশি। বিল্লার আবার পছন্দ ওর মেয়ে রাজনীতি করুক। কত টাকা কত ক্ষমতা। পড়াশুনা না করেও ওই একটা কাজ সহজে পাওয়া যায়। খালি একটু মুখরা হতে হবে। সে না হয় মেয়েকে শিখিয়ে দেবে। গ্রামে একশো দিনের কাজ পেতে পঞ্চায়েতে গিয়ে কম ঝগড়া করতে হয়। বিল্লার পেট মোচড় দিয়ে ওঠে। ব্যাথায় দম হয়ে হয়ে আসছে। কত স্বপ্ন তার। একদিন মেয়ে বড় নেত্রী হবে তাকে ঘিরে চারপাশে কত লোকজন থাকবে। নীলবাতি গাড়িতে চড়বে। মিছিল করবে মিটিং করবে। বড় রাস্তা দিয়ে মিছিল যাবে। ছাদ থেকে ফুল ছুঁড়বে। সবাই দাঁড়িয়ে তার মেয়েকে দেখবে। পুলিশ আটকে দেবে। কেউ তার কাছে যেতে পারবে না। সব গাড়ি থেমে যাবে। আহা রাজার মতো। 

গাড়ি থেকে মুখ বার করে বিল্লা। রাস্তায় একটা বড় মিছিল যাচ্ছে। সামনে কেউ হাঁটছে। পেছনে হাজার হাজার লোক। হঠাৎ করেই তিনি তার গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন। বললেন "তোমরা এই গাড়িটাকে আটকে রেখেছ কেন, দেখছ না প্রেগন্যান্ট। একে ছেড়ে দাও তাড়াতাড়ি।" বিল্লা গাড়ির ভেতর থেকে দু- হাত জোড় করে প্রণাম জানায়। উনিও মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।

বিল্লার স্বপ্ন আকাশ নেয়, ভাবতে থাকে এই তো, এই তো আমার মেয়ে অদ্রিজা। 

গাড়ি ছুটতে থাকে গ্রিন করিডোর দিয়ে। পেটে একটা নতুন প্রজন্ম।  

 

 

বহতা নদীর নাম জীবন 

ফারজানা ইয়াসমিন 



সাদিয়া তার স্বামীর কিছু কাগজ খুঁজতে গিয়ে সেই পুরনো এ্যালবামটা পেয়ে গেল।অনেক বছর এই এ্যালবামের খোঁজ ছিল না। চোখের সামনে ভেসে উঠলো হাজারো স্মৃতি। তার বিয়ের ছবিগুলো একটু একটু নষ্টও হয়ে গেছে। কিন্তু হঠাৎ করেই সাদিয়া ছবিগুলো বুকে জড়িয়ে ধরলো।মনে পড়ে গেল আগামী মাসে তাদের বিবাহ বার্ষিকী। এই বিশ বছরে এই দিনটার কথা মনে করার সময় পায়নি। সংসারের দায়িত্ব আট বাস্তবতায় চলে গেছে এতগুলো বছর। 

সাদিয়ার বিয়ের দুই বছর পর প্রথম সন্তান মিলা আসে পৃথিবীতে। তার দুই বছর পর শাহেদ জন্ম নেয়। দুই সন্তান নিয়ে পুরোপুরি সংসারী হয়ে যায় সাদিয়া। প্রথম দিকে বাচ্চারা ছোট ছিল বলে বাবার বাড়িতে যেত মাঝে মধ্যে। কিন্তু বাচ্চাদের স্কুল শুরু হওয়ার পর থেকে একদম গৃহবন্দী। বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ ছাড়া আর কোনো চিন্তাই যেন মাথায় ছিল না। এখন দুই ছেলে মেয়ে চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে।তারা দূরে থাকে। সন্তান বড় হলে বাবা মা একটা সময় একা হয়ে যায়। সাদিয়ার এখন অজস্র অবসর সময়। কিন্তু এখন শিহাবকে একা রেখে কোথাও যাওয়া হয় না।সত্যি বলতে সাদিয়ার যেতেও ইচ্ছে করে না।সারাদিন ব্যবসার কাজে ব্যস্ত শিহাব।রাতে বাসায় ফেরে ক্লান্ত হয়ে। তবুও তো মন খুলে কিছু কথা হয়।

বিয়ের আগে সাদিয়া খুব সুন্দর গান গাইত।অনেক পুরষ্কার আছে তাপ স্কুল, কলেজ আর ভার্সিটির। এছাড়াও তখন বাংলা বেতারেও দু'বার গান গেয়েছিল।তার গান শুনে মুগ্ধ হয়েই শিহাব তাকে পছন্দ করেছিল।অথচ বিয়ের পর শশুর বাড়ির কড়া নির্দেশে ছাড়তে হয়েছে গান।এ্যালবামে বিয়ের আগের কিছু ছবি রেখেছিল সাদিয়া। এগুলো দেখে চোখ ভিজে গেল। জীবন কতটা বদলে গেছে। নিজের সবকিছু হঠাৎ করেই যেন বদলে যায়। এখন চাইলেও সেই দিন ফিরে আসবে না।চাইলেও আবারও শুরু করা যাবে না।তার অনেক বান্ধবী এখনও গান গায়। মাঝে মাঝে টিভিতে দেখে।

তারএখন খুব একা লাগে। সারাদিন ঘরের কোণে মাকড়সার মতো জাল বুনে যায় মনের কোণে। 

এ্যালবামটা নিজের অজান্তেই টেবিলে রেখে বাহিরের বৃষ্টি দেখতে লাগল সাদিয়া। মনটা আজ ভিজে যাচ্ছে বৃষ্টির সাথে। মনে হচ্ছে যেন মরুর বুকে বহু যুগ পরে বৃষ্টি এলো।হঠাৎ করেই ইচ্ছা হলো আজ মন খুলে বৃষ্টিতে ভিজতে।তাই বৃষ্টি থেমে যাওয়ার আগেই ছাদে গেল।ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে মনের সব চাপা কষ্ট ধুয়ে দিল যেন এক ক্লান্ত প্রহরে। বাচ্চারা যখন ছোট ছিল তখন মাঝে মাঝে বাচ্চাদের সাথে ছাদে গিয়ে ভিজতো।ইদানীং সাদিয়া ঘরে বসে টিভি দেখতে দেখতে চা খায় না। বারান্দায় বসে নীল আকাশে সাদা মেঘের সাথে তার কথা ভাগাভাগি করে আর উষ্ণ চায়ে ভালোবাসা খুঁজে। 

রাতে শিহাব বাসায় এসে এ্যালবামটা টেবিলে দেখে। তার চোখে পড়ে সাদিয়ার গানের ছবি। নিজের মনের মধ্যে কেমন যেন একটা অপরাধ বোধ জাগে।যাকে গানের জন্য পাগল হয়ে বিয়ে করলো, তার জীবন থেকে গানটাকেই বিলুপ্ত করে দিল। তখন খুব অসহায় ছিল শিহাব। বাবার কথায় বাধা দিতে পারেনি।

শিহাব বাচ্চাদের সাথে প্ল্যান করেছে আগামী দশ তারিখে কক্সবাজারে যাবে।বারো তারিখে তাদের বিবাহ বার্ষিকী। সবাই মিলে ঘোরাঘুরি করা যাবে।আর সাদিয়ার আবার গান শুরু করার সারপ্রাইজ দিবে। একজন খুব ভালো গানের শিক্ষকের সাথে কথা বলে রেখেছে।অনেক দিন গান গায়নি।তার একটা প্র্যাকটিস দরকার। এই সংসার ছাড়া তেমন কিছু দেওয়া হয়নি সাদিয়াকে। নিঃশর্তে নিজের জীবনের  সারাটাই  দিয়ে গেল সবার জন্য। 

শিহাব সাদিয়াকে বলল,আগামী পরশু আমি কক্সবাজারে যাবো। ওখানে কাজ আছে। তুমিও যাবে আমার সাথে। বাচ্চাদের সাথেও দেখা হবে।ভালো লাগবে।শিহাবের কথা শুনে সাদিয়া অস্থির হয়ে গেল।

আগে বলবে না? আমি বাচ্চাদের জন্য রান্না করতাম।কতকিছু নিতে পারতাম।এত অল্প সময়ে কী কী করতে পারবো?

তুমি এত অস্থির হয়েও না।আমরা যাওয়ার দুই দিন পর ওরা আসবে। ওদের কাজ আছে। মোটামুটি এক সপ্তাহের গোছগাছ করে নেও।আর তোমার কিছু রান্না করা লাগবে না।আজ বরং শপিং করে আসো।আর একটু পার্লারে যেও।

কেন আমাকে কী অনেক খারাপ লাগছে?

শিহাব সাদিয়ার কপালের চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে বলল, একদমই না।তুমি এখনো অসম্ভব সুন্দরী। একটু ক্লান্ত লাগছে। তাই বললাম। আগে তো বলতে,আমাদের জন্য একটু পার্লারেও যেতে পারো না।

এবার দু'জনেই হেসে উঠল। সাদিয়া বলল,আচ্ছা যাবো।তবে শপিং করতে একা একা ভালো লাগে না।

আচ্ছা আমি নিয়ে যাবো। সন্ধ্যায় তৈরি থেকো। 

অনেক বছর পর দু'জনে এভাবে এক সাথে শপিং করতে গেল। জীবন এখন ছুটন্ত ঘোড়ার মতো। এত ব্যস্ততা জীবনে। শিহাব নিজের পছন্দে আকাশী-নীল রঙের একটা খুব সুন্দর জামদানি শাড়ি কিনে দিল। অসম্ভব ভালো লাগল সাদিয়ার। অনেক দিন এভাবে কিছু কিনে না শিহাব। রাতে রেস্টুরেন্টে খেল দু'জন। কত বছর পর যে এমন মনের মতো সময় পাড় করলো তা মনে নেই। আজ শিহাব গাড়ি ড্রাইভ করছে পাশে সাদিয়া বসে আছে। 

হঠাৎ করে নিজের অজান্তেই সাদিয়া গাড়ির মধ্যে গেয়ে উঠলো 

আমার এ ভালবাসা জানিগো তোমার

ক্ষণিকের ভালো লাগা ফুল।

ক্ষণিক কবরী মাঝে দিয়েছিলে ঠাঁই,

তারপর ভেঙ্গে গেছে ভুল।

এত সুন্দর মধুর কণ্ঠে সাদিয়া গাইল যে শিহাবের মন ছুঁয়ে গেল। গান শেষে শিহাব হাততালি দিতেই সাদিয়া লজ্জা পেল। দু'জন হাতিরঝিলের ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে আকাশের ভরা পূর্ণিমার রাতের সৌন্দর্য উপভোগ করলো কিছুক্ষণ। তারপর গল্প করতে করতে বাসায় চলে এলো।

কক্সবাজারে এসে এই দুই দিন শিহাব কোথাও গেল না দেখে সাদিয়া জিজ্ঞেস করলো,

তুমি তো কোনো কাজেই গেলে না। সত্যি করে বলো তো কী ব্যাপার?

কাজ তো এটাই। তোমাকে সময় দেওয়া। এত বছর চলে গেল নিজের মতো করে কিছুই করা হলো না। এমন না যে সামর্থ্য ছিল না। দায়িত্ব দায়িত্ব করে নিজের ইচ্ছা পূরণ করা হয়নি।এই বয়সে এখন মন মতো ঘুরবো। যা মন চায় করবো।আমাদের সময়ও তো কমে আসছে। কে কখন চলে যাই জানা নেই। 

শিহাবের কথায় সাদিয়ার বুকেটা হুহু করে উঠলো। মাথা রাখলো শিহাবের বুকে।

এভাবে বলো না।তোমাকে ছাড়া এ জীবন আমি চিন্তাও করতে পারি না। তোমার আগে যেন আমি যাই।

আচ্ছা বাদ দেও এসব কথা। চলো সাগরের পাড় থেকে ঘুরে আসি। রাতের সৌন্দর্য আলাদা।

রাত বারোটায় হঠাৎ দরজায় বেল বেজে উঠলো। সাদিয়া দরজা খুলে দেখল মিলা আর শাহেদ দাঁড়িয়ে আছে। ওদের এত রাতে কেক নিয়ে আসতে দেখে সাদিয়া বেশ অবাক হলো। ওরা মা'কে জড়িয়ে ধরে বলল, শুভ বিবাহ বার্ষিকী মা।এরপর বাবাকেও শুভেচ্ছা জানালো। সবাই মিলে কেক কাটলো। ছবি তুললো। অনেক মজা হলো।

এরপর শিহাব সাদিয়ার হাত ধরে বলল, আমার আজ কিছু চাই তোমার কাছে। কখনো যেমন কোনো কিছুতেই মানা করো নাই। আজও করবে না। তুমি আবারও গান গাইবে।

সাদিয়ার মনের গহীনে চাপা পড়ে থাকা ইচ্ছার প্রকাশ হলো অবশেষে। ধীরে ধীরে অসম্ভব সুন্দর গান গাইতে শুরু করলো সাদিয়া। আজ এত বছর পর সাদিয়া টিভিতে একটা জনপ্রিয় গানের লাইভ অনুষ্ঠানে গান গাইবে। মিলা ও শাহেদ ঢাকায় এসেছে। শিহাব, মিলা আর শাহেদ তাদের পরিচিত বন্ধু বান্ধবকে কল করছে। মেসেজ দিচ্ছে। সবাই যেন অনুষ্ঠান দেখে। আজ সত্যি আনন্দের দিন সবার জন্য। আজ সাদিয়ার স্বপ্ন সবার মাঝে লালিত হচ্ছে। ঠিক এতবছর যেভাবে সবার স্বপ্ন সাদিয়া নিজের মনে লালন করেছে। সত্যি বলতে সাদিয়ার কাছে মনে হচ্ছে বহতা নদীর নাম জীবন। সময়ের স্রোতে কতকিছু ভেসে আসে যায়। 




কবিতার জন্মদিন

নবী হোসেন নবীন



কদম আলী আমার এক সময়ের সহপাঠী। ছাত্রাবস্থায় সে টুকটাক কবিতা লিখত। মাঝে মাঝে আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাকে তার স্বরচিত কবিতা পড়ে শুনাত। প্রথম প্রথম সহপাঠীরা তাকে ফুল কবি, পাতা কবি বলে ডাকত। কিন্তু সে তা গায়ে নিত না। এক সময় জীবিকার তাগিদে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। এর পর দীর্ঘ দিন কদম আলীর সঙ্গে আমার আর দেখা হয়নি। 

একদিন হঠাৎ আমার লেখার টেবিলের সামনে কদম আলী এসে হাজির। তাকে দেখে আমি কিছুটা অবাক হলাম। তার মাথার চুল লম্বা হয়ে ঘাড়ের নিচে নেমে গেছে। দাড়ি-গোঁফে  মুখ আচ্ছন্ন। দেখে মনে হল যেন কোনো সন্যাসী এই মাত্র আস্তানা থেকে উঠে এসেছে। তার হাতে একটা ফাইল। ফাইলে বেশ কিছু এলোমেলো কাগজ পত্র। তাকে ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করে বসতে বললাম। সে বসে ফাইল হতে একটা চিঠি বের করে আমার সামনে রাখল। জিজ্ঞেস করলাম কিসের চিঠি? সে বলল, আমার কবিতার জন্মোৎসবের দাওয়াত পত্র। কদম আলীকে আমি কখনও নিজের জন্মদিন পালন করতে দেখিনি। এবারই প্রথম হঠাৎ ঘটা করে কবিতার জন্মদিন পালন করেছে আনুষ্ঠানিক ভাবে। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, সহপাঠী সহকর্মী সবাইকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। কিছুক্ষণ অতীতের স্মৃতি চারণের পর যাওয়ার সময় বলে গেল, অনেক কষ্টে ঠিকানা সংগ্রহ করে এসেছি। যাবে কিন্তু। বললাম, ঠিক আছে। 

আমি ভেবেছিলাম কবিতা হয়তো কবির কোনো মেয়ের নাম হবে। না গেলে মেজবানের কাছে নিজেকে ছোট করা হবে। তাই সাধ্যমত কিছু উপহার সামগ্রী নিয়ে আমিও হাজির হলাম কবির বাড়িতে। গিয়ে দেখি কবিতা কোনো মেয়ের নাম নয়, কবির লেখা কবিতা। সুন্দর করে ঘর সাজানো হয়েছে। রং বেরঙের কাগজ কেটে দেয়ালে সেঁটে দেয়া হয়েছে। মাঝে মাঝে কবির স্বরচিত কবিতাও শোভা পাচ্ছে দেয়ালে। ঘরের দৈর্ঘ্য বরাবর একটি দেয়ালে বড় হরফে লেখা আছে একটি কবিতা। যার শিরুনাম "গোলাপ যদি প্রেম হতো।" কবিতাটি এখন পুরোটা মনে পড়ছে না তবে প্রথম দিকের কয়েকটি চরণ ছিল এমন

"গোলাপ যদি প্রেম হতো 

প্রেম হতো সুবাসিত।

প্রেমিক হতো অলি

অকালে ঝরে পড়ত না আর কোনো কলি।"

এ কবিতাটিরই জন্মদিন ছিল সেদিন। কবিতার জন্মদিন বাংলাদেশে এই প্রথম নাকি সারা বিশ্বেই প্রথম, তা নিয়ে আমি কিছুটা ভাবনায় পড়ে গেলাম। মানুষের যে কত বিচিত্র রকমের ভাবনা ও শখ থাকতে পারে তা ভেবে কিছুটা অবাকও হলাম। অনুষ্ঠানটি সাজানো হয়েছে তিন পর্বে। প্রথম পর্বে কবির কবিতা সম্পর্কে আলোচনা। দ্বিতীয় পর্বে কবির লেখা কবিতা আবৃত্তি। তৃতীয় পর্বে প্রীতি ভোজ। 

আলোচনা শুরু হল। একজন আলোচক তার আলোচনায় বললেন, আমাদের মত এমন দরিদ্র ক্লিষ্ট দেশে কবিতার জন্মদিন পালন করা খুব সহজ কথা নয়। এর জন্য যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস ও সৎ সাহস থাকা প্রয়োজন যা কবি কদম আলীর আছে। আর এক জন বললেন, যে দেশে এখনও অসংখ্য মানুষ অনাহারে অর্ধাহারে জীবন যাপন করে সে দেশে কবিতার জন্মোৎসব পালন করা সত্যিই গর্বের বিষয়। কবি কদম আলী এ কর্মের সূচনা করে ইতিহাসে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর এক জন বললেন, যে দেশের অর্ধেক মানুষ এখনও দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে সে দেশে কবিতার জন্মোৎসব প্রামাণ করে আমারা শিল্প-সংস্কৃতিতে কতটা এগিয়ে গেছি। আমাদের আর পিছেনে ফেরার সময় নেই। সামনে এগিয়ে যেতে হবে তাই আমি আশা করছি কবি কদম আলী প্রতি বছরই তাঁর এক একটি কবিতার জন্মদিন পালন করবেন। 

আমি বসে বসে বক্তৃতা শুনছিলাম আর ভাবছিলাম যে এখানে আসাটা সত্যিই ভুল হয়েছে। এখন যদি আমাকে কিছু বলতে বলা হয় তাহলে আমি কী বলব এ নিয়ে যখন চিন্তিত হয়ে পড়লাম, তখনই আমাকে অনুরোধ করা হলো কিছু বলার জন্য। অগত্যা কী আর করা, মাইক ধরে বললাম, সুধিবৃন্দ, যে দেশে কবির জন্মদিন পালিত হয় না সে দেশে কবিতার জন্মদিন পালন করা হাস্যকর। ভেবেছিলাম অনুষ্ঠানে পিন পতন নীরবতা নেমে আসবে কিন্তু ঘটল উল্টো ঘটনা। যদি আমারা আমাদের নিজ নিজ এলাকার গুণীজনদের প্রাপ্য সম্মান দিতাম তাহলে আমাদেরকে আজকের মত কবির উপস্থিতিতে কবিতার জন্মদিন পালন করতে হতো না। আমরা কখনও কখনও নিজের আত্মতৃপ্তির জন্য কিংবা সুনাম সুখ্যাতির জন্য অথবা শখের বসবর্তী হয়ে এমন সব ব্যয়বহুল অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকি, যার ব্যয় দ্বারা কয়েকজন ভাগ্যাহত মানুষের ভাগ্য বদলে দেয়া যায়। 

এবার অনুষ্ঠানে নীরবতা নেমে এলো। সবাই মাথা নিচু করে আমার কথা শুনছিল। বললাম, বন্ধুগণ আসুন আমরা কবিতার জন্মোৎসব পালন না করে কবিকে সম্মানিত করি। এই বলে আমি আমার আনিত একটি নোট খাতা ও কলম কবির হাতে তুলে দিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে এলাম। উপস্থিত সবার উপহার সামগ্রীগুলো আজকের অনুষ্ঠানের সাথে অনেকটাই বেমানান হয়ে গেল। কারণ সবাই আমার মত ধরেই নিয়েছিল যে কবিতা-কবির কোনো মেয়ের নাম হবে।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে কয়েক জন অতিথি কবির লেখা কয়েকটি কবিতা আবৃত্তি করলেন। পরিশেষে কবি কদম আলী তাঁর স্বরচিত 'গোলাপ যদি প্রেম হতো'কবিতাটি আবৃত্তি করলেন। আবৃত্তি তো নয় যেন কুড়াল দ্বারা বয়স্ক গাছ কাটার শব্দ। তারপর শুরু হল তৃতীয় পর্ব প্রীতিভোজ। বিয়ে বাড়ির মতো বিশাল আয়োজন। দেশি মুরগির রোস্ট, খাসির কোর্মা, গরুর কালো ভুনা ও সুগন্ধী চালের পোলাও পাক করা হয়েছে। সবাই তৃপ্তি সহকারে খেল বটে তবে খাবারের মান অনুযায়ী রসাত্বক আলোচনা আর তেমন জমলো না। আমিও খাবার সম্পর্কে আর কিছুই বলিনি। সবাই খাওয়া দাওয়া শেষ করে চলে গেল। আমিও বিদায় নিয়ে আসতে আসতে ভাবলাম, এ ধরণের একটি অপ্রয়োজনীয় অনুষ্ঠানে না আসলে হয়ত জানতেই পারতাম না যে, কবিতারও জন্মোৎসব হতে পারে। অনুষ্ঠানটি যত হাস্যকরই হউক না কেনো, তার বার্তাটি কিন্তু মোটেও হাস্যকর মনে হলো না। 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন