https://www.prothomalony.com/
8847
literature
শেষবারের মতো ঝলসে যাবার আগে
হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
বলে ফেলার মতো সহজ সুন্দর
জলপ্রপাতের ধার ঘেঁষে
এখনও দু'একটি বাড়ি দেখা যায়
পাহাড় জঙ্গল নদীর নামে তাদের পরিচয় হলেও
তারা হাঁ করলেই ঢুকে যেতে পারে
এক একটা কঠিন বছর
অথচ আমাদের চরিত্রহীনতার জন্যে পড়ে থাকে
অগণন নগ্ন নির্জন পথ
কোথাও কেউ নেই বলেই আমাদের কোনো গল্প নেই
অথবা এমন গল্প যাদের বাড়ির উঠোনগুলো
মরুভূমির গরম বালির একা আর হিংস্র
শেষবারের মতো ঝলসে যাবার আগে
গল্পের দুয়ার থেকে চিৎকার করছি
এখনই শব্দের শুকনো পেটের ভেতর
একটু জলের দোলা দাও
আর ঠিক তখনই উদ্ধত পায়ে হেঁটে যাচ্ছে
ফাইবারের মূর্তি ধারণায় বিশ্বাসী বেশ কিছু তরুণ পথ
যাদের প্রতিটি পদছাপ
পুরোনো রক্তমুখী ক্ষতস্থানের মতো গভীর।
জ্বলছি জলের প্রজ্জ্বলনের মতো
আশরাফ হাসান
আমি জ্বলছি জলের প্রজ্জ্বলনের মতো
কখনো দেশলাই-হৃদয়
কখনো বারুদগন্ধী মৃত্তিকা
কখনো-বা শিল্পতুলির মতো দাবানল
আমি জ্বলছি নিসর্গনিশিন্দা
জ্বলছি স্বপচ্যুত ইস্পাত-ইচ্ছের মতো
সবুজ সম্ভাবনার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া
অগ্নিলাভার মতো পোড়া অশ্রু
আমার যাত্রাপথে থমকে যাওয়া স্রোতের মতো
দাঁড়িয়ে থাকে সকালের বিবস্ত্র আলো
দুপুরের উল্লাসহীন রোদ
আর সন্ধ্যার ক্লান্তিহীন পোশাক
আমি চলছি বিরতিহীন গতির
নৈঃশব্দ্য-ধ্বনির মতো
জ্বলছি উপুড়হওয়া চাঁদের নিচে জেল্লার মতো
আমার আকাশে যৌবনামেঘের বিদ্রুপ
কাদামাটির ঠিকানায় দিয়েছি পত্র-প্রযত্ন
ললাটে লিখেছি 'পরিযায়ী-গিনিপিগ' নাম
আমি মূলত ভিটেমাটিহীন উদ্বাস্তু এক
আমার একহাতে নুয়েপড়া পলাশীর প্রান্তর
অন্যহাতে রক্তাক্ত নদীর মতো কারবালা
বেনামি ঝড়ের মতো আছড়েপড়া নিশ্বাস
আমি নিজদেশের সন্ধানে নিমগ্ন-নিরুদ্দেশ
আমি মধ্যরাতে হারিয়ে যাওয়া 'প্যারাডাইস লস্ট'
ডাহুকের ছেঁড়াপালকে বজ্রাহত সুর
সমুদ্রমন্থনে ডিসকভারি 'ডেস্ট্রয়ার'
আমি বহুকাল ধরে পুড়ছি তোমার চোখের উনুনে
আমি জ্বলছি
বাসরত্যাগী 'হানযালা'র প্রেমের মতো
জমাটপাহাড়ের নিচে পারমাণবিক চুল্লির মতো
আমি জ্বলছি রাতের পাঁজরে, দিনের ঔরসে
আমি এভাবেই জ্বলি, জ্বলছি যুগযুগ ধরে;
তোমার উন্মুক্ত বন্দরে l
ড্রেসিং টেবিল কিম্বা পড়ার টেবিলে
আহসান জামান
তোমার ড্রেসিং টেবিলে
সেপ্টিপিনটির মতো আমিও
কেবল বসে থাকি, অপেক্ষায়।
চোখ ভর্তি কৌতুহল নিয়ে
তোমার চুল বাঁধা দেখি, কত যত্নে
নিজকে বানাও রোজ পূঁজোর প্রতিমা।
আমি ঠাঁই একা বসে দূরত্ব মাপি;
আয়নার অই পাশের তোমার সাথে এপাশের
সত্যিকারের তোমাকে।
প্রতিবিম্বের তুমি কেবলই পণ্য
ধরে আছো লাবণ্য, এপাশের তুমি
শিল্পী স্বপ্নময়ী; সাজাও রোজ অভিলাষে।
আমি সাদা বক পাখি অথবা
সারসের দীর্ঘ গ্রীবায় এক ব্যথিত
কাল ঘড়ি; ডাইরির পাতার মতো বসে
থাকি, তোমার পড়ার টেবিলে; নিরন্তর।
ভাগ্যলক্ষ্মী
এনাম আনন্দ
যেদিক তাকাই- শুধুই দেখি
বিদঘুটে অন্ধকার ও প্রেতাত্মাদের অশুভ ছায়া!
পুষ্প-তনুরা অঙ্কুরের অপেক্ষায়
পথপানে চেয়ে- নির্দ্বিধায় কাটিয়ে দিচ্ছি যুগের পর যুগ।
হয়তবা একদিন- দীপ্তশিখা নিয়ে
টগবগিয়ে ছুটে আসবে কোনো পথিক, দূর হবে অন্ধকার,
খুলে যাবে ভাগ্যের দুয়ার।
আলোর তেজস্ক্রিয়তায় দৌঁড়ে পালাবে অশুভ ছায়া।
সে আশায়-
বিপুল মুগ্ধতা নিয়ে সংসার সাজাই, স্বপ্ন দেখি,
দেখি প্রেয়সীনির হাস্যোজ্জ্বল মুখ।
নূর-উন-নাহার
সোমের কৌমুদী
ফিরে গিয়ে ফিরে আসা ত্বরান্বিত হলে
শর্বরী দুঃখ ভুলে হেসে উঠে; নূরময় নাহার।
যামিনী ঘুমিয়ে থাকে পরম সুখে নাহারের বুকে।
ফিরে গিয়ে ফিরে আসা ত্বরান্বিত হলে
সুবাসিত সত্যের সৌরভ ফের ছড়াবে,
স্নিগ্ধ কৌমুদী ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর বুকে।
ফিরে গিয়ে ফিরে আসা ত্বরান্বিত হলে
'সত্য' অমলিনই রবে ইস্রাফিলের শিঙার ফুৎকারে।
আমারও নিদ্রা ভাঙ্গুক
বিলকিস ঝর্ণা
শীতের তীব্রতা বাড়ে, হাটখোলার মাঠে ঘোড়া চড়ে
অঘ্রানে চাঁদের উঠানে রেডিও বাজে
যুদ্ধের খবরে ভরে যায় আমাদের ঘর।
কাস্টিম পাটের দাম বেড়ে যায়
হলুদ ঘাঁটি ফুলের মাঠে শীতল সন্ধ্যা নামে
তোমার কাটাছেঁড়া জ্যাকেটের পিঠে
রোজকার বিস্ফোরণ
যুদ্ধে বাঁচার কলাকৌশল সব পুরনো হয়
আর পুরনো হয় তোমার দুঃখও।
রাতের পাখিরা ঝিমোয়, দরজায় খিল আটা
তবুও পথের ফেরিওয়ালা হাঁকে
দরজা থেকে দরজায়-লাল নীল হলুদ বিলাসিতা।
পার্বণে পার্বণে বাঁশি বাজে
মেঘেদের গায়ে তার সুর কেটে যায়
মেঘেরা নিজের মত ছুটে পাহাড় থেকে পাহাড়ে
একটা পাখি কাকে যেন ডেকে যায় একা
আমারও নিদ্রা ভাঙ্গুক।
বিবর্ণ সময়
শারমিন নাহার ঝর্ণা
বিবর্ণ সময় যেন কচ্ছপের মত ধীরে ধীরে
পা ফেলে যায়,
চেনা সময় যেন অচেনার ভান ধরে
উদাসীন অপারগ।
সময়ের চোখে অসময়ী জাগ্রত ঘুম,
খিটখিটে মেজাজের চাদরে-
ঢাকা সময়ের অবয়ব।
মধুময় সময়ের শরীর ভালো নেই
মনটা ভীষণ খারাপ
জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে,
মাথা ব্যথা ও তো আছে।
একটু স্নেহ আদর যত্ন চাই তার,
জ্বরের জন্য চাই সোহাগের থার্মোমিটার,
তবেই সে সুস্থ হয়ে তাড়াবে বিবর্ণ সময়।
অপরাহ্ণ সুসমিতোর গল্প
১. মায়ের পেটে যাচ্ছি
ক্যাডেট কলেজ থেকে আমাকে রাসটিকেট করা হয় আমি যখন একাদশ শ্রেণি। আমি একা না, আমার সাথে আরো ৪ জন। ক্লাস সেভেনে আমাকে যখন বাবা ক্যাডেট কলেজে ভর্তি করান তার ছয় মাস পরেই আমি একদিন ছুটিতে বাসায় এসে গোঁ ধরি ক্যাডেটে আর পড়ব না। আমার কথা বাসায় কেউ পাত্তা দেয়নি।
আমাকে আমার বয়সের তুলনায় অনেক ছোট লাগতো। হস্টেলে রাতের আলো নিভে গেলে রুমমেট বড় ভাই আমাকে জড়িয়ে ধরতেন, চুমু খাওয়ার চেষ্টা করতেন। মনে হতো রুমমেট বড় ভাই পশু হচ্ছে রাতের অন্ধকারে। আমি ভয়ে কাঁপি। কাউকে কিছু বলতে পারি না। ক্যাডেটে বড় ভাইদের পানিশমেন্ট খুব তীব্র।
বাথরুমে লুকিয়ে বুক সেভ করতাম, মুখ সেভ করতাম যাতে আমার যেন তাড়াতাড়ি বুকে লোম ওঠে, দাড়িগোঁফ গজায়। আমাকে যেন ক্লাস সেভেনের চাইতে অনেক বড় দেখায়। ড্রিলে বেশি বেশি রোদে পুড়তাম যাতে আমার ফর্সা রঙটা যেন পুড়ে কালো হয়ে যায়। রুমে শর্টস পড়তে ভয় করত, রুমমেট চান্স পেলেই উরুতে হাত রাখেন। আমি অক্ষম চিৎকার করে উঠি। বাবার প্রতি, সমস্ত মানুষের প্রতি আমার ঘৃণা সেভিংস একাউন্টের মতো জন্ম নিতে থাকে।
আমি আস্তে আস্তে পকেটে চাকু রাখতে শুরু করি। ক্যাডেট কলেজে রোদ নামে সাঁওতাল অঞ্চলের মতো। শীত নামে, বর্ষার নিপুণ তীর ছুটে যায় আমার অজস্র কান্নার ক্ষুরধ্বনিতে। একাকী একাকী।
এস এস সিতে আমি সম্মিলিত মেধা তালিকায় দ্বিতীয় হলাম। বাসায় যেন ব্রাজিলীয় উৎসব। যেন বিশ্বকাপ জেতার আনন্দ। আমি নিরিবিলি মুষড়ে পড়তে থাকি। মিনমিন করে বাবাকে আবার বলতে থাকি, ক্যাডেট কলেজে পড়ব না। আমাকে নিয়ে এসো। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে দরখাস্ত পাঠানোর মতো আমার সবিনয় আবেদন বাবার কান স্পর্শ করল না।
একাদশ শ্রেনীতে উঠে একদিন ঘুটঘুটে রাতে রুমমেট বড়ভাইকে ছুরি চালাই। সমস্ত হাউস জুড়ে তুমুল চিৎকার। আমাদের রুম ভেসে গেল লাল ফুটফুটে জবা ফুলের মতো সুন্দর রক্তে। প্রিফেক্টসহ ক্যাডেট কলেজের সব কর্মকর্তা ছুটে এলো।
আমার নামে মামলা হলো, বহিষ্কৃত হলাম আমি।
না না। মেধাবী রুমমেট সুদর্শন বড় ভাই মারা যাননি। আমার অপটু ছুরি চালনা তার উরুতে লেগেছিল মাত্র। পেপারে নিউজ হলো। তখনি আমার মায়ের সাথে বাবার সম্পর্ক চুকেবুকে গেল। ছাড়াছাড়ি। বাবা তার গার্লফ্রেন্ড কাম একান্ত সচিবকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়া উড়াল দিলেন।
বাবা আমাকে ভোলেননি। আমাকে নিয়ে এলেন মেলবোর্নে। দিনভর বিয়ার খাই, টো টো করে ঘুরি। যদিও ভর্তি হয়েছিলাম মনাশ ই্উনিভার্সিটিতে। পড়াশুনায় আমার আর মন নেই। দিনভর ঘুমাই, ক্লাস করি না। রাত জাগি শহরের সাথে পাল্লা দিয়ে। বাবা মাঝে মাঝে আমাকে দেখতে আসেন। চুপচাপ হু হু করে কাঁদেন। আমার বিরক্ত লাগে।
বাবার ব্যবসা মেলবোর্নে ফুলতে থাকে।
একদিন দুপুর নাগাদ টাকার দরকার পড়ল খুব, বাসে করে যাচ্ছিলাম বাবার কাছে। মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডের পাশ দিয়ে আমার বাস। জানালা দিয়ে স্টেডিয়ামের চারপাশ দেখি। সেই স্বপ্নের গ্রাউন্ড। জলিমন্ট রোডে এসে দেখি রাস্তার একপাশে ভিড়, পুলিশের গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স।
শহরের স্বাভাবিক ছবি। আচমকা ভিড় গলে চোখ পড়ে একটা লোক রাস্তায় লম্বালম্বি পড়ে আছে। পায়ে ক্র্যাম্প ব্যান্ডেজ। বাস ড্রাইভারকে অনুরোধ করে ইমেইলের গতিতে নেমে যাই বাস থেকে। ছুটে যাই ভিড়ের কাছে। পুলিশ আটকে দিচ্ছে।
আমার বাবা রক্তাক্ত পড়ে আছে জলিমন্ট রোডে।
বাবার লাশ নিয়ে ছুটে চলে অ্যাম্বুলেন্স সাইরেন বাজিয়ে। ইয়ারা পার্কে আমি সবুজ হয়ে ঝিম মেরে বসে থাকি। পার্কটা কী যে সুন্দর! মনে হচ্ছে আমি সেই ক্লাস সেভেন। বাবার কনে আঙ্গুল ধরে হাঁটছি হাঁটছি। তির তির করে ছোট ছোট পা।
: বাবা ইয়ারা নদী দেখব
: ঐ তো
: বাবা চিম্বুক পাহাড়ে যাব
: ঐ তো
: বাবা আমি আর পড়ব না
: আচ্ছা বাবুইটা
: বাবা তোমার আঙ্গুল ছেড়ো না
: আচ্ছা বাবুই
দুপুরের রোদের তেজ কমে আসে মাখনের মতো নরোম প্রপাতে। আমি ছোট হতে থাকি ছোট হতে থাকি। মনে হচ্ছে ভ্রুণের মতো আমার মায়ের পেটে ঢুকে যাচ্ছি।
: মা আমাকে নাও। মা..
২. ময়মনসিংহ ভাতের দোকান
প্রতিদিন আমি তিনবেলা ভাত খাই। সিমের বিচি আর শিং মাছ দিয়ে ঝোলের সাথে মোটা চালের গরম ভাত আমার খুব প্রিয়। খাবার সময় কোনো কথা বার্তা বলি না। কারো সামনে বসেও খাওয়া আমার স্বভাবে নাই। বিরক্ত লাগে। বিয়ের দাওয়াত পেলে সকাল থেকে না খেয়ে থাকি যাতে রাতে দাওয়াতে পেট বোঝাই করে খেতে পারি আর টেবিলে একলা বসার চেষ্টা করি।
খাওয়ার সময় আমার বিশ্রী চপচপ শব্দ করি বলে আশেপাশের লোকজন খুব বিরক্ত হয়। সামনের দাঁত খুব বিশ্রী টাইপ উঁচু আমার এক বোন আছে, এ নিয়ে অনেক চড় থাপ্পড় দিয়েছে, স্বভাব আমার আর পাল্টায়নি। বরং বেড়েছে।
দাঁত উঁচু আমার এই বোনটার বিয়ে হয়েছিল বিসিএস ক্যাডারের এক কর্মকর্তার সঙ্গে। লোকটারও সামনের পাটির দাঁত উঁচু। আদর্শ জুটি। দুলাভাইয়ের ওখানে বেড়াতে গেলেই তিনি আমার সঙ্গে রসিকতা করতেন।
: শালা হা করো তো?
: কেন দুলাভাই?
: দেখি তো তোমার দাঁত, উঁচু দাঁতের বংশ কিনা তোমরা!
বলে তিনি খেকশিয়াল টাইপ শব্দ করে হাসতেন। রাগে দু:খে আমার চোখের পানি চলে আসত। দুলাভাই দুই হাতে ঘুষ খেতেন। এলাকায় মসজিদ বানানোর চাঁদার বই বানিয়ে নিতেন। লোকজন ওনার কাছে কাজে কর্মে এলে বলেন;
: দেখেন এখানে দুই নম্বর কোনো কারবার নেই। তবে খুশি হয়ে আমাদের এলাকার মসজিদের নামে যদি কিছু দান করতেন..
বলেই তিনি চাঁদার বইটা বাড়িয়ে দিতেন। লোকজন মহা আনন্দে দুলাভাইকে টাকা দিতেন। দুলাভাই এদিকে আপার নামে,তার মায়ের নামে জমি কেনে। আমার ভাগনেকে আবার টরন্টো পাঠিয়ে দিয়েছেন।
আপা খাবার টেবিলে আমাকে ডাকে না লজ্জায়। একাই খেতে ডাকে। প্রতিদিন বিকেলে ঘুরতে বেরুলে আমাকে পকেট ভর্তি করে টাকা দেয়। বুঝতে পারি দুলাভাইয়ের ঘুষের টাকা। খরচ করতে কী যে আরাম!
বিকেলের পকেট খরচ পেলেই রিক্সা করে গুলিস্তান। ওখানে একটা লাল সালু মাজার আছে। খাদেম আবার পার্ট টাইম গাঁজা বিক্রি করে। খাদেমের কাছ থেকে গাঁজা কিনেই সাঁ করে ঢুকে যাই পাশের গণ শৌচাগারে। শৌচাগারে ঢোকার মুখে বিশাল করে সাইনবোর্ড।
প্রস্রাব : ৩ টাকা
পায়খানা : ৫ টাকা
দুলা্ভাইয়ের ৫টাকা খরচ করে ঢুকে যাই নিরাপদখানায়। ভিতরে বসে সিগারেটের ভিতর গাঁজা পুরি। আহা ঘুষের টাকা..
সন্ধ্যা নামে চায়ের কাপের হাতল বেয়ে। টেম্পো নিই, নো শেয়ারিং। এক টানে পলাশী ব্যারাক। ওখানে একটা ভাতের দোকান আছে : মৈমনসিংহ ভাতের দোকান।
মালিক ময়মনসিংহের। আমি একবার ময়মনসিংহ বেড়াতে গেলে ওখানে আকুয়া চৌরঙ্গীরপাড়ে ওনার সাথে পরিচয় হয়, পরে খাতির। লোক ভালো। কেমনে কেমনে যেন লোকটার বউয়ের সাথে আমার মন মজে যায়। পুরো ময়মনসিংহ আমার দিওয়ান-ই-ইশক লাগে। মাঝে মাঝে ওনার বউ আর আমি ছায়াবানী সিনেমা হলে দুজন...
পলাশী ব্যারাকে লোকটাকে আবার দেখা পেয়ে পুরানো ইশক নদীচরের মতো জেগে ওঠে। মৈমনসিংহ ভাতের দোকানে আরাম করে ভাত খাই চপচপ শব্দ করে। কেউ বিরক্ত করে না। অনেক সময় নিয়ে গলা পর্যন্ত খাই। ঘেমে যাই খেতে খেতে। দম বন্ধ লাগে।
মালিক আমার খাওয়া দেখে খুব খুশি হয়। জানে আমি দিলদরিয়া কাস্টমার। সবাইরে বকশিষ দিই। বিল দেওয়ার সময় টাকা গুনি না। ক্যাশের সামনে এসে বড় একটা ঢেকুর তুলে পকেটে হাত ঢুকিয়ে যা আসে বিল দিই। বলি;
: রাখইনছেন। আমরা আমরাই তো। ভাবীজান কেমন আছেন?
লোকটা অনাবিল হাসি দেয়। অফুরন্ত টাকার কী মাজেজা!
: ইয়াল্লা কী যে করুইন না আফনে! বাসাত যাইন, পলাশের মা পলাশ বাসাতই ..
একটা সুগন্ধি সিগারেট ধরিয়ে পলাশী ব্যারাকের হলুদ বাসা গুলোর পাশ দিয়ে হাঁটতে থাকি। ভরপেটের হাঁটা। দুনিয়াটাকে বেহেস্ত লাগে।
পলাশদের বাসার সামনে এসে দাঁড়াতেই বুকের মাঝে ধুকধুক করে। কেমন যেন আবেশ লাগে। ইশক রৌশনাই লাগে। কলিং বেল চাপি চোখ বন্ধ করে। ভেতরে টিয়া পাখির ডাক দিয়ে কলিং বেল বেজে ওঠে ..
টের পাই আমার হৃদয় পার হয়ে যাচ্ছে ..
আকুয়া চৌরঙ্গীর মোড়, ছায়াবানী সিনেমা, অজন্তা সিনেমা, গৌরাঙ্গ বস্ত্রালয়, বিপিন পার্ক, সাহেব কোয়ার্টার, জয়নুল আবেদীন চিত্রশালা..ব্রহ্মপুত্র
আমি উড়ে যাচ্ছি, উড়ে যাচ্ছি...
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন