https://www.prothomalony.com/

878

literature

সাহিত্য

লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাস ও সাহিত্যে তার প্রভাব

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২২ ০২:২৮

লিটল-ম্যাগাজিনেওরা বড় স্বল্পায়ু। ওরা জন্ম নেয় মরে যাওয়ার জন্যে। প্রাণ না থাকলেও লিটল ম্যাগাজিন সম্পর্কে ইংরেজিতে কথাটি প্রচলিত। কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য লিটল ম্যাগাজিনকে পত্রিকা জগতে আলাদা করে চিহ্নিত করে রেখেছে। আকার কিংবা কলেবর নয়, বরং প্রচার প্রকাশ সংখ্যার ভিত্তিতেই এরা ছোট কাগজ বলে অভিহিত। ফেলিক্স পোলাক অধ্যাপক মার্ক ওলসনের সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে লিটল ম্যাগাজিন সম্পর্কে বলেছেন, “ একে ঠিক সংজ্ঞায়িত করা কঠিন । বর্ণনা করে বলার চেয়ে দেখে বোঝা সহজ।” কোন কোন সাহিত্য সমালোচক বলেছেন লিটল ম্যাগাজিন সাহিত্যে বেজে ওঠা প্রতিবাদের সুর। কারও কারও অভিমত, “অনেক ছোট্ট পরিসরে থেকেও পুরো জাতি বা বাইরের বিশ্বকে খুঁটিয়ে দেখার অভিপ্রায় লিটল ম্যাগাজিনের।” কন্ঠস্বর সম্পাদক অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ দৈনিক ইত্তেফাকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, “লিটল ম্যাগাজিন আর ব্যবসা এক সাথে যায় না।” দেশ পত্রিকায় দেয়া ১৯৫৩ সালের মে মাসের সংখ্যায় ‘সাহিত্য পত্র’ প্রবন্ধে বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন, “এক রকমের পত্রিকা আছে, যা আমরা রেলগাড়িতে সময় কাটাবার জন্য কিনি, আর গন্তব্য টেশনে নামার সময় ইচ্ছে করে গাড়িতে ফেলে যাই, যদি না কোনো সতর্ক সহযাত্রী সেটি আবার আমাদের হাতে তুলে দিয়ে বাধিত ও বিব্রত করেন। আর এক রকমের পত্রিকা আছে যা স্টেশনে পাওয়া যায় না, ফুটপাথে কিনতে হলেও বিস্তর ঘুরতে হয়, কিন্তু যা একবার আমাদের হাতে এলে আমরা চোখ বুলিয়ে সরিয়ে রাখি না, চেয়ে দেখে আস্তে আস্তে পড়ি, আর পড়া হয়ে গেলে গরম কাপড়ের ভাঁজের মধ্যে ন্যাপথলিনগন্ধী তোরঙ্গে তুলে রাখি, জল, পোকা আর অপহারকদের আক্রমণ থেকে বাঁচাবার জন্যে। যেসব পত্রিকা এই দ্বিতীয় শ্রেণীর অন্তর্গত হতে চায়, কৃতিত্ব যেটুকুই হোক, অন্ততপক্ষে নজরটা যাঁদের উঁচুর দিকে, তাঁদের জন্যে নতুন একটা নাম বেরিয়েছিল মার্কিন দেশে, চলতি কালের ইংরেজি বুলিতে এদের বলা হয়ে থাকে- ‘লিটল ম্যাগাজিন’।   আমেরিকায় লিটল ম্যাগাজিনের যাত্রা শুরু হয় আমেরিকান বিপ্লবের প্যাম্ফলেট হিসাবে। বিশ শতকেচর শুরুতে এরা নিজেদের প্রকৃত চেহারায় আবির্ভূত হয়। ১৮৪০ সালে বষ্টনে প্রথম প্রকাশিত হয় লিটল ম্যাগাজিন। ১৮৪০– ১৮৪৪ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়। সম্পাদক ছিলেন Ralph Waldo Emerson এবং Margaret Fuller . ১৮৯৬ সালে লন্ডনে প্রকাশিত হয় ‘দ্য স্যাভয়’। সম্পাদক Arther Simons. ভিক্টোরিয়ান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার উদারপন্থী ও সাম্যবাদী লেখকদের প্রধান বাহন ছিল এটি।   আমরা লিটল ম্যাগের কতিপয় সুনির্দিষ্ট বিষয় প্রত্যক্ষ করে এর স্বরূপ চিহ্নিত করার প্রয়াস পেয়ে থাকি। প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। প্রচলিত রীতি নীতি পরিপন্থী। প্রতিষ্ঠান বিরোধী। সীমিত প্রচার সংখ্যা। একটি নির্দিষ্ট মহৎ উদ্দেশ্য সামনে রেখে একজন, বা একদল সমমনা লেখকদের চিন্তার প্রতিফলন নিমিত্তে নিজেদের উদ্যোগ ও চেষ্টায় পত্রিকায় নিজেদের কথা বলা।   সাহিত্যক্ষেত্রে বিশ শতকের গোড়ার দিকে সবচেয়ে নামী লিটল ম্যাগাজিন ছিল ‘পোয়েট্রি’, যাকে বলা হতো ‘এ ম্যাগাজিন অব্ ভার্স’ বা ‘কবিতার পত্রিকা’। এটি শুরু হয় ১৯১২ সালে, সম্পাদক ছিলেন হেরিয়েট মনরো ও এজরা পাউন্ড। এই ম্যাগাজিন এতোটাই জনপ্রিয় ছিল যে, পোয়েট্রি-তে কোনো কবির কবিতা ছাপা হলে তাঁকে আর কখনো পিছে ফিরে তাকাতে হতো না।   প্রাচ্যে লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশনা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ, লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশনার মধ্য দিয়েই বঙ্গ সাহিত্যের উত্তরণ প্রক্রিয়ায় প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের সাহিত্যের সেতুবন্ধন গড়ে ওঠে। বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত বঙ্গদর্শনকে (১৮৭২) বাংলা ভাষার প্রথম লিটল ম্যাগাজিন ধরা হলেও, পাশ্চাত্যের আদলে প্রথাবিরোধী , মননশীল গদ্য নিয়ে বঙ্গদেশে যথার্থ লিটল ম্যাগাজিনের যাত্রা শুরু হয় মূলত: প্রমথ চৌধুরীর সবুজ পত্র দিয়ে ১৯১৪ সালে। সবুজপত্রের সফলতার পরে পরবর্তীকালে ১৯২৩– ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত কল্লোল, সওগাত, শিখা, কালি ও কলম, প্রগতি, পরিচয়, পূর্বাশা, কবিতা, চতুরঙ্গ, শনিবারের চিঠি পত্রিকাগুলি প্রভূত অবদান রেখেছে ও নতুন নতুন চিন্তার উন্মেষ ঘটিয়েছে।   ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পূর্ব পর্যন্ত বাংলা সাহিত্য সাংস্কৃতিক চর্চার কেন্দ্র ছিল কলকাতা। উপূ্র্যুক্ত পত্রিকাগুলি প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতা থেকে। এর বাইরে ঢাকায় ১৯২৭ সালে বুদ্ধদেব বসু ও অজিত কুমার দত্ত সম্পাদিত প্রগতি এবং কুমিল্লা থেকে ১৯৩১ সালে সঞ্জয় ভট্টাচার্য সম্পাদিত পূর্বাশা উল্লেখযোগ্য লিটল ম্যাগাজিন। ১৯৪৭ সালে চট্টগ্রাম থেকে মাহবুব আলম চৌধুরী ও সুচরিতা চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সীমান্ত। টানা পাঁচ বছর এটি প্রকাশিত হয় এবং ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে পত্রিকাটি স্মরণীয় হয়ে আছে। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ফজলে লোহানীর সম্পাদনায় ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত হয় ‘অগত্যা’। অগত্যা মধ্যবিত্ত ও নব্য নাগরিক জীবন ও বুর্জোয়া মানবতাবাদী মানসিকতার প্রতিফলন ঘটায়, যা সেই সময় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত এনামুল হকের সম্পাদনায় ‘উত্তরণ’ ম্যাগাজিনটি বাংলাদেশের লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। ফজল শাহাবুদ্দীনের সম্পাদনায় ‘কবিকণ্ঠ’ , সাইদুর রহমানের ‘খাপছাড়া’ , মহিউদ্দীন আহমেদের ‘স্পন্দন’ , সিরাজুর রহমান সম্পাদিত ‘সংকেত’ পন্চাশ দশকের লিটল ম্যাগ আন্দোলনকে গতিশীল করে। একুশে ফেব্রুয়ারীকে কেন্দ্র করে এ সময়ে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অনেক সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ষাটের দশক সামাজিক ও রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের দিক নির্দেশ করেছে। ইতিহাসের বাঁক বদল চিহ্নিত করে তার দাগ টেনে রেখেছে । সাহিত্য সংস্কৃতিতেও এর প্রভাব পড়েছে। এসময় লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন জোরদার হয়। এই দশকে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তারকারী লিটল ম্যাগাজিনগুলি যথাক্রমে: সপ্তক,বক্তব্য,স্বাক্ষর, স্যাড জেনারেশন, সাম্প্রতিক, কালবেলা, কন্ঠস্বর, ছোটগল্প, না, বহুবচন, স্বদেশ, শব্দের বিকৃতি, শিল্পকলা প্রভৃতি।   স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম লিটল ম্যাগাজিন ‘মুখপত্র’ ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয়, সম্পাদক ওবায়দুল ইসলাম ও মুহম্মদ হাবিবুল্লাহ। এরপর মফিদুল হক সম্পাদিত গণসাহিত্য (১৯৭২) পত্রিকাটি প্রগতিশীল লেখকদের সাহিত্যের একটি স্বতন্ত্র ধারা গড়ে তুলেছিল। তিতাশ চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় অলক্ত। উল্লেখিত পত্রিকাগুলি আমাদের সাহিত্যধারায় বিশেষ অবদান রাখে। মধ্য সত্তরে আবিদ আজাদের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘কবি’।পত্রিকাটিতে সমকালীন কবিদের বিশ্লেষণধর্মী কবিতা প্রকাশিত হয়। মধ্য সত্তর পরবর্তী রাজনৈতিক সঙ্কট ও পালাবদলে মধ্য সত্তরের পর থেকে আশির দশক লিটল ম্যাগাজিন ও আমাদের সামগ্রিক সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্র বিপদাপন্ন হয়। এই সঙ্কটময় সময় ও পরিস্থিতিতেও উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিন আবুল কাশেম ফজলুল হক সম্পাদিত ‘লোকায়ত’ ( ১৯৮২) , পত্রিকাটি প্রায় তিন দশক তরুণ সমাজের চিন্তার জগতকে প্রভাবিত করে রেখেছিল। তপন বড়ুয়া সম্পাদিত ‘গান্ডীব’ সমকালীন প্রগতিশীল নতুন লেখকদের সাহিত্যচর্চার চারণভূমি ছিল। সরকার আশরাফ সম্পাদিত পর্যায়ক্রমে বগুড়া ও ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘নিসর্গ’ গত সাড়ে তিন দশক ধরে নিরলস ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। খোন্দকার আশরাফ হোসেন সম্পাদিত ‘একবিংশ’ কবিতা ও কবিতা বিষয়ক লিটল ম্যাগাজিন, মিজানুর রহমান সম্পাদিত ‘মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা’ (১৯৮৩) , বদর উদ্দীন ওমর সম্পাদিত ‘সংস্কৃতি’ , আবু ইউসুফ সম্পাদিত ‘আত্মপ্রতিকৃতি’ মোহাম্মদ শাকের উল্লা সম্পাদিত ‘ঊষালোক’ ম্যাগাজিনগুলি বাংলাদেশে মুক্তবুদ্ধি চর্চার ক্ষেত্র প্রসারিত করেছে।   সাহিত্যে লিটল ম্যাগাজিনের প্রভাবঃ অর্থনীতি আর প্রযুক্তির মেরুকরণে হারিয়ে গেছে অনেক লিটল ম্যাগাজিন। মনে হতে পারে আর্থিক কারণেই এসব পত্রিকা দীর্ঘজীবী হতে পারে না। কিন্তু সেটাই সবটুকু নয়। স্বল্পায়ু হওয়াই এদের ধর্ম। বিশেষ কোনো সময়ে, বিশেষ কোনো ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর মাধ্যমে, বিশেষ কোনো একটি কাজ নিয়ে এরা আসে, কর্ম সম্পন্ন করে বিদায় নেয়। তবে ছাপ রেখে যায়, তার অস্তিত্বের জানান দিয়ে যায়, কালের যাত্রায় তাদের কথা রয়ে যায় কোথাও না কোথাও, আমাদের সাহিত্যের নিজস্ব রুপরেখা তৈরীতে, নব নব ধারায়, নতুন ভাষায়, নতুন দিনের কথায়। আমরা পূর্বেই বলেছি, ‘পোয়েট্রি’— ‘ এ ম্যাগাজিন অব্ ভার্স’ পত্রিকায় নতুন কবিদের কবিতা প্রকাশিত হয়ে গেলে তাঁর আর পীছু তাকাবার প্রয়োজন হয়নি। বাংলা সাহিত্যে সবুজপত্র, কল্লোল, বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকা নতুন সাহিত্য নির্মাণে, নতুন শক্তিশালী লেখক ও কবি চিনিয়ে দিতে, বাংলা সাহিত্যের আধুনিক ধারার সুদৃঢ় ভিত্তি রচনায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। কৃত্তিবাস সুনীল গঙ্গাপাধ্যায়কে আলাদা করে চিনিয়েছে। বাংলা সাহিত্যে ব্যতিক্রমী অথচ সতেজ, সাবলীল, নিজস্ব ভাষা-ভঙ্গি নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন, নিম অন্নপূর্ণা, তাহাদের কথা, অন্তর্জলি যাত্রা’র স্রষ্টা কমল কুমার মজুমদার। বাংলাদেশে — সমকাল, কন্ঠস্বর, অগত্যা প্রভৃতি লিটল ম্যাগাজিন বাংলাদেশের নব সাহিত্য ধারাকে সচল রেখেছে। খোন্দকার আশরাফ হোসেনের সম্পাদনায় ‘একবিংশ’, সরকার আশরাফ সম্পাদিত ‘নিসর্গ’, নব্বই ও শূন্য দশকে এক ঝাঁক প্রতিভাবান কবিকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে, যাঁরা নিজেদের সৃজনশীলতা দিয়ে বাংলা কবিতায় স্থান করে নিয়েছেন। সাহিত্যের বিকাশে, নতুন ধারা নির্মাণে, জনমানসে তার প্রভাব ফেলতে লিটল ম্যাগাজিনের উজ্জ্বল ভূমিকা ছিল, আছে , থাকবে।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন