https://www.prothomalony.com/
18554
religion
খতীব, নূরে মদীনা জামে মসজিদ, সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম।
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬ ০১:৪৭
সামাজিক জীবনে ভুল বোঝাবুঝি ও মান-অভিমান খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু মুমিন হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো এই সাময়িক দূরত্বকে স্থায়ী ফাটলে পরিণত হতে না দেওয়া। কারণ দুটি হৃদয়ের দূরত্বই শয়তানের সবচেয়ে বড় সফলতা। অহংকার বা ইগোকে পায়ে মাড়িয়ে কীভাবে আবার সম্পর্কের সেতুবন্ধন শক্ত করা যায়, ইসলামে রয়েছে তার চমৎকার নির্দেশনা। এই নিবন্ধে সুন্নাহসম্মত কিছু কার্যকর উপায় আলোচনা করা হলো।
প্রথমে বুঝতে হবে, আপনার দ্বীনি ভাইয়ের সাথে আপনার দূরত্বে সবচেয়ে বেশি খুশি হয় কে? সে আর কেউ নয়, ইবলিস। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আরব উপদ্বীপের মুসলমানদের কাছ থেকে আনুগত্য পাওয়ার ব্যাপারে শয়তান নিরাশ হয়ে গেছে, কিন্তু তাদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ ও মনোমালিন্য সৃষ্টির ব্যাপারে সে নিরাশ হয়নি (সহিহ মুসলিম: ২৮১২)। তাই যখনই আপনি আপসের জন্য হাত বাড়াবেন, মনে রাখবেন আপনি শুধু বন্ধুর মান ভাঙাচ্ছেন না, বরং শয়তানকে পরাজিত করছেন। এটি নিজের আত্মার বিরুদ্ধে একটি জিহাদ।
আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু আমাদের আমিত্ব। আমরা ভাবি, ভুল করেছে সে, আমি কেন আগে সালাম দেব? অথচ শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ উল্টো। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কোনো মুসলিমের জন্য বৈধ নয় যে, সে তার ভাইয়ের সাথে তিন দিনের বেশি কথা বন্ধ রাখবে; আর তাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে প্রথমে সালাম দিয়ে কথা শুরু করে (সহিহ বুখারি: ৬০৭৭)। অতএব আজই ফোনটা হাতে নিন, সালাম দিন, কুশল জিজ্ঞেস করুন। এই ছোট্ট পদক্ষেপ পাহাড়সম অভিমান গলিয়ে দিতে পারে। নবীজি আরও বলেন, আমি কি তোমাদের এমন একটি কাজের কথা বলব না, যা করলে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি হবে? তা হলো তোমাদের মধ্যে সালামের প্রসার ঘটানো (সহিহ মুসলিম; মিশকাত: ৪৬৩১)। সাক্ষাতে হাত মিলিয়ে মুসাফাহা করাও গুরুত্বপূর্ণ, কেননা নবীজি বলেছেন, দুজন মুসলিম সাক্ষাৎ করে মুসাফাহা করলে আলাদা হওয়ার আগেই তাদের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয় (সুনানে আবু দাউদ: ৫২১২)।
উপহার বিনিময় মনের কালিমা দূর করার আরেকটি কার্যকর মাধ্যম। অনেক সময় মুখে সরি বলা কঠিন হয়ে পড়ে, তখন একটি বই বা এক শিশি আতর নীরবে বলে দেয়, আপনি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা একে অপরকে উপহার দাও, তাতে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি হবে (আল-আদাবুল মুফরাদ: ৫৯৪)। যে উপহার নিয়ে এগিয়ে যায়, সে মূলত নিজের অহংকারকেই বিসর্জন দেয়।
সোমবার ও বৃহস্পতিবারের কথাও স্মরণ করা দরকার। এই দুই দিন আল্লাহর দরবারে বান্দার আমলনামা পেশ করা হয় এবং সবাইকে ক্ষমা করা হয়, কেবল সেই দুজন ছাড়া যাদের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ রয়েছে; বলা হয়, এদের ছেড়ে দাও যতক্ষণ না তারা আপসে মীমাংসা করে নেয় (সহিহ মুসলিম: ২৫৬৫)। ভেবে দেখুন, আপনি তাহাজ্জুদ পড়ছেন, সিয়াম রাখছেন, দান করছেন, অথচ শুধু ভাইয়ের সাথে কথা না বলার কারণে আপনার ক্ষমার বিষয়টি আল্লাহর দরবারে ঝুলে আছে। এর চেয়ে বড় আফসোস আর কী হতে পারে?
অধিকাংশ দূরত্ব তৈরি হয় কুধারণা থেকে। তাই অন্যের কথা বা কাজ শুনে নেতিবাচক মন্তব্য না করে তার জন্য ওজর তালাশ করুন। জাফর ইবনে মুহাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তোমার ভাইয়ের কোনো আচরণ অপছন্দ হলে তার জন্য সত্তরটি পর্যন্ত অজুহাত খোঁজো (শুআবুল ঈমান: ৭৯৯১)। মুহাম্মাদ ইবনে সিরিন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তুমি যদি তোমার ভাইয়ের মন্দ কিছু আঁচ করতে পারো, তবে তার ওজর গ্রহণ করো; কোনো ওজর না পেলে বলো, হয়তো তার এমন ওজর আছে যা আমি জানি না (বায়হাকি)। আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মুমিন অন্যের ওজর খোঁজে, আর মুনাফিক অন্যের ভুল-ত্রুটি খোঁজে (ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন: ২/১৭৭)। আল্লাহ তায়ালাও অনুমান করে সিদ্ধান্ত নিতে নিষেধ করেছেন, কেননা কিছু ধারণা পাপ (সূরা হুজুরাত: ১২)। তাই অনুমানের ধোঁয়াশা জমতে না দিয়ে সরাসরি কথা বলে সত্যটা জেনে নেওয়াই উত্তম। একটি খোলামেলা কথোপকথন নিমিষেই অভিমান দূর করতে পারে।
ক্ষমা চেয়ে নেওয়া বা ছাড় দেওয়াও সম্পর্ক রক্ষার অন্যতম চাবিকাঠি। অনেক সময় আমরা তর্কে জিতে যাই, কিন্তু তর্কে জিততে গিয়ে প্রিয় মানুষকে হারিয়ে ফেলি। তাই কখনো কখনো শতভাগ সঠিক হয়েও সম্পর্ক জোড়া লাগানোর স্বার্থে একটু নত হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি হকের উপর থাকা সত্ত্বেও তর্ক পরিহার করে, আমি তার জন্য জান্নাতের মাঝখানে একটি ঘরের জিম্মাদার (সুনানে আবু দাউদ: ৪৮০০)। কারও প্রতি রাগ বা অভিমান পুষে রাখা মানে নিজের বুকের উপর একটি ভারী পাথর চাপিয়ে রাখা, যা অপরপক্ষের চেয়ে আপনাকেই বেশি ক্ষতবিক্ষত করে। যখন বলে দেন, যা হয়েছে ভুলে যাও, আমিই দুঃখিত, তখন সেই বোঝা নেমে গিয়ে মনে প্রশান্তি আসে। আল্লাহ বলেন, তুমি ক্ষমার নীতি গ্রহণ করো (সূরা আরাফ: ১৯৯)। নবীজি বলেন, তোমার সাথে যে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তুমি তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখো (মুসনাদে আহমাদ: ১৭৪৮৮)। তিনি আরও বলেন, ক্ষমার মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার সম্মান বৃদ্ধিই করেন, আর যে আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয় আল্লাহ তার মর্যাদা উঁচু করে দেন (সহিহ মুসলিম: ২৫৮৮)।
রাগের মুহূর্তে প্রতিপক্ষের দোষ না খুঁজে তার ভালো গুণ এবং আপনার দুর্দিনে তার অবদানের কথা স্মরণ করুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন, যে মানুষটি একসময় আপনার উপকার করেছিল, সামান্য মতভেদের কারণে তাকে কি ভুলে যাওয়া উচিত? কৃতজ্ঞচিত্তে তার অবদান মূল্যায়ন করলে দেখবেন মনের জমে থাকা অভিমান ধুলোর মতো উড়ে গেছে। এভাবে ক্ষমা করা এবং সম্পর্ক জোড়া লাগানো অনেক সহজ হয়ে যায়।
একই দস্তরখানে বসে খাবার ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেও এক অলৌকিক শক্তি রয়েছে। একটি আন্তরিক দাওয়াত নীরবে জানিয়ে দেয়, দ্বন্দ্বের চেয়ে মানুষটি আমার কাছে অনেক বেশি দামি। তাই অযথা জেদ ধরে না থেকে প্রতিপক্ষকে আজই নিমন্ত্রণ জানান। আপ্যায়নের মিষ্টতায় সম্পর্কের ফাটল নিমিষেই জোড়া লেগে যেতে পারে।
যখন দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিনের নীরবতা চলে, তখন সরাসরি কথা বলতে অনেকের আত্মসম্মানে বাধে। এমন অবস্থায় তৃতীয় পক্ষের সাহায্য নিন। এমন একজন কমন বন্ধু, শ্রদ্ধেয় শিক্ষক বা মুরব্বিকে বেছে নিন, যিনি উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য, বিশ্বস্ত ও প্রজ্ঞাবান, যিনি গোপনীয়তা রক্ষা করেন এবং আগুনে ঘি না ঢেলে পানি ঢালতে জানেন। একা গুমরে মরার চেয়ে কারও সাহায্য নিয়ে সম্পর্ক বাঁচানো অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ।
সবশেষে, যখন দুনিয়ার সব কৌশল ব্যর্থ হয়, তখন দোয়ার শক্তিই অসম্ভবকে সম্ভব করে। কারও সাথে ঝগড়া হলে মানুষের কাছে তার সম্পর্কে বাজে মন্তব্য না করে দুই রাকাত সালাত পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে বলুন, হে আল্লাহ, আমাদের শয়তানের প্ররোচনা থেকে রক্ষা করুন, হে অন্তর পরিবর্তনকারী, তার মনকে আমার প্রতি নরম করে দিন, আমাদের মাঝের দূরত্ব ঘুচিয়ে দিন। যার জন্য আপনি কেঁদে কেঁদে আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন, তার প্রতি আপনার মনে ঘৃণা বা হিংসা বেশিক্ষণ টিকতে পারে না। ইয়াকুব আলাইহিস সালাম সন্তানদের আচরণে কষ্ট পেয়ে বলেছিলেন, আমি আমার অসহনীয় বেদনা ও দুঃখ কেবল আল্লাহর কাছেই নিবেদন করছি (সূরা ইউসুফ: ৮৬)। ফলস্বরূপ আল্লাহ তাঁর হারানো সম্পর্কগুলো অভাবনীয়ভাবে জোড়া লাগিয়ে দিয়েছিলেন। দোয়া সেই অদৃশ্য সুতো, যা ছিঁড়ে যাওয়া সম্পর্ককে এমনভাবে সেলাই করে দেয়, যেন তা কখনো ছিঁড়ে যায়নি।
মান-অভিমান করে নিজেকে একা করে ফেলা উচিত নয়। দুনিয়া অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। আজ যার সাথে কথা বলছেন না, কাল হয়তো তার জানাজার খবর আসতে পারে, তখন আফসোসের সীমা থাকবে না। আল্লাহ তায়ালা জান্নাতীদের গুণাবলি বর্ণনা করে বলেন, যারা রাগ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে দেয়, আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন (সূরা আলে ইমরান: ১৩৪)। তাই আসুন, আজই আমাদের মান-অভিমানের দেয়াল ভেঙে ফেলি এবং ইগোকে পদদলিত করে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিই। কারণ সম্পর্ক জোড়া লাগানো দুর্বলতা নয়, বরং ঈমানের পূর্ণতা। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে সেই তাওফিক দান করুন। আমীন।
আধুনিক সমাজে তাওহীদী চেতনার গুরুত্ব
আব্দুল্লাহ শুয়াইব
শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম।
বর্তমান বিশ্ব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে। মানুষের জীবনযাত্রা হয়েছে অনেক সহজ ও আরামদায়ক। যোগাযোগ, চিকিৎসা, শিক্ষা, শিল্প ও অর্থনীতিতে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। কিন্তু বাহ্যিক এই উন্নতির বিপরীতে মানুষের আত্মিক প্রশান্তি, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। মানুষ আজ অর্থ, সম্পদ, ক্ষমতা ও ভোগবিলাসের পেছনে ছুটতে গিয়ে জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ভুলে যাচ্ছে। হতাশা, অস্থিরতা, হিংসা, বিদ্বেষ ও আত্মকেন্দ্রিকতা আধুনিক সমাজের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। অথচ মানুষের প্রকৃত সফলতা কেবল বস্তুগত উন্নতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তার অন্তরের প্রশান্তি, নৈতিক চরিত্র এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি আনুগত্যের মধ্যেই নিহিত। এই সংকট থেকে উত্তরণের অন্যতম প্রধান উপায় হলো তাওহীদী চেতনার প্রতিষ্ঠা। তাওহীদ কেবল একটি ধর্মীয় বিশ্বাস নয়; বরং এটি মানুষের চিন্তা, চেতনা, জীবনবোধ ও কর্মপদ্ধতিকে পরিচালিত করার পূর্ণাঙ্গ আদর্শ।
তাওহীদ অর্থ একত্ববাদ। ইসলামী পরিভাষায় মহান আল্লাহকে তাঁর সত্তা, গুণাবলি, ইবাদত ও সার্বভৌম কর্তৃত্বে এক ও অদ্বিতীয় বলে বিশ্বাস করাকে তাওহীদ বলে। আল্লাহই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রিযিকদাতা এবং ইবাদতের একমাত্র যোগ্য সত্তা। তাঁর কোনো শরীক নেই। তাওহীদ ইসলামের মূল ভিত্তি এবং সকল নবী-রাসূলের দাওয়াতের কেন্দ্রীয় বিষয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি প্রত্যেক জাতির কাছে রাসূল পাঠিয়েছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগূত থেকে দূরে থাকো’ (সূরা আন-নাহল, ১৬ : ৩৬)। এ আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, মানবজাতির প্রতি সকল নবী-রাসূলের প্রধান আহ্বান ছিল এক আল্লাহর ইবাদত প্রতিষ্ঠা করা এবং শিরক থেকে মুক্ত থাকা।
মানুষ কেন পৃথিবীতে এসেছে এবং তার জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী এই মৌলিক প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেয় তাওহীদ। আধুনিক সমাজে অনেকে জীবনকে কেবল ভোগ, উপার্জন ও পার্থিব সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে করে। কিন্তু ইসলাম মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, তার সৃষ্টি কোনো উদ্দেশ্যহীন ঘটনা নয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি’ (সূরা আয-যারিয়াত, ৫১ : ৫৬)। অর্থাৎ মানুষের জীবনের মূল লক্ষ্য আল্লাহর দাসত্ব ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন। এই বিশ্বাস মানুষের জীবনকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য প্রদান করে। সে বুঝতে পারে, তার শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা, পরিবার পরিচালনা, সামাজিক দায়িত্ব—সবকিছুই আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালিত হলে ইবাদতে পরিণত হতে পারে।
আধুনিক মানুষ নানা ধরনের মানসিক অস্থিরতা ও হতাশায় ভুগছে। জীবনে প্রয়োজনীয় সব উপকরণ থাকা সত্ত্বেও অনেকের মনে প্রশান্তি নেই। এর অন্যতম কারণ হলো সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে মানুষের আত্মিক সম্পর্কের দুর্বলতা। তাওহীদ মানুষকে শেখায় যে, সকল ক্ষমতা ও কল্যাণের মালিক একমাত্র আল্লাহ। তাই বিপদে সে হতাশ হয় না, সফলতায় অহংকারী হয় না এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন থাকে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে’ (সূরা আর-রা‘দ, ১৩ : ২৮)। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘মুমিনের বিষয়টি কতই না আশ্চর্যজনক! তার প্রতিটি বিষয়ই কল্যাণকর। সে সুখ লাভ করলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, যা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর দুঃখ-কষ্টে আক্রান্ত হলে ধৈর্য ধারণ করে, তাও তার জন্য কল্যাণকর হয়’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৯৯)। তাওহীদী বিশ্বাস মানুষকে এই ভারসাম্যপূর্ণ জীবনবোধ শিক্ষা দেয়।
বর্তমান সমাজে দুর্নীতি, প্রতারণা, মিথ্যাচার, সুদ, ঘুষ, আত্মসাৎ ও অনৈতিকতার বিস্তার একটি বড় সমস্যা। শুধু আইন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব অপরাধ সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন মানুষের অন্তরে এমন বিশ্বাস সৃষ্টি করা, যা তাকে প্রকাশ্যে ও গোপনে অন্যায় থেকে বিরত রাখবে। তাওহীদ মানুষকে এই শিক্ষা দেয় যে, সে যেখানেই থাকুক না কেন, মহান আল্লাহ তাকে দেখছেন এবং তার প্রতিটি কাজের হিসাব গ্রহণ করবেন। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর পর্যবেক্ষক’ (সূরা আন-নিসা, ৪ : ১)। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘তুমি যেখানেই থাকো, আল্লাহকে ভয় করো’ (জামে‘ আত-তিরমিযী, হা/১৯৮৭)। ফলে তাওহীদী চেতনায় উজ্জীবিত ব্যক্তি মানুষের অনুপস্থিতিতেও অন্যায় করতে ভয় পায়। তার কাছে সততা, আমানতদারি ও ন্যায়পরায়ণতা কেবল সামাজিক গুণ নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম।
তাওহীদ মানুষের সামনে এমন এক সাম্যের আদর্শ তুলে ধরে, যেখানে বংশ, গোত্র, ভাষা, বর্ণ, অর্থ ও সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠত্বের কোনো সুযোগ নেই। সকল মানুষ একই স্রষ্টার সৃষ্টি এবং সবাই তাঁরই বান্দা। ফলে কোনো মানুষ অন্য মানুষের ওপর জন্মগতভাবে শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই অধিক সম্মানিত, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াসম্পন্ন’ (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯ : ১৩)। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিদায় হজ্জের ভাষণে মানুষের পারস্পরিক শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হিসেবে তাকওয়াকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাওহীদী চেতনা মানুষকে মানুষের গোলামী থেকে মুক্ত করে একমাত্র আল্লাহর দাসত্বে আবদ্ধ করে। এর ফলে সমাজে অহংকার, বর্ণবাদ, শ্রেণিবৈষম্য ও শোষণের পরিবর্তে ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা ও পারস্পরিক সম্মান প্রতিষ্ঠিত হয়।
একটি আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য ন্যায়বিচার অপরিহার্য। কিন্তু ব্যক্তিস্বার্থ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে সমাজে ন্যায়বিচার প্রায়ই বাধাগ্রস্ত হয়। তাওহীদী বিশ্বাস মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আল্লাহর কাছে প্রত্যেককে তার কর্মের জবাবদিহি করতে হবে। তাই নিজের স্বার্থের বিপরীত হলেও সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো মুমিনের দায়িত্ব। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং আল্লাহর জন্য সাক্ষ্যদাতা হও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে যায়’ (সূরা আন-নিসা, ৪ : ১৩৫)। এই নির্দেশনা বাস্তবায়িত হলে বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পারিবারিক জীবনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সহজ হয়।
আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সম্পদ অর্জনকে অনেক সময় জীবনের একমাত্র সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর ফলে সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, মজুতদারি ও অন্যায়ভাবে সম্পদ ভোগের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। অথচ তাওহীদী চেতনা মানুষকে শেখায় যে, সম্পদের প্রকৃত মালিক আল্লাহ এবং মানুষ কেবল এর দায়িত্বশীল ব্যবহারকারী। তাই সম্পদ অর্জন ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান মেনে চলতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না’ (সূরা আল-বাকারা, ২ : ১৮৮)। তাওহীদ মানুষকে হালাল উপার্জন, যাকাত প্রদান, দান-ছাদাকাহ এবং অসহায় মানুষের অধিকার আদায়ে উৎসাহিত করে। ফলে সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়।
বর্তমান যুগে প্রযুক্তির উন্নতির পাশাপাশি নাস্তিক্যবাদ, ধর্মহীনতা, বস্তুবাদ, নৈতিক অবক্ষয় ও ভোগবাদী সংস্কৃতির বিস্তার ঘটছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, অশ্লীলতা, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা নতুন প্রজন্মকে নানাভাবে প্রভাবিত করছে। এসব সংকট মোকাবিলায় কেবল বাহ্যিক পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন চিন্তা ও বিশ্বাসের পরিবর্তন। তাওহীদ মানুষকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধানকে সর্বোচ্চ মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করতে শেখায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর অবতীর্ণ বিধান অনুযায়ী বিচার করে না, তারাই কাফির’ (সূরা আল-মায়েদাহ, ৫ : ৪৪)। অতএব, ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে আল্লাহর নির্দেশনার প্রতি আনুগত্য প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য।
আধুনিক সমাজের বহুমুখী সংকটের অন্যতম কারণ হলো মানুষের জীবন থেকে তাওহীদী চেতনার অনুপস্থিতি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন মানুষের বস্তুগত প্রয়োজন পূরণ করতে পারে, কিন্তু আত্মিক প্রশান্তি, নৈতিকতা ও পরকালীন মুক্তি নিশ্চিত করতে পারে না। এসবের জন্য প্রয়োজন আল্লাহর প্রতি বিশুদ্ধ বিশ্বাস, তাঁর বিধানের অনুসরণ এবং রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদর্শে জীবন পরিচালনা। তাই ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাওহীদী চেতনার বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে হবে। কেবল মুখে তাওহীদের স্বীকৃতি নয়; বরং চিন্তা, বিশ্বাস, ইবাদত, চরিত্র ও কর্মে তার বাস্তবায়নই পারে একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে বিশুদ্ধ তাওহীদের ওপর অটল থেকে জীবন পরিচালনার তাওফীক দান করুন। আমীন।
ধর্ম থেকে আরো পড়ুন