https://www.prothomalony.com/
18557
new-york
নিউইয়র্কে শাস্ত্রীয় নৃত্যের দুই ঐতিহ্যবাহী ধারা কুচিপুড়ী ও কত্থককে ঘিরে জামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়েছে নীলা ড্যান্স একাডেমির বিশেষ আয়োজন ”নৃত্য অর্পণ”। ১ নভেম্বর রোববারের এ আয়োজনে একাডেমির শিক্ষার্থীরা সরাসরি পেশাদার কর্ণাটকী ও হিন্দুস্তানি সংগীতশিল্পীদের সঙ্গতে নৃত্য পরিবেশন করেন। ”নৃত্য অর্পণ” নামের মধ্যেই ছিল আয়োজনটির মূল ভাবনা। সংস্কৃত নৃত্য ও অর্পণ’ শব্দের সমন্বয়ে অনুষ্ঠানটি ছিল ধ্রুপদি নৃত্য ও সংগীতের ঐতিহ্য, গুরুদের শিক্ষা এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পচর্চার প্রতি এক নিবেদন।
.jpg)
সন্ধ্যার প্রথম পর্বে ছিল ধ্রুপদি নৃত্যধারা কুচিপুড়ী। এ পর্বে একাডেমির নবিন শিল্পীরা কাশীনাধা শব্দম, যতিস্বর, শ্রী সরস্বতী নমস্তুতে, রামায়ণ শব্দম, বৃন্দাবনী সারং তিল্লানা ও মঙ্গলম পরিবেশন করেন। নৃত্যের ছন্দ, পদচারণা ও অভিব্যক্তির পাশাপাশি পৌরাণিক কাহিনি ও ভক্তিরসের নানা অনুষঙ্গ উঠে আসে এসব পরিবেশনায়। রামায়ণ শব্দমে কুচিপুড়ীর অভিনয় ভঙ্গির মধ্য দিয়ে রামায়ণের কাহিনি তুলে ধরা হয়। আর মঙ্গলমে দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী ও সরস্বতীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে কুচিপুড়ী পর্বের সমাপ্তি ঘটে। কুচিপুড়ী নৃত্য পরিবেশনায় ছিল দক্ষিণ ভারতীয় কর্ণাটকী সংগীতের সরাসরি সহযোগিতা। অর্কেস্ট্রায় কণ্ঠে ছিলেন অবন্তিকা শ্রীনিবাসান, মৃদঙ্গমে কাবিলান জেগানাথান এবং বেহালায় তানিশা শ্রীবৎস। তাঁদের লাইভ সংগীতের সঙ্গে শিক্ষার্থীরা কুচিপুড়ির ছন্দ, পদচারণা ও অভিনয় পরিবেশন করেন।
এরপর মঞ্চে আসে শাস্ত্রীয় নৃত্যধারা কত্থক। গণেশ বন্দনা দিয়ে শুরু হওয়া এ পর্বে পরিবেশিত হয় তিনতাল, ঝাঁপতাল, সরগম, তারানা এবং গৎ নিকাস ও তিহাই । কত্থকের সূক্ষ্ম পদচারণা, তাল-লয়ের বৈচিত্র্য, ঘূর্ণন ও অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা এ ধ্রুপদি নৃত্যধারার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন। বিশেষ করে তিনতাল ও ১০ মাত্রার ঝাঁপতালের পরিবেশনায় কথকের ছন্দ ও লয়ের বিন্যাস গুরুত্ব পায়। কত্থক পর্বে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছিল উত্তর ভারতীয় হিন্দুস্তানি সংগীতের লাইভ অর্কেস্ট্রা। কণ্ঠে ছিলেন বাংলাদেশী সঙ্গীতশিল্পী ফটিক চৌধুরী, তবলায় মাইক লাকশিস এবং সারেঙ্গিতে রোহান মিশ্র। তাঁদের সরাসরি সঙ্গতে পরিবেশিত হয় কত্থকের বিভিন্ন নৃত্যরচনা। নীলা ড্যান্স একাডেমির নৃত্যগুরু ড. নীলা জেরীন তাঁর শিক্ষার্থীদের পরিবেশনার জন্য এই দুই স্বতন্ত্র লাইভ অর্কেস্ট্রাকে পরিচালনা ও সমন্বয় করেন।
.jpg)
অনুষ্ঠানের সম্মানিত অতিথি ছিলেন কর্ণাটকী সংগীত, পাশ্চাত্য ধ্রুপদি পিয়ানো ও ভরতনাট্যমে প্রশিক্ষিত গুণীজন শ্রীমতি কামিনি ডান্ডাপানি তিনি দক্ষিণ ভারতের ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়েও লেখালেখি করেন। প্রায় চৌদ্দ বছর আগে ড. নীলা জেরীনের কুচিপুড়ি নৃত্য-সমাপনী অনুষ্ঠান বা রঙ্গপ্রবেশমে কণ্ঠসংগীত পরিবেশন করেছিলেন তিনি। এবারের অনুষ্ঠানে বক্তব্যে শ্রীমতি কামিনি ডান্ডাপানি নতুন প্রজন্মের মধ্যে কুচিপুড়ী ও কত্থকের মতো ধ্রুপদি শিল্পধারা ছড়িয়ে দিতে ড. নীলা জেরীনের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন।
দুই ধ্রুপদি ধারার মেলবন্ধনে ড. নীলা জেরীন ও নীলা ড্যান্স একাডেমি
নীলা ড্যান্স একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা, পরিচালক ও শিক্ষক ড. নীলা জেরীন কত্থক ও কুচিপুড়ী, শাস্ত্রীয় নৃত্যের এই দুই স্বতন্ত্র ধারায় প্রশিক্ষিত একজন নৃত্যশিল্পী। কত্থকে তাঁর গুরু শ্রীমতী প্রেরণা দেশপান্ডে এবং কুচিপুড়ীতে শ্রীমতী সাধনা পারাঞ্জি। দুই দশকের বেশি সময় ধরে তিনি নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন মঞ্চ, নৃত্যোৎসব ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে নৃত্য পরিবেশন করে আসছেন। ২০১৪ সালে জ্যাকসন হাইটসে নীলা ড্যান্স একাডেমি প্রতিষ্ঠার পর বর্তমানে মিডটাউন ম্যানহাটনেও এর একটি শাখা রয়েছে। নৃত্যচর্চার পাশাপাশি ড. নীলা জেরীন একজন স্নায়ুবিজ্ঞান গবেষক। তিনি Columbia University থেকে নিউরোবায়োলজিতে পিএইচডি অর্জন করেছেন এবং বর্তমানে CUNY School of Medicine-এ গবেষণা করছেন।
|.jpg)
‘নৃত্য অর্পণ’-এর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল একই মঞ্চে দুই স্বতন্ত্র ভারতীয় ধ্রুপদি নৃত্য ও সংগীতধারার সমন্বয়। বাংলাদেশি ড. নীলা জেরীনের শিল্পচর্চার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক তাঁর একাডেমির বহুসাংস্কৃতিক শিক্ষার্থীসমাজ। ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের তালিম নিতে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের ভারতীয় গুরু ও প্রতিষ্ঠানের কাছে যাওয়ার চিত্রটি অতি পরিচিত। ড. জেরীনের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে এর বিপরীত সাংস্কৃতিক প্রবাহ। তাঁর কাছে কুচিপুড়ী ও কত্থকের তালিম নিতে আসছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও জাতিগত পটভূমির শিক্ষার্থীরা। নিউইয়র্কের বহুসাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে একজন বাংলাদেশি নৃত্যগুরুর কাছে ভারতীয় বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থীদের এই দুই ধ্রুপদি নৃত্যধারায় প্রশিক্ষণ নেওয়া তাঁর শিল্পযাত্রায় যোগ করেছে এক স্বতন্ত্র মাত্রা। নীলা ড্যান্স একাডেমির লক্ষ্যও কেবল দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাংস্কৃতিক বা জাতিগত পরিচয় নির্বিশেষে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের কাছে কত্থক ও কুচিপুড়ীর ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়া এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই দুই শাস্ত্রীয় নৃত্যধারার চর্চা অব্যাহত রাখাকে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্ব দেয়।
.jpg)
‘নৃত্য অর্পণ’-এ দর্শকদের উপস্থিতিতেও ছিল আয়োজনের বহুসাংস্কৃতিক চরিত্রের প্রতিফলন। মিলনায়তন ছিল দর্শকে পরিপূর্ণ। বাংলাদেশি ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত দর্শকের পাশাপাশি বিভিন্ন জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পটভূমির মানুষের উপস্থিতি ‘নৃত্য অর্পণ’কে নিউইয়র্কের বৈচিত্র্যময় সমাজের এক মিলনমেলায় পরিণত করে। ধ্রুপদি নৃত্য ও সংগীতকে ঘিরে ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীর এই উপস্থিতি ছিল আয়োজনটির অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক। অনুষ্ঠানের শেষভাগে বক্তব্য দিতে গিয়ে ড. নীলা জেরীন সম্প্রতি অকালে চলে যাওয়া বাংলাদেশি কমিউনিটির তরুণ নৃত্যশিল্পী তাসীন ফেরদৌস-কে স্মরণ করেন। তিনি তাসীন-এর বাবা-মা, পরিবার ও বন্ধুদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং তাঁর আত্মার চিরশান্তি কামনা করেন। তিনি তাসীন ফেরদৌস-এর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে উপস্থিত সবাইকে নিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। ”নৃত্য অর্পণ” প্রযোজনাটি ফ্লাশিং টাউন হলের শিল্পকলাবিষয়ক অনুদানের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হয়েছে। অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের সনদ ও পদক প্রদান করা হয়। কর্ণাটক ও হিন্দুস্তানি সংগীতের শিল্পীদের ফুল ও উপহার দিয়ে সম্মাননা জানানো হয়। ধন্যবাদজ্ঞাপন ও ছবি তোলার মধ্য দিয়ে শেষ হয় নীলা ড্যান্স একাডেমির‘নৃত্য অর্পণ’।
ধ্রুপদি নৃত্য ও সংগীতের ধারাবাহিকতায় আগামী ১৫ নভেম্বর ড. নীলা জেরীন আবার মঞ্চে আসবেন। এবার লাইভ হিন্দুস্তানি অর্কেস্ট্রার সঙ্গে তিনি নিজেই একক কত্থক পরিবেশন করবেন এবং সাথে অন্যান্য কত্থক শিল্পীদের দলীয় পরিবেশনাও থাকবে। এই প্রযোজনা বাস্তবায়িত হচ্ছে কুইন্স আর্টস ফান্ডের শিল্পকলাবিষয়ক অনুদানের অর্থায়নে।
নিউইয়র্ক থেকে আরো পড়ুন