https://www.prothomalony.com/

18542

literature

সাহিত্য

রোমের রোদে শেষ চিঠি

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ ২২:০৭

একটা ঘোরের ভেতরে, ঘুম আর জাগরণের মাঝে কতটা সময় কেটে গেছে জানি না। একটাআরামদায়ক শাওয়ারের পরে, খুব দারুন একটা ঘুম হয়েছে। ক্লান্তিটা অনেকটাই কেটে গেছে।শরীর এবং মন দুটোই ঝরঝরে, ফুরফুরে লাগছে। বাবুল আমার আগেই ঘুম থেকে জেগেউঠেছিল।

 

আমাদের স্টেটরুম স্টুয়ার্ড এসে কলিংবেল বাজাতেই বাবুল দরজা খুলে দিল। তার হাতে একটালিফলেটের মতো কাগজ ছিল। সে কাগজটা সোফার সামনের সেন্টার টেবিলে রাখলো। এবংহাসিমুখে জানতে চাইলো আমাদের সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা। 

 

আমি দু’পাতার কাগজটা হাতে নিয়ে দেখলাম, তার উপরে লেখা আছে ‘ভাইকিং ডেইলি’।আমাদের স্টেটরুম স্টুয়ার্ডকে দেখে মনে হল তিনি সম্ভবত ফিলিপিনো। জিজ্ঞেস করতেই তিনিসন্মতিসূচক হাসলেন। তার পকেটের নেইমট্যাগে তার নাম লেখা আছে, ‘কার্লোস মিগুয়েলরেয়েস’। আমি তার কাছে ভাইকিং ডেইলি সম্পর্কে জানতে চাইলাম।কার্লোস বললেন, " ম্যাডাম, আমি প্রতিদিন সন্ধ্যায় আপনাদের ঘরে এইরকম একটা কাগজ রেখে যাব। এটার নামভাইকিং ডেইলি। এখানে পরের দিনের জাহাজের সমস্ত কর্মসূচি, জাহাজের কোথায় কি হচ্ছে, ঐদিন স্পেশাল কি কি হচ্ছে সবকিছু লেখা থাকবে। এটা দেখলেই আপনি বুঝতে পারবেনআগামীকাল আমরা কোন বন্দরে যাচ্ছি, আবহাওয়া কেমন থাকবে, কখন ডিনার, কোথায় গানহবে।সকালে উঠে অবশ্যই একবার চোখ বুলিয়ে নেবেন, তাহলেই আপনার পুরো দিনটা গুছানোহয়ে যাবে।কোনো কিছু মিস হবে না। বাইরে গেলে এটা আপনার ব্যাগে রাখলে আরও ভালোহয়। কারন যদি নতুন শহরে ঘুরতে গিয়ে কোন বিপদ হয়, ঝামেলায় পড়েন বা হারিয়ে যানতাহলে নিচে যে জরুরী কন্টাক নম্বর দেয়া আছে আপনি সেইসব নম্বরে কল করতে পারবেন।এখানে আমাদের শীপের নম্বর, শীপের লোকেশন, ব্যাক অন বোর্ড টাইম লেখা আছে।আপনাদের দেশের অ্যামবেসীর নম্বরও দেয়া আছে।” 

 

বিষয়টা ধাতস্থ করতে আমরা মনোযোগ দিয়ে কার্লোসের কথা শুনলাম।। বোঝা গেলো, ভাইকিং ডেইলিতে প্রতিদিনের জন্য খুবই গোছানো একটা প্লান দেয়া আছে। যা আমাদের জন্যহেল্পফুল হবে। 

 

বাবুল কার্লোসের দৃষ্টি আকর্ষণ করে কেবিনের সেফটি লকারটা কীভাবে ব্যবহার করা যায় তাজানতে চাইল। কার্লোস বললো, এটা খুব সহজ। একবার দেখলেই আপনার মনে থাকবে। 

 

সে লকারের সামনে গিয়ে আমাদেরকে হাতেকলমে লকার বন্ধ করা এবং খোলার নিয়মকানুনশিখিয়ে দিলো। বললো, ‘লক করার জন্য প্রথমে লকারের দরজা বন্ধ করতে হবে। আমাদেরপছন্দমত যেকোনো ৪ সংখ্যার একটা পাসকোড ঠিক করে নিতে হবে। যেমন ১-২-৩-৪। তারপরলকারের বাটনে পাসকোড প্রেস করে LOCK বোতাম চাপলেই — একটা ক্লিক শব্দ হবে। মানেলক হয়ে গেছে। খোলার নিয়মও একইরকম। আবারও সেই একই পাসকোড চাপলে দরজা খুলেযাবে।কোড ভুলে গেলেও চিন্তা নেই। স্টুয়ার্ডকে বললেই হবে। বা রিসেপশনে ফোন করে 0 চাপলেগেস্ট সার্ভিসের লোক এসে  ওদের মাস্টার কোড দিয়ে খুলে দেবে। কার্লোস আমাদের মনে করিয়েদিলো, শুধু শেষদিনে জাহাজ ছাড়ার আগে আপনাকে অবশ্যই মনে করে সেফ থেকেজিনিসগলো নিতে হবে। কারণ শেষমুহূর্তে অনেকেই দরকারী জিনিসটাই ভুল করে। 

 

কার্লোস চলে যেতেই আমরা আমাদের দুটো পাসপোর্ট, কিছু ডলার সেফে রেখে লক করেদিলাম। আমরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাসলাম। বললাম, মনে রাখার দায়িত্ব  কিন্তু তোমার।শুধু শেষ মূহুর্তে না ভুললেই হল। এই যা! 

 

আমরা ঘুমানোর সময় ভারী পর্দা টেনে দিয়েছিলাম বলেই বাইরেটা এতক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না।পর্দা সরিয়ে দিতেই দেখা গেলো বিকেল হলেও বাইরের এখনও ভালোই রোদের তেজ আছে।নিচের দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল দুটো বাস দাঁড়িয়ে আছে। তার থেকে অনেক লোকজন নেমেজাহাজের দিকে আসছে। তারমানে আজকে দিনভর যাত্রীদের আসা অব্যাহত রয়েছে। আমরাসকালে ল্যান্ড করেছি বলেই আগেভাগে জাহাজে চলে এসেছি। ভাইকিং ডেইলিতে ডিপার্চারটাইম দেয়া আছে রাত আটটা। এখন বাজে সাড়ে ছটা। যেহেতু আমরা দুজনই আর্লি ডিনারেঅভ্যস্ত তাই দ্রুত রেডি হয়ে সাত তলার ডেকে ওয়াল্ড ক্যাফেতে ডিনার করতে রওনা হলাম। 

 

আমাদের মতো আর্লি ডিনার লাভার অনেকেই ইতোমধ্যে সেখানে জড় হয়েছেন। দুপুরে লান্চেরসময় যাদের দেখেছিলাম, সেই পরিচিত মুখের কয়েকজনের সাথে দেখা হল। অপরিচয়েরসংকোচ কাটিয়ে কেউ কেউ হাসি বিনিময় করলো।

 

বাবুল এইধরনের বুফেতে খেতে বেশী স্বাচ্ছন্দ অনুভব করে। এখানে তেমন কোনো ফরমালিটিনেই। নিজের প্লেট নিয়ে ঘুরে ঘুরে পছন্দের খাবার নেওয়া যায়। বুঝেশুনে খাবার অর্ডার করারকোনো রিস্ক নেই। এক পাশে গ্রিল থেকে সদ্য ভাজা ফিশ, এক পাশে পাস্তা বানিয়ে দিচ্ছেসামনে। তাছাড়া দুপুরের মতোই প্রতি সেকশনে বাহারি সব খাবার সাজানো রয়েছে। কার্ভিংস্টেশনে রাতের মেনুতে রোস্ট পর্ক লয়েনের পরিবর্তে জায়গা নিয়েছে চিকেন। রোস্টেট বিফেরজায়গায় কর্ণবিফ। গ্রিলড ফিশ, বিনস কারি, রোস্টেড ভেজিটেবল রয়েছে যথারীতি। হোয়াইটরাইসের জায়গায় এসেছে ফ্রাইড ভেজিটেবল রাইস। 

 

ডেজার্ট সেকশনে চিজকেক, ফ্রুট টার্টের পাশে ছোট ছোট রেডিমেড ডেজার্ট বোল রাখা আছে।তাজা ফলের সেকশনে আঙ্গুর, তরমুজ, আনারস, হানিডিউর সাথে যোগ হয়েছে পেয়ারা এবংপাকা পেঁপে।

 

আমরা সেই এক কোণার দুপুরের টেবিলটাতেই গিয়ে বসলাম। প্লেটে একটু সালাদ নিয়ে শুরুকরে মোটামুটি অনেকগুলো আইটেমই চেখে চেখে খেলাম। রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার রাজেশেরসাথে চোখাচোখি হতেই সে কাছে এসে দাঁড়ালো। জানতে চাইলো, কেমন লাগছে। ক্লান্তি কেটেছেকিনা। টেবিলে কোনো পানীয় নেই দেখে জানতে চাইল, কোনো বিশেষ পানীয় চাই কিনা।আমার নিজের জন্য রেড ওয়াইন এবং বাবুলের জন্য নন-অ্যালকোহলিক ওয়াইন - ননঅ্যালকোহলিক হোয়াই ওয়াইন চাইলাম। রাজেশ হাসিমুখে দুটো ওয়াইনের বোতল নিয়ে ফিরেএলো। দুটো গ্লাসে ওয়াইন পরিবেশন করে বললো, ‘এনজয় ইউর মিল!’  

 

কোনো তাড়া নেই তাই সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতেডিনার শেষ করলাম।  কিছুক্ষণের মধ্যেই প্লেটের টুংটাং, উচ্ছসিত হাসি, কথাবার্তায় জমজমাটহয়ে উঠলো রেস্টুরেন্টের ভেতর এবং বাইরের সিটিং এড়িয়াগুলো। 

 

রোম শহরেই আমরা আমাদের লান্চ এবং ডিনার সারলাম সম্ভবত ব্রেকফাস্ট করবো নেপলস এগিয়ে। ভাইকিং ডেইলিতে ডিপার্চার টাইম লেখা আছে  রাত আটটা। জাহাজের নিয়ম হচ্ছে।প্রতিটি কেবিনের টিভিতে এবং পাবলিক প্লেসের লাউডস্পিকারে জাহাজ ছাড়ার এবং নোঙ্গরকরার আধা ঘন্টা আগে ঘোষণা দেয়া হয়। সাড়ে সাতটা বাজতেই  লাউড স্পিকারে ক্যাপ্টেনেরঘোষণা এলো,  

 

‘লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান, দিস ইজ ইউর ক্যাপ্টেন ম্যাগনাস বার্গম্যান স্পিকিং।ফ্রম দ্য ব্রিজ, ওয়েলকাম অ্যাবোর্ড ভাইকিং সি।উই আর নাউ প্রিপেয়ারিং টু ডিপার্ট ফ্রম চিভিতাভেক্কিয়া।প্লিজ মেক শিওর অল গেস্টস আর অন বোর্ড। দ্য ওয়েদার ইজ বিউটিফুল, সি ইজ কাম। উইউইল হ্যাভ এ স্মুথ সেলিং টু নেপলস।এনজয় ইউর ইভিনিং অ্যান্ড থ্যাংক ইউ ফর সেলিং উইথভাইকিং।’

 

আমাদের খাওয়া যেহেতু শেষ হয়ে গেছে, তাই আমরা রেস্টুরেন্টের পেছনের ডেকের দিকে চলেএলাম। জাহাজ ছাড়ার সময় ঘণিয়ে আসছে। যাতে আমরা  জাহাজের ডিপার্কেশন মূহুর্তটা মিসনা করি তাই জাহাজের সাততলা ডেক থেকে শিঁড়ি দিয়ে উপরের ডেকে উঠে গেলাম। যেখানথেকে সবকিছু আরও পরিস্কার দেখা যায়। 

 

আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী বন্দর ছাড়ার সময় প্রতিটা জাহাজকেই একটা লম্বা ভেঁপু অবশ্যইবাজাতে হয়। এটা সিগন্যাল যে জাহাজ এখন নোঙর তুলছে। অনেক বন্দরে বিদায় জানানোরজন্য ৩ বার ছোট-বড় মিলিয়ে বাজায়, তখন পুরো বন্দর কাঁপে। জাহাজ যখন বন্দর ছেড়ে যায়, তখন তার জন্য তারা কতগুলো প্রক্রিয়া মেনে চলে। ধাপে ধাপে চলে এই  জাহাজ ছাড়ারপ্রস্তুতি।

 

আমাদের মতো উৎসাহি অনেকেই এখন আকুয়াভিট টেরেস এবং পুল গ্রিলের সামনে এসেজড়ো হয়েছে। নোঙ্গর তুলে জাহাজের বিদায় পর্ব দেখার জন্য। 

 

ঘড়িতে আটটা বাজতেই নিচের প্রথম ডেকের ক্রুরা মুরিং লাইন খুলতে শুরু করলো। অথাৎজাহাজ যাতে ভেসে না যায়, তার জন্য যে মোটা দড়ি দিয়ে ডকের সাথে জাহাজকে আটকে রাখাহয় সেগুলো খুলে দড়িগুলো  গুছিয়ে রাখছে। আমরা আটতলার ডকে দাঁড়িয়ে দেখছি।সব শেষে— ভোঁওওওওও — একটা লম্বা ৭-১০ সেকেন্ডের ভেঁপু বাজতে শুরু করলো। শব্দ নেহাত কমনয়। একটা লম্বা, গভীর শব্দ। বুকের ভেতর পর্যন্ত কেঁপে উঠলো। ভাইকিং সি আস্তে আস্তে ঘাটথেকে সরে আসতে শুরু করলো। নিচে আলো জ্বেলে সম্ভবত চারপাশ দেখে নিচ্ছে। 

 

রোম শহরের রোদ আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে আসছে। তারপর ধীরে ধীরে রোম উপকূলে জ্বলে ওঠা  আলোগুলোও একে একে মিলিয়ে গেল। বড় আফসোস হল, রোম তার সমস্ত অবগুন্ঠন সরিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। সময়াভাবে তাকে ভালো করে দেখা হল না। জানা হল না। 

 

আমরা বহুক্ষণ ডকে দাঁড়িয়ে রইলাম। রাত বাড়তেই জাহাজ খোলা সমুদ্রে পড়লো। দুলুনি প্রায়নেই। সমুদ্র তখন একদম শান্ত জলাশয়ের মতো। আকাশে তখন প্রথম তারা ফুটেছে। আমাদের যাত্রা শুরু হলো — সামনে সাত দিন, ছয় শহর, কিন্তু এই মুহূর্তটা  যেনো অনাদিকালের! 

  

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন