https://www.prothomalony.com/

8563

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত্য

প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৪ ০৮:৪৩

মধ্যবিত্তের মানিব্যাগ 
সীমান্ত সরকার

 

মধ্যবিত্তের মানিব্যাগ হেঁটে চলেছে—
সামনে বাজার থেকে সিন্ডিকেট ক্রয় করে
সিন্ডিকেটের ব্যাগে মাছ, মাংস, ডিম, সবজি ভরে।
গন্তব্য দূরে নয়, বাচ্চার খেলনা গাড়ি পর্যন্ত;
সে হেঁটে চলেছে।

গিয়ে সভ্যতার আয়নায় মানিব্যাগ মুখ দেখেছে,
বাজেটে টান; তবে গাড়ি কেনা অবকাশে যাক।
সে যদি হাঁটতে পারতো দশ বছর আগে;
যেখানে বৈভবের বাজারে শৈশব খেলা করে
মধ্যবিত্তের মানিব্যাগে উচ্চবিত্তরা রইতো
জীবিকা ও আর্থিক ভারসাম্যে।
এখন চা খাবে কি?
না থাক, আগামী মাসে খোকার খেলনা কেনা যাবে।
গন্তব্য দূরে নয়; অভাবের বৃত্তের মাঝে
মধ্যবিত্তের মানিব্যাগ হেঁটে চলে।

 

 

 

আহ্বান
কোমল দাস

 

আমি ভুল, বিভ্রান্তির বন্ধনে ঝঞ্ঝাটের তিরস্কারে 
দুঃস্বপ্নের গরিমায় ডুবে যাওয়া
কলঙ্কের বেদিতে আঁকা ভুল।

দূরদূর করে তাড়িয়ে বেড়ায় নির্ভুলের বেড়াজাল
ওদের যাতাকলে পিষ্টে আমি লাঞ্ছিত 
দূর্বাসার গ্লানিতে অকথ্য শোণিত প্রপাতে
নিমজ্জিত বিক্ষিপ্ত সত্তায় ঘৃর্ণিত নির্ভুলের দুর্বৃত্তের মুখে
শাশ্বত বিতৃষ্ণার রথে ব্যঞ্জনার তরঙ্গে বয়ে চলা
কলঙ্কের সম্পৃক্তা নিয়ে,ভুলের মাসুলে এগিয়ে চলা
সহস্র ঘৃণিত প্রপাতের অপবাদের গ্লানিতে ঝরে পড়া।

সেই ভুল আমি তিমির কুচক্র ঘনিভূত এই মনে
বিষাক্ত হৃদয় আমার প্রজ্ঞাহীন কুৎসিত বিভীষিকায় ভরা
বেবিচারের অন্তিম অঙ্গার তলে হয়তোবা
কুচক্রি অসভ্য উদ্ধত মনের টানে,
যতসব রিপুর ক্ষুধাতুর হায়নার কবলে
আমি আজ বড্ড অসহায়।

আমার ব্যাকুল মনের আকুল আহ্বান
আমায় করোনো তিরস্কার
আমি ভুল আছি বলেই তুমি নির্ভুলের এত সমাদর।

 

 

 

এই শহর আমার নয়
গোলাম সরোয়ার

 

এই শহর আমার নয়
শত ব্যস্ততার ভীড়ে
লাল নীল ধোঁয়াশার চাঁদরে ডাকা থাকে
রাতের নীল আকাশ
এক মুহুর্তের জন্য ছুটি নেই।
ছুটছে গাড়ি ছুটছে মানুষ
ঘোড়দৌড়ের মত এদিক সেদিক
যান্ত্রিক জীবনের এক টুকরো সুখ মনের সাম্পানে 
আঁটকে আছে
নিষ্ঠুরতায় জঞ্জাল এ শহরের পথে প্রান্তরে বিরাজমান।

তাইতো আমি, 
গৌধূলি পিচঢালা পথে একাকী
হেঁটে চলি নতুন কোন ঠিকানায়
এক টুকরো শান্তি ও সুখের মা ও মাটির সন্ধানে।

 

 

 

ফিরে আসি
মুসান্না হাবিব

 

কুয়াশায় ভিজতে ভিজতে 
শীত ঋতুর ওমে আর ঘামে
বাইফোকাল চশমা দিয়ে
দেখতে পাই তোমাকে।

স্মৃতিরা আড়মোড়া ভেঙে
রোদ তাতিয়ে হয়ে যায় বিস্মৃত।

চোখের জুলুম আর কাব্যের আয়াতে
ভাষার ফুল হয়ে যায় বকুল
ফুটে থাকে কবিতার খাতাজুড়ে।

জীবনের ইতিউতি সেরে
তুকতাক মন নিয়ে
ফিরে ফিরে আসি তোমার শহরে।

 

 

 

একটি ভাষার তরে
কাইয়ুম পারভেজ

 

একটি ভাষার তরে দিতে পারে প্রাণ
বুলেট বুকে নিতে সে করে নাকো ভয়
বাঙালি জাতি ছাড়া কি আছে এ প্রমাণ
এমন জাতির কেমনে হবে না বিজয়? 

মায়ের ভাষা যখন কেড়ে নিতে চায়
বিজাতীয় ভাষা দিয়ে মুখেতে চাপিয়ে
মায়ের ছেলে কি করে মেনে নিবে হায়
মিছিল স্লোগানে দেয় রাজপথ কাঁপিয়ে।

অত্যাচারী পিছু হটে মেনে পরাজয়
হেরে গিয়ে শাসকেরা আঁটছে কুমন্ত্র
দামালেরা লড়ে গিয়ে আনে সে বিজয় 
সময় নিয়ে লুঠেরা করে ষড়যন্ত্র।

একুশ দুই বায়ান্ন ফেব্রুয়ারি মাসে 
চূড়ান্ত ত্যাগে বিজয় আসে অবশেষে।

 

 

 

বিবর্ণ ফুল 
সাইদ মুহাম্মাদ ওলিউল্লাহ

 

বাক্যের দেয়ালে লেখা: ভালোবাসি তোমাকে ভীষণ
রাতের কার্নিশে পা নাড়াচ্ছে, বিষণ্ণতা ও গীতিকা।
জেগে দেখি, আত্মহত্যা করে পড়ে আছে মৃত ঘুম
সবুজ সকাল উদিত হয়নি, মাটি চাপা গোরে।

সমস্ত কাঠামো ঘুণে ধরা— শুধু বিদঘুটে গন্ধ
এপিটাফ হয়ে গেছে রচিত যাবতীয় কবিতা।
শব্দদের বিয়োগান্ত, ছেড়ে গেছে একা ফেলে
ফুরিয়ে গেছে জীবন, প্রিয় মৃত্যুর আত্মহত্যায়!

 

তন্দ্রার কৌমার্য শুষে নেয়, অনর্থক কাপলেট
মসনভি, রুবাইয়্যাত, কবিতিকা, লিমেরিক কাব্য
কবির কবরে তারাদের বৃষ্টি হবে, ছুঁয়ে যাবে— 
মিঠে হাওয়ার সুগন্ধি, অন্য কোনো পৃথিবীর খোঁজে।

 

ভেঙে যাওয়া ফুলদানী, বিবর্ণ ফুলের চিৎকার—
চুরমার করে ফেলে, শাদা গোলাপের সিক্ত রঙ।

 

 

 

স্বপ্নভূক
শম্পা ঘোষ

ভালোবাসার ইঙ্গিতে নিপীড়িত মন
ভলোনি ষ্প্রে-তে সব যন্ত্রণা উধাও
পৃথিবীর সব সমস্যা আমন ধানের চারার মত সৃষ্টিশীল
অপরিহার্য; ব্যাকগ্রাউন্ডের মুদ্রাদোষ অছিলায় ব্যস্ত আমি
জেগে উঠতে গিয়েও নীরবতা দেখি,
ছায়াপথে অশ্লীল ফোকাসে স্বপ্নভূক উন্নয়ন।
চাবির গোছা ছেড়ে দুয়ারে এসে দাঁড়ানো মরীচিকার
বালিয়াড়ির সূর্যাস্ত যেন-
সম্পূর্ণতাকে জানা হয়নি, চোখে হেমন্তের প্রলেপ
বসন্তের ঔদাসীন্য অতি বড় বাস্তব আমার কাছে
মাঝেমাঝে শিলাবৃষ্টি উপরি পাওনা 
দিগন্তের ওপার থেকে দাগা দেওয়া প্রেম তবু ক্ষণিকের 
সন্ধি, যন্ত্রণার আনন্দে সুখ বিলাসী যে আমি।

 

 

 

ব্যবচ্ছেদ
রেশম লতা 

 

সূর্যের নড়ে উঠাকে কোনো ব্যবচ্ছেদ 
আড়াল করতে পারে না! 
সীমান্ত যখন আকাশ ছুঁয়, তখন একদলা মেঘ চাঁদপাথরের
ঠাঁই খুঁজে, আমাদের অকর্ষিত জীবন ধুম্রজালে আটকে
পড়ে; মধ্যপন্থায় পাহাড় কিনে আবাসস্থল গড়ার পরিকল্পনা
ঝিঝিরা করে-
যদি কোনো সংকোচপূর্ণ নিঃসরণ ঘটে_তবে কি 
জোনাকির হালকা গান সবাই শুনে?
হালকা লড়াই বিপ্লব হতে হতে রক্ত বমি করে?
বিদঘুটে প্রেমে হালকা ছোঁয়ায় কি ইতিহাস হয়?
উত্তরে_ জ্বলন্ত ক্ষুধা। 
ইঙ্গিতময় দর্শন কেবলি শূন্যতা বাড়ায়
আমরা তাই কয়লাকে আগুন বলে ডাকি!
সত্যিই, সূর্যের নড়ে উঠাকে কোনো ব্যবচ্ছেদ আড়াল 
করতে পারে না। 

 

 

 

বায়স্কোপ
সোহানা নাজনীন

ফোল্ডিং ছাতাটা বন্ধ করে বারকয়েক ঝাড়া দিয়ে বাসে উঠে পড়লো নিমা। মোটে পাঁচটা বাজে, অথচ চারপাশ জুড়ে কি ভয়ঙ্কর রকমের অন্ধকার। অফিস ছুটির সময় এখনো হয়নি, তাই বাসে-ট্রেনে ভীড় কিছুটা হলেও কম। মেট্রোকার্ড পাঞ্চ করে একদম পিছনের সিটে গিয়ে বসলো। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ, বাইরে ঝির ঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। ইলেক্ট্রিকের চিকণ তার চুইয়ে টুপটাপ করে পানির ফোঁটাগুলো ঝরে যাচ্ছে। পাতা ঝরার পর প্রথম বৃষ্টি, তার মানে আরো ঠাণ্ডা নামাবে এরপর। পনেরো বছর ধরে এদেশে আছে, ঋতুর হেরফের ভালোই বোঝে নিমা। বাসটা আটলান্টিক এভিনিউ ধরে ধীর গতিতে এগিয়ে চলছে। ব্যাগের ভিতর থেকে সাদা প্যাকেট বের করে ভাঁজ করা ছাতাটা রাখলো। পানি ভেজা চুলগুলোতে একটু চিরুনি বুলিয়ে নিল। বাসা থেকে তেমন একটা সাজগোজ করে আসতে পারেনি। হাতে একদম সময় ছিলোনা, তাই শুধু কাঁক ভেজার মতো করে একটা শাওয়ার নিয়ে বের হয়েছিল।

আজ বাইরে আসার একদম ইচ্ছা ছিল না নিমার। গানের এই অনুষ্ঠানের দাওয়াত পেয়েছে সপ্তাহ দুই আগে। তখনই মনে মনে ঠিক করে রেখেছিল যে যাবে না, এইসব গানের আয়োজন গুলো বেশ রাতের দিকে শেষ হয়। মাঝরাত হয়ে যায় বাড়ি ফিরতে, রাত করে বাড়ি ফেরা একদমই পছন্দ নয় শিহাবের। আর নিমা একলা একলা বাড়ি ফিরবে এটা তো আরো অপছন্দের। শিহাব মুখে কিছু বলবে না, কিন্তু ভিতরে ভিতরে খুব রেগে থাকবে। এসব নিমা জানে, উনিশ বছর ধরে সংসার করে শিহাবের ভালোলাগা মন্দলাগা সম্পর্কে জানতে কিছু বাকি নেই। প্ল্যান না থাকা সত্ত্বেও আজ বের হয়েছে নিমা। এর পিছনে সূক্ষ্ম হলেও ঘোরতর একটা কারণ আছে। একমাস যাবত শিহাবের সাথে মনমালিন্যতা চলছে নিমা’র। নিজেদেরকে গুটিয়ে রেখেছে দুজন। কথা কম বলে, বাইরে থাকা অবস্থায় কেউ কাউকে কল দেয়না, রাতে একসাথে খাবার টেবিলে বসলেও সেই আগের মতো গল্প করে খাওয়া শেষ করে না। ভেবেছিল আস্তে ধীরে ঐ গুমোট আবহাওয়া কেটে যাবে, অভিমান আর ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটবে। কিন্তু তা হয়নি, দুজনেই একরোখা জিদ নিয়ে যার যার অবস্থানে ঠায় দাঁড়িয়ে। মাঝখানের ব্যবধানটা ঠিক রেল লাইনের মতো। পাশাপাশি চলছে একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে। দূরে তাকালে মনে হবে যেন, রেললাইনের পাতদুটো মিলেমিশে একাকার হয়েছে। কিন্তু আসলে হয়নি। আজ দুপুরে হঠাৎ করেই নিমার মাথায় ভুত চেপেছিল। গানের আসরে যোগ দেবার জন্যে সহসাই মনস্থির করে ফেললো। শিরীন আপাকে কল দিয়ে জানিয়ে দিল যে সেও আসবে গান শুনতে।

গেটের বাইরে পা দিয়ে নিমা সেলফোন থেকে লোকেশন সার্ভিস অফ করে দিল। সে কোথায় যাচ্ছে শিহাব এসবের কিছুই হদিস পাবে না, এটা ভেবে নিমার ঠোঁটে একটা বিজয়ের হাসি খেলে গেল। যথারীতি সন্ধ্যার পর শিহাব বাড়ি ফিরবে, খালি ঘর দেখে হয়তো ইতিউতি খুজবে। তারপর ছেলেকে খুব সাবধানের সাথে জিজ্ঞাসা করবে,

“তোমার আম্মু কোথায় গেছে? কখন ফিরবে জানো কিছু?”

শিহাবের উদ্বিগ্ন জড়ানো চেহারাটা মনে ভাসাতে পেরে নিমা বেশ স্বস্তির একটা ঢেউ অনুভব করলো।  হাতের ছোট্ট ব্যাগ থেকে মেরুণ লিপিস্টিক বের করে ঠোঁটে বুলালো। একটা টিপ দিল কপালে, আলতো চোখে দেখে নিল বাসের কেউ নিমাকে দেখছে কিনা। ঠান্ডা থাকা সত্ত্বেও ভারী ওভারকোটের নীচে কালো একটা রাজশাহি সিল্কের শাড়ি পরেছে। পাড় আর আঁচলের দিকাটায় সবুজ বাটিকের ছাপ। সব জায়গায় জিন্স-টপস পরে ঘুরে বেড়ালেও বাঙ্গালিয়ানা জায়গাগুলোতে একটু ভিন্ন সাজ দেয় নিমা। খুব শখ করে শাড়ি পরে, টিপ দেয়, গলায়-কানে দেশীয় গয়না চড়ায়। নিউইয়র্কের মানুষ আজকাল এসব দেখে আর অবাক চোখে ঘুরে তাকায় না। এই শহরে হাজারো জাতের মানুষের বাস, হাজারো পোষাক আর চেহারায় তারা নিজেদের মানচিত্র ফুটিয়ে তোলে।

এসব ভাবতে ভাবতেই কাঙ্ক্ষিত স্টপেজে নেমে পড়ে নিমা। তিন ব্লক দূরত্বে শিরীন আপা’র বাসা। সন্ধ্যে ছয়টার মধ্যে সবার পৌঁছানোর কথা, তারপর গানের আসর বসবে। ঢাকা থেকে একজন বিখ্যাত গায়ক এসেছেন, সব ধরনের গান আজ তিনি শোনাবেন। বসার ঘরে বিশাল আয়োজন, হিটারের উষ্ণতার সাথে আরো উষ্ণতা ছড়াচ্ছিল ঢাউস টেবিলে স্যুপ আর পাকোড়া। মন অনেকটাই হালকা হয়ে এলো নিমা’র। এমনটাই তো চেয়েছিল সে, এমন একটা পরিবেশ যেখানে আসার পর বিষণ্ণতার ভারী মেঘ কাটতে শুরু করবে।

গানের আসর শুরু হয়েছে, পুরনো দিনের বাংলা সিনেমার গানের আবদার বেশি। গায়ক চোখ বুজে কণ্ঠে দরদ ঢেলে গাইছেন, সাথে সবাই পুরনো দিনের ছন্দে দুলছে। হাই পাওয়ারের বাল্বগুলো বন্ধ করে জ্বালানো হল নরম আলোর কিছু ল্যাম্পশেড। মনোরম এক পরিবেশ, সবাই সেলফোন হাতে নিয়ে ভিডিও করছে, কেউ বা সাথে সুর মেলাচ্ছে। এভাবে আট-দশটা গানের মাধ্যমে কেটে গেল অনেকটা সময়। সবাই আবদার করলো ব্যান্ড শিল্পীদের গান গাওয়ার। “কিছুই নাকি দেইনি তোমায়, বল কে করেছে নিঃস্ব আমায়?”… কুমার বিশ্বজিতের এক সময়কার মাতাল করা গান গাইতে শুরু করলেন গায়ক। নিমা পাথরের মতো জমে গেল যেন, কেমন যেন কষ্টের একটা ঢেউ তার গলা বেয়ে উঠে আসছে। গান শেষ হতেই এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালো। সবাইকে বিদায় জানিয়ে কোটটা টেনে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। শিরীন আপা ভ্রু কুঁচকে পিছন থেকে চেঁচিয়েই যাচ্ছেন,

“কি রে নিমা, আজ কি হল তোর? রাতে খেয়ে যাবি না? গানই তো শেষ হয়নি!”

“আজ আর না শিরীন আপা, বাসায় একটা জরুরি কাজ পড়ে ছিল। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম, এখন না গেলে সমস্যায় পড়বো।“

পায়ে কোনরকমে জুতোটা গলিয়ে নিমা ফুটপাথে নেমে এলো। রাত প্রায় দশটা বাজে, তাপমাত্রা আরেকটু কমেছে। বাসের সময়সুচী দেখার পর হাটার স্পিড বাড়িয়ে দিল। এই বাস মিস করা যাবে না, তাহলে পরের বাস আরো ত্রিশ মিনিট পর আসবে। রাত দশটায় বাস স্টপেজের ছাউনিতে ঠান্ডা শীতল স্টিলের বেঞ্চে বসে আছে নিমা। কেউ নেই আশেপাশে, সুনসান চারিদিক, রাস্তায় দু একটা গাড়ি হেড লাইট জালিয়ে হুঁশ-হাঁস করে ছুটে যাচ্ছে। নিমা’র মনের ভিতরে অদম্য এক কান্না ঘুরপাক খাচ্ছে, মুখ-চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসতে যেয়েও আটকে যাচ্ছে। মুখের উপর হাত চাপা দিয়ে নিমা ফোঁপাচ্ছে শুধু। আশেপাশে কেউ নেই তবুও ঐ কান্না আড়াল করার বৃথা চেষ্টা চলছে। নিমা’র মনে পড়ে গেল, আজ থেকে বাইশ বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীণ বরনে এই গানটা বাজানো হচ্ছিল। রেজিস্টার বিল্ডিংয়ের সামনে বড় প্যান্ডেলের নিচে বসে ছিল নিমা। ওইদিনই শিহাবের সাথে তার পরিচয়, ভালোলাগা গান আর উপন্যাসের গল্প ভাগাভগি করেছিল দুজনে। ভালোলাগা থেকে ভালোবাসার শুরু, সেই পথচলা আজও থামেনি। গানটা কোথাও শুনলে ঐ প্রথম দিনের কথা মনে পড়ে। ঢেওয়ের মতো উথাল পাথাল করা দুটো মনের দুলুনি টের পায় যেন।

টুয়েন্টি ফোর নাম্বার লেখা বাসটা সামনে থেমে দরজার অটোমেটিক পাল্লাদুটো খুলে দিল। চোখ মুছে নিমা আবারো ধীর পায়ে পাটাতনে উঠে এলো। ছাতিটা আর বোধহয় প্রয়োজন পড়বে না, বৃষ্টি এক্কেবারেই ধরে গেছে। জানালার কাঁচে মুখ ঠেকিয়ে তাকালো বাইরে, ছেঁড়া মেঘ সরিয়ে চাঁদ উঁকি দিচ্ছে। শিহাব হয়তো এতোক্ষণে বাসায় ফিরে ডিনার সেরে ফেলেছে। ক্লান্ত চোখে সোফায় আধশোয়া হয়ে আছে, সামনে টিভি খোলা থাকলেও সেদিকে নজর নেই তার। আজ শিহাবের কাছে ফিরতেই হবে নিমাকে,  ভালোবেসে নিঃস্ব হতে এখনও অনেক পথ বাকি পড়ে আছে।  

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন