https://www.prothomalony.com/

8468

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত্য

প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৪ ০৭:৫৮

মায়ের ভাষার বর্ণমালা
মিতা পোদ্দার

 

অ, আ, ক, খ, গ, ঘ, ঙ, চ, ছ, প, ত, এ, ভ, ম শ- এই অক্ষরগুলোই আমাদের প্রাণ, জয়ের গান, বিশ্ব দরবারে পরিচয় করিয়ে দিতে যার ভূমিকা অপরিসীম। মায়ের ভাষা কথাটির পেছনে অনেক রক্তঝরা শহীদের স্মৃতি বিজড়িত। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় সফিক, সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারদের মতো বাঙালির রক্তের বিনিময়ে আজ এ দিনটিকে আরও বেশি স্মরণীয় করে রাখতে ইউনেস্কো ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার মানুষরাও আজকের এই দিনে সম্মান জানায় আমাদের এই ভাষা শহীদদের প্রতি।পাকিস্তানি জান্তারা বরাবরই বাংলার মেধাবীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল মেধাশূন্য করে তাদের উর্দু ভাষাকে পুরোপুরিভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে। কিন্তু তা কী করে সম্ভব; বাংলা মায়ের সন্তানরা এতোটা দেশপ্রেমী যেখানে যেকোন পরাশক্তিকে প্রতিহত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তাই মহান একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটি কালজয়ী স্বাক্ষী হয়ে আছে আজকের এই বাংলাদেশ। যেই দেশটিতে আজ সবাই মুক্ত মনে তাদের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারছে।যেখানে আজ পৃথিবীর মানচিত্রে সিয়েরালিওন নামক রাষ্ট্রটি পর্যন্ত আজ আমাদের মায়ের ভাষাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ ঐতিহাসিক গানটি পরিবেশন করে।

ভাষার লড়াইয়ের তাৎপর্যপূর্ণ পর্যালোচনা:- ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে দ্বিজাতি তত্তের ওপর ভিত্তি করে। পূর্ব বাংলায় মুসলমানরা ছিল সংখ্যা গরিষ্ঠতার দিক দিয়ে। তাই পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।কিন্তু মায়ের ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে এই বাংলার আকাশে বাতাশে তখন ধ্বণিত হতে থাকে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই নামক স্লোগান।আর এই মিছিলের কণ্ঠস্বর এতো বেশিই প্রতিধ্বনিত হতে থাকে যার ফলশ্রুতিতে আজ আমরা মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারছি।ঐ বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু” শিরোনামে এই সংগঠনের উদ্যোগে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়, যা ভাষা আন্দোলনের ঘোষণা পত্র নামে পরিচিত।১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি এদেশের আপামর ছাত্র সমাজ বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে যে মাতৃভাষা বাংলা অর্জিত হয়েছে তার গন্ডি তখন শুধু দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের চেতনা আজ ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্রই। ভাষার জন্য বাঙালি জাতির এ আত্মত্যাগ আজ নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে মাতৃভাষার গুরুত্ব সম্পর্কে।একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার জন্য বাংলাদেশের অনন্য ত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ এবং সারা বিশ্বে স্মরণীয় করে রাখতে এই দিনটিকে “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি ইউনেস্কোর ১৮৮ টি সদস্য দেশ এবং ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করে।সারা বিশ্বব্যাপী প্রথম পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।আজ আমরা হাসি-আনন্দ, দু:খ বেদনা সবকিছুই প্রকাশ করি মায়ের ভাষায়। তাই ভাষার এ গুরুত্বের কথা ভেবেই পৃথিবীর সব দেশেই প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় মাতৃভাষার মাধ্যমে। মাতৃভাষা দিয়েই শিশুর মনে স্বদেশ প্রেমের সূত্রপাত ঘটে। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা

 

 

 

ছন্দের আনন্দ ও বেদনা
শেখর ভট্টাচার্য

 

জন্মসূত্রে নাম ছিলো সৈয়দ আব্দুল মান্নান। লেখা-লেখিতে এসে নাম পরিবর্তন করে রাখলেন আবদুল মান্নান সৈয়দ। নামকে ওলট পালট করার এই ধরনটি বাংলা সাহিত্যে প্রথম নিয়ে আসেন আব্দুল মান্নান সৈয়দ।তিনি ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সাহিত্য সমালোচক ও সম্পাদক। কবিতা, উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ-গবেষণা, কাব্যনাটক, স্মৃতিকথাসহ তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা দেড় শতাধিক।

এরকম প্রতিভাবান আধুনিক মানুষকে অনুসরন করে আমার বন্ধু মুহম্মদ সালাম পারভেজ তার নামটি পালটে পারভেজ মুহম্মদ সালাম করে ফেলে। সত্তর দশকের শেষের দিকের কথা; মুরারিচাঁদ কলেজের ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষার্থী আমরা।সালাম আমার সহপাঠী এবং বন্ধু। বন্ধুটি তার নামকে আধুনিক করার জন্য যা’ই করুক না কেনো আমি তাঁকে সালাম ছাড়া অন্য নামে ডাকিনি। সালামের গভীর অনুভূতি কাব্য প্রতিভা আমাকে মুগ্ধ করতো। কবিতার ছন্দ নিয়ে আমাদের আলোচনা হতো নিয়মিত।

ছন্দ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে জানা গেলো সালাম একটি মেয়েকে গভীর ভালোবাসে। মানুষের প্রেম ভালবাসা ঘটে অদ্ভুত সব কারণে। মেয়েটির হাঁটার ছন্দ সালামকে মোহিত করে ফেলেছিলো। হাঁটার ছন্দে সে কবিতার রূপ মাধুর্য খুঁজে পায়।অতঃপর প্রেম।

ছন্দ নিয়ে আমাদের আলোচনা সালামের প্রেম ছাপিয়ে আকাশ, মহাকাশ পর্যন্ত পৌছে যায়। অদ্ভুত সব উদাহরণ। আমি মন্ত্র মুগ্ধ শ্রোতা। পৃথিবী এবং সৌর জগতের সব কিছু চলে ছন্দে। মানুষের হৃদযন্ত্রে কান পাতলে যে ধ্বণি শোনা যায়, সে ধ্বণিটির মধ্যে ছন্দ আছে। যখন ধ্বণি ছন্দ হারায়, চিকিৎসকরা তখন বলেন ইরেগুলার হার্ট বিট অর্থাৎ ছন্দ পতন। প্রকৃতির মধ্যে ছন্দ ক্রিয়াশীল। নদীর ঢেউ, ঝিরি ঝিরি বাতাস, বৃষ্টির শব্দ, ঝি ঝি পোকা এমন কী ব্যাঙের ডাকের মধ্যেও মনোযোগ দিয়ে শুনলে ছন্দ খুঁজে পাওয়া যায়। ঋতু চক্রের মধ্যেও ছন্দ আছে। গ্রীষ্মের দাব দাহকে কোমল করতে শান্তির বারি নিয়ে আসে বর্ষা। এই যে পর পর ঋতু গুলো আসে তার মধ্যেও ছন্দ কাজ করে। গ্রীষ্মের পরে হেমন্ত আসলে ছন্দ পতন ঘটে। ছন্দ পতন ঘটলেই প্রকৃতি আঘাত প্রাপ্ত হয়। প্রকৃতির ছন্দ পতনের কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হয় মানুষ। প্রকৃতি ছন্দ হারালে শষ্য উৎপাদন বাহত হয়। এই যে জল বায়ুর পরিবর্তনের কারনে, হিমালয়ের বরফ গলে যাচ্ছে, সমুদ্র পৃষ্ঠ উপরে উঠে যাচ্ছে এগুলো সব মানুষের দ্বারা প্রকৃতি বিনাশের কারনে অর্থাৎ মানুষ যখন পাহাড়, বন উজাড় করে নদী দখল করে নদীর স্বাভাবিক চলাকে ব্যাহত করে তখন প্রকৃতি ছন্দ হারায়। অতি বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, সাইক্লোন,টাইফুন, এগুলো হলো প্রকৃতির ছন্দ পতনের প্রকাশ।

সমাজ এবং রাজনীতিরও ছন্দ আছে। রাজনীতি যখন অধিকাংশ মানুষের মতামতকে অবজ্ঞা করে তখন সমাজ ও রাষ্ট্রে ছন্দ পতন ঘটে। প্রকৃতি যেমন ছন্দ পতনের বিরুদ্ধে তার অবস্থান জানায় সাইক্লোন, ভূমিকম্পের মাধ্যমে মানুষও তাদের প্রতিক্রিয়া জানায় নানা কর্মসূচির মাধ্যমে। চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, তারা যেমন একটি রীতি মেনে চলে মানুষকেও রীতি মেনে চলতে হয়। ছন্দ আমাদের নিঃশ্বাস প্রশ্বাসকে স্বাভাবিক করে। ভালোবাসায় আবদ্ধ করে। এই ভালোবাসা আমাদের ছান্দসিক করে তোলে। আমরা পৃথিবী জুড়ে ছন্দে চলা মানুষ দেখতে চাই।

 

 

 

মাটির কলমদানি
দীলতাজ রহমান 

 

সাত-আট বছর আগে বইমেলায় একেবারে একুশে ফেব্রুয়ারির অসহনীয় ভিড়ে, তথ্যকেন্দ্রের সামনে বিকেলের উজ্জ্বল রোদে আমরা কজন একজায়গায় থিতু হয়ে দাঁড়ানো। এর ভেতর কে একজন ‘দীলতাজ! দীলতাজ!’ বলে আমাকে কোনদিক থেকে ডাক দিল। তাতেই আরেকদিকের একটু দূর থেকে ক্ষিপ্র গতিতে একজন ছুটে এসে বললেন, ‘আপনার নাম দীলতাজ?’ বললাম, হ্যাঁ! তিনি বললেন, ‘আমার নাম মাহবুব আজাদ। বাংলা একাডেমির উপ পরিচালক। আপনাকে আমি মনে মনে কত খুঁজছি! কারণ উত্তরাধিকার পত্রিকাটা আমি দেখি। আপনার বেশ ক’টা গল্প জমা হয়ে আছে। একটা পড়তে গিয়ে বেশ মজা লেগে গেল। আমার বাড়ি চট্টগ্রাম। একবার বাড়িতে যাওয়ার পথে আপনার সবগুলো গল্প সাথে নিয়ে গেলাম, ট্রেনে বসে পড়ব বলে। তো আমি তো একের পর এক আপনার গল্প পড়ছি, আর হাসছি। আমার হাসি দেখে, আমার পাশের লোকটি আমার দিকে গলা বাড়িয়ে দেখছেন। শেষে তাকে বললাম, আপনি পড়বেন? নেন না, এখান থেকে নিয়ে পড়েন, বলে তার হাতে আমার পড়া গল্পগুলো দিয়ে দিলাম। তারপর দেখি, তারও আমার মতো দশা। তিনিও পড়ে পড়ে হাসছেন! 

'কিন্তু আপনাকে যে কারণে খুঁজছিলাম। আমাদের তো সরকারি পত্রিকা। আমরা যা ইচ্ছে ছাপতে পারি না। তাই ওখান থেকে কোনো একটি গল্পের কিছু সংলাপ একটু সংযত করে দিতে হবে!'

আমি মুগ্ধ হয়ে আগন্তুকের কথা শুনছিলাম। শুনছিলেন, আমার পাশে যারা ছিলেন। এই ঘটনার বেশ আগে একদিন বাংলা একাডেমির একজনকে বলেছিলাম, যেখানে ডিজি স্যার নিজে ফোন করে আমাকে একটা গল্প নিয়ে আসতে বলেছিলেন। আমার দেয়া গল্পটা তিনি ছেপেও ছিলেন। কিন্তু তিনি ওখান থেকে চলে গেলে পরপর আরো ক’টা গল্প দিলাম, ছাপা হলো না। আমার কথা শুনে বাংলা একাডেমির সে কর্মকর্তা বলেছিলেন, ‘এখন ওটা দেখে মাহবুব আজাদ। উনি যে কুতুব, উনি আপনার গল্প ছাপবেন না!’

আর সেই মাহবুব আজাদ আমার লেখা নিয়ে আমার কানে অমৃত বর্ষণ করে গেলেন!  সবার ভেতর আমার একটু দর্পিতভাবই তখন ফুটে উঠলো। সেই তখনি মাহবুব আজাদের সাথে আমার ফোন নাম্বার লেনদেনও হলো। তারপর থেকে তিনি যখন তখনই আমাকে ফোনে ডাকতেন। সপ্তাহে অন্তত তিনদিন আমি বাংলা একাডেমিতে তার সাথে লাঞ্চ করি। প্রায়ই ঘরের খাবারও নিয়ে গিয়ে মাহবুব ভাইয়ের সাথে খাই! প্রায়ই অনেক রাতে মাহবুব ভাই ফোন করে বলতেন, 'দীলতাজ, একটা বই পড়ছিলাম। একটা জায়গায় এসে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আপনি শোনেন তো।’

সম্পর্কের এমন অবস্থার ভেতরে একদিন দুপুরে মাহবুব ভাইয়ের ডাকে গিয়ে দেখি তার টেবিলে একটা মাটির কলমদানি। বেশ কটা কলম তাতে তিনি সাজিয়েও রেখেছেন। আমি সে কলমদানিটা ধরে বললাম, এটা আমি নেব!

মাহবুব ভাই তা আমার হাতের থেকে ছিটকে কেড়ে নিতে নিতে বললেন, 'এটা আমাকে আমার একজন ভালবাসার মানুষ দিয়েছে! এটা কেন আপনি নেবেন? আপনার এমনটা পছন্দ হলে আমি আপনাকে আরেকটা কিনে দেবো!’

মাহবুব ভাইয়ের এই আচরণে আমি যারপরনাই  অবদমিত হয়ে গেলাম। সেখানে আরো দু’একজনও ছিলেন। কিন্তু বিষয়টা সবার সামনে ঘটলেও সূক্ষ্ম বা মোটাদাগের আপমান তাতে থাকলেও, বুঝতে পারলাম, সেটুকু দু’জনের কেউ খেয়াল করেননি! কিন্তু আমি অনেক্ষণের জন্য অবদমিত হয়ে গেলাম তিনটি কারণে। এক হলো, যেভাবে মাহবুব ভাই ওটা আমার হাত থেকে কেড়ে নিয়েছেন। দুই, আমার চেয়েও ভালবাসার মানুষ তার আর কেউ আছে। তিন, যাদের সামনে বিষয়টি ঘটলো তারা কি কিছু ভেবেও না ভাবার ভান করছেন কি না!

ঘটনাটা প্রায়ই মনে পড়ে আমার, মন খারাপ হয়। কিন্তু মনেরে বোঝাই, এই যে মানুষটি কি পড়লেন না পড়লেন, তাও আমাকে কিছুটা গেলাতে চেষ্টা করেন। এই যে প্রায়ই নিজের টাকায় দুপুরে খেতে ডেকে আনেন। বাড়িতে মিসকিন খাওয়াতে গেলেও আমাকে জোর দিয়ে যেতে বলেন। আমার বাড়ির সামনে দিয়ে কোথাও দাওয়াত খেতে গেলেও বৌকে বলেন, দীলতাজকে নেয়া যায় কি না। সর্বোপরি আমার তো শিশুতোষ গল্প লেখারই কথা ছিল না। যখন আমার সাথে তার পরিচয়, তার পরপরই তিনি উত্তরাধিকার ছেড়ে ‘ধান শালিকের দেশ’এর দায়িত্ব পেয়েছিলেন। তাই শিশুতোষ গল্প একরকম জোর করেই তিনি বেশ কয়েকটি আমাকে দিয়ে লিখিয়েছেন। তবুও সেদিনের পরে যতই তার সাথে সম্পর্কটা অছেদ্য রাখি না কেন, ভেতরে ভেতরে আমার ঠিকই বিষের বালি গর্জায়। তবু তিনি ডাকলে আগের মতোই যাই। না ডাকলেও ওই পথ দিয়ে যাওয়া আসার সময় ঢুঁ মারি! একদিন কোনখান থেকে ফেরার পথে ড্রাইভারকে বললাম, গাড়ি বাংলা একাডেমিতে ঢোকাও। আমি মাহবুব ভাইয়ের চেম্বারে ঢুকে দেখি, সেখানে তার আরো দু বন্ধু-কলিগ গল্প করছেন। যাদেরকে আমি ভাল করেই চিনি। কিন্তু তখন তিনজনেই বেরিয়ে যেতে উদ্যত। আমাকে দেখেই মাহবুব ভাই বললেন, ‘দীলতাজ এসে ভাল করেছেন। আমার এক বন্ধু এসছে আমেরিকা থেকে। আজ দুপুরে সে আমাদেরকে খাওয়াবে। আপনিও সাথে থাকেন।’ কেউ বিদেশ থেকে এলেই তার পকেট কেটে খেতে হবে, আমার সাথে সে প্রবাসীর তেমন সম্পর্ক নেই বলে আমি হতোদ্যম থেকে গেলাম এবং মাহবুব ভাইকে বললাম, তার চেয়ে সবাই মিলে চলেন, আমার বাসায় গরম গরম রুইমাছের দোপিঁয়াজি আর ভাত খাবেন। সাথে গাড়ি আছে। সবার জায়গা হবে। চলেন!’ আমার কথায় মাহবুব ভাই পটে গেলেন। কিন্তু তার কলিগ আনোয়ার মুর্শিদ অত সময় খরচ করতে রাজি হলেন না।

তারা তিনজন ভেতরে টেবিল-চেয়ার কেন্দ্র করে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমি চলে আসার জন্য ঘুরে দাঁড়াতেই মাহবুব ভাই বললেন, ‘দীলতাজ দাঁড়ান তো!’ বলেই তিনি ঝুঁকে টেবিলের নিচ থেকে কি যেন বের করছেন। একটু দূরের থেকেই টেনে আনছেন মনে হচ্ছিল। তারপর কাগজে মোড়ানো একটা প্যাকেট আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘ধরেন এটা! যেটার জন্য আপনার জান বেরিয়ে যাচ্ছিল!’

আমি মোড়ক খুলতেই দেখি মাটির সেই কলমদানিটা! আমার সমস্ত পৃথিবী তখন অলৌকিক আলোতে ভাস্বর হয়ে উঠলো। ভেতর থেকে বহুদিনের ধুলোর এক আস্তরণ যেন এক দমকা বাতাসে সরে গেল। আমি পারলে সবার সামনে কেঁদে ফেলি। কম্পিত কণ্ঠে বললাম, মাহবুব ভাই, আপনি আমাকে কি বাঁচানো যে বাঁচালেন! প্রতি মুহূর্তে আপনার এই এইটা কেড়ে নেয়ার সেদিনের দৃশ্যটা আমার মনে তীরের মতো বিঁধতো এবং সারাজীবনেও এটা আমার মনকে মুক্তি দিত না! মাহবুব ভাই বললেন, ‘জানি তো!’

তারপর মোড়ক খুলে দেখলাম ঠিক সেইটাই কি না। কারণ ও জিনিস শিশু একাডেমির সামনে ভুরি ভুরি পাওয়া গেলেও ওটা একটু অন্যরকম ছিল। ঠিক অনেকগুলো বোনের ভেতর একটা বোন অন্যরকম সুন্দর হলে যেমনটি হয়। কলমদানিটা ছিল, আদিবাসী নারীর মুখ। তারপর নজর গেল মাহবুব ভাইয়ের টেবিলে ঠিক তেমন আরেকটার দিকে। কিন্তু আলকাতরার মতো কালি মাখানো। বললাম, ওটাতে কেন কালি মাখিয়ে রেখেছেন?

মাহবুব ভাই উষ্মা মেশানো কণ্ঠে বললেন, ‘আর কেন? আপনার ভয়ে, ওটাও যদি চান!’

তারপর আমরা একসাথে রুম থেকে বেরোলেও তারা তিনজন কোনদিকে গেলেন তা আর দেখলাম না। কারণ আমার হাতে তখন যে জিনিসটি ধরা, তা আমাকে উড়িয়ে নিয়ে চললো এক ঝকঝকে উজ্জ্বল আলোর দেশে।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন