https://www.prothomalony.com/

8421

literature

সাহিত্য

দিলাম উষ্ণতার সবটুকুঃ এইচ বি রিতার এক রহস্যময় প্রেমের কবিতার বই

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৪ ১০:৪৪

প্রেম মানুষের মনের এমন এক উপলদ্ধি, যা যে কোনো সময় জাগ্রত হতে পারে। প্রেমের রঙিন বসন্ত কিংবা প্রেমের বিষাদ জীবনের কোনো এক সময় সবাইকেই ছোঁয়ে যায়। প্রেমের এই অনুভূতি ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে শ্রষ্টার প্রতি, প্রকৃতি, পশুপাখি, জাগতিক সৌন্দর্য ও নিজের সাথেও হতে পারে। এইচ বি রিতার 'দিলাম উষ্ণতার সবটুকু'- বইটির শুরুতে এমনটাই লেখা আছে। 

'দিলাম উষ্ণতার সবটুকু'-সুখ ও জ্বালাময় প্রেমাস্বাদনে মুক্ত কবিতায় রচিত একটি বই। বইটিতে ৫২টি প্রেমের কবিতা রয়েছে। প্রতিটি কবিতা গভীর এবং সূক্ষ্ম আবেগের একটি চিত্তাকর্ষক অনুসন্ধান যা সর্বস্তরে প্রেমের বুনন করে। শব্দের ছন্দময় নৃত্যের মাধ্যমে, প্রতিটি কবিতা লুকানো প্রেম, ব্যথা, অব্যক্ত আকাঙ্ক্ষাকে উন্মোচন করে, যার মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ের সবচেয়ে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের একটি প্রাণবন্ত প্রতিকৃতি পাঠক দেখতে পাবেন। মর্মস্পর্শী থেকে আবেগময় মুহূর্ত পর্যন্ত কবিতাগুলোতে নস্টালজিয়া এবং গভীর আত্মদর্শনের একটি সূক্ষ্ম মিলন রয়েছে। 'দিলাম উষ্ণতার সবটুকু'- এইচ বি রিতার এমন এক প্রেমের শৈলী যা ভালবাসার স্থায়ী শক্তির প্রতি একটি নিরবধি শ্রদ্ধাকেও প্রকাশ করে।

বইটি পড়ার পর কিছু কবিতা যা আমার খুব ভালো লেগেছে এবং সহজে বুঝতে সুবিধা হয়েছে, সেগুলো নিজের মতো করে একটু বলার চেষ্টা করছি। 


বইটির প্রথম কবিতার নাম 'চুম্বন।' 

"চুম্বন-ছিল একটি শুরু

একটি মধ্যম এবং সবশেষে একটি পরিণতি

এটি চিরকাল ধরে রাখার মতো একটি মুহূর্ত

কারও কলম হাতে তৈরি একটি; প্রেমের গল্প।" 

শেষের এই স্তবকেই বোঝা যায় যে, প্রথম চুম্বনের অনুভূতি থেকে গেলেও 'এটি চিরকাল ধরে রাখার মতো একটি মুহূর্ত' অর্থাৎ সে প্রেমের পরিণতি ঘটেছিল বিচ্ছেদের মাধ্যমেই, তাই কবি মুহূর্তটিকে চিরকাল ধরে রাখতে চাচ্ছেন। 

 

উষ্ণ প্রেমের আহ্বানে কবি 'কেউ কী আছো' কবিতায় বলছেন, 

"কেউ কী আছো অবসরে-সময়কে বুকে না ধরে

যে আমায় নিয়ে যাবে নাটোরের চলন বিলে

বর্ষায় ভাসমান দ্বীপ-সবুজ গ্রামে 

যেখানে হেঁটে হেঁটে শীতের অতিথি পাখিরা আমায়-

গান শোনাবে?"

এমন প্রেমের কবিতাও কোনো প্রেমিককে নিয়ে যেতে পারে নাটোরের চলন বিলে যেখান থেকে শুরু হতে পারে হাতে হাত রেখে দু'জনের আজীবন চলার পথ।

 

"এটি ছিল বসন্তের প্রস্ফুটিত ঋতুর মতো একটি রাত।

সে এসেছিল, স্পর্শের প্রয়োজনে আমার হৃদয় ভিজে গেল

একটি দ্বিধাগ্রস্ত আত্মা সংযম ছাড়াই, আত্মসমর্পণ করল।

সে আমাকে চুমু দিল

আমি তার বুকের উষ্ণতায় স্তব্ধ হয়ে গেলাম -সারা রাত ধরে"(থেকে যায়) 

এমন মধুর প্রেমে পাঠক খোঁজে পাবেন বিচ্ছেদের ঘ্রাণ, 'এটি ছিল বসন্তের প্রস্ফুটিত ঋতুর মতো একটি রাত' লাইনটিতে যা অতীত হয়ে গেছে। 

 

"আমি-ই কী সেই নারী প্রতিমা" প্রেমের কবিতাটি ভগ্ন হৃদয়ের যে কাউকে আন্দোলিত করবে। 

"আমিই কী সেই, যাক খুঁজে চলেছো অনন্তকাল

প্রতিজ্ঞার আড়ালে কল্প ঠোঁটে 

পিগম্যালিয়ন প্রগাঢ় চুম্মনে কম্পন তুলছো তুমি বাহুবলী

আমিই কী তবে সেই নারী প্রতিমা-

যাকে খুঁজছো তুমি অনন্তকাল?" 

 

"আজ বৃষ্টির দিন" কবিতাটিতে কবি অতি নিপুনতার সাথে প্রেমকে প্রকৃতির সাথে বেঁধেছেন।

"ভিজে যাওয়া পৃথিবীর মিষ্টি সুবাসে 

ঝরনার প্রবাহিত জলের স্নিগ্ধ শব্দ-জানান দিয়ে যায়

আজ বৃষ্টির দিন! গাছের ডালে পাখির কলকাকল

নগ্ন তরুণীর মতো রৌপ্য তরল বৃষ্টির ফোঁটায়

ভেজা শরীর মন ভিজিয়ে যায়-

শিহরণে তাপ ছুঁড়ে যায়।

এমন দিনে রঙিন ছাতা-গরম কফিতে আমাদের 

একটি চুম্বন, বর্ষার কাছে ঋণী করে যায়।" 

 

ভাবনার জগতে তলিয়ে যেতে যেতে কবি অতীত ছেড়ে ভবিষ্যতের দুয়ারে এগিয়ে গিয়ে দেখেন তার জরাজীর্ণ সময়কে। ফিরে ফেতে চান পুরোনো প্রেম। তাই তো কবি "বয়স যখন ষাট" কবিতায় লিখেন,

"ষাটের বয়সে হয়তো আমি সমুদ্রপাড় বেছে নিবো

বসে থাকবো জলের কলকল শব্দের গা ঘেঁষে 

সবুজ হারাবে তার রঙ 

গোধূলি লগ্নে উচ্ছল জলতরঙ্গে চলবে আমার

জীবনের সাথে সন্ধির ঘূর্ণয়ন

চলবে নিঃসঙ্গতার সাথে বহু বছরের গোপন চুক্তি!

ঠিক এমন সময় হয়তো, আধো আলোয়ারিতে কারো

অশরীরী ছায়া দেখে চমকে পিছন ফিরে তাকাবো

একি! তুমি!" 

 

এইচ বি রিতার এমন আরো বহু কবিতা আমার মনকে নাড়া দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করার মতো কবিতাটি ছিল সরল বাক্যে গদ্যে লেখা "অচিন্ত্য।" দীর্ঘ দশ পর্ব আকারে লেখা কবিতাটির মধ্যে লুকানো এক গভীর রহস্যময় প্রেম খুঁজে পাই। এটি পড়তে পড়তে যে কোনো পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগবে, কে এই অচিন্ত্য?  কবিতায় অচিন্ত্য কখনো শিশু, কখনো একজন অভিভাবক, কখনো বন্ধু, কখনো প্রেমিক, কখনো পরামর্শদাতা হয়ে উঠেন কবির আবেগময় কাব্যিকশৈলীতে। একি কেবলই কবির কল্প জগতের কেউ নাকি বাস্তবের কেউ-তাও এক রহস্য। এমন প্রেমময় কবিতাটি পড়তে পড়তে যে কোনো পাঠক ঢুকে যেতে পারেন নিজের কল্পজগতে। আবিস্কার করতে পারেন এক প্রেমিক বা প্রেমিকাকে। 

'দিলাম উষ্ণতার সবটুকু' -এইচ বি রিতার ব্যক্তি এবং  সামগ্রিক প্রেমকে তোলে ধরে। সে প্রেমে দেখি পশুপাখি, ঝরা পাতাদের কলকল ধ্বনি, গৃহহীনের কান্না, কাঠবিড়ালি, বৃষ্টির রুমঝুম শব্দ, কারো ভরাট কণ্ঠস্বর, চোখের ভাষা, আহ্বান, অস্থির চাহনি, কফির কাপে স্টারবাক্স, রাতের আকাশ, রাতের তারা, বৃক্ষ, ভাঙ্গন, কাস্তের বাঁকা চাদ, শরৎয়ের নিঃশ্বাস, লুলাবাই, আলিঙ্গন, আকাঙ্ক্ষা, ফোনালাপ, সমর্পণ এবং অবশেষে অচিন্ত্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধায় নত কখনো অভিযোগে ভরাট এক আবেগময় প্রেম। 

একজন কবি তার কবিতায় তখনই জীবন্ত হয়ে উঠেন যখন তার প্রতিটা অক্ষর, শব্দ-বাক্য, অভিজ্ঞতা, আবেগ ও ভাবনা  পাঠকের ভেতর নাড়া দেয়। যখন পাঠক একটি কবিতা পড়তে পড়তে আবেগী হয়ে উঠেন, মনে মনে ভাবেন, 'আহা! এ তো আমারই কথা', তখনই একজন কবি তার কবিতার মাধ্যমে সার্থকতা লাভ করেন। এইচ বি রিতা এমনই একজন কবি লেখক, যে তার লেখায় খুব সহজে তোলে ধরতে পারেন মানুষের যাপিত জীবনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ বেদনা কিংবা পূর্ণতার পাশাপাশি অভাব। বইটির কবিতাগুলো পড়ে নিন্দা বা সমালোচনা করার মতো কোনো কিছু আমি খুঁজে পাইনি। হতে পারে আমি একজন অদক্ষ বা অনভিজ্ঞ পাঠক।  তবে এটুকু তো বুঝতে পারি, এইচ বি রিতা যা-ই লিখেন, তা তার গভীর পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা, উপলদ্ধি ও ইন্দ্রিয়ের বাইরে গিয়ে গভীর ভাবনার ফসল। 

বইটিতে কবি এইচ বি রিতা লিখেছেন, "বইটি সাজাতে আমার বিন্দুমাত্র সমস্যা হয়নি। কেননা, প্রেমের কোমলতার অগণিত দিকগুলি অন্বেষণ করতে, আলিঙ্গন করতে জানি আমি। বিষণ্ণতার গভীরে নিজেকে নিমজ্জিত করা কিংবা প্রেমের আনন্দ উপভোগ করা- দুটোর অভিজ্ঞতাই রয়েছে আমার। তাই এই বইয়ের কবিতাগুলো পাঠকদের আবেগের পূর্ণ বর্ণালীকে আলিঙ্গন করতে এবং কবিতার রূপান্তরকারী শক্তিকে আবিষ্কার করতে আমন্ত্রণ জানাবে বলে আশা রাখি।" 

প্রেম জাগ্রত অগণিত আবেগের মধ্য দিয়ে এইচ বি রিতার লেখা 'দিলাম উষ্ণতার সবটুকু' বইটি পাঠকের ভাবনাকে আলোড়িত করবে বলে আমিও আশা রাখি। 

বইটি প্রকাশ করেছে ঘাসফুল। প্রকাশক মাহাদী আনাম। প্রচ্ছদে আছেন শামীম আরেফীন। বইটি পাওয়া যাচ্ছে অমর একুশে বইমেলা-২০২৪, স্টল নম্বর ১৪৭/১৪৮। 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন