https://www.prothomalony.com/
8384
literature
অহঙ্কার নেই বলে
কাকন রেজা
অহঙ্কার নেই বলে করি না তা নয়
মাঝেমধ্যে করতে ইচ্ছে করে
কিন্তু চেপে রাখি
যেমন চেপে রাখি বুকের মধ্যে তাকে
অহঙ্কার নেই বলে করি না তা নয়
করতে ইচ্ছে তো করেই
যখন দেখি নিজের তৈরি পুতুল ভেংচায়
খোলস কাটে তার সুতীক্ষ্ণ দাঁত
অহঙ্কার নেই বলে করি না তা নয়
আলস্যের কারণে করা হয়ে ওঠে না
আলস্য পরম ধন, নইলে কী আর পুঁচকেরা
হ্যাঁ, পুঁচকেই বটে ধুলোর মতন
অহঙ্কার নেই বলে করি না তা নয়
আমি নিজেই বিমূর্ত অহঙ্কার এক
প্রকট হবার ইচ্ছে নেই বলেই চুপচাপ
তোমাদের সামনে নত হয়ে থাকি
আমার সব মগ্নতা
খ্রীষ্টফার পিউরীফিকেশন
আমার সব মগ্নতাকে তুমি,
ছাইচাপা দিয়ে কেড়ে নিয়েছ
সাথে, সবটুকু সময় যা ছিল আমার জমা।
কিছুতেই আমি তা ফিরিয়ে আনতে পারিনি।
না আমার মগ্নতা। না আমার সময়।
আর এখন কী সব অনাবশ্যক
মনস্তাপ নিয়েই কাটাই বিনিদ্র নিশিকাল।
বাইরে কী সুনসান চাঁদরাত একা পড়ে থাকে
বাঁশঝাড়ের আবডালে।
এ সময় কেউ ওখানে পা মাড়িয়েছে
আমার বিশ্বাস হয় না।
আমার বিশ্বাস হয় না তুমিও
এগিয়ে গিয়েছ ওদিকে।
বোধ করি এক্ষণে তুমি বাতি নিবিয়ে
মাথার নিচে অবসন্ন হাত রেখে
ঘুমের আড়ালেই চলে যেতে চাইছ।
আমার তো এখানেই কষ্ট।
বিনিদ্র প্রহর গুণে গুণে আমি যখন
একেবারেই নাজেহাল,
তুমি কী নিরাপদে রাতের আঁধারে
নিজেকে কর সমর্পণ! একান্ত সন্তর্পণে!
একবারও কি ভেবেছ এই আমার কথা?
ভেবেছ কি তোমার আমার স্বপ্নময়
সেই চাঁদরাতের কথা?
এমন সময় কবিতার পঙক্তি ছাড়া
রবীন্দ্রসংগীতের মূর্ছনা ছাড়া
কীভাবে কালের গর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে!
তুমি ভেবেছ? ভেবেছ কি
এই আমি কীভাবে অনর্থক সময়ের করতলে
নিজেকে সঁপে দিয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছি?
আহ্বান
পিংকী দাস
কিসের এতো ত্রাস! কিসের এতো ভয়!
বেরিয়ে আসো দাসত্বের বাঁধন খুলে
জীবনের উল্লাসে নাম লিখতে চাইলে বেরিয়ে আসো পথিক;
ত্রাসের রাজ্যে সত্যের ফুলকি হয়ে।
বাড়িয়ে দাও দু'পা, প্রসারিত করো বাহু
সদা সত্যকে আলিঙ্গনে।
জীবন কাউকে নিজে থেকে কিছু দেয়না
অর্জন করে নিতে হয়, নতুবা মৃতের মতো
প্রাণহীন দেহ কংক্রিটের জঞ্জাল হয়ে
দু'পা আর বাহুকেই জড়িয়ে রয়।
কিসের এতো ভয়!
বেড়িয়ে আসো পথিক ত্রাসের রাজ্যে দামাল বেশে
সদা সত্যকে আলিঙ্গনে।
আসো পথিক, আসো দিকভ্রান্তের আলোর দিশারী হয়ে।
আসো পথিক অন্ধকার ঘুচিয়ে
মশাল মিছিলের অগ্নিশিখা হয়ে।
সত্যানুসন্ধান
সুবীর কাস্মীর পেরেরা
আয়নার ভিতরে প্রতিচ্ছবি
আমার ভিতরে আমি,
অংহকারের ছন্দ-মাত্রা
তুচ্ছ না-কি দামি?
পরকে আমি ভাবি না পর
ঘরকে ভাবি ঘর,
নরের ভিতর নারীর আভা
নারীর ভিতর নর।
জয়ের ভিতর কষ্ট থাকে
নষ্টের ভিতর ভ্রষ্ট ,
দোষের ভিতর দোষী থাকে
সবই মানব সৃষ্ট।
জীবের ভিতর মরণ থাকে
ধরণ ভিন্ন ভিন্ন,
লক্ষ্য হীনা তুমি-আমি
যোগ ফলাফল শূন্য।
দিনের মাঝেই রাত্রি থাকে
কালোর ভিতর আলো,
দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দেখো
জগৎ সবই ভালো।
ধর্মের ভিতর বাড়ছে ভেজাল
কর্মের ভিতর দ্বন্দ্ব,
কবির কাব্যে সত্য ভাষণ
বলুক লোকে মন্দ!
কালের ঘড়ি
আলম মাহবুব
মেঘরাঙা রোদে কুয়াশার বিনয়ী ফুল ফোটে
লাম্পপোস্টের আলোয় জাগে রাত
ধূসরের চোখ স্বপ্ন দেখে।
নদী মরে তৃষ্ণায়
অন্ধ ছায়ার গানে ব্যস্ত কাপালিক দিন
পরন্ত প্রহরে বালক দেখে সময়ের ঘড়ি,পথের
ডাকে উড়ে আগুন চোখ
তীব্র ভিজে বৃষ্টির কুহকে শ্যাওলার ঘাম
গহীনে নিশ্চুপ দুঃসহ বিষাদ।
লাল ঘোড়া দাবড়ায় রাজ্যের সেতুর সেতারে
ক্ষুধার্ত ঈগলের চোখে জুঁইফুল
কামরাঙা রঙে লেখে ভোরের কারফিউ।
ডানা ঝাপটানো মানুষের তীব্র ডাক আসে
সাগর সঙ্গমে ভেসে ওঠে কবিতার লাল বারুদ।
অনুভবের অনুধ্যান
জহিরুল হক বিদ্যুৎ
জীবনের প্রতিটি আঘাতই যেন
শিক্ষকের মতো পথ দেখায়,
যে বুকে আঘাত নেই সে বুকে ইতিহাস নেই।
ঐ যে সূর্য কী দারুণ শিল্পকর্ম তার
কখনো নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা হয়ে
অগ্নিচোখে ফিরে আসে এই জনপদে,
কখনো দ্যুতি ছড়ায় শরতের কাশফুলে
কখনো বা স্বপ্ন আঁকে হেমন্তের পাকা ধানে।
কখনো আসে শীতের ঘনকুয়াশায়
জীবনানন্দের কবিতা হয়ে
অথবা এক লহমায় বসন্তের কচিপাতায়
হয়ে ওঠে রবীন্দ্রনাথের প্রেমকাব্য।
কতটা আগুন বুকে চেপে হয়ে ওঠে সূর্য
সে কথা সবাই যদি ঠিক জানতো,
তাহলে আঘাতের কাছে হাঁটু গেড়ে না বসে
সূর্যের মতো লিখে যেত জীবনের পাণ্ডুলিপি।
যুথীকে মিস করি
সৈয়দ নূরুল আলম
আজকাল লিখতে গেলে কথারা আসে না, দু-এক লাইন
লিখার পরে থেমে যায়,
মনে পড়ে না কি জন্যে- হয়তো তুমি নেই তাই।
এক সময় গভীর বনে হাঁটার কথা ছিল দু'জনের- ঘুঘুর ডাক
শুনবো নির্জন দুপুরে
লক্ষ্মীপ্যাঁচা যদি আসে, তাড়াবো না- আদরে আদরে ভরে দেব,
প্রয়োজনে কাছে টেনে নেব।
হিংসে যদি হয়, অভিমানী মুখ টেনে তোমাকেও না হয়,
আরো দুটো দেব।
যদি তাতেও না হয়, লক্ষ্মীপ্যাঁচার কান দুটো মলে
ছেড়ে দেব ঝোপের আড়ালে।
খুব মিস করি তোমাকে।
বহাল বিবাদ
আরজাত হোসেন
একদল শকুনের কলহ - বহাল বিবাদ
নাই কোনো শুভাশুভ নিষ্পত্তি।
সারি গাছের পাহাড়ে বন কার্যালয়,
এতক্ষণ যে জবুথবু আছিল সে হঠাৎ কইরা দৌড়ি আহে –
তারপরে বেবাক ঝগড়া!
পেটে ক্ষুধা তো জিহ্বায় স্বাদ থাকবেই।
কাড়াকাড়ি পইড়া যায়, কে কারে মারে!
বোঝানো মুশকিল - তোমরা দেহনাই মিথ্যার নাচানাচি!
এমন দুর্বোধ্য সময়ে কী করা যায় কও তো?
বিকল্পে ফেলে আইছি সে শকুনের দল।
এহন তুরা কাড়াকাড়ি কইরা খা।
.jpeg)
জীবনের অর্থ
পারভীন আকতার
নির্দিষ্ট একটি বহমান সময়ের ধরাবাঁধা শৃঙ্খলই জীবন। এর বাইরে মানুষ চাইলেও কখনোই যেতে পারার সাধ্যটি তার নেই। মানুষ যখন শিশু বেশে সদ্য পৃথিবীতে আগমন করে তখন সে থাকে খুবই দুর্বল,অবুঝ আর অক্ষম। অন্যের সাহায্য ছাড়া তখন শিশুটি একফোঁটা মায়ের দুধও চেয়ে পান করতে পারে না। এমনই অসহায় থাকে মানুষ শিশুকালে। ধীরে ধীরে মা বাবা স্বজনের সহায়তায় শিশুর মুখে বুলি ফোটে। হাঁটতে শেখে অন্যের হাত ধরে। জীবন চলার পথ এমনই কঠিন।
আমরা যখন জীবনকে বুঝতে শিখি, তখন কতই না আমাদের অহমিকা দাম্ভিকতা জ্ঞানের বাহাদুরি হৃদয়ে জন্মে। চলাফেরায় বেশভূষণে অপার অহমিকা আভিজাত্য প্রকাশ পায়। মানুষ তখন সৃষ্টিজগতের সবকিছুই তার পায়ের তলায় মনে করে। ধরাকে মনে করে এ তাদের কাছে কিছুই না। মানুষ এতটাই বেঈমান আর অকৃতজ্ঞ যা পবিত্র কোরআনেও আল্লাহ বারবার বলেছেন। তাঁর সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ থেকে তিনি প্রতিনিয়তই ভালোবাসার বদলে আঘাত পান। তবুও তিনি ক্ষমা করে দেন মানুষ কাঁদলে স্বীয় কৃতকর্মের অনুশোচনায়।
শৈশব,কৈশোর আর যৌবন পেরিয়ে মানুষ একসময় ফের বার্ধক্যে পৌঁছে। মুখাবয়ব হয়ে পড়ে কদাকার আর বলি রেখায় ভরপুর। বার্ধক্য রূপটার বাহ্যিক সৌন্দর্যটা খুবই ভিন্ন হয়। একটা মেশিন চালাতে চালাতে একসময় পুরোনো হয়ে নাট বল্টু যেমনি পড়ে গিয়ে নড়বড়ে হয়ে যায় ঠিক তেমন হয়ে পড়ে মানুষের শরীর মন। এরপরও অহংকার করার মত কিছু থাকে কি? বয়সের ভারে নুইয়ে পড়ে ধন সম্পদের পেছনে মরিয়া হয়ে ছুটে চলা মানুষগুলো, তখন প্রিয়জন থেকে সহস্র মাইল দূরে থাকে। কারণ সুখের সময়ে তারা ছিল উচ্চ বিলাসী, দাম্ভিক আর ধরা ছোঁয়ার বাইরে। গরীব আত্মীয়স্বজন থাকে ধনীদের চোখের বালি। রমরমা ব্যবসায় তখন মা বাবা ভাই বোন হয়ে পড়ে অচ্ছুৎ। আর বাইরের লোক হয় লাভের মনোহরী উপাদান।
মানুষ জন্মের সময় যেমন একা আসে অসহায়ের বেশে তেমনি মৃত্যুর সময়ও খুব একা হয়ে পৃথিবী ছাড়ে। তখন তার ধন সম্পদের পাহাড় থাকলেও তা কোন কাজে আসে না। মানুষ বিবস্ত্র হয়ে পৃথিবীতে আসে আর বিবস্ত্র হয়েই যেত যদি না সাদা কাফনটা না দেয়া হত। মানুষের জন্মের পর গোসল যেমন অন্যের হাতে হয় তেমনি মৃত্যুর পরও তার শেষ গোসলটাও অন্যরা দেয়। তাহলে কীসের এত বাহাদুরী, অহংকার, মারামারি, হানাহানি আর বেঈমানী করার প্রয়োজন পড়ে মানুষের? অথচ ক্ষণস্থায়ী এ জীবনটা হতে পারে কতই না সুন্দর অর্থবহ!
মানুষের মতো তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার জীব আরেকটি নেই।পুরো পৃথিবী শাসন করার ক্ষমতা এজন্য মানুষের হাতেই ন্যস্ত। কিন্তু ক্ষমতার লোভ, অর্থের লিপ্সা, কামাতুর বাসনা আজ মানুষকে চির অধ:পতনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
মানুষ চাইলেই জীবনকে অর্থবহ সুন্দর ব্যাখ্যায় চালাতে পারে। কেবল নিয়মিত নিজেকে অনুশাসনে রাখা,অন্যের দুষ্ট বুদ্ধি বোঝার ক্ষমতা প্রজ্জ্বলিত হলে শয়তানের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। আর ভুল করলে তার অনুতপ্তের নিরেট স্বীকারোক্তি নিজের কাছে হওয়া চাই। বাইরের লোক কে, কী বলল তা কোন বিষয় নয়। কারণ মানুষ তার কর্মফল নিজেই ভোগ করে আর পাপ পূণ্যের ভাগিদার হয় তার পরিবার। কষ্ট বা সুখ অনুভব করে একান্তই তার পরিবার পরিজন। বাকীরা হাততালি দেয়। অসহায় হয়ে পড়লে করুণা দেখায়। কখনোই সহমর্মিতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সাহায্যের হাত বাড়ায় না। তাহলে জীবনে অর্থ কী দাঁড়াল? আসছি একা আর যাব একাই। কেউ কারো স্মৃতিতেও একসময় না-ই হয়ে যাব, তাহলে কী দরকার এতই দুনিয়ার প্রতি লোভ করে?
জীবনের অর্থ হবে যেহেতু নির্দিষ্ট একটি সময়সীমায় আমরা বেঁচে থাকব আর কখন তা শেষ হবে হুট করে জানিও না। তখন জীবনকে ভালো কাজেকর্মে, ন্যায়ের পথে পরিবার পরিজন নিয়ে আনন্দে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া,অসহায়ের পাশে প্রতিবিম্ব হয়ে দাঁড়ানোর নামই হলো জীবন। আমরা মানুষ বিবেক দিয়ে চললে ধীরে ধীরে পাপ মোচন হবেই হবে। স্রষ্টাও ক্ষমা করবেন তার সৃষ্টির অনুতাপ সত্যিকার দেখলে। তিনি তো সবার মনের ভিতরের বাইরের সব খবর জানেন এবং রাখেন সর্বদা। তাহলে ভয় কি, আমরাতো তাঁর কাছেই ফিরব ফের। তাই পবিত্র হয়ে ফিরতে হবে তাঁর কাছে আত্মার বিশুদ্ধতায়।
শেষদিনটি জীবনের যেন প্রিয়জনের সান্নিধ্য নিয়ে মরা যায় তা-ই হওয়া উচিত জীবনের চরম উপজীব্য। অর্থ বিত্ত, সুনাম আর গাড়ি বাড়ি মৃত্যুর সময় অহেতুক মনে হবে কেবল রক্ত মাংসের মানুষের ভালোবাসার ভালোলাগার অনুভূতির স্পর্শ তখন পরম শান্তি দেবে। তাই, না হয় সকলের মাঝে নিঃস্বার্থ, নির্লোভ আর মোহহীন ভালোবাসা ছড়িয়ে যাই।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন