https://www.prothomalony.com/
8295
literature
শিল্পকর্ম
কাজী জহিরুল ইসলাম
প্রকৃতি-সৃষ্ট একটা কিছু দেখে মানুষ প্রায়শ অভিভূত হয়,
মুগ্ধ হয়,
কেউ কেউ সেই মুগ্ধতার প্রতিকৃতি তৈরি করে,
কেউ ভাস্কর্য নির্মাণ করে,
কেউ রঙতুলির আঁচড়ে ক্যানভাসে ভাসিয়ে তোলে প্রিয় কোনো দৃশ্য,
কেউ নির্মাণ করে শ্রেষ্ঠতম শব্দের বিন্যাস,
মানে একটি কবিতা, আবার কেউ নির্মাণ করে চলচ্চিত্র,
এইসবই শিল্পকর্ম,
শিল্প মানেই কৃত্রিম, অ-প্রাকৃতিক।
দেখা থেকে নির্মাণ অব্দি যে দূরত্ব, এটি শিল্পের গর্ভাবস্থা,
এই সময়ে শিল্পের হাত-পা গজায়,
হৃৎপিণ্ড তৈরি হয় এবং
জন্মের জন্য সে প্রস্তুত হতে থাকে।
দেখার মধ্যেও একটা বড়ো ব্যাপার ঘটে,
এই ব্যাপারটিই বলে দেয় কে শিল্পী
আর কে শিল্পী নয়।
দুজন মানুষ একটি বৃক্ষের দিকে তাকিয়ে কি একই বৃক্ষ দেখে?
দুজন মানুষ আসলে দেখে দুটি বৃক্ষ,
প্রত্যেকের বুকের ভেতর তার নিজস্ব একটি বৃক্ষ আছে,
নিজের একটি নদী আছে,
নিজের একটি পাহাড়, অরণ্য আছে,
আছে খুব নিজের একটি পাখি,
সব পুরুষের বুকের ভেতর তার নিজের একজন নারী থাকে,
নারীদেরও থাকে এক অনিন্দ্য পুরুষ।
সব মানুষের মধ্যে সে তার নিজের মানুষের প্রতিফলন দেখে,
এবং বাইরের দৃশ্যের সঙ্গে ভেতরের দৃষ্টি, যাকে আমরা অন্তর্দৃষ্টি বলি,
তা মিশিয়ে তৈরি করে নতুন এক গাছ,
নতুন এক পাখি,
নতুন নদী,
নতুন নারী কিংবা পুরুষ।
যিনি শিল্পী, নিজের মধ্যে অনুভব করেন
সেই দৃশ্যের রেপ্লিকা তৈরির তাড়না।
শিল্পকর্ম হচ্ছে শিল্পীর চোখে দেখা প্রকৃতি-সৃষ্ট দৃশ্য বা প্রাণের
এক অনিন্দ্য রেপ্লিকা, আর কিছু নয়।
নির্বোধ বুজুর্গি
কাজী আতীক
কখনো যখোন গভীর সমুদ্রে সৃষ্টি হয় নিম্নচাপ,
ক্রমশ জোরালো হবে, ফুসে উঠবে সাগর,
শুরু হবে প্রলয় ঝড়, সাথে বজ্রবৃষ্টি অঝোর,
জানা ছিলো সবারই,
উপরন্তু বিপদ সংকেত দেখিয়েও যেতে বলা হয়েছিলো
শুরুতে স্থানীয়, ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী তারপর মহা ইত্যাদি,
তবুও কেউ সহজে ছেড়ে যেতে চান না নিজস্ব বসত,
যেতে চান না অপেক্ষাকৃত নিরাপদ স্থানান্তরে,
অতঃপর যদি প্রাণহানি হয়, মানুষ এবং গবাদি
যদি নষ্ট হয় যাকিছু অস্থাবর সহায় সম্পত্তি,
বৈরী প্রকৃতিকে দোষারোপ করে লাভ কি হবে কিছু?
উপায় ছিলো নিজেকে বাঁচানো সাথে কিছু জরুরি,
বুদ্ধিভ্রষ্ট- সবকিছু বাঁচাতে চাওয়া নিরেট পাগলামি,
পরিণাম- আমতো গেলো গেলো- সাথে ছালাও
অথচ শুনেছি- নিজের ভালোটা নাকি পাগলও বুঝে।
অনতিক্রম্য বিষাদ
বেনজির শিকদার
গর্ভবতী জোছনায় মনটা আর্দ্র ভীষণ
বালখিল্যতা নয় কিছু বন্ধুও পেয়েছি;
কতক পরিবার গড়ে উঠেছে হৃদয়ের অদূরে।
জগৎ-সংসার বলে কথা!
পলে পলে পাতার নাচনের মতো অনুভূতির বিস্তার
ছায়ায়-কায়ায়-মায়ায় গৃহস্থালিও রচনা করতে চায়।
লুলো-ঠ্যাটাদের মতো ঘিরে ধরা অভিপ্রায়-উদ্গম
আছে ব্যঞ্জন অবসরে কিলবিলিয়ে ওঠা—
স্মৃতিবিজড়িত মসলিন মায়া;
যেন হাপিত্যেসে গলধকৃত;
সমীরণ-সৌন্দর্যে স্বর্গকে হার মানানো!
পিঞ্জরে কুলফি মালাই ক্ষরণ নিয়ে মন
বিষে বিষক্ষয় ভালো থাকা নয়; মনস্তাপ, দহন
কুয়াশাচ্ছন্ন নির্মম সব, বড়ো এলোমেলো ভীষণ!
যেন সাইরেন বাজিয়ে মনের দোটানা কুরেকুরে খাওয়া
যেন কোথাও এক অবসম্ভাবি অনতিক্রম্য বিষাদ!
যেন কষ্টবাড়ির ঝংকারে এক ধুতুরার শরীর!
যেন বুক-ইঁদারায় হলাহল পান করা এক নীলকণ্ঠ!
যেন ভালোবাসা আমার সহ্য হয় না—
আর কী এক অপেক্ষার বুনোজলে ভেসে যায় সকল জবাব!
কোথায় গেলো সব
পলি শাহীনা
বাড়ি ঢুকতেই মনে হলো, কোথায় আমার বাবা-মা!
কোথায় আমার রঙিন ছেলেবেলা!
কোথায় সে স্নিগ্ধ সকাল, শান্ত দুপুর,
যাযাবরী সন্ধ্যা!
কোথায় আমার ভাইবোন, ভাতঘুম, খেলার সাথীরা!
কোথায় সে উৎসব, জাউ ভাতের গরম থালা
কোথায় সে ফুলের বাগান, হাসনাহেনা, অপরাজিতা!
কোথায় সে সোঁদা মাটি, রসুইঘর,
ফোড়নের ঘ্রাণ, বাঁশপাতা
কোথায় সে পূবের মাঠ, রুপালি রোদ,
সহজ পাঠ, পাঠশালা!
গাঢ়তর বিষাদে ডুবে শূন্যতার তরঙ্গ সাঁতরে ভাবছি,
কেউ কি তাদের খবর জানে?
ঠিক তখুনি চোখ পড়ে রঙ্গনে,
সে আমায় উবু হয়ে পরম আদরে কাছে ডাকছে।
হাত বাড়াতেই যেন কতগুলো রঙিন প্রজাপতি
উড়ে গেলো আকাশে।
অজস্র শুকনো পাতাদের সঙ্গে হেলেদুলে আমিও
উড়ে যেতে থাকি উৎসবে।
জীবনচক্র ঠিক এরকমই, ঝাপসা চোখ মুছে
এক আশ্চর্যজনক আনন্দ যাত্রা অজানা-অচেনা গন্তব্যে।
সূর্যগন্ধা মেঘ
রফিকুল নাজিম
সূর্যগন্ধা মেঘ, আমায় চেয়ে দেখ্
আমি কেমন আছি?
দেখ্- দু'চোখে আমার সাত সমুদ্রের জল
প্রায়শই তুই সেই জলে স্নান করিস
আমার বুক ভিজে;
তবুও কেন তোর মন ভিজে না?
আজও আমার বুকে জল গড়ায়
আমি আর ভিজি না
সূর্যগন্ধা মেঘ,
কেন ভিজি না- বলতে পারিস?
উজানে
সনজিৎ নারায়ণ চৌধুরী
তুমি তো উজানি, উজানেই তোমার বাস
তবে কেন ভাটির নদীর সাথে মেটাতে চাও মনের আশ?
স্রোত ছিলো না, ঢেউ ছিলো না--ছিলাম নিরিবিলি
শুনেছি, গন্ধমে হয় খেলা শুরু
সরোবরে নিশিঘুমের বদলে বরং
নৌকায় যাবো আমি
ঘোলাজলে উজানে অলকানন্দায়।
যথাবিহিত ভালোবাসা
সাজ্জাদুর রহমান
একটু যথাবিহিত ভালোবাসা পেতে
মৌণ বিছানার পাশে বসে থাকে পীড়িত সময়
হৃৎপিণ্ডের হাঁসফাঁস
আলিঙ্গন করে শিল্পের কারুকাজ।
দুর্দান্ত দার্শনিক মগজের রেণুগুলো
মরে যায় ভোর অবধি
আরাধ্য জীবনের নদী পেরিয়ে
ক্লান্তির রহস্য জমে থাকে রজ্জুদেহে।
এই কর্পোরেট জীবন সোঁদা আঁশটে গন্ধে
চতুর মড়কের উনুনে দাহ্য হয়।
ভালোবাসার দূরারোগ্য আসবাব
জ্বলে জ্বলে রূপান্তরিত হয় ফণীমনসায়
অথৈ সমুদ্রে রংচটা ব্রিজের নিচে
হিমাচল দেহটাকে মনে হয় শর্করা তৈজস।
তোমার জন্য পাথর হয়ে আছি
গাজী তারেক আজিজ
এই যে অবারিত আকাশ তার কোন মালিকানা নেই। অথচ সীমান্ত বরাবর প্রথম আকাশের সবটুকুই একেকটি রাষ্ট্রের মালিকানায় চলে গেছে। নীল সে আকাশ কখনো কালো মেঘে ছেয়ে যায়। আবার কখনো রক্তিম সূর্যের মত ক্ষেপে যায়। এই খামখেয়ালির আকাশ মানুষের মনোযোগ কাড়ে বিভিন্ন ঋতুতে। প্রকৃতির ভালোবাসা সবটুকু নিংড়ে দিতে চায় বসন্তে। বসন্তে সর্বত্রই দোল দোল দুলুনি ভাব। আহা! মনটা যে কেমন যেন উদাসী হয়ে ওঠে। মাতোয়ারা হয় মন। কেমন এক অদ্ভুত শিহরণ জাগিয়ে জানান দিতে চায় আমিও প্রেমে উন্মাতাল! ভালোবাসতে মুখিয়ে আছি। সংসার বিমুখ মানুষের সংসারী হতে চাওয়ার মতো। নির্বিকার মানুষের বিকার ফিরে পাওয়ার মতো। প্রকৃতিই উদ্বেল করে তোলে সীমাহীন।
বসন্তের আগমনে প্রকৃতিও যৌবন ফিরে ফিরে পায়। অতি আবেগী হয়। পাখিদের কূজন আর কিচিরমিচির শব্দের রেশ কাটিয়ে এক সুরেলা ঝংকার তোলে যুবতী কোকিল। এ যেন মনোযোগ কাড়তে প্রাণান্ত চেষ্টার স্ফুরণ। মানুষের সাথে পাখিদের ভাষাগত মিল না থাকলেও ভাবগত মিল বেশ লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। মানুষ অতিশয় প্রেমে পড়ে! মাতোয়ারা প্রেম! যৌবনের কুসুমিত প্রেমের ফল্গুধারা আবার জেগে ওঠে। খুব ভালোবাসতে ইচ্ছে হয়। সেই ইচ্ছেরা অবারিত অবিরত শক্তিতে নিজেকেই জাগিয়ে রাখে প্রাণে প্রাণে-মনে মনে।
মেহেরজানের সাথে আমার তেমনই এক প্রেম জমে ওঠে, যেখানে আলিঙ্গনের ত্রিমাত্রিক পাঠ জানা হয়। চেখে দেখা হয় মনের উত্তাল সমুদ্রের উপচে পড়া ঢেউয়ের নোনাপানি। সে কি আথালি-পাথালি সুখ। চৈতন্যের শির আরো পোক্ত হয়। বেবাক ভালোবাসাবাসি হয়, লোকচক্ষুর আড়ালে। আমি আর সে-এত এত কল্পিত সুখ বাস্তবে ধেই ধেই করে আসে। আসে আমাকে নাড়িয়ে, আমাকে ঝাঁকিয়ে। এ প্রেম আমাকে ভাসিয়ে দিতে চায়, শূন্যে উড়িয়ে নিতে চায়।
মেহেরজানকে নিয়ে বিস্তর গল্প আছে। দিনের গল্প। রাতের গল্প। রাতের অন্ধকারের গল্প। নির্জনতার গল্প। আয়েশি গল্প। অতিশয় গল্প। সকল গল্পের পাঠ জল্পিত কল্পিত, স্পষ্ট ও ধাঁধার। মন ও প্রাণের, জীবনের ও মরণের। কেমন মরণ? তবে স্পষ্ট করেই বলি, আমি আর তার বেখেয়াল ইচ্ছে অনিয়মতান্ত্রিক ফসলের মাঠে পেশাদার চাষির মত চষে যাই। ফলনের লোভে নয়। ফসল চাই না দু'জনের কেউই। শুধুই ভালোবাসা ফেরি করি। নিজেকে জড়াতে চাইনি কোন দ্বিধায়। সেও না। আমরা শুধুই প্রেমে মাতোয়ারা হই। খোলনলচে পাল্টে দিতে চাই নিজেদের অবাধ্য কিছুতে। পাথরের গল্প হতে চাই। নুড়ি পাথরের। শাদা পাথরের। ঝকমকি পাথরের। যে পাথর প্রণয় আবেগে ভরিয়ে দেয় নদীর বিস্তার। তেমন পাথর হয়ে বাঁচিয়ে রাখতে চাই প্রাণপণ। তার সাথে, গোধূলি দেখা হয়, সন্ধ্যার দীপ জ্বলা আকাশে তারাদের উন্মত্ততা দেখা হয়। শীতের কুয়াশায় পায়ে পায়ে হেঁটে যেতে যেতে কদমে কদম মেপে সেও বুঝিয়ে দিতে চায় তাকে ছেড়ে গেলেও পেয়ে যাবে খোঁজ। লুকিয়ে কিংবা আড়াল করেও আমাকে হারাতে দিতে চায় না।
তারপরও সে হারিয়ে যায়। সাগরের অতলে নাকি মহাশূন্যের কৃষ্ণগহ্বরে, বুঝি না। আমি তাকে খুঁজে যাই। পাহাড়ে, অরণ্যে লোকালয়ে। আপন আলোয় সেও অন্ধকার খুঁজে ফেরে। কল্পিত সুখের ছোঁয়ায় যে আমাকে বিলীন হতে দিতে চায়নি, আমিই শুধু তাকে আমার ভিতর আবিষ্কার করি, করে ক্ষান্ত দেই না বরং তার ভিতর বাহির চষে নিজেকে আবিষ্কার করি। আমাকেই ফেরত চাই বড় আবেগে। সে দিতে চায় না! আমাকে চুরমার করে দিয়ে যায়। আমি আর আমার থাকি না। নিজেকে বোকার মত হারিয়ে ফিরি। এ যেন তোলপাড় করা আমার ভেতরের আমি হতে চাই, ফাগুনের আহ্বানে তারার দীপ্তি ছড়িয়ে।
কতদিন তার হয়ে নিজেকে জাগিয়ে রাখি। অথচ সে জানে না সে কথা। স্পর্শের যত অনুভূতি সবই পরখ করা হয়ে যায়। তাকে নিয়ে ভাবি। ভাবনার অতল থেকে বের হতে চায় না এ মন। আমি যে তার ধার করা নই! মানুষ কত কি ধার করে, ধার ধারে না কত কিছুর। আদতে সে কখনো পাখি হতে চায় মনোজগতে। আমি সে পাখি হতে চাইনি। কারণ পাখিদের কাকলি বুঝি, ভাষা বুঝি না। আমার চোখের ভাষা এত বেশি সে জানে যে, তাকে কখনো ভুলিয়ে রাখা যায়নি। প্রেম আসে দুজনের ইচ্ছেতে। সে গল্পের আরো এক অন্ধকার দিক আছে বলেই জানান দেওয়া হয় না আমার। আমি তার হয়েই আছি অথচ সে আমার নয়! সে আমাকে পাথর বানিয়ে দুঃখ ভরে দেয়। আর বলে গড়িয়ে চল আমাকে পাবি! এ কোন জীবন নিয়ে খেলেছে সে, যে আমার নয় অথচ আমি তার! আমি তার জন্যে পাথর হয়ে আছি পাহাড়ের ভিতর। দুঃখ পুষে রাখা এক কঠিন পাথর। যে পাথর কোমায় থাকে; আমিও ঘুমিয়ে থাকি কোটি কোটি বছর!
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন