https://www.prothomalony.com/
8128
literature
অন্তঃসত্ত্বা
খ্রীষ্টফার পিউরীফিকেশন
ঘনকালো অমাবস্যার নিঝুম রাত। চারিদিকে সে এক ভূতুড়ে নিস্তব্ধতা। ঝিঁঝিঁ পোকারা বিরামহীন ডেকে চলেছে। দূরে কোথাও মাঝেমাঝে হুহু করে কতগুলো কুকুর কেঁদে ওঠে। অপরদিক থেকে ক্ষুধার্ত শিয়ালের দল একযোগে হুক্কাহুয়া গলা ছেড়ে তাদের প্রতিপক্ষকে ব্যাঙ্গাত্মক জবাব দিয়ে দেয়।
চিকন মেঠো পথ। অপরিচ্ছন্ন। আবরিত দিগন্ত ছুঁয়ে ওপারের বন পেরিয়ে অন্য এক গাঁয়ে উঠে গেছে। ওদিকে আরও ঘনীভূত অন্ধকার! দূর থেকে তাকালে কালো প্রলেপে অপর্যাপ্ত আলোয় জমকালো ছবির মতোই মনে হয় তাল হিজলের সারি সারি অস্তিত্বকে।
এপারের চিকন যে মেঠো পথ, তাও আবার অতি ঘনায়মান জমকালো বনের ভিতর দিয়ে বিজন গহীনে ঢুকে হারিয়ে গেছে। এখন বর্ষার ঘোর মরশুম। সর্বত্রই জলে টইটুম্বুর হয়ে আছে। একটানা হিজল তাল বাঁশঝাড়ের প্রলম্বিত ছায়া, জলের উপর সে এক অদ্ভুত চিত্রকলার বিমূর্তরূপ ধারণ করেছে। এ এক বিস্ময়! সন্ধ্যায় বা রাতের গভীরে এদিকেই সার্চলাইটের মতো জ্বলে ওঠে আচমকা বিক্ষিপ্ত টর্চের আলো। এখানে এতো কিসের ভয়? এতদাঞ্চলের মানুষজন পারতপক্ষে কেউ এদিকে মুখ ফিরায় না। কী এক ভয়ানক আরণ্যক বিভীষিকা এখানে জমাট বেঁধে আছে। লম্বা লম্বা কয়েকটি ডিঙ্গি নৌকা একযোগে ছিপ্ ছিপ্ শব্দ তুলে রহস্যময় নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে কোথা থেকে কোথায় চলে যায়, বাইরের কেউ জানে না। দূরে তিমির দূরত্বে পিট্ পিট্ করে আবার চুরুটের আগুনের মতো কিছু জ্বলে ওঠা কেবল!
এদিকে বনের ধার ঘেঁষে ভিতরের পরিসরে একটা মেঠোপথ চলে গেছে আঁকাবাঁকা হয়ে। সামনে কিছুক্ষণ হাটলেই তালপাতার ছাউনি ঘেরা একটা কুটীর পুরাকীর্তি বিজড়িত তাত্ত্বিকের মতো যেন ন্যুব্জ হয়ে বসে আছে। অতি অলসভঙ্গিতে ভিতরে কোনো মানুষের তরঙ্গায়িত ক্রমবর্ধমান খুক্ খুক্ শুকনো কাশির শব্দ। তার লাগাতার গলা খাকারির কারণে মাঝে ব্যাঘাত সৃষ্টি হওয়াতে ক্ষণিকের জন্য ঝিঁঝিঁ পোকাদের ডাক থেমে যায়। তারপর আবার একটানা চলে। যেমন বলা হয়েছিলো ডিঙ্গি নৌকার ছিপ্ ছিপ্ শব্দ তুলে আগমন নির্গমনের কথা। কখনও কখনও এগুলো জলপথ ধরে এ ভাঙ্গাকুটীরের একেবারে কাছাকাছি চলে আসে।
পুরাকীর্তিময় ইতস্ততঃ এই কুটীরের ঝাঁপ অনায়াসেই ফাঁক হয়ে যায়। ভিতরে তাঁর মাটির পিদিমের পরিশ্রান্ত আলোকরশ্মি কখনও এই বন মধ্যে ঝিলিক দিয়ে ওঠে সপ্রতিভ হয়ে।
প্রাগৈতিহাসিক যুগের এই মানুষটা তার লম্বা জিভের ভাঁজ খুলে নির্লিপ্ত হাঁই তোলে। মুখবিবরে তার দন্তবিহিন শূন্যতায় অরণ্যের বিস্তর বিভীষিকা! শিরদাঁড়া বেঁকে মাথা একেবার হাঁটুর কাছে নুয়ে আসে সোজা হয়ে দাঁড়ালেও।
এভাবে লোকটা বাঁকাসোজা হয়েই তার প্রত্নতাত্ত্বিক ডেরা থেকে বেরিয়ে আসে। লম্বা লম্বা বাহু ও ঠ্যাং তার। ঢিলেঢালা চামড়া চুপসে যেন টিকটিকির শরীর। বারবার নড়েচড়ে ওঠে। গায়ে মাংস বলতে নেই। হাড্ডিসার শরীরে এক হাতে কোমরে ভর করে খচ্ খচ্ শব্দ তুলে ডেরার বাইরে বেরিয়ে আসে। যেন পুরনো শকুনের প্রতিকৃতি! আর এক হাতে তার হাত পাঁচেক লম্বা পুরনো পাটের পাকানো মোটা দড়ি। ঘনঘন চোখের পাতা তার পড়ে তো আবার অতি কষ্টে উপরে ওঠে। ঠিক যেন হুতোমপেঁচার চাহনি।
তার ডেরার ভিতর কোনো নারীর অসহায় কান্নার শব্দ! মিটমিটে পিদিমের আবছা আলোর মতো কখনও তা মিলিয়ে যায়, আবার হঠাৎ শব্দে অন্ধকার তেঁতে ওঠে। কোত্থেকে অসময়কার আগুন্তুক বাউকুড়ালির মতো ঘূর্ণায়মান বাতাস, সব কান্না, চাপা নিঃশ্বাস, হতাশা সব নিয়ে উপরের দিকে উঠে যায় ছাদবিহিন আকাশে।
কাছেই যে এক প্রকান্ড তালগাছ যমদূতের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে, তার মাথায় ঝপাঝপ করে জমাট অন্ধকার ফাঁক করে অতিকায় এক প্রাচীন শকুন পাখা ঝাপটে পড়িমরি করে আরামে বসে পড়ে। অতর্কিতে দুর্গন্ধের প্রচন্ড ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে বাতাসের অণুতে। পরমাণুতে।
ততক্ষণে প্রাগৈতিহাসিক বটগাছটাও অতর্কিতে সেই বাতাসে নিজেকে ছেড়ে দিয়ে অসম্ভব প্রগল্ভতায় শরীর কাঁপায়। কিছু শুকনো পাতাও প্রাণহীন হয়ে লুটিয়ে পড়ে নিচে স্যাঁতসেঁতে ভুতুড়ে অন্ধকারে।
লম্বা কুচকিখড়ি আঙ্গুলে খসখসে আবেগে বৃদ্ধঋষি আয়েশি ভঙ্গিতে তার চোখমুখ কচলায়। চোখে মুখে তার জ্বলজ্বলে উত্তেজনা। টগবগে আবেগ।
-খালি কান্দে!
এবার উপুড় হয়ে অনুগতদড়িটার বাকী মাথাটা মাটি থেকে কুড়িয়ে নিজের গলায় প্যাঁচ দেয়। এক প্যাঁচ, দুই প্যাঁচ। ততক্ষণে তালের ডালে কুৎসিত শকুন মনের আনন্দে ডানা ঝাঁপটায়। বটের বিস্তর ছায়া ভূতুড়ে শরীরে নড়ে ওঠে। এবার পরখ করে দেখার পর এই মাথাটার একটা গিট প্রস্তুত করে ফেলে আন্দাজ মতো। লোকটার দুই হাতের সচকিত দশটি আঙ্গুলই নিখুঁত ভঙ্গিতে কাজ করে যায় অতি দক্ষতার সাথে।
ডিঙ্গি নৌকা ছিপ্ ছিপ্ শব্দ তুলে এগিয়ে আসে বনের ঘনীভূত অন্ধকারের দিকে। বৈঠাগুলো একসময় থেমে যায়। টান টান কালো চামড়ায় মোড়ানো বুনো কতোগুলো পুরুষ তাদের গায়ে জামাকাপড় কিছু আছে কি নেই, অথবা অতি সংক্ষিপ্ত তা ঠিক ঠাহর করা যাচ্ছে না। তারা লম্বালম্বি আকৃতির কিছু একটা ধরাধরি করে এলোপাথাড়ি নেমে পড়ে চিকন রাস্তায়। টর্চের কোনো আলো জ্বলে উঠলো না এবার। কেবল কারও চাপা গোঙ্গানির শব্দমালা প্রতিধ্বনিত হলো রাত্রির দেয়ালে। আঠালো অন্ধকারের গোয়েন্দাআবরণ ভেদ করে বেরিয়ে আসা তার গোঙ্গানির যা রেশ, তাতে কোনো মেয়েমানুষের বুকভাঙ্গা চাপা কান্নাই জীবন্ত হয়ে ওঠে প্রাগৈতিহাসিক এই দৃশ্যপটে।
-খালি কান্দে!
আবার ঝুপঝাপ শব্দ। ধস্তাধস্তি। কর্দমাক্ত নলবনে চিতার কবলে যেমন হরিণী ছটফট করে মরে, ঠিক তেমন। হাঃ হাঃ হিঃ হিঃ জাতীয় মিশেল শব্দাবলী। একাধিক পুরুষালি কণ্ঠে কর্কশ লালাভ প্রবৃত্তি জ্বলে ওঠার সেই দৃশ্যপট, শকুনের ডানা ঝাপটানির আবেশে বিমোহিত হয়। বৃদ্ধটার গলায় কুতকুত হাসির বিকৃত শব্দ বনভূমিতে বিস্তার লাভ করে প্রতিধ্বনিত হয়।
এবার বটের ডাল কিছুটা ঝুঁকে পড়ে মাটির কাছাকাছি। ঝুপ করে অলৌকিক শব্দ হয় আচমকা। ডালটা আবার উপরের দিকে উঠে যায়। তালগাছে বসে থাকা শকুনের খুবই কাছাকাছি উঠে যায়। আশেপাশে বনের ভিতর থেকে খচ্ খচ্ করে দাঁতাল নিশাচরেরা ত্রস্ত পায়ে বেরিয়ে আসে।
ডিঙ্গিনৌকা আবার দাঁড় ভেঙ্গে ছিপ্ ছিপ্ শব্দ তুলে জলের উপর, ওপারের অন্ধকারের ঠিকানায় মিলিয়ে যায়। প্রাগৈতিহাসিক এই মানুষটা অভিজ্ঞতায় পারঙ্গম। এবার এগিয়ে যায় তার নিজস্ব ডেরার দিকে। দরাজ গলায় আবার হাসে, হাঃ হাঃ হিঃ হিঃ।
-খালি কান্দে ...!
এবার ঝাঁপ টানার শব্দ। পুষ্টিহীন হাতে তার ঝলসে ওঠে চকচকে চাকুর তীক্ষ্ণ ফলা। পিদিমের আলো নিভে যায়। বীভৎস অন্ধকার আসন্ন সূর্যোদয়ে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই, শেষবারের মতো অতিশয় ঘনীভূত হয়ে ওঠে প্রবল বিভীষিকার রং মেখে! রাত্রি সে তো ভয়াল এক রক্তাক্ত পাশবিকতায় মেতে রয়েছে কালের সঞ্চিত বাস্তব অভিজ্ঞতার পুঞ্জিভুত চাহিদার নীচে। জন্মের অনাবিল আনন্দ, সে তো ক্ষণকাল স্থায়ী মাত্র। তাজা টকটকে লাল রক্তপাতে যে জীবনের পরিসমাপ্তি, সে তো আগুনের তেজে আবার নবজীবন লাভ করে।
আর কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষামাত্র। তারপর অবশ্যম্ভাবী যে সূর্যোদয়টি সংঘটিত হতে যাচ্ছে, তার নবীন আলো এই কুৎসিত বনভূমিতে পৌঁছাতেও অনেক সময় নেবে। তাতে দেখা যাবে যে, সেই প্রতীক্ষিত সূর্যোদয়ের আগেই দাঁতাল নিশাচরেরা পৈশাচিক উল্লাসে নুয়ে পড়া বটের ডাল থেকে খুবলে খুবলে মোটা দড়িতে বাঁধা ঝুলন্ত মেয়েমানুষের কাঁচা মাংস খাচ্ছে! একনিষ্ঠ প্রতিযোগিতায় মত্ত হয়েই খাচ্ছে! সাথে আরও দেখা যাবে, তারই নীচে রক্তাক্ত জঠরের একদলা অমরাপিন্ড অতি অনাদরে অবহেলায় ধূলিময় বটের নীচে পড়ে আছে সংগোপনে। উপরে ঝুলছে তার হৃদপিণ্ডবিহীন জননীর বিক্ষত রক্তাক্ত নিথর দেহ!!
প্রাগৈতিহাসিক এই পশুটি, মানুষের আদলে খবিশের মতো যার চেহারা সাথে তার অন্তরঙ্গ সাঙ্গপাঙ্গ ওরা কারা? কোত্থেকে আসে ওরা? আবার কোথায় মিলিয়ে যায় রাতের অন্ধকারে?
এই মরণহীন পুরুষটা কি শুধু অন্তঃসত্ত্বা মেয়েমানুষের রক্তাক্ত কলিজা খুবলে খুবলে খায়? যমদূতের মতো তালগাছ আর প্রাচীন শুকুনের সাথে হায়েনারূপী নিশাচরদের এতো সখ্যতা কেন? জননীর গর্ভ চিঁড়ে অপরিণত ভ্রূণের আত্মারা অন্ধকারাচ্ছন্ন বনভূমিতে কেবলই আর্তনাদ করে ফিরে হাজার প্রশ্নবাণে বিদ্ধ হতে থাকে অনবরত।
অন্ধকারাচ্ছন্ন এই এক জগত! মানুষের সভ্যতার কোনো আলোকরশ্মি এখানে আন্দোলিত হতে পারেনি প্রাণের স্পন্দনে। তবুও এখানকার মাটি তার গর্ভে অকালে ঝরে যাওয়া ভ্রূণদের আশ্রয় দেয় অতি সযতনে।
অবশেষে তবুও একদিন নতুন প্রভাতের সূর্যের কিরণ এখানে এসে পৌঁছাবে। তখন দূরীভূত হবে সমস্ত জমাট অরাজকতা। পাথরসম অচলায়তন। প্রাগৈতিহাসিক স্থবির আদমের মৃত্যু ঘটলেও এখানে জন্ম নতুন করে নেবে নবপ্রজন্মের সৃজনশীল মানুষ আবার।
এই জন্যই এই বনভূমি হতে চায় সৃজনশীল বসুন্ধরা। সেই অনাদিকাল থেকেই প্রাণের সাড়া যাগে এখানে। এই জগত বার বার অন্তঃসত্ত্বা হয়। মানুষের জন্ম ও তাই থেমে নেই এখানে।
অমূল্য
সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। রাস্তায় কিছুই প্রায় দেখা যাচ্ছে না। মনতোষ ছাতা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে পড়ে একটা রেডিমেড দোকানের সামনে। কোনও রকমে ঝোলা ব্যাগটাকে গুছিয়ে ধরে। এই ব্যাগেই আছে তার অমূল্য রত্ন। যদিও এই রত্নের মূল্য আজ কতটা পাবে সে নিয়ে সন্দিহান। তবে গত পাঁচ বছরে এই সম্পদ তাকে ঠকায় নি। মনতোষ একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কেরানির কাজ করে। সরকারী চাকরি কপালে জোটে নি। বুদ্ধি শুদ্ধি যে নেই তা নয় তবে কাঁচা বয়সেই প্রেমে পড়ে সব হারায়। কাজটা পেতেই বিয়েটা সেরে ফেলে। আজ সকাল সকাল বস কে বলে অফিস থেকে বেরিয়ে এসেছে কিন্তু মুশকিল সেজেছে এই বৃষ্টি। বৃষ্টিতে সপসপে ভিজে গেছে । গা গরম করতে ফুটপাতের শেড ধরে একটু এগিয়ে সিগারেটের দোকানে যায়। কিন্তু দোকান একটা সিগারেটের জন্য পঞ্চাশ টাকার খুচরো দিল না। অগত্যা বিরক্ত হয়ে মনতোষ চলে আসে আগের স্থানে।
দোকান করতে এসেছে সাথে খুচরো তো আনা উচিত ছিল ভাবতে ভাবতে পাশ থেকে একটা গলা শুনতে পায়। 'এই যে শুনছো এদিকে এসো এখানে'। রেডিমেড দোকান আর সিগারেট দোকান দুটোর মাঝে একটা অন্ধকার ফাঁকা জায়গা ওপরে ত্রিপলের শেড করা, অন্যদিন লটারির দোকান বসে আজ বোধহয় বৃষ্টিতে উঠে গেছে। ওখানেই ভাঙা চেয়ারে ছাতা মাথায় বসে একটা লোক মনতোষকে ডাকছে। মনতোষ এগিয়ে যায়। 'আমাকে বলছেন?'
'হ্যাঁ তোমাকেই বলছি এই নাও সিগারেট। এটাই খুঁজছিলে তো?' মনতোষ সিগারেটটা কিন্তু কিন্তু করে নিয়েই নেয় তারপর ধরিয়ে সুখটান দিতে শুরু করে। মনে মনে খানিকটা অবাকই হয় মনোতোষ। কেনই বা ফ্রিতে সিগারেট খাওয়ালো লোকটা কে জানে! কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর মনোতোষ সাগ্রহে জিজ্ঞেস করে, 'বৃষ্টিতে বাড়ি ফিরতে পারেন নি বুঝি' লোকটা মনোতোষের মুখের দিকে বিরক্তির চোখে তাকিয়ে বলে, 'তোমার কী মনে হয় বাড়ি বলে কোনো কিছু আছে?' মনতোষ উত্তর দেয়, 'আছে বইকি।' 'তাহলে বলছ ওই চার দেওয়ালের ইটের দুর্গটা তোমার কাছে বাড়ি?' 'তা আপনার কেন দুর্গ মনে হল?'
ভদ্রলোক এবার রাগ গলায় বলে উঠলেন, 'দুর্গই তো। দ্যাখো ভাইয়া ঘরের সবকটা রুমই এক একটা যুদ্ধ ঘর। ঘর ঢোকা থেকে বার হওয়া পর্যন্ত এক একটা যুদ্ধ।'
মনোতোষ বিস্মইয়ে জিজ্ঞেস করে, 'কীরকম? '
'ধরো ঘরে ঢুকতে যাচ্ছ জুতো কোথায় থাকবে বাড়ির বাইরে না বারান্দায় এই নিয়ে শুরু হয় অসহিষ্ণুতা। পা ধুয়ে খাটে উঠতে যাবে গামছার অবস্থান কোথায় হবে এটা হল বিরতি চুক্তি লঙ্ঘন। একটু রিলাক্স করে টিভি দেখবে চ্যানেল নিয়ে রিমোটে ক্রস ফায়ারিং, এরপর মাথা বাঁচাতে সিগারেটের ধোঁয়া দিয়ে ইলুউশন তৈরি। গোপন আশ্রয় ব্যালকনি। অবশেষে খাবার টেবিলে একটা দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। সেখানেও ঠিক কেউ না কেউ উল্টো করে পতাকা রাখবে মানে ওই ধর নুন কম তেল বেশি, সবজি ছিল না, দুধওয়ালা দুধ দেয় নি ইত্যাদি। সর্বশেষে খাটের উপর সন্ধি। এখন সন্ধির প্যাঁচ ঠিকঠাক না জানলে সকাল থেকে আবার যুদ্ধ শুরু। তার থেকে বরং লাইন অফ কন্ট্রোল পার না হওয়াই ভাল। কী বল?' মনতোষ সব শুনে হা হা করে হেসে উঠে। যতটা সে গম্ভীর ভালছিল লোকটিকে আসলে তো খুব রশিক। 'যদিও আমি তৃতীয় পক্ষ তবে হস্তক্ষেপ করতে দিলে ব্যবস্থা একটা করতে পারি। এই নিন দুটো ছিল একটা আপনাকে দিলাম কাজে লাগিয়ে দেখুন।' এই বলে মনতোষ ব্যাগের ভেতরে থাকা তার অমূল্য সম্পদের একটা লোকটিকে দেয়। লোকটিও খুব অবাক হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি থামে, মনোতোষ বাড়ির দিকে হাঁটা দেয়।
দরজায় টোকা পড়তেই তিয়াসা দরজা খোলে। খুলেই চলে যায় রান্নাঘরে। মনতোষ মৃদু স্বরে বলে, 'আজ সারাটা দিন একটা ফোনও তো করোনি, ভুলে গেছলে বুঝি?' তিয়াসা কোনও উত্তর দেয় না। হাল্কা অলিভ গ্রিন শাড়িতে দারুণ মিষ্টি দেখাচ্ছে। প্রসাধনী ব্যবহার করেনা তিয়াসা। আজও তার ব্যতিক্রম নয় শুধু একটা ছোট্ট টিপ। মনতোষ ঝোলা ব্যাগ থেকে ধীরে ধীরে দুটো সবুজ পাতার সাথে ছোট্ট একটা গোলাপ বার করে রান্নাঘরে আসে, সারপ্রাইজ বলে তিয়াসার দিকে বাড়িয়ে দেয়। তিয়াসা প্রতিবারের মতো প্রথমে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তারপর আবার মনোতোষের দিকে ফিরে বুকে দুটো কিল দিয়ে চোখে চোখ রাখে। পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে। ভালোবাসার গন্ধে মো মো করতে থাকে রান্নাঘর
শিলার বন্ধু নীলা
গাজী আরিফ মান্নান
ব্যাচেলর জীবনে এমনিতে দীর্ঘসময় হাঁটার অভ্যাস ছিল সুনীলের, কিন্তু কর্মজীবনের ফাঁদে পড়ে হাঁটার অভ্যাসটাই বদলে গেছে এখন। তবুও যান্ত্রিক নগরজীবনে এখনো মাঝেমাঝে হাঁটার চেষ্টা করেন। এখন কর্মজীবনে একটু অবসর সময় খুঁজে নেওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। সেই সময়টা ভোর সকালে হয়ে উঠে না কখনো, তাই বাধ্য হয়ে বিকাল কিংবা সন্ধ্যায় সময় পেলে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে বেড়ান। আনমনে হেঁটে বেড়ান কখনো রাস্তার ডানে, কখনো বা বামে, এভাবেই হেঁটে বেড়ান চক্ষুদ্বয় চৌদিকে রেখে। হাঁটার মাঝেও নিজের অজান্তে মন আনন্দে সুখ খুঁজে পান। হাঁটার মধ্যে এ গলি ও গলির ধারের চিরচেনা লতা-পাতা, গাছগাছালির সঙ্গেও আনমনে ভালোলাগার কথা বলে উঠেন সুনীল। পথের গাছগাছালিও তাঁর বন্ধু হয়ে উঠছে এই সময়টুকুতেই।
একদিন ক্লান্ত দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে গা এলিয়ে শুয়ে পড়লেন বিছানায়, একফাঁকে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঘুম ভাঙতেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো, তখনো চোখে ঘুম লেগে রয়েছে। আজ আবার হাঁটার খুব ইচ্ছে হলো, হাতমুখ ধুয়ে রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লেন হাঁটার উদ্দেশ্যে। বাসা থেকে বেরিয়ে দ্বিধায় পড়লেন আজ কোন দিকে যাবেন, অনেকটা প্রস্তুত ভঙ্গিতে বাচবিচার না করে রাস্তার একপাশ ধরে হাঁটা শুরু করলেন। এভাবে উদ্দেশ্যহীন হাঁটা চলতে থাকে, কিন্তু তখনো চোখে-মুখে ঘুমের লেশমাত্র যায়নি! তারপরও হাঁটছে তো হাঁটছে, কোথায় যে একটু বসবে সে, তাও মন সায় দিচ্ছে না আজ। হাত ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে দেখে সময় প্রায় রাত ৯টা ছুঁইছুঁই! হঠাৎ তাঁর মন বলল আজ আর না বাসায় ফিরতে হবে। এবার অন্য রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগলো সুনীল।
বাসায় ফিরতে এখনো আধা কিলো পথ বাকি রয়েছে, অপ্রস্তুত রাস্তায় এরমধ্যে হঠাৎ সামনে এসে হাজির একজন বোরকা পরা মেয়ে! সামনে এসে সুন্দর করে একটি সালাম দিয়ে বলল, কেমন আছেন? বোরকাপরা মেয়েটির দিকে কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকে সে। মেয়েটি বলল, আপনি আমাকে চিনতে পারেননি? সুনীল বলল, ইয়ে মানে আপনাকে চিনতে পারিনি! মেয়েটি বলল, আমি নীলা, শিলার বান্ধবী! যেহেতু কালো কাপড়ে মুখ বাঁধা তাই সুনীল তাকে চিনতে পারছে না আবার কিছু বলতেও পারছেনা। সুনীল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, 'আপনি কেমন আছেন' 'ভালো আছি।'
এর মধ্যে সুনীলের সবকিছু মনে পড়তে শুরু করেছে। ক্লাসমেট শিলার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী নীলা। যদিও শিলার সাথে এখন আর যোগাযোগ নেই, অপূর্ব সুন্দরী হওয়ায় আমেরিকান এক প্রবাসীর সঙ্গে বিয়ে হয় তার, সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। সুনীল, নীলাকে দুয়েকবার দেখেছে তবে কথা হয়নি। সন্ধ্যারাতের আলো ঝলমলে রাস্তায় সুনীল আর নীলার মধ্যে কথোপকথন একপাশে দাড়িয়ে চলতেই থাকে। দুইজনেই নিজের বর্তমান পড়ালেখা, ক্যারিয়ার নিয়ে বলতে লাগলো। কথা বলতে বলতে অনেকটা সময় গড়িয়ে যায়। বিদায় নেওয়া আগে ফোন নম্বর আদান-প্রদান করে নিলো তারা।
দুইজনেই নিজ নিজ বাসায় পোঁছে গেলেও কেন জানি একটা টান অনুভব করতে থাকে। কর্মব্যস্ত জীবনে দুয়েক দিন অতিবাহিত হলো, কেউ কাউকে ফোন করেনি। আজ আবার সুনীল হাঁটতে বেড়িয়ে পড়ে গন্তব্যহীন শহরের রাস্তায়। হাঁটতে বেড়িয়ে নিঃসঙ্গতা অনুভব করে বরাবরের মতো। আজ কেমন যেন লাগছে তাঁর, কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। ফুটপাতের ছোট্ট টং দোকানে ঢুকে একটা কড়া লিকারের চা খেয়ে, একটা বেনসন সিগারেট হাতে বেরিয়ে পড়লো, গিয়ে বসলো পাশের দীঘির পাড়ের বেঞ্চে। সিগারেটে আগুন জ্বেলে দুয়েকটা সুখ টান দিতে দিতেই মনে পড়লো সেই নীলা কথা! প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল ফোনটি বের করে নীলার নাম্বারটি খুঁজে নিয়ে কল দিল সুনীল, একবার রিং বাজতেই নীলা ফোনটি রিসিভ করে বলল, কেমন আছেন? সুনীল কিছুক্ষণ কোন কথা না বলে বুঝতে পারে সেও তাঁর ফোনের অপেক্ষায় ছিল এতোদিন! সুনীল বলে উঠলো একাএকা কি ভালো থাকা যায়! নীলাও বলে উঠলে, আমিও ভালো থাকতে পারলাম কই আর! আপনার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর নিজের মনের ভিতর কেমন জানি মোচড় দিয়ে উঠছে।
এভাবে প্রতিদিন কথা চলতে থাকে দুইজনের মধ্যে। এভাবে কথা বলতে বলতে নীলা আর সুনীলের সম্পর্কটা আপনি থেকে তুমিতে নেমে আসে। তাঁরা নিজেদের গল্পকথার মধ্যে ভালোলাগার কথা, ভবিষ্যৎ স্বপ্নের কথা একে একে বলতে থাকে। একসময় নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিল আবার সরাসরি দেখা করবে। সেই মোতাবেক দুইজনই শনিবার দিনক্ষণ ও স্থান ঠিক করেছ, যেহেতু অফিস বন্ধ থাকবে।
ঠিক সকাল ৫ টায় দুইজনেই দীঘির পাড়ে পার্কের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো সাজগোছ করে। যথাসময়ে নীলা পৌঁছে গেল গন্তব্যে, এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখলো সুনীল এসেছে কিনা, কিন্তু না কোথাও তাকে দেখা যাচ্ছে না! নীলা একটু চিন্তায় পড়ে গেল আবার সুনীলের ফোনে কল দিয়েও লাইন বিজি পাচ্ছে। ঠিক ৫:১৫টার কিছুক্ষণ পরেই রিক্সা থেকে নামলো সুনীল। নীলার সামনে এসে বলল, আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত, অনেক লেইট হয়ে গেছে। মুহূর্তে নীলার মনটা ভালো হয়ে গেল। সুনীল দুটো টিকেট কেটে নীলাকে নিয়ে পার্কের বেঞ্চে গিয়ে বসলো, কুশলাদি বিনিময় শেষে সুনীল একটি সুন্দর ডিজাইনের আংটি আর নীলা টারজান ব্রান্ডের একটি ঘড়ি একে অপরকে ভালোবাসার উপহারস্বরূপ পরিয়ে দিল। গল্প করতে করতে অনেকক্ষণ হয়ে যাওয়ায় দুইজনের জন্য হালকা খাবার অর্ডার করলো। খাবার খেতে খেতে আবার গল্পকথায় হারিয়ে গেলো। এভাবে এগিয়ে যায় দুইজনের রোমান্টিক সম্পর্ক। খাওয়ার বিল মিটিয়ে সন্ধ্যা হওয়ার পূর্বেই দুইজন একে অপরকে বিদায় জানায়। সুনীল নীলাকে একটা রিকশাতে উঠিয়ে দিয়ে সেও বাসার দিকে চলে যায়।
মাস দেড়েক পর তাদের ভালোলাগা-ভালোবাসার ইতিবাচক সম্পর্কটা দুই পরিবারের সম্মতিতে একসময় প্রণয়ে রূপ নেয়।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন