https://www.prothomalony.com/
8034
literature
নিরুত্তর শব্দমালা
সুদীপ কুমার চক্রবর্তী
দেখতে দেখতে কেটে যাচ্ছে পাঁচ পাঁচটা দশক
এখনও কণ্ঠে সেই আহত পাখির ভগ্নস্বর -
বিঁধেছিল কবে নৈঃশব্দ্যের ধারালো ফলক!
যাপনচিত্রে তির্যক রঞ্জনরশ্মি ভেদ করে কখনই
ফুটে ওঠে না সেইসব ক্ষতচিহ্নের গভীরতা -
ভিতরে ঘুমিয়ে থাকে পাপবিদ্ধ বিবর্ণ শায়ক।
আরোগ্যের কাছে হাত পেতে রয়েছি কতকাল।
উপহাস জমেছে বিস্তর।
খরস্রোতা সময়ে ধুয়ে গেছে স্বপ্নের রূপজৌলুস -
পড়ে আছে ধূসর কঙ্কাল।
নিরুত্তর শব্দমালায় যতবার হাতরাই নীল অন্ধকার
ততবারই বেজে ওঠে অস্ফুট যন্ত্রণার বিষাদ বন্দিশ
নৈশ সিম্ফনির এক অলীক ইন্দ্রজাল।
এই পথে হেঁটে যাই
অলোক আচার্য
যতই সামনে হাঁটি
আরেকটু পথ সামনে এসে দাঁড়ায়
আমি পথিক হতে চাইনি, তবু
পথের দাবি মেনে হেঁটে যাই
পথ ছেড়ে পালাতে গেলে
দু’হাত বাড়ায়।
আমি ভাবি, থেকে যাই আরেকটু সময়
এখনও কাটেনি পউষের কুয়াশার ঘোর
কিশোরীর পায় রক্ত মেশানো রঙ মুছেছে
শিশিরের প্রলেপে
প্রণইয়ের আরও কিছুটা দেরী!
মনে পরে, একদিন আমিই ছিলাম পথজুড়ে
ক্যাম্পাসের স্লোগানে, আড্ডায়—প্রভাতফেরী!
শোভাময় সন্ধ্যা
আরজাত হোসেন
যদি সন্ধ্যার মৃদু মলয় হতাম,
তবে বক্ষে জড়িয়ে নিতাম প্রকৃতির অমৃত সুধা।
বলিতাম কতো মধুর অন্তরঙ্গ আলাপন
মৃত্তিকা হতে গগন ছুঁতাম।
যদি সন্ধ্যার মৃদু মলয় হতাম,
শিমুল কি়ংবা জলপাই গাছের ডগায় বসে
খেলিতাম রক্তিম হোলি।
কেউ কেউ দেখতো সে দৃষ্টিনন্দন ছাদ
মানুষের দৃষ্টি ভেদ করে হৃদয়ে পৌঁছাতাম।
যদি সন্ধ্যার আবির হতাম,
অথবা হয়ে যেতাম একটি শোভাময় সন্ধ্যা
পর্বতসমূহের মাথায় পরা হতো স্বর্ণালি মুকুট।
হতে পারতাম নিখিলের নিস্তেজ রাজা কিংবা
হয়ে যেত এক শোভন রাজ্যসভা।
বলা হতো- এমনই শান্ত সময় পেতে হলে
বিষণ্ণ মধ্যাহ্ন পেরিয়ে এসো।
অন্তর্ধ্যানে অন্তর্ধান
তুহীন বিশ্বাস
লাস্যময়ীর ঠোঁটে অন্তর্ধ্যানে অন্তর্ধান;
নিমিষেই পরাস্ত জাগতিক প্রেমাস্পদ
বিষাক্ত নিকোটিনের কব্জায় ধরিত্রী
ভ্রুণ ছটফট করে মৃত্যুর দরজায়।
আগামী প্রজন্ম অবিশ্বাসের পাহাড়ে -
বালার্ক ঢেকে থাকে মেঘের কৃষ্ণতায়
অন্তর্হিত হয় বর্তমানের চারিত্রিক সনদ
এলোমেলো কাব্যে রচিত জীবনের গল্প।
গতকাল এসেছিলে আমার শহরে
সোমা মুৎসুদ্দী
গতকাল এসেছিলে আমার শহরে মেঘদূত হয়ে,
তোমার আসার খবরে আমিও ধারণ করেছি
প্রজ্ঞালাবনীর রূপ,
কুড়নো পাতার মতো এখান সেখান থেকে
কুড়িয়েছি কিছু কবিতা, শুধু তোমাকেই দিতে।
আমাদের কথোপকথন প্রবাহিত হয় গঙ্গার ধারায়
মাঝেমাঝে আমরা হয়ে যাই পশ্চিমবঙ্গের আকাশে
শুভ্র মেঘের সারি।
আমাদের ভালোলাগার অনুভূতিগুলো মুড়িয়ে নেই
প্রাচীন ভারতের কারুকার্য শোভিত শাখা পলায়।
কখনো, কখনো দুজন হয়ে যাই শিলং পাহাড়ের বৃষ্টি
হঠাৎ কোনও কটেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতে থাকি
সেই রূপ, আর এভাবেই আমাদের ভালোবাসা;
আসামের চিরসবুজ পাহাড় হয়ে যায়।
অসহায়ত্ব
আবির হাসান
একটা অভাবগ্রস্ত কালো ছায়া দুরন্ত বাতাসের মতো
আমার পিছু নিচ্ছে
প্রবল দুশ্চিন্তা কিংবা ক্ষুধার থরকাঁপুনিতে
সীমাহীনভাবে ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে স্বপ্নের শরীর
আর হতাশার জীর্ণশীর্ণ পোশাকগুলো
পুড়িয়ে দিচ্ছে জীবন—তাই মুমূর্ষ ব্যক্তির মত
এখন আর বেঁচে থাকার সামান্য আশা নেই—
তমসাচ্ছন্ন রাতের দুরন্ত দেহ'জুড়ে
শুধু অসহায়ত্বের ক্ষতচিহ্ন—যেন পৃথিবীর সমস্ত
কোলাহল মিউট করে মূক হয়ে থাকছে সময়
আর কাঙালের মত মৃত্যুর দ্বারস্থ হচ্ছে
চেতনার শত শত সম্ভাবনা,
যেখানে নবযৌবনা ফুলের নামে
প্রতিনিয়ত উৎসর্গিত হয় হৃদয়ের সমস্ত ক্ষুধার যন্ত্রণা!
মেঘনার মেয়ে
গোলাম রববানী
নির্বাক বধির করে কথা কী শৃঙ্খলে চলে;
মন অবরোধ হলে- কোনও জিভ কী স্থির থাকে?
চাঁদপুরের একটি চাঁদ তুমি, রাত আকাশে কি খুঁজি!
চোখ দুটি বুজে আমি, আলো ঝলকানি দেখি।
সেদিনের সেই হাসিমাখা মুখ; কি যে অপরূপ-
কৃষ্ণ মেঘের পাখায় দিব্যি নিই আমি তোমার শপথ।
এ আমার একজীবনের সুখ- এতো সুভাষিণী মুখ,
ভোরের দূর্বাঘাসের ডগায় একফোঁটা নীহারও বুক।
অবহেলার বিরুদ্ধ কোপাতে যদি মেরুদণ্ড ভাঙে
তবে যাক ভেঙে, সব প্রেমিকতো ভাঙা মনে।
যেখানে ভাঙাড়ি মন থাকে- বলিষ্ঠ শিরদাঁড়া কী হবে?
সেখানে অটিস্টিক বেটার- প্রেমিকার দেয়া শ্রেষ্ঠ উপহার।
কী দুঃখে মন ফুলদানিতে সাজিয়ে রাখছি ফুল-
বুকের মধ্যে শীতের শীল,আসবে বলেই পলাশ শিমুল।
ফাগুনের ফুটন্ত আগুন, প্রেমিকার বুকেতে দহন-
বিরহ, বেদনা- হোক না যাতনা, সমস্ত তোমার দান।
তিন অক্ষরের সাদামাটা 'গরিব'
আরমান দেওয়ানজী
তোমরা যে পথে হাঁটো, সে পথ পরিষ্কার রাখি আমি-রেল
কলোনির বস্তিতে বাস করা গরিব! আমার চুল, মুখ,
নোংরা জামা, খালি পা-এই আমার পরিচয়।
আমার পরিচয়ের আগে পরে কোন ডিগ্রি নেই, নেই কোনো
ভিজিটিং কার্ড, বাড়ি-গাড়ি কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান;
তিন অক্ষরের পরিচয়ে আমার আমি-গরিব!
আমি কখনো লোকাল মার্কেটের সবজি বিক্রেতা, কখনো
আমি ডাস্টবিন পরিষ্কারের সস্তা শ্রমিক, ইট পাথরের
দালানের শ্রমিক, রিকশাচালক, বাসের হেল্পার, কখনো
দিনমজুর; কখনোবা ফুটপাথের হকার!
ফুটপাতের দুই ফুট জায়গা আমার সঠিক বিছানা,
ঘামে মাখা শরীর আর রোদে অর্ধদগ্ধ মুখটাই আমার
পরিচয়!সাদামাটা, একেবারে সাদামাটা আমি-গরিব!
আমার অন্ন আর তৃপ্তি বলতে দুটি সিঙ্গারা, একটি পাউরুটি,
এক কাপ চা সাথে একগ্লাস জল।
দিনশেষে ফুটপাতে আরামদায়ক ঘুম আমার শান্তি
তিন অক্ষরের পরিচয় আমার-আমি গরিব!
হে জমিদার, ভোজনরসিক পুঁজিবাদী সমাজ-শোনো তবে,
আমি কাক-চিলের মতো পরিষ্কার করি তোমাদের শহর
কুকুরের মত পাহারা দেই তোমাদের নারী-শিশু বিলাসিতা
তোমাদের গর্বের রচনার সূত্র উৎপাদন করি-আমি গরিব।
আমি তোমাদের শহরের সেই ফুল, যে তোমাদের দূষিত
বায়ুর বিশুদ্ধতায় নিজে হয়ে উঠে এক অনন্য পদ্ম; যে
পদ্মের কোনো নাম নেই, ঘ্রাণ নেই, বর্ণনা নেই-
নেই একটু বাহবা্ তোমাদের মুখে।
আমি সেই তিন অক্ষরের গরিব-সাদামাটা গরিব।
মৃগয়া কালে কালে
কাজী ইসলাম
সে অনেকদিন আগের কথা। কত আগের? তা হাজার বিশেক বছর আগের তো বটেই! মানুষ তখন গুহায় বাস করতো। একেক গুহায় একেক পরিবার। তখন পুরুষেরা বিশাল দেহ ও দেমাগের অধিকারী হতো। এখনকার পুরুষেরা দেহে গতরে ছোট হলেও দেমাগে ঐ সময়ের মানুষের মতোই আছে অবশ্য। একেক পুরুষের একাধিক রমণী থাকতো আর থাকতো অজস্র বাচ্চাকাচ্চা। তারা নিজেদের ভাষায় কথাবার্তা বলতো। সাতসকালে পুরুষেরা তখন শিকারের সন্ধানে বেরুতো পাথরের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে। নারী আর শিশুরা গুহায় থাকতো। আশেপাশে শিশুরা খেলতো। মেয়েরা গুহা পরিষ্কার করতো, বাচ্চাদের সামলাতো। আশেপাশের জঙ্গলের গাছ থেকে টুকটাক ফলটল পেড়ে বাচ্চাদের খাওয়াতো। তার আগে নিজেরা খেয়ে দেখতো বিষাক্ত কিনা। বাচ্চাদের জন্য নিরাপদ খাবার যাচাই করতে যেয়ে কত মা যে আদিমকালে বিষক্রিয়ায় মারা গেছেন।
আমাদের আলোচ্য গুহা মানবের নাম, মুম্বা।মনে রাখতে হবে তখন তালু, জিহ্বা ও দন্তের ব্যবহারে শব্দোচ্চারণে মানুষ ধাতস্থ হয়নি।শুধু ওষ্ঠের ব্যবহারে শব্দ উচ্চারণ করতে জানতো গুহামানবরা। মুম্বা প্রত্যেকদিন দল নিয়ে শিকারে যেত। বল্কল বা মৃত পশুর চামড়া দিয়ে লজ্জানিবারণ করতে তখন তারা শিখে গিয়েছে। দলবেঁধে তারা যেত পাথরের, গাছের ডালের,পশুর হাড়ের তৈরি অস্ত্র নিয়ে। যাবার সময় মুম্বা তার রমণীদের বলে যেত সাবধানে থাকতে, বাচ্চাদের বনের পশুটশুর হাত থেকে রক্ষা করে রাখতে। তবে বাচ্চারা একটু বড় হলে সঙ্গে করে নিয়ে যেত শিকারের কলাকৌশল শেখাতে।শিকার করেই তো খেতে হবে! অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ ততদিনে বুঝে গিয়েছিল তৃণভোজী পশু শিকার করা সহজ এবং মানুষের খাদ্য হিসেবে ভালো।
গুহামানবেরা যেত দূরের বনের দিকে। দলবেঁধে লক্ষ্যস্থির করে তাড়া করতো কোন পশুকে। তাড়িয়ে, ক্লান্ত করে, ঘেরাও করে পাথর,কাঠ, পশুর হাড়ের তৈরি অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যা করতো পশুটিকে। জানিনা তাদের কোন আরাধ্য দেবতা ছিল কিনা, থাকলে হয়তো তারা কৃতজ্ঞতা জানাতো দেবতার প্রতি, কোনভাবে। আচ্ছা! পশুটিও তো সেই দেবতারই সৃষ্টি, হত্যা হবার মুহূর্তে কি সে অনুযোগ জানাতো দেবতাকে? কে জানে! তবে তার অন্তিম আর্তনাদ আছড়ে পড়তো বনের প্রান্তরে প্রান্তরে।
শিকার কাঁধে নিয়ে মুম্বারা ফিরে আসতো গুহায়, সূর্যডোবার আগেই। মানুষ আগুন জ্বালানো শিখেছিল তখন।আগুন জ্বালিয়ে ঝলসে নিতো শিকার করা পশুর মাংস। সবাই মিলে খেতো সেই মাংস।কিছু কুকুর তখন থেকেই পোষ মেনেছে মানুষের। কুকুরগুলো সঙ্গ দিতো, বনের হিংস্র পশু দেখলে চীৎকার করে মানুষকে সজাগ করতো। গুহার মুখে আগুন জ্বালিয়ে রেখে ঘুমুতে যেত মানুষেরা।জানতো আগুন জ্বালানো থাকলে হিংস্র পশুরা গুহায় ঢুকতে ভয় পাবে।আর কুকুরেরাও ঐ গুহামুখের ঠিক বাইরেই থাকতো। মুম্বা ঘুমাতো একেবারে গুহার মুখে।ভিতরের দিকে থাকতো নারী ও শিশুরা।কোন হিংস্র পশুর আক্রমন হলে মুম্বা প্রথম জানবে।
প্রত্যেকদিন শিকার জুটতো না। খালি হাতে ফেরত আসতে হতো। তখন তারা শিখলো আগের দিনের শিকারের কিছু অংশ সংরক্ষণ করতে হবে।
কখনো কখনো দলের কেউ শিকারে গিয়ে মারা পড়তো হিংস্র পশুদের হাতে। সেই নিহত মানবের নারী ও শিশুরা তখন অন্য গুহামানবের অধীনস্ত হয়ে যেত। শিকারে যাবার,মৃগয়ার কোন ছেদ পড়তো না। গুহামানবেরা পেট ভরাবার একটাই উপায় জানতো, পশু শিকার।অবশ্য গাছের ফলমূলও কেউ কেউ অল্পস্বল্প খেতো। মুম্বা জন্মেছিল, শিকার করতো, জীবনের স্রোত বহতা রেখেছিল, অর্থাৎ প্রজননে ভূমিকা রাখতো। স্ত্রী ও শিশুদের রক্ষা করতো এবং একদিন পৃথিবী থেকে বিদায়ও নিলো।
মুম্বার বিদায়টা স্বাভাবিক হয়নি।অন্য গুহার অন্য একজনের প্রিয়তমাকে গায়ের জোরে নিজের গুহায় নিয়ে এসেছিল মুম্বা। মেয়েটির পুরুষ লোকটি তাই একদিন পেছন থেকে পাথর দিয়ে আঘাত করে হত্যা করেছিল মুম্বাকে। প্রণয়, পরকীয়া প্রতিশোধ, আদিম মানবদের মাঝেও ছিল। ঘূর্ণায়মান পৃথিবীর সঙ্গে চলতে থাকলো মানব প্রজাতি, বদলাতে থাকলো জীবনধারা। বদলালো না মানুষের শিকার করা, মৃগয়া। কৃষি মানুষকে সভ্য করেছিল। সেই সভ্যতা পেরিয়ে মানুষ এমন এক সভ্যতা নির্মান করলো, যেখানেও মানুষ শিকারিই থেকে গেল, শিকারের ধরন বদলালো শুধু।গুহা মানবেরা দলগতভাবে শিকারে যেত, এখন মানুষ দলগদ ও এককভাবে শিকারে যায়। সেইসব দলের আবার নাম থাকে, অমুক কম্পানি, তমুক কর্পোরেশন এই সব। কর্পোরেট শিকারিরা খুব শ শিকারি হয়।
একবিংশ শতকের কোন এক সকাল। সোয়েব তৈরি হচ্ছে তার গুহায় অর্থাৎ তার গৃহে। বল্কলের বদলে পোষাকে এসেছে তন্তুর ব্যবহার, প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম। তবে আদিম অভ্যাস থেকে মানুষ এখনো মাঝেমাঝে পশুর চামড়ার তৈরি পোষাক পরে। পোষাক পরছে সোহেল, বাইরে যাবে। সজ্জিত হচ্ছে ব্রিফকেস, ল্যাপটপের অস্ত্রে। যাবে জীবন সংগ্রামে। সরল ভাষায় বললে, শিকারে। অন্য কোনো মুনির অথবা আসিফ অথবা সৌম্য তৈরি হচ্ছে, হয়তো অন্য কোনো অস্ত্র হাতে। হয়তো কলম, নইলে স্টেথোস্কোপ, কিংবা অন্য নামের কোন অস্ত্র হাতে। শিকারের সরঞ্জাম এখন বহুবিধ। লৌহযুগ, তাম্রযুগ ইত্যাকার বহুযুগ পেড়িয়ে মানুষ এখন রকেট-অন্তর্জালের যুগে বাস করে। প্রাচীনকালে মানুষ শিকারে যেয়ে অপঘাতে মারা পড়তো। হিংস্র পশুর হাতে বেশিরভাগ। আচমকা ঘাড়ে লাফিয়ে পড়তো চিতা, শ্বাপদ প্রাণীরা। নদী পেরোতে যেয়ে পড়তো কুমিরের মুখে, মারা পড়তো বিষধর সাপের কামড়ে।পাহাড় থেকে পিছলে পড়তো কেউ কেউ।
এখন আধুনিক মানুষেরা বাড়ির বাইরে যেয়ে মারা পড়ে গাড়িচাপা পড়ে, রাস্তা পেড়োতে যেয়ে আচামকা ঘাড়ে উঠে পড়ে লরি, নদীযাত্রায় বেঘোরে মরে নৌকা বা লঞ্চ ডুবিতে, অথবা পথে ছিনতাইকারি দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে।
সোহেলের অস্ত্র তার কলম। সংবাদপত্রকর্মী সে। একটা ট্যাবলয়েড পত্রিকার। শিকারে তার লক্ষ্য-নামী মানুষের সুনাম, অর্থাৎ মুখরোচক কোন কেচ্ছা কারো নামে ছাপিয়ে, তার সুনামে কালিমা লেপন করে তাকে হেনস্থা করা।পত্রিকার কাটতি বাড়লে মালিক তাকে বোনাস দেয়। মুম্বা যেমন শিকার করা প্রাণীর মাংসের ভাগ দিত সঙ্গে যাওয়া দলের অন্যদের।
ওদিকে একজন আসিফের বা মুনিরের বা সৌম্যের শিকারের ক্ষেত্র হয়তো একটা হাসপাতাল। মালিকদের নির্দেশে সেখানে আসা মানুষরূপী প্রানীগুলোকে নিঙড়ে মুনাফা তোলা তার কাজ। মানুষই শিকারে পরিণত হয়। আরেকজন সোহেল বা আসিফ বা মুনির ফ্যাক্টরি ম্যানেজার, কম মজুরি দিয়ে শ্রমিকদের কাছ থেকে বেশি কাজ আদায় করা তার কাজ। আবার সেই উৎপাদিত পণ্যগুলো মানুষের কাছে বিক্রি করে বেশি মুনাফা করাও তার কাজ। আরেকজন, পিটার, আবার বিজ্ঞানী, তাকে দিয়ে মানুষের অগোচরে মানুষের শরীরে বিভিন্ন জিনিষের প্রতিক্রিয়া যাচাই করায় তার কোম্পানি। তারও শিকার মানুষ। আজকাল অবশ্য মানুষেরা তাদের স্ত্রীদেরকেও শিকারে পাঠায়। আর বাচ্চাদের পাঠায় জীবনের মৃগয়ার প্রশিক্ষণের জন্য স্কুলে, কলেজে। একজন সোহেল (অথবা আসিফ বা মুনির বা সৌম্য ,আসলে নামে কিছু আসে যায় না, এখনো সব মানুষই একই রকম, সেই আদিম মানবের সময় থেকেই) কাজের থেকে বেরুলো অর্থাৎ সেদিনের মতো মৃগয়া শেষ।পথে বেরিয়েই মাংস পোড়ার গন্ধ পেলো। মাংস পোড়ার গন্ধে মনটা আনচান করে উঠলো।কোথাও কাবাব বানানো হচ্ছে। সেই আদিমকালের গুহামানবদের মাংস পোড়ানোর গন্ধের স্মৃতি তবে হাজার হাজার বছর পরেও মানুষের মস্তিষ্কের কোথাও থেকে গেছে।ধীরেসুস্তে একটা রেস্তোঁরায় বসে কাবাব খেল সোহেল। আজকে তার মন ভালো। মৃগয়া আজ ভালো হয়েছে। অনেক রোগী পেয়েছে হাসপাতালে। গৃহে যাবে না এখনই সে। যাবে এক জুনিয়র ডাঃ হামিমের বাসায়। সোহেলই হামিমকে হাসপাতালের রাত্রের শিফটে ডিউটি দিয়েছে। আজকেই ওর স্ত্রীকে কব্জায় নিতে হবে। সোহেলের মধ্যে নড়ে ওঠে আদিম মানব মুম্বা।
কথা বেশি বাড়িয়ে লাভ নেই। মানুষের জীবন চন্দ্র- সূর্যের উদয় অস্তের মতই, একই রকম একঘেঁয়ে গতানুগতিক সেই প্রথম সূর্যদ্বয়ের দিন থেকেই। সেই মানুষই প্রথম দু'পায়ে ভর দিয়ে হাঁটতে শিখে পায়ের ধাপ ফেলার সময় থেকেই। সেই মুম্বাদের সময় থেকেই আজতক ,সব একই রকম। সেই একই জন্ম নেয়া, জীবনধারা- প্রজননের রীতি টেনে নেয়া, সেই মৃগয়া, তারপর একদিন মহাকালের অসীম নিঃসীমতায় হারিয়ে যাওয়া। বদলেছে শুধু বহিরঙ্গ। বৃক্ষরাজির অরণ্যের বদলে মানুষ বাস করে ইট-কাঠ-কংক্রিটের অরণ্যে। কোন অমোঘ শক্তির নির্দেশে শুধুই বয়ে নিয়ে যাওয়া জীবনধারা।
মুম্বার মতই সোহেলও মারা পরেছিল ঐ জুনিয়র ডাঃ হামিদের হাতেই ঐ একই পরনারী অপহরণের কারণে।
তফাত শুধু আদি মানবেরা সাধারণত শিকার করতো তুলনামূলকভাবে দুর্বল পশুদের, কখনো হিংস্র পশুদের শিকার করতে হতো আত্মরক্ষার জন্য। আধুনিক মানুষের শিকারের ধরনটা শুধু একটুখানি বদলেছে। মানুষ এখন শিকার করে মানুষই, দুর্বল মানুষদের।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন