https://www.prothomalony.com/

7846

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত্য

প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৩ ০৬:৪৭

এটা হেমন্ত
রেজাউদ্দিন স্ট্যালিন

 

গভীর নিস্তব্ধতা খেয়ে ফেলছে কোলাহল
শিশিরের উত্তেজনা নিয়ে কথা বলছে গণমাধ্যম
লক্ষ্মীপেঁচার সাক্ষাৎকার ভাইরাল
তাঁর বাড়ি ভেঙে দিয়েছে ভূমিদস্যুরা
ভয়ে নিরব হয়ে আছে কাঠবেড়ালি 
অবসরে যাচ্ছে মেঘকর্তা
নড়ছে না পাতার নথিপত্র
পিঁপড়েরা দলবেঁধে মিছিলে যাচ্ছে
শীতের আগে খাদ্য চায় তারা
চক্কর দিচ্ছে বাদুড় 
খেজুর রসের ইজারা নিয়ে টেন্ডার ফেলবে একা
বুলডোজারের ভয়ে
ঘাসফড়িং মাথায় একটা সবুজ রঙধনু নিয়ে পালাচ্ছে 
হাঁটতে হাঁটতে শালিকের স্যান্ডেল ছিঁড়ে গেছে 
শীতের আগে ধুলোবাজার থেকে কিনতে হবে জুতোমোজা

এটা হেমন্ত
নদীর মেয়ে স্রোত বাতাসের সাথে ঘর ছেড়েছে 
মাছের অভিমান ভাঙাতে জেলেবক পেতেছে কারেন্ট জাল
ধরবে আর মাছরাঙা বাবুদের বাসায় পাঠাবে উপঢৌকন 

অক্লান্ত পরিশ্রম করে ইঁদুর ধানক্ষেতে যে গর্ত খুঁড়েছিলো
গোয়েন্দা মেঠোচাঁদ তা জানিয়েছে থানার বড়গোখরোকে
হাস্নুহেনাকে মোবাইলে পাচ্ছে না প্রজাপতি- নেটের গতি মন্থর 
ম্যাসেজ দিয়েছে সূর্যমুখীকে
অপেক্ষা অসীম হয়ে উঠছে

 

 

 

অকৃতজ্ঞ নই
কাকন রেজা

 

রেখে যাই কৃতজ্ঞতার চিহ্নটুকু, উৎসর্গ হোক
তোমাদের নামে...
যারা ভাবো অকৃতজ্ঞ
চিয়ার্স, এই গ্লাস উৎসর্গ করি মদিরার শামে। 

না, কৃতঘ্ন নই, নই সর্বনামে ভূত 
এই যে শব্দের কঙ্কাল জুড়ে তৈরি অবয়ব;
বই না হয় উৎসর্গ করিনি
করেছি যাপনের ব্যাকুল অনুভব। 

জানি, ব্যাকুলতা বোঝে না কেউ, ভীষণ নিরর্থক
উৎসর্গপত্রে খোঁজে নিজের নাম,
অথচ অবয়বে নির্দেশিকা রয়েছে জুড়ে 
প্রতিটা অক্ষর জানে তার সমর্পণ ও সংগ্রাম। 

কৃতজ্ঞতা কাকে বলে, ঝুলে থাকা অটোগ্রাফ 
দিয়েছিলাম সান্ত্বনা কাকে...
অদৃশ্য কালি লিখে নাম সান্ত্বনাহীন
বেদনারা যাকে মনে রাখে।

 

 

 

বাজুক পাতার বাঁশি
দীপংকর গৌতম

 

ধান ভরা মাঠ গাইছে গান, পাখিদের হাটবার
শীত নেমেছে ঘরের ছাউনিতে
কুয়াশাতে তোমার মুখের ছায়া
খেজুর রসের নলে গান গায় ফিঙে

তোমার জন্য পাতার বাঁশি বাজে ললিত রাগে 
সুর তুলেছে নদী
ধলেশ্বরী, পথ হারিয়ে পথের দূরে দাঁড়িয়ে থাকে পথ 
তোমারই দ্বারে

নক্ষত্রের উঠোন জুড়ে মেলা
মাটির সোঁদা গন্ধে ভাসে সাঁওতালী সুর মেলা
সোঁদা মাটির বুকে দোলে পারফিউমের ঢেউ
বন্ধু আমার - জন্মদিনে থাকো
গোলাপ ভেজা শিশির জলে হোক না স্নান এবার।

বাজুক পাতার বাঁশি-বারে বারে আসি। 

 

 

 

দূরত্বের ব্যবধান ছড়ায়
পল্টু দত্ত

 

আমার ভিতরে বুভুক্ষু মৃত্যুর এক ভয়াবহতা
দূরত্বের ব্যবধান ছড়ায়
স্যাঁতসেঁতে শ্যাওলা ধরা দেয়ালের খসে পড়া
ইটের পাঁজরে কাঁদে সীমাহীন রোদ।

প্রাণহীন এই অনুভূতি
মানুষের দোর গোড়ায় মুচকি হাসে
আমি বুঝতে পারি
মাটি শুকে তাই আর
সেই সজীবতার গন্ধ পাই না। 

কতোগুলো আবর্জনার অভ্যন্তরে
সেই সোনার মাটির সোঁদা গন্ধ
খোঁজার ব্যর্থ প্রয়াস আমার ভিতরে এক 
বুভুক্ষু কান্না জমে থাকে।

 

 

 

একাত্তরের অনুসিদ্ধান্ত
সাকিব জামাল

 

বলা যায়, আমার বর্তমান এই হাসিমুখও রক্তে কেনা
একাত্তরে!
অবাক হবার কিছু নেই, এই বাংলায় 'বিজয়' না এলে-
হয়তো হাসতেই ভুলে যেতো বাঙালি- জনম জনম ধরে!
বিশ্বাস না হলে-
চেয়ে দেখো পৃথিবীর পরাধীন প্রান্তরে প্রান্তরে,
ওরা হাসতে পারে না!
বলা যায়, তোমার বর্তমান ঐ হাসিমুখও রক্তে কেনা 
একাত্তরে!
অকৃতজ্ঞ হবার দুঃসাহস দেখাও কি করে?
সব পরিস্থিতিতে উচিত হবে-
একাত্তরের বীরদের প্রতি, 
এদেশের প্রতি, 
এদেশের মানুষের প্রতি,
ভালোবাসা রাখো অন্তরজুড়ে।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে, সব অনুজকেই বুঝতে হবে একাত্তরের এই অনুসিদ্ধান্ত।

মৃধা আলাউদ্দিনের ন্যানো কবিতা 
সমুদ্ভাসিত
জলে-ডাঙায় সমুদ্ভাসিত হয়ে দেখি রাস্তা সরে গ্যাছে রাস্তায়।
কোথাও কোনো মেঘ নেই। ক্ষত নেই। 
রৌদ্দুরে ভেসে গ্যাছে শুঁড়িখানা... 

জ্যাভেলিন 
আমাকে ক্ষত-বিক্ষত করলো একটি মাত্র জ্যাভেলিন
তারপর, চলে গ্যালো একজন শাদা চামড়ার বর্বর মানুষ।
একজন শাদা চামড়ার মানুষ... তবে ওরা ভালো কথা বলে।
বক্তৃতায়ও মন্দ না... 
কাবারাস্তানই বাহোত আচ্ছা হ্যায়

গোলবাহার আর গুলিস্তানমে তাকাকে দেখো বাঁচকে রাহেনেকা
তোক্ষার রাওশ্নি; শুঁড়িখানাসে মেরা মাট্টিকা জিন্দাগি
—কাবারাস্তানই বাহোত আচ্ছা হ্যায়…! 

 

 

 

ব্যবধান
উইলি মুক্তি

 

তুমি মিথ্যা প্রণয়ের কারিগর 
শ্ৰাবণের অপরাহ্ণে ঝড়ো বাদল,
আমি বিরহী দক্ষিণা বাতাস 
ফাগুনের আদর মাখা প্রভাত। 

তুমি নিরবধি দুর্দম হৃদয় নিধনকারী
ডুব সাঁতারে নিমগ্ন প্রচ্ছন্ন অপরাধী,
আমি গহনো হিয়ার অনন্ত প্রেমী
বিধুর পৃষ্ঠায় রোপণ করি প্রেমময় সম্পত্তি।

তুমি আদিম রাত্রির নক্ষত্রপুঞ্জের হাতছানি 
অগণিত অমাবস্যার ইতিহাস,
আমি জ্যোৎস্না শোভিত বরফের গালিচা বিছানো 
অভিমানী নিশুতি রাত।

তুমি ধোঁয়া ওঠা বাষ্পের একবিন্দু শিশির
নিমিষেই হাওয়ায় উড়ে যাওয়া বেদনা,
আমি নিষ্পাপ কলমের খরশান অস্ত্র 
প্রহরকে ধরে রাখার আকুল প্রার্থনা।

 

 

 

অরবরই বৃত্তান্ত 
এনাম আনন্দ 

 

যে দেশের দেবতারা কথার ইন্দ্রজালে
ভক্তদের মুখ বন্ধ রেখে সুউঁচ্চ-সুকৌশলে
মজলুমের থালায় ভাগ বসায় 
সে দেশে-গোরের দুর্বা হয়ে; 
আমাকে কতকাল বুকে আগলে রাখবে মায়াবিনী!
কচি তেঁতুল পাতায়
অসুর আত্নারা জায়নামাজে দাঁড়িয়ে ফন্দিআটে
কখন কীভাবে 
শ্রম বেচা মানুষদের ঠকিয়ে গড়া যায় 
আকাশচুম্বী অর্থের ইমারত। 
আমার গোরে- তুমি আর ফুল দিতে এসো না
যেদিন-
মেহনতী মানুষের ঘাম থেকে কস্তম্বরি সৌরভ ছড়বে
সেদিন সম্ভব হলে আমার বসত ঘরে এসে
অশ্রুসিক্ত চোখের দুফোঁটা জল ফেলে যেও।

 

 

 

দরজায় দাঁড়িয়ে 
বিলকিস ঝর্ণা 

রাত ২'২৫। একটা ফোন বাজল, অচেনা নাম্বার থেকে। এত রাতে সাধারণত ফোন আসে না। রিসিভ করতেই ওপাশে কান্না। 
'আন্টি কাল সকালে আপনার বাসায় আসবো।'
'কাঁদছো কেন?' 
'আমাকে মেরেছে। আর এখানে থাকব না।'
'ঠিক আছে, সকালে চলে এসো। কথা বলবো।এখন ফোন রেখে দাও। চুপচাপ থাকো। ওদের সাথে তর্ক করোনা।' 
অনেক রাত। তর্ক করলে যদি আরও মারে। ভয় লাগে। বড্ড ভয়। জীবনের মূল্য কিছুতে হয় না। মরে যাওয়া হল সব শেষ। লড়ে যেতে হবে। লড়তে হলে বেঁচে থাকা চাই। 

ভাল্লাগছিল না। আজ মহল্লায়ও বিশাল মারামারি পাশের মহল্লার সঙ্গে। শঙ্কা ছিল। কেউ একজন মরে গেল হয়তবা মেরে ফেললো। শুনলাম হাসপাতালে। তখনও বেঁচে আছে। 

মানুষ বড় ভয়ানক প্রাণী। আপাততঃ তাই মনে হচ্ছে।
আবার ফোন! ধরলাম। রাত ২'৫০। কাঁদছে। 
'আন্টি আমাকে এখান থেকে বের করার ব্যবস্থা করেন। আমাকে বুকে লাথি মেরে দম আটকায়ে ফেলছিল। আমাকে বাড়ি থেকে বের হতেও দেয়না। আটকায়ে রেখে মারতেছে।'
'দাঁড়াও দেখছি।' 

ওর মাকে ফোন দিই। ফোন ধরে ওর বাবা। ওদের সবকিছু কুলসুমই ম্যানেজ করে। বললাম, কুলসুমকে দাও। কিন্তু কুলসুম কথা বলল না। আমি জানি, কেন কুলসুম কথা বলল না। বাবাকেই বললাম, মেয়েকে ওখান থেকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা কর। ওকে মারতেছে। 

বুঝলাম বাবাও জানে। তাকেও ফোনে বলেছে। তারপর আমাকে। ফোন রেখে দুমিনিট বসে থাকলাম। কানে বেজে চলছে খাদিজার মধ্যরাতের কান্না। 

আমি লিখতে বসলাম। কুলসুমের কথা। খাদিজা, কুলসুমের কন্যা। ক'দিন আগে, মাস দুয়েক হয়তো। একটা ফোনকলে কুলসুম কেঁদে বলল, 'আপা আমার মেয়েকে ওরা মারতেছে। ভিডিও কলে দেখাইতেছে মেরে মেরে। বলে লাশ পাঠাইয়া দিবো।' 

সেদিন সন্ধ্যা-রাতে বারবার ফোন। অনেক কথা হল। পরের দিন ওরা কোর্টে এল। শুনলাম ওদের কথা। আমি কখনও কাউকে মামলায় উৎসাহিত করি না। জীবনের জটিলতা নিয়ে বলি। ভাবতে সময় দেই। কুলসুমকে বললাম মেয়েকে নিজের কাছে আপাতত রাখতে। অতঃপর মামলা। কিন্তু কুলসুম দ্বিধায়, খাদিজাও। আমি খুব করে বকে দিই। ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে বলেছিলাম। 

কুলসুম দৌড়ায় সেই কবে থেকেই। পাঁচবাড়ি কাজ ক'রে সংসার চালায়। কুলসুমের বর দুর্বল -অসুস্থ। লোকমুখে ভালমানুষ। দু' মেয়ে আর ছেলে বড় হল। মেয়ের বিয়ে দিল কম বয়সেই একটু স্বস্তির জন্য। নাতিরও দু'বছর বয়স। 

আর ছেলে পোশাক শ্রমিক। এখনও মেয়ের শখ পূরণ করতে সাধ্যের অতীত তৎপর। মামলা করেও আমাকে বলছিল, 

'আপা! দেখি ওরা মেয়েটার খোঁজ নিতে আসে কিনা।

আসেনি সাতদিনেও। কুলসুম কমিশনারের কাছে যায় একাধিকবার। কমিশনার ধমকে দেয়, 'মামলা করছ কেন। মামলা তোলে নাও।' ধমক দেয় কুলসুমের বাড়িওয়ালাও।

কাস্টডিতে খাদিজার বর।খাদিজা ভেবেছিল ওরা ভয় পাবে। খাদিজাকে আর নিপীড়ন করবে না, মারবে না। খাদিজার শ্বশুড় চতুর লোক। সে সমাজের মাথাদের হাতে রেখে চলে। সে কমিশনার এবং আরও অনেককে দিয়ে কুলসুমকে শাসায়। কুলসুম কূলকিনারাহীন। ভেবে পথ পায় না।

অবশেষে কুলসুম নিজেই মেয়ে জামাইকে জামিন করায়।

আমি শুধু হলফ করাই যে, ভবিষ্যতে ওরা ভাল জীবন যাপন করবে। 

প্রায় দুমাস পর, আজ গভীর রাতে আবার ফোন এল। খাদিজা কাঁদছে! জানি কাঁদছে কুলসুমও।

অনেক দিন কুলসুমের সাথে যোগাযোগ হয়নি। দুদিন আগে কাজ থেকে ফিরতে সন্ধ্যা হয়। সিঁড়ি দিয়ে চারতলায় উঠতেই দেখি দরজায় নক করছে খাদিজা। ফাঁকা ঘর। আমি লক খুলে বসতে দেই। আগে রান্না বসাই। তারপর খাদিজাকে নিয়ে ওঘরে বসি। সে চোখ মুছছিলো। কি হয়েছে জানতে চাই। জানতাম মামুলি যত্তসব। 

জীবনের জোড়াতালি খাদিজারা বুঝে না। মধ্যবয়সি নদীর মতো গতিময় ছন্দময় জীবনের শব্দ তার চাওয়ায়।আমি বুঝাতে চাই, বুঝতে চাই নিজেই। আমার শব্দ গড়ার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। মাঘের শৈত প্রবাহের স্রোত দরজার ওপাশের বারান্দায়। জানালার ফাঁকে সজোড়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকে আমাকে ছুঁয়ে যায় বহুকালের পুরনো শীত, বংশানুক্রমে; ভেঙে ভেঙে। 

বকে দেই। বকে দেই খুব করে। বলি, মানিয়ে চলতে না পারলে মায়ের কাছে থেকে যা। মায়ের কাছে তার ঠাঁই মেলেনা। মায়ের জীবনে বড় ক্লান্তি। মায়ের ক্লান্তির ধ্যানে সন্ধ্যার আরতির আকাঙ্খা। শ্রমের ঘামে অন্য দু'সন্তানের ভবিষ্যত। 

খাদিজা চোখের জল মুছতে মুছতে সিঁড়ি ভেঙে নামতে থাকে। আমি দরজায় দাঁড়িয়ে থাকি। 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন