https://www.prothomalony.com/
7750
literature
কবিতার এক পাতাঃ ডিসেম্বর সংখ্যা
—————————————————-
ভুবনবাংলার সকল কবি, কবিতাকর্মী, কবিতার অনুরাগী পাঠককে বিজয়ের শুভেচ্ছা। প্রাণপ্রিয় স্বদেশভূমি বাংলাদেশের বিজয় ছিনিয়ে আনতে যে ত্রিশ লক্ষ প্রাণ আত্মোৎসর্গ করেছেন, দুই লক্ষ মা-বোন সম্ভ্রমহারা হয়েছিলেন, তাঁদের সকলকে জানাই আমাদের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা ও সর্বোচ্চ সম্মান। নিঃসন্দেহে তাঁরা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল বিজয়কে সামনে রেখে মানুষের মুক্তির চিরন্তন আকাঙ্খাকে কবিতায় মূর্ত করেছেন কবিগণ প্রায় সবগুলো কবিতায়। কবিদেরকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। আপনাদের জন্যে এক বুক ভালোবাসা ও কবিতাগুলি পড়ার বিনীত আমন্ত্রণ।
ফারুক ফয়সল
রাগ
শামস আল মমীন
তোর চুলগুলো কাট নারে বাপ। শ্যাম্পু
করিস না সেলুনে যাস না; শাসন না মানা জেদে
লাফাতে লাফাতে ওরা দখল নিয়েছে তোর গ্রীবা, কাঁধ।
কী তোর কাজ এতো,
কী করিস এতো রাত?
তোর শিশু শরীরের গন্ধ শুঁকে কতো
যে আনন্দে নিষ্পলক কতো বেলা কেটে
গেছে, এখন গুহার মতো তোর খাঁ খাঁ চোখে খুঁজি
তোকে, অসহায়।
তোর নিঃশ্বাসে মায়ের চোখ ছলছল করা গন্ধ।
হ্যাঁ-রে, রাগী ছেলেগুলো, যারা বোমা ফাটায় মিটিং
মিছিলে কী করে তোর বন্ধু হয়ে গেলো রে, কী করে?
ডুবে যাই সব রঙে
হোসাইন কবির
এই ধূসরতায় তাকিয়ে সব রঙে তলিয়ে যাই
এই ধবধবে শাদায় তাকিয়ে শিশুদের কান্না শুনি,
ডানা ছাড়া পাখি'র শোকার্ত পালকে
মৃত শিশুদের অবয়ব আঁকি, শিশুদের কান্না শুনি
যেনো তারা রয়েছে মিশে আমাদের শরীরে
যেনো তারা রয়েছে আমাদেরই শরীরের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে
এই শাদায়, ধূসরতায় অংকিত অসংখ্য শিশুর অবয়ব–
ছিন্নভিন্ন রক্তাক্ত দেহেরই মানচিত্র
মাহমুদ দারবিশ আমরাও তোমার মত
এই উপত্যকায় 'ডানা ছাড়া পাখি'র শোকার্ত পালকে
অগণন শিশু আর নারীর অবয়ব আঁকি, আর
ডুবে যাই সব রঙে, ডুবে যাই শাদা ও ধূসরতায়।
স্মৃতি ও স্বপ্ন
মাহমুদ হাফিজ
কোটি জনতার ক্রোধের আগুনে
হানাদার গুটিয়ে নেয় নিষিদ্ধ নখর
রাজপথে ঢল নামে
জনারণ্যে কেটে যায় কুয়াশা আঁধার
পৃথিবীতে কোমল আলো ঢালে রূপোলি মায়াবী চাঁদ
ঘুম থেকে উঠে মানুষেরা কাজে যায়
পাখিরা উড়তে থাকে নীলিমার নীলে।
এইসব স্মৃতি ও স্বপ্নের ঘোরে-
মরা বেঁচে থাকি
একটি ফুলকে বাঁচিয়ে রাখবো বলে।
নীরব ঘুঙুর
বদরুজ্জামান আলমগীর
সারাদুনিয়া ভর দুপুরে উপুড় হয়ে দেখছে
ডানাওয়ালা মানুষ ও আগুনে পোড়া মাছ
কালের চৌকাঠে জমানো তার আনত মোহর,
নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে ভিন গ্রহে উড়ে যাচ্ছে।
চিত্রা হরিণ অযুত নিরভিমানী মায়া হরিণ
রাত্রির তমসা জলে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে
আমাদের মরমি শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া বুঝি
বুক ঘষে ইজেলে লেপে দেন খয়েরি মাটির রঙ
সারাদুনিয়া দুই কাটা হাত- মুখ নামিয়ে দ্যাখে
ফিলিস্তিনের নির্লিপ্ত কূয়ায় ঘনঘোর জ্যামিতি
সুতা ছিঁড়ে উড়ে যায় অচিন পাহাড়ের নিচে ঘুড়ি
গর্ভবতী নারীর পানিভাঙা লৌয়ে নীরব ঘুঙ্গুরি।।
মৃতরা কথা বলে
তাপস গায়েন
পৃথিবীর যে প্রান্তেই যাই না কেন
আমি থেকে যাই সম্ভাষণহীন
অদৃশ্যতায় দৃশ্যমান হতে থাকে
আমার জগৎ, আর আমি শুনি মৃত মানুষের কলস্বর
মহাকালকে অচেতন জেনে বয়ে যায় সময়
সন্ধ্যার আযান আর উলুধ্বনিতে ভেসে গেছে
বিগত শতাব্দীর ফেলে আসা গ্রাম, জোয়ারের জল,
কচুরিপানা, আর বিষণ্ণ ডোরা সাপ…
জলের সমাধি রেখে
আমার পদচিহ্ন এখন রূপারূপ শিশ্নময়…
মহানগরীর পানশালায় বুঁদ হয়ে আছি,
ত্রিকাল দেখি আমি, আর শুনি—
ঘুম ও স্বপ্নের মাঝে অস্ফুট গুঞ্জন
ম্যাসেঞ্জারে পড়ে আছে মৃত বন্ধুর মিস্ড কল
প্রয়াত পিতামাতার মুখচ্ছবি যেন মুগ্ধ জলকলস্বর
আর যুদ্ধ-বিধ্বস্ত জনপদ থেকে
জেগে ওঠে মৃত শিশুদের উত্তোলিত হাত
মৃতরা কথা বলে, নৈঃশব্দ্যে অবিরল…
নিত্যপুরাণ
পারভীন শাহনাজ
পড়ন্ত বেলায় ডানায় রোদ মেখে যে শালিক
নীড়ে ফেরে তার চোখে দিব্য খড়কুটো সংসার
শরীর থেকে চুইয়ে পড়া বিষাদের ঘাম
চেটোতে মুছে তুমিও হয়ে যাও দুরন্ত প্রেমিক
পথ ও পথিকের গল্প সে তো নিত্যপুরাণ
তোমাকে কাছে পাই, না পেয়েও বেশি
যেমন কোনো কোনো যাত্রী ট্রেনের জানালায়
মন রেখে চোখে গেঁথে নেয় ছেড়ে আসা প্ল্যাটফর্ম
সংগোপনে বুকে তুলে রাখে জলজ নিঃশ্বাস
পৃথিবীর গায়ে জ্বর, পায়ে গ্যাংরিন ধনুষ্টংকার
তবুও জোনাকিরা জরায়ুতে আগুন নিয়ে প্রেম
বুনে যায় নিথর রাত্রির গায়।
দুঃস্বপ্ন
রেজা শামীম
দুরত্বকে দুর্গম ভাবিনি কোনদিন
তুমি চাইলেই পাড়ি দিতে পারি চৌদ্দ হাজার মাইল
এয়ারবাসের ছোট্ট জানালায় পরিযায়ী মেঘ দেখতে দেখতে।
স্যাটেলাইট বার্তায় তুমি অনায়াসে জেনে যেতে পারো
আমার ইঞ্চি ইঞ্চি এগিয়ে আসার খবর।
আমার আগেও তোমার কাছে পৌঁছেছে
মোঘল সুলতানেরা তাদের আয়েশী হাতিতে দুলে দুলে।
কিংবা তারও আগে বণিক নাবিক
সন্ধ্যাতারার দিকে কম্পাস ঘুরিয়ে।
আরব্য দূতেরাও এসেছিল দ্রুতগামী ঘোড়ার ক্ষুরে
ধুলোর ঝড় উঠিয়ে সাহারায়।
তুমি চাইলে আমি জুল ভার্নের ফিকশনের মতো
পৃথিবী ঘুরে তোমার কাছে আসতে পারি দ্রুততম সময়ে।
অথবা আদিম সেপিয়েন্সদের মতো সুদীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে
যেমন তাঁরা গিয়েছিল পূর্ব আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ এশিয়ায়।
অথচ প্রায়শই আমি দুঃস্বপ্নের ভেতর
সামান্য এক সাঁকো ভেঙ্গে পৌনঃপুনিক পড়ে যাই…
এক শাস্বত সত্যের সংজ্ঞা
ফারজানা নাজ শম্পা
বিজয়ের গোপন নিঃশ্বাস শুনি নিপীড়িত মানুষের দীর্ঘশ্বাসে
বিভাজনে প্রশ্নবিদ্ধ সভ্যতা, যুদ্ধ আর ঈর্ষার নির্মম আঘাতে!
ধ্বংসের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন আকাশ-ভেদে ওঠে তবু বিজয়ের সূর্য
বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত সারানোর মতোই গাজা ও কিয়েভের ধ্বংসস্তূপে
দল মেলে উঠবে ফুটে নানাবর্ণ সুগন্ধ ছড়ানো মানুষের বিজয় ফুল।
মৃত্যুগন্ধসন্ধানী শকুনের মতোই বিলুপ্ত হবে যুদ্ধবাজের আগ্রাসী শিৎকার,
সমুদ্র গর্জন শোনা যায়, মুক্তিকামী মানুষের প্রত্যয়ের পদযাত্রায়
কেননা বিজয় কোন মিথ নয়, এক শাস্বত সত্যের সংজ্ঞা!
বিজয়ের পদযাত্রা ধ্বনিত হয়েছে—-
চে গুয়েভারা, মহাত্মা গান্ধী, ম্যান্ডেলা আর বঙ্গবন্ধুর চিরঞ্জীব আহ্বানে।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন