https://www.prothomalony.com/

7745

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত্য

প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৩ ০৭:৪৩

নষ্ট ফুল
নুশরাত রুমু
 

রাতের খাবারটা এখনও টেবিলেই পড়ে আছে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন মানোয়ারা বেগম। আজকের দিনটা রৌদ্রজ্জ্বল।  সরকারি ছুটির দিন কিন্তু ছেলে- মেয়েরা স্কুলের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছে। পেছনে ঘুরে দেয়ালের ক্যালেন্ডারে লাল দাগের তারিখটি কেটে দিলো মনোয়ারা।

১৬ ডিসেম্বর! বাংলাদেশের জন্মদিন আজ। বিজয় দিবস বলেই সারাদেশ এত খুশি। ভাইয়ের ছোট্ট মেয়েটা সেজেগুজে ভোরেই বেরিয়ে গেল কলেজের অনুষ্ঠানে। বসার ঘরে টিভিতে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান চলছে। এসব কিছুতেই মনোয়ারা বেগমের আগ্রহ নেই। একজন পরাজিত নারী ছাড়া নিজেকে কিছু ভাবার সুযোগ হয়নি তার। এখন শুধু জীবনটাকে টেনে নিয়ে যাওয়া...। 

কাল রাতেও মনোয়ারার একমাত্র ছেলে মাসুম বিদেশ থেকে ফোন করেছিল। কথা বলতে পারেনি মনোয়ারা। যে সন্তানের পিতৃ পরিচয় নেই, সমাজ যাকে অস্পৃশ্য ভেবে দূরে ঠেলে দিয়েছে, তার সাথে কোন মুখে কথা বলবেন, ভেবে পান না। চোখের জল চেপে ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিলেন তিনি। 

মনে পড়ে গেল তার ৭১-এর বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা! 

দরজার ওপাশ থেকে ছোটভাই রায়হান অনেক ডাকাডাকি করেও সাড়া পেলেন না। কেঁদেই চলেছেন মনোয়ারা। রায়হানের স্ত্রী রাজিয়া এসে বলল "কাঁদতে দাও, জানো তো এই মাসে বুবু কতটা কষ্টে থাকেন। কেঁদে কিছুটা হালকা হোক। 

রায়হান সাহেব ঢাকার অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী। নিরিবিলি একজন মানুষ। বড়বোন মনোয়ারাকে খুব ভালোবাসেন কিন্তু কিছুতেই বোনের কষ্ট দূর করতে পারেন না। 

সমাজ যখন তার বোনকে বীরাঙ্গনা বলে বিদ্রুপের হাসি হাসে তীব্র মনস্তাপে কুঁকড়ে পড়ে তার সমস্ত সত্তা। রায়হান সাহেবরা মাত্র দু'ভাই- বোন। তার জন্মের পরই মা মারা গিয়েছিলেন। চাচা- চাচির সংসারে তারা বড় হচ্ছিলেন। বাবা আজিমুল্লাহ সন্তানদের কথা ভেবে দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। পুলিশের চাকরি থেকে তিনি ১৯৭১ সালে  পালিয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন। মনোয়ারা তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। রায়হান চতুর্থ শ্রেণির ছোট্ট বালক। চাচা হাফিজউল্লাহ্সহ গ্রামের আরো কিছু যুবক দেশের টানে যুদ্ধে চলে গেলেন। স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের নজরে পড়ল তাদের পরিবার। গভীর রাতে কয়েকজন মানুষ এসে দরজা ধাক্কা দিলো। চাচি রমিজা জেগে উঠলেও ভয়ে নড়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেন। অকথ্য গালাগালির শব্দে  মনোয়ারা জেগেই বুঝতে পারল রাজাকার এসে গেছে। দ্রুত জানালার শিক ভেঙে রায়হানকে বের করে দিলো। চাচাত ভাই ছোট্ট সবুজকে কোলে নিয়ে বেরোতে যাবে, এমন সময় লাথি মেরে দরজা ভেঙেই তারা ঘরে ঢুকে পড়ল। মনোয়ারার কোল থেকে সবুজকে টেনে উঠানে ফেলে দিল একজন। মনোয়ারাকেও টেনে ঘর  বের করতে চাইল, চাচি রমিজা উঠে বাধা দেয়ায় গুলি করে ঝাঁঝরা করে দিলো তাকে। অবুঝ শিশু সবুজের কান্নার শব্দে পাষন্ডগুলো আরো নির্মম হয়ে উঠেছিল। পায়ের তলায় পিষ্ট করে চিরতরে তাকে চুপ করিয়ে দিলো। খড়ের গাদার নিচে লুকিয়ে সবকিছু দেখছিলো রায়হান। চারজনের  দলটি এবার বেশ পরিতৃপ্ত। পাক বাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে মনোয়ারাকে জমা দিয়ে নিজেদের যোগ্যতা জাহির করবে আজ। 

টেনে-হিঁচড়ে মনোয়ারাকে নেবার পথে তার আত্মচিৎকারে পথের কুকুরগুলোও যেন বাক রুদ্ধ হয়ে গেল। নৈঃশব্দের রাত্রির বুকে বেজেছিল দুঃসময়ের অস্পষ্ট সাইরেন। ভোরের আলো ফুটলেও তা ছিলো নিষ্প্রাণ।

দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হলো।  

বাংলাদেশ নামক দেশ পৃথিবীর মানচিত্রে জায়গা করে নিলো কিন্তু মনোয়ারারা কি পেল? বীরাঙ্গনা উপাধী দিয়ে কতটুকু সম্মান ফিরিয়ে দিতে পেরেছি আমরা? সে হিসাব মেলে না কারো কাছেই। এক নষ্ট ফুলের পরাগ নিয়ে অভিশাপের বলয়ে তাঁদের বেঁচে থাকা..! 

 

 

তিতানের বিজয়
শামছুন ফৌজিয়া
 

শিমুলপুর হাইস্কুল মাঠে তিনদিন ব্যাপী বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান চলছে। চমৎকার কারুকাজে কাগজ কেটে মাঠ সাজানো হয়েছে। প্যান্ডেল দেখলে চোখ জুড়িয়ে আসে।সবার বসার জন্য চেয়ার পাতা আর ওপরে সামিয়ানা। সুন্দর সব ফুল আর লাল সবুজের পতাকা দিয়ে সাজানো হয়েছে মঞ্চ। তিনদিন যাবত খেলাধুলা হচ্ছে, প্রতিদিন বিকেলে নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে।শীতের রাত উপেক্ষা করে একদিন তিতান গিয়েছিল নাটক দেখতে। বেশ আনন্দ লেগেছিল তার! মুক্তিযাদ্ধা যারা সেজেছিল তাদের দুর্দান্ত অভিনয় মন কাড়ার মতো।

তিতান চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। সবাই জানে সে দুষ্টোর শিরোমণি। লেখাপড়ায় তেমন ভালো না হলেও শিক্ষকদের কথা শুনে সে। তিতানের পরিবার খুবই দরিদ্র, নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা। তার বাবা সারাদিন বাসের হেল্পারি করেন, যাত্রী ওঠায় নামায় আর জোরে জোরে হাঁক দেন। কখনো কোন জায়গা, সেটা বলে দেন। তিতানের আরো দু’ভাই বোন আছে। তিতানের বড়ো ভাই, সংসারের টানাপোড়েনে মিঞাবাড়ি কাজ করে। আর বোনটি ছোট চার বছরের। তিতান খুব দাদিপ্রিয়। দাদির মুখে সে মুক্তিযুদ্ধের নানা গল্প শুনেছে। তার দাদা যে যুদ্ধে মারা গিয়েছিল, তাও শুনেছে। দাদিই বলেছিল, পাক হানাদার তিতানদের বাড়ির এককোণে মেশিনগান বসিয়ে খুঁজে খুঁজে গ্রামের সবাইকে জড়ো করিয়েছিল। লাইন ধরে দাড় করিয়ে একে একে সবাইকে গুলি করেছিল। যারা বলেছিল 'পাকিস্থান জিন্দাবাদ' শুধু তারাই বেঁচে গিয়েছিল সেদিন। 

তিতান বসে আছে স্কুলের মাঠে। দুষ্টু বলে কেউ তার কাছে আসে না। তবে স্কুলের স্যার, ম্যাডামরা তাকে ভালোবাসেন। সবাই গান, কবিতা যেমন খুশি তেমন সাজো সহ অনেক কিছুর প্র্যাক্টিস করছিল আর তিতান সেগুলো দেখছিল। সে মনে মনে বহুবার মরহুম দাদার মত মুক্তিযাদ্ধা সেজেছে, দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে। আজ স্কুলে ১৬ই ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস পালিত হচ্ছে। প্রধান অতিথি একজন মন্ত্রী বসে আছেন মঞ্চে, সাথে চেয়ারম্যান সহ নেতাকর্মী অনেকে। মাইকে একের পর এক গান কবিতা ভেসে আসছে। যেমন খুশি তেমন সাজো'তে তিতান অংশ নিল। কোনো প্র্যাক্টিস ছাড়াই সে এত সুন্দর মুক্তিযাদ্ধার অভিনয় করল যে, তা দেখে সবাই হাততালি দিতে লাগল। তিতান খুব খুশি হলো। খুশি হলো স্যার, ম্যাডামরাও। তারা বলেই ফেললেন, বুঝলি তিতান! তুই যদি দুষ্টুমি কম করতি তাহলে অনেক কিছু করতে পারতি। তোর মাঝে প্রতিভা আছে রে ...! 

তিতান যখন শুনল মাইকে তার নাম ঘোষণা হচ্ছে, সে খুশিতে গিয়ে পুরস্কার হাতে নিল। একইমাঝে এলাকার মুক্তিযাদ্ধাদের তালিকা পড়া হলো, কিন্তু সেখানে তিতানের দাদার নাম নেই। হঠাৎ তার মন খারাপ হয়ে গেল। চোখ ভিজে উঠল!  সে জোরে জোরে বলতে লাগল, আমার দাদা মুক্তিযাদ্ধা ছিলেন। তিনি একজন দেশপ্রেমিক কেউ তাঁর কথা বলছেন না। আমি বলব, আমার দাদা শহীদ মুক্তিযাদ্ধা আরফান আলী, আমার দাদি এখনো বেঁচে আছেন। বিশ্বাস না হলে  দাদি ও বাবার কাছ থেকে জেনে নিন। পাশের বাড়ির সবাই জানে আমার দাদার কথা। কেউ না বলুক আমি বলব, আমি একজন মুক্তিযাদ্ধার নাতি।

সবাই বিস্ময় নিয়ে তিতানের দিকে তাকিয়ে রইল। 

 

 

 

উত্তাল দিনের কথা
কনক কুমার প্রামানিক

 

একাত্তরের উত্তাল দিনের কথা। বঙ্গবন্ধু তখন স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সাড়া দিয়েছেন দেশপ্রেমিক লাখো জনতা। মাতৃভূমির বিপদে ঘরে বসে থাকতে পারেননি যুবক, বৃদ্ধ, তরুণ কেউই। টগবগ করছে রক্ত। পাক হায়েনাদের নির্মম নির্যাতনে ইতোমধ্যে দেশ ছেড়েছে অনেকে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে ঠাঁই হয়েছে তাদের। কারো মনে শান্তি নাই। দেশ ছেড়ে দেশের মানুষ ছেড়ে কি শান্তিতে থাকা যায়? পাকিস্তানি মিলিটারি আর তাদের দেশীয় দোসররা নির্বিচারে মানুষ হত্যা করছে। জ্বালিয়ে দিচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। আতঙ্কে কাটছে সবার দিন। না জানি কখন কি হয়। বাড়ি ঘর ছেড়ে কেউ কেউ মাঠ ঘাট আর নির্জন বন জঙ্গলে লুকিয়ে থাকছে। গ্রামে গ্রামে মিলিটারিরা ক্যাম্প বসিয়েছে। তাদের সাহায্য করছে দেশীয় রাজাকার, আলবদর, আল সামস বাহিনী। দিনে দুপুরে বাড়িঘর লুটপাট করছে। গরু ছাগল টেনে নিয়ে হায়েনাদের খাতির যত্নও করছে। যুবতী, বিবাহিত আর অবিবাহিত নারীদের জোরপূর্বক ধরে ধরে মনোরঞ্জনের জন্য তুলে দিচ্ছে পাক হায়েনাদের হাতে। শত শত নিরীহ নারীর আর্তনাদে দিনকে দিন ভারী হচ্ছে আকাশ বাতাস। একটা মুক্ত স্বাধীন দেশের স্বপ্ন নিয়ে গেরিলা প্রশিক্ষণ নিচ্ছে মুক্তিবাহিনী। 

রহিম সোনাপুর গ্রামের যুবক। ২১ বছরের দুরন্ত বয়স।  টগবগে রক্ত ঝাঁকুনি দেয় শরীরে। মাত্র কয়েক মাস হলো বিয়ে করেছে সে। স্ত্রী কমলা ভীষণ সুন্দরী। এখনো গায়ে ওদের বিয়ের গন্ধ লেগে আছে। দুজনের মধ্যে দারুণ ভাব ভালোবাসা। সারাদিন খুনসুটিতে সময় কেটে যায় ওদের। তার মধ্যে লেগে যায় দেশের মধ্যে তুমুল এক যুদ্ধ। আকাশে বাতাসে কান পাতা দায়। সারাক্ষণই গোলাগুলি আর বোমা ফাটার বিকট শব্দ। রহিমের পাশের বাড়ির ছেলে জাফর। খুব খারাপ প্রকৃতির ছেলে। নারী লোভী আর চরিত্রহীন। ওকে নিয়ে বেশ কয়েকবার বিচার সালিশও হয়েছে। তবুও শোধরানোর নয় সে। এবার জাফরের খারাপ নজর পড়েছে রহিমের সুন্দরী স্ত্রী কমলার প্রতি। নানা সময় বিভিন্ন খারাপ অঙ্গ ভঙ্গিতে বাজে ইশরা করেছে কমলাকে। রহিম এসব শোনার পর তাকে কয়েকবার ধোলাইও করেছে। তারপর থেকে দুজনের চরম একটা শত্রুতা তৈরি হয়েছে। এখন জাফর শুধু একটা সুযোগের অপেক্ষায়। ক্ষতি করবে রহিমের। এবার সে মোক্ষম একটা সুযোগ পেয়ে যায়। নাম লেখায় রাজাকারের দলে। তার অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে পড়ে গ্রামবাসী। লুটপাট, ধর্ষণ, রাহাজানি সবকিছুতে দক্ষ হয়ে ওঠে সে। রহিমের অবর্তমানে পাকসেনাদের সহায়তায় একদিন সে কমলাকে তুলে নিয়ে যায় আর্মি ক্যাম্পে। তারপর নরপশুর দল রাতভর পাশবিক অত্যাচার চালায় তার উপর। নির্মম সে অত্যাচার। আকাশ বাতাস ভারী হয়ে ওঠে কমলার করুণ আর্তনাদে। সহ্যের সীমানা পেরিয়ে যায়। ছিঁড়ে খুড়ে হায়েনারা ক্ষত বিক্ষত করে কমলার নিষ্পাপ দেহখানি। 

পরদিন ভোরে কমলার স্পন্দনহীন দেহখানা পড়ে থাকে গ্রামের পাশের খালপাড়ে। প্রতিশোধের স্পৃহায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রহিমের শীতল তনু। নাম লেখায় মুক্তিবাহিনীতে। বর্ডার পেরিয়ে ভারতে গিয়ে গেরিলা ট্রেনিং নেয় সে। ট্রেনিং শেষ করে গ্রামে ফিরে আসে রহিম। সঙ্গীয় মুক্তিবাহিনী নিয়ে গুড়িয়ে দেয় মিলিটারি ক্যাম্প। জাফরসহ সব রাজাকারদের ঝাঁঝরা করে দেয়। অবশেষে স্বাধীনতার রক্তিম সূর্যটা পুব আকাশে উদিত হয়। ঘরে আসে বহু কাঙ্খিত স্বপ্নের স্বাধীনতা। রক্তের নদী পেরিয়ে অধরা বিজয় ধরা দেয়। হারিয়ে যায় কমলার মতো হাজার হাজার বীরাঙ্গনা। লক্ষ লক্ষ তরতাজা প্রাণ। সদ্য স্বাধীন দেশে প্রাণ ভরে মুক্তির স্বাদ নেয় সবাই। কিন্তু রহিম আজ উম্মাদ। গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ায়। খুঁজে বেড়ায় প্রিয়তমা স্ত্রী কমলাকে। 

 

 

১৭ ডিসেম্বর বাগেরহাট মুক্ত দিবস
সিকদার মনজিলুর রহমান

 

১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর সারাদেশ যখন বিজয়ের আনন্দে উত্তাল, বাগেরহাটের আকাশে তখনও উড়ছিল চাঁদ তারা খচিত পাকিস্তানী পতাকা। তখনও নির্যাতন, হামলা, লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী রাজধানী ঢাকায় রেসকোর্সে আত্মসমর্পণ করলেও বাগেরহাট হানাদার মুক্ত হয় একদিন পর, ১৭ ডিসেম্বর। এবং ১৮ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।

পাকিস্তান সরকারের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মাওলানা আবুল কালাম মুহাম্মদ ইউসুফ (একেএম. ইউসুফ) রাজাকার-আলবদর বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা, জন্মস্থান বাগেরহাট জেলার শরণখোলায় হওয়ায় তখনও বাগেরহাট ও তার অধীনস্থ  থানাগুলোও ছিল রাজাকার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। একেএম ইউসুফের দোসর খুলনা অঞ্চল প্রধান রাজাকার রজব আলী ফকির ও কুখ্যাত আকিজ উদ্দিন ফকির এর নেতৃত্বে বাগেরহাটে তখনও ব্যাপক লুঠপাট ও মুক্তিকামী মানুষকে হত্যা ও নির্মম নির্যাতন অব্যাহত ছিল। মদনের মাঠ ছিল রাজাকারদের ক্যাম্প, বর্তমান পানি উন্নয়ন বোর্ড। জেলা পরিষদ ডাক বাংলো ছিল রাজাকারদের বিচারালয় আর মাঠ টর্চার সেল।

১৬ ডিসেম্বর ঢাকাসহ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাগেরহাটের মুক্তিযোদ্ধারা উদগ্রীব হয়ে পড়ে। তারা শহর দখলের পরিকল্পনা করে। ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর শুক্রবার দুপুর আড়াইটার দিকে বাগেরহাট শহরের ডাকবাংলোতে অবস্থিত রাজাকারদের ক্যাম্প দখল করে সেখানে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো হয়। এইদিন সকালে জেলার চিতলমারীর সন্তোষপুরে অবস্থিত বাগেরহাট সাব-সেক্টরের হেড-কোয়াটার থেকে সাবসেক্টর কমান্ডার তাজুল ইসলাম মুক্তিযোদ্ধাদের ফল-ইন করিয়ে মোট দুটি গ্রুপে ভাগ করে বাগেরহাট শহরের দিকে রওনা হন। তাজুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন বড় দলটি মুনিগঞ্জ খেয়া পার হয়ে বাগেরহাট শহরে ঢোকে। অন্যদিকে ছোট আরেকটি দল সুলতানপুরের পথে বাগেরহাট মাঝিঘাট দিয়ে নদী পার করানো হয়। দ্বিতীয় দলের নেতৃত্ব দেন কমান্ডার রফিকুল ইসলাম খোকন ও সৈয়দ আলী। শহরের উত্তর-পূর্ব দিক দিয়ে ও দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে মেজর জিয়া উদ্দিনের বাহিনী সম্মিলতভাবে বাগেরহাট শহর দখলের জন্য আক্রমন করেন।

বাগেরহাট সদর থানায় রাজাকার ক্যাম্পে অবস্থানরত রাজাকার-আল বদর ও পাকিস্তানী বাহিনী প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে পাকিস্তান বাহিনী  পালিয়ে যায়। ঐ দিন দুপুরেই বাগেরহাট শত্রু মুক্ত হয়। বিজয়ের আনন্দে সাধারণ মানুষ উল্লাস ও আনন্দে ফেটে পড়ে। মুক্তিকামী জনতাকে সঙ্গে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা উত্তোলন করেন।

বাগেরহাট শহর মুক্তি প্রসঙ্গে প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা হাজরা জাহিদুল ইসলাম মন্নু জানান, ১৭ ডিসেম্বর দুপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত আক্রমণের মুখে বাগেরহাট সদর মুক্ত হলে কচুয়াসহ অন্যান্য থানার রাজাকার আলবদর বাহিনীর সদস্যরা কেউ পালিয়ে যায়, আর কেউ আত্মসমর্পণ করে। আমাদের কচুয়া ছিল রাজাকার কমান্ডার মনিরুজ্জান তিনিও সদলবলে কচুয়া ছেড়ে পালিয়ে যান। কচুয়ায় রাজাকারদের ক্যাম্প ছিল তৎকালীন সিও অফিস বর্তমান উপজেলা পরিষদ ভবন ।  রাজাকারগন পালিয়ে গেলে  কচুয়ার স্থানীয় জনগণ কচুয়ার পানীয়জলের দিঘীতে প্রচুর পরিমাণ আগ্নেয় অস্ত্র গোলাবারুদ এবং স্থানীয়দের বাড়িঘর থেকে লুট করে আনা হাড়িপাতিল ডেগ খোন্তা কুড়াল উদ্ধার করে। ঐ দিনই সমগ্র বাগেরহাট মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আসে এবং ১৮ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা বর্তমান স্বাধীনতা উদ্যান এলাকায় উড়ানো হয়।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন