https://www.prothomalony.com/

7614

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত্য বিজয় দিবস সংখ্যা

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৩ ০৮:৫০

আমরা হাঁটতে শুরু করেছিলাম
তমিজ উদ্‌দীন লোদী

 

তারা সবাই সগুম্ফ সচুলো সশস্ত্র 
দৃঢ পদক্ষেপে এসে দাঁড়ালো আমাদের উঠোনে
আমাদের উঠোন তখন ভেসে যাচ্ছিল জ্যোৎস্নায়
তাদের ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে ঝুলে থাকলো
কাঁঠাল শাখায়

আমরা তখন সব ভুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম ঠাণ্ডা নলে
জানতাম এটিই প্রয়োজনে কিভাবে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে
একেকজন গেরিলা একেকজন চেগুয়েভারা
দাড়ি ও গোঁফের ফাঁকে হাসি ঝুলে আছে

পেছনে ফেলে এসেছি আগুন ও ছাই
পেছনে ফেলে এসেছি মাটিচাপা লাশের বহর
ফেলে এসেছি সম্ভ্রম , অসংখ্য অজস্র করুণ চিৎকার
শোকের ছায়া প্রতিচ্ছবির মতো ঝুলে আছে দেয়ালে

আমরা শোক ভুলে যাই না, আমরা মৃত্যু ভুলে যাই না
তবু আমাদের মনে হয় এবার দাঁড়াতে হবে
আমাদের ভাঙ্গাচুরা বিধ্বস্ত ভূখণ্ডকে মেরামতে আনতে হবে
মৌলিক কিংবা অন্য কোনো নামে নয়
প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে দেশে

বিজয়কে সামনে রেখে আমরা হাঁটতে শুরু করেছিলাম
সে হাঁটা অব্যাহত আছে ,শুরু হয়েছিল, শেষ হয়নি …। 

 

 

বিজয় কেবলই এক অর্জন নয়
কাজী আতীক


প্রলাপ বকছো? 
অনলবর্ষী, অপলাপ অনুলেখ 
সুনামি প্রলয় বিভীষিকা যেমন
অনুষঙ্গ বিভ্রম- শব্দ কুহক আর কতো?
কতো আর কুটকৌশল কপট প্রণয়!

ভাবছো- আপনা আপনি হয়ে গেছে সব!
এমনি এমনি কিংবা জনান্তিকের কেউ এসে 
বললো কেবল- চিচিঙ ফাঁক, সাথে সাথেই 
বদলে গেলো সব! বদলে গেলো অনুভব!

তা কি হয়? নাকি হতে পারে কখনো!
ঘটনার প্রবাহ এবং আনুপূর্বিক বিষয়াদি
জড়িয়ে থাকে অঙ্গাঙ্গি, এটাই সত্য।

যদি নিঃশঙ্ক নয় কোনো মেরুকরণ
যদি আস্থা অনাস্থা দুরুহ, প্রভেদ প্রাক্কলন,
তাই সময় অসময়ে কেবল বিঘ্ন বিভাজন।

যাহোক, আমূল বদলে ফেলো অনুভব
নিশ্চিত যখন, নিঃস্ব হবেই নিশ্বাস
তাই একবার না হয় তবে 
একটু কেবল নন্দন শোভন ইচ্ছে সাজাও!

বুঝতে পারবে ঠিকই, আচমকা হয়নি কিছুই
সুদীর্ঘ, সুদৃঢ় এক পটভূমি ভিত্তি রয়েছে এসবের,
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের স্বাধীনতা
অমাদের বিজয়, কেবলই এক অর্জন নয়
মহান ত্যাগ ও তিতিক্ষার এক দীর্ঘ পথ পরিক্রমা।

 

 

বিজয় উৎসব
বেনজির শিকদার



এসেছে বিজয়-মাস ডানামেলা ভোর
গাছে গাছে পাখি ডাকে অবারিত দোর;
শিশিরে জড়িয়ে আছে ঘাস পাতা ফুল
রোদের ঝিলিক মাখে নদীর দুকূল।

মাইকে মাইকে বাজে বিজয়ের সুর
যাবতীয় অমানিশা যাবে বহুদূর।
আলো এসে উঁকি দেয় আশাবাদী ঘর
বিজয়ের জামা গায়ে এলো ডিসেম্বর!

তবু দেখি হাহাকার অনাদর খাঁখাঁ
বিজেতার বুনোমুখ পরাজয় মাখা;
তার কথা বলা নেই কোনো ইতিহাসে
বিজয়ের ডাক শুনি— ঝরাপাতা ঘাসে!

এখানে ওখানে দেখি কলকল রব
শোক নয় শোক নয়, হোক উৎসব!

 

 

বিজয় দিবস
পীযূষ কান্তি সরকার


ইয়াহিয়া খানের নৃশংস সেনা যেন
ঘুম ভেঙে জেগে ওঠা কুম্ভকর্ণ --
নারী-শিশু-বৃদ্ধকে গপাগপ গিলে নিয়ে
বাংলাকে চেয়েছিল করতে বিবর্ণ।

তারা ছিল শত শত পিশাচ - রাক্ষস
ধলেশ্বরীর বুকে ঢেলেছিল রক্ত --
পিশাচেরাও  এতখানি হয় না নৃশংস
রেহাই পায় নি তারা সেজেছিল ভক্ত।

আগরতলায় এসে ফেলে গিয়েছিল বোমা
মুক্তিযোদ্ধারাও তুলে নিল স্টেনগান --
একাত্তরের সেই ষোলোই ডিসেম্বর
সোনার বাংলাদেশ গাইল যে জয়গান।

 

 

রক্তের মলাটে একাত্তর
মাসুম আহমদ



একটি মিছিল, কিছু উম্মাতাল যুবকের হুঙ্কার এবং একটা তর্জনীর ইশারায় কিভাবে ইতিহাস জেগে উঠে কিংবা ইতিহাসের পাতায় লাল কালিতে কিভাবে একটা রাষ্ট্র রচিত হয়, তা নিয়ে সেদিন আড্ডায় কথা হচ্ছিলো। পিছন দিকে ফিরে চেয়ে দেখি সালাম বরকতরা বায়ান্ন আর একুশ মাথায় বেঁধে আমাদের দিকে আসছে। তাদের শার্টের সব বোতাম খোলা। বুক দিয়ে গলগল রক্ত ঝরছে। সামনের দিকে চেয়ে দেখি এক লোক তর্জনী উঠিয়ে বলছেন 'এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।' দুর থেকে ভেসে আসছে কে যেন দরদী গলায় গেয়ে যাচ্ছে 'আমরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি!'

এই ব্যাপারটা আড্ডার অন্য কেউ খেয়াল করেনি বিধায় হয়ত আমাদের মুখে ভাষা তুলে দেয়া নিয়ে আলোচনা তেমন দীর্ঘ হয়নি। অথবা আমদের প্রতিনিয়ত ঋণী করার বা হওয়ার বিষয়টা আমাদের আড্ডার এজেন্ডায় বাই ডিফল্ট চলে আসেনি। আড্ডার টেবিল হউক, রাজপথের মিছিল হউক কিংবা ইতিহাসের ক্লাস রুম হউক, আমি সবখানে সবসময় ইনিয়ে বিনিয়ে একটা সহজ জিনিস বোঝাতে চাই – বাংলাদেশ আসলে একটা গল্পের নাম। বর্ণমালা থেকে রক্ত ঝরা এক দুপুরের গল্প। এক হার না মানা বিজয়ের গল্প। একুশ বা একাত্তর সংখ্যাগুলো কিভাবে রক্তের মলাটে বন্দি  হলো তার গল্প।। আর এই গল্পের ভিতরে লুকিয়ে আছে আমাদের মাথা তুলে উঁচু হয়ে দাঁড়াবার ইতিহাস।

 

 

লাল-সবুজে একাত্তর
এইচ বি রিতা


বাতাসে ওড়ছে লাল-সবুজের একাত্তর স্বপ্ন ও অর্জনের 
গল্প নিয়ে, এ গল্প-জাতির মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর গল্প-
সাহসীদের ত্যাগ ও বীরত্বের গল্প।

বাবার মুখে শোনা একাত্তর-উত্তেজনায় জানান দেয়, 
যুদ্ধের সাহসী এক নাম-মুক্তিযোদ্ধা 
রক্তক্ষরণের কালিতে কথিত অকথিত গল্পরা
সেই বীরদের ত্যাগে অন্ধকার এবং উজ্জ্বলতা-
উভয়ই দেখায়; যেখানে উষ্ণ সূর্যালোকে বর্ণমালারা 
আজ বাংলার গান গেয়ে যায়। 

ডিসেম্বর এলেই বাতাসের কম্পন আবেগী হয়ে উঠে, 
শোনায়, লাল-তাঁদের হৃদয়ে জমা করা সাহস, জাতির 
চেতনা যা আগুনের মতো জ্বলজ্বলে, ক্ষিপ্র, সাহসী 
আর সবুজ সেই জমি, যেখান থেকে শুরু হয়েছিল
জাতির কান্না, গভীর সংগ্রাম, একটি লড়াই এবং
স্বাধীনতার জন্ম। 

ডিসেম্বরের বাতাসে লাল-সবুজ রঙ্গে ওড়ছে একাত্তর
বিজয়ের প্রতিধ্বনি নিয়ে; যে একাত্তর আমারও। 

 

 

স্মৃতিতে সেই আশাজাগানিয়া বেতার তরঙ্গ
আনোয়ারুল হক লাভলু

বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন, মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিকামী মানুষদের অসামান্য সাহস যুগিয়েছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ২৬ মার্চ, স্বাধীন বাংলা বেতারের সূচনা হয় চট্টগ্রামের কালুরঘাটে ট্রান্সমিশন ভবন থেকে এবং নানা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যদিয়ে প্রায় দু’মাস পর, ২৫ মে তারিখে। কলকাতার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের ৫৭/৮নং দোতলা বাড়িটিতে তৎকালীন বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও অন্যান্য মন্ত্রীদের আবাসের কক্ষের সাথের একটি কক্ষ থেকে এর সম্প্রচার কাজ শুরু হয়েছিল। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রীরা অন্য বাড়িতে উঠে যাওয়ার পর সেই ৫৭/৮ নম্বর বাড়িটিই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের স্থায়ী কার্যালয়রূপে গড়ে ওঠে। এরপর থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান নিয়মিতভাবে সম্প্রচারিত হতে থাকে। পরবর্তীতে এই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকেই বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের নীতি নির্ধারণী ভাষণসহ জনগণের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন নির্দেশাবলী প্রচারিত হতো। মুক্তিযুদ্ধকালীন যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের এবং অবরুদ্ধ বাংলাদেশের জনগণের মনোবল অক্ষুণ্ণ রাখার ক্ষেত্রে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র বিভিন্ন অনুষ্ঠান পরিবেশনের মধ্যদিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল যা ইতিহাসে সমুজ্জ্বল। 

“দেবদুলালের কণ্ঠে শোনা পরিক্রমায়
লড়তে গিয়ে সেদিন জানি সাহস পেতাম
এই আকাশে পায়রারা সব মেলবে ডানা
স্বপ্ন নিয়ে নতুন দিনের যুদ্ধে যেতাম"

কবি তুষার করের কবিতার দুটি লাইন যৌবনে আমি যতবার পড়েছি, ততবার-ই মনে পড়েছে যুদ্ধদিনে গ্রামের বাড়ির উঠোনে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রচারিত অনুষ্ঠানমালা এবং সেই সাথে 'আকাশ বাণী'র প্রখ্যাত সংবাদ পাঠক দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায় এর কণ্ঠ শোনার স্মৃতিI 

যুদ্ধের সময় গ্রামের যে বাড়িতে রেডিও আছে সেই বাড়ির উঠোনে সন্ধ্যার পরপরই বয়োকনিষ্ঠ, যুবক, বৃদ্ধ, হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে আশপাশের মানুষজন জড়ো হতোl এটা যেন তখনকার নিত্যদিনের জীবন প্রবাহের অংশ ছিলI এর মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রতিদিনের যুদ্ধের সর্বশেষ সংবাদ জানা এবং তা পর্যালোচনা করা অর্থাৎ অজানা আতঙ্ক, আশা-নিরাশা, কিংবা যুদ্ধে জয়-পরাজয়ের হিসাবনিকাশ কষাI বিশেষ করে আকাশবাণী এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত অনুষ্ঠানমালা গুলোর আকর্ষণেই সেই সময়ে  মানুষজন উদগ্রীব হয়ে থাকতো সন্ধ্যাকালীন আসরের জন্যI যুদ্ধকালীন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাজারগুলোর যে সব দোকানে রেডিও ছিল সেই দোকানগুলো ঘিরেই জমায়েত হতো মানুষেরI স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তা এমনই পর্যায়ে গিয়েছিল যে, এর রেশ ধরে জনসাধারণের মুখেমুখে অনেক বাজার এর নামকরণও হয়েছিল 'জয় বাংলা বাজার' নামে I

পিতার পেশার সূত্রধরে সেই সময় আমরা সান্তাহার শহরে বাস করতাম। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর লগ্নে অর্থাৎ তেইশ থেকে পঁচিশ মার্চের মধ্যের এক সন্ধ্যাবেলা বিহারি (অবাঙালি) জনগোষ্ঠীর তাণ্ডবের মুখে শতশত বাঙালিদের  মতো আমরাও সান্তাহার রেলওয়ে আবাসিক এলাকার বাসা থেকে দৌড়ে বের হয়েছিলাম I মায়ের হাত ধরে পালানোর সেই চরম মুহূর্তে চতুর্থশ্রেণীর অতটুকুন বয়সের আমি সংসারের এতসব আকর্ষণীয় জিনিসপত্রের মধ্য থেকে শুধুমাত্র নতুন রেডিওটি ঝটপট সাথে নিয়েছিলাম কেন? ভেবে আজও আনমনেই অবাক হইI যুদ্ধকালীন আমাদের প্রচণ্ড দুঃসময়ে এই রেডিও'র কারণে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠানমালা আমাদের সবাইকে দারুণভাবে মানসিক শক্তি যুগিয়েছেI স্বাধীনতার পর পর ঐ বয়সেই সেই অনুষ্ঠানগুলোর প্রতি আমার ভীষণরকম আকর্ষণ বোধ হতো! স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের 'চরমপত্র'র ব্যাঙ্গাত্বক সেই কণ্ঠ কিংবা আকাশবাণী থেকে প্রচারিত  "খবর পড়ছি দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায়" বা সংবাদ পাঠের শেষের দিকে এসে হঠাৎ করেই ঝটপট "খবর শেষ" বলে দেয়া দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায়ের সেই কণ্ঠ আজো শ্রবণ ধারাপাতে যেন প্রজ্বলিত অহংকারের অনুরণন! অনুধাবন করে কিংবা না করেই 'চরমপত্রের' কথন এবং শব্দ প্রক্ষেপণের ভঙ্গিমায় আমরা হেসে গড়াগড়ি যেতামI কখনো বা চরম পত্রের কিছু কিছু সংলাপ অনুকরণের প্রতিযোগিতা হতো আমাদের মাঝে। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে পত্রিকার পাতায় কিংবা স্বাধীনতার ইতিহাস সম্পর্কিত বইপত্রে শৈশবের সেই 'চরমপত্রের' বিষয়ে যখনই কোন লেখা পেয়েছি অত্যন্ত আগ্রহভরেই পড়ে ফেলতাম! ইতিহাস ঘেটে জেনেছি 'চরমপত্র' অনুষ্ঠানটি ২৫শে মে থেকে শুরু করে ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার দিন পর্যন্ত প্রতিদিন প্রচারিত হয়েছে। 'চরমপত্র' ছিল ব্যাঙ্গাত্মক ও শ্লেষাত্মক মন্তব্যে ভরপুর একটি অনুষ্ঠান। আঞ্চলিক ভাষায় রচিত ‘চরমপত্র’ কথিকার ভাষা এখন অনেকের কাছে শালীন মনে না হলেও সময়ের বিবেচনায় সেটাই জরুরি ছিল বলে মনে করা হয়I এই অনুষ্ঠান বাংলাদেশের শত্রু কবলিত এলাকার জনগোষ্ঠী ও ভারতে অবস্থানরত বাঙালি শরণার্থীদের মনোবল বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত সাড়া জাগানো ‘চরমপত্র’ অনুষ্ঠানের পরিচালক, লেখক ও কথক ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক, লেখক এবং কণ্ঠযোদ্ধা এম আর আখতার মুকুল। চরমপত্রের উচ্চারিত সেই কথন আজ আমাদের এক গৌরবগাথা কথন হিসেবেই ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে আছে নিঃসন্দেহে। চরমপত্রের তেমনি একটি নমুনা কথনে ফিরে দেখি একাত্তর!

"আঁতকা আমাগো ছক্কু মিয়া কইল, ভাইসাব আমার বুকটা ফাইট্যা খালি কান্দন আইতাছে। ডাইনা মুড়া চাইয়া দেহেন। ওইগুলা কী খাড়াইয়া রইছে। কী লজ্জা! কী লজ্জা! মাথাডা অ্যাংগেল কইরা তেরছি নজর মারতে দেহি কী, শও কয়েক মছুয়া অক্করে চাউয়ার বাপ-মানে কিনা দিগম্বর সাধু হইয়া খাড়াইয়া রইছে। ব্রিগেডিয়ার বশীর জিগাইল, ‘তুম লোগকো কাপড়া কিধার গিয়া?’ জবাব আইল—যশোরে শার্ট, মাগুরায় গেঞ্জি, গোয়ালন্দে ফুলপ্যান্ট আর আরিচায় আন্ডারওয়্যার থুইয়া বাকি রাস্তা খালি চিল্লাইতে চিল্লাইতে আইছি—‘হায় ইয়াহিয়া, ইয়ে তুমনে কেয়া কিয়া?—হামলোগ তো আভি নাংগা মছুয়া বন গিয়া।’

আঁতকা ঠাস ঠাস কইরা আওয়াজ হইল। ডরাইয়েন না, ডরাইয়েন না! মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী চুলে ভর্তি সিনা চাবড়াইতে শুরু করছে। ‘পদ্মা নদীর কূলে আমার নানা মরেছে, পদ্মা নদীর কূলে আমার নানি মরেছে—গাবুর বাড়ির চোটে আমার কাম সেরেছে।’  

ব্যস, মওলবি রাও ফরমান আলী জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল উথান্টের কাছে খবর পাডাইল, ‘হে প্রভু, তোমার দিলে যদি আমাগো লাইগ্যা কোনো রকম মহব্বত থাইক্যা থাকে, তা হইলে তুরনদ আমাগো কইয়া দাও; কীভাবে বিচ্চু আর হিন্দুস্তানি ফোর্সের পা জাপটাইয়া ধরলে আমার লেডুলেড়া আর ধ্বজভঙ্গ মার্কা বাকি সোলজারগো জানডা বাঁচানো সম্ভব হইব।’

এই খবর না পাইয়া একদিকে জেনারেল পিঁয়াজি আর একদিকে সেনাপতি ইয়াহিয়া কী রাগ? সেনাপতি ইয়াহিয়া লগে লগে উথান্টের কাছে টেলিগ্রাম করাল, ‘ভাই উথান্ট, ফরমাইন্যার মাথা খারাপ হওনের গতিকেই এই রকম কারবার করছে। হের টেলিগ্রামটা চাপিশ কইরা ফালাও।’ এই দিকে আমি ছ্যার শাহ নেওয়াজ ভুট্টোর ‘ডাউটফুল’ পোলা, পোংটা সরদার জুলফিকার আলী ভুট্টোরে মিছা কথা কওনের ওয়ার্ল্ড রেকর্ড করণের লাইগ্যা জাতিসংঘে পাডাইতাছি। পোলডারে একটুকু নজরে রাখবা। বেডার আবার সাদা চামড়ার কসবিগো লগে এথি-ওথি কারবার করণের খুবই খায়েশ রইছে।

সাবে কইছে কিসের ভাই, আহ্লাদের আর সীমা নাই। সেনাপতি ইয়াহিয়া খানের হবু ফরিন মিনিস্টার জুলফিকার আলী ভুট্টো ব্র্যাকেটে শপথ লওনের টাইম হয় নাইক্যা—ব্র্যাকেট শেষ জাতিসংঘে যাইয়া পয়লা রিপোর্টারগো লগে বেশ কায়দা কইরা লুকোচুরি খেলতে শুরু করল। তার-পর। জাতিসংঘের ডায়াসে আঁতকা কয়েক দফায় কান ধইরা ‘উঠ-বস’, ‘উঠ-বস’ কইরা ভুট্টো সাবে ছিল্লাইয়া কইল, ‘আর লাইফের এই রকম কাম করুম না। বঙ্গাল মুলুকে আমরা গেনজাম কইরা খুবই ভুল করছি। আমরা মাফ চাইতাছি, তোওবা করতাছি, কান ডলা খাইতাছি। আমাগো এইবারের মতো ক্ষেমা কইরা দেন।’

কিন্তু ভুট্টো সাব। বহুত, লেইট কইরা ফালাইছেন। এই সব ভোগাচ কথাবার্তায় আর কাম হইব না। আঁতকা ঠাস ঠাস কইরা আওয়াজ হইল। কী হইল? কী হইল? জাতিসংঘে ভেটো মাইরা সোভিয়েত রাশিয়া হগগল মিচকি শয়তানরে চিৎ কইরা ফালাইছে। কইছে, ফাইজলামির আর জায়গা পাও না? বাঙালি পোলাপান বিচ্চুরা যহন লাড়াইতে ধনা-ধন জিততাছে, তহন বুঝি লাড়াই বন্ধ করণের নানা কিসিমের ট্রিকস হইতাছে—না?" 

এছাড়া 'জল্লাদের দরবার' নামের অনুষ্ঠানটিও ব্যাপকভাবে সাড়া জাগানো একটি আয়োজন হিসেবে স্বীকৃত ইতিহাসের পাতায় I 'জল্লাদের দরবার’ ধারাবাহিক নাটকে হাস্যরসের মধ্যে দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে তার স্ত্রী ও সাঙ্গপাঙ্গদের আলাপ; এই ব্যতিক্রমধর্মী অনুষ্ঠান দুটি জনগণের কাছে বিপুলভাবে সমাদৃত হয়। এতে একইসঙ্গে ছিল তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ ও জাতীয়তা বোধের প্রকাশ যা জনগণের নৈতিক মনোবল দৃঢ়ীকরণে ও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। মুক্তিযুদ্ধকালীন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত জাগরণের গানগুলো ছিল যেন পরম এক জীবনী শক্তি! মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল অক্ষুণ্ণ রাখার ক্ষেত্রে এক মহামন্ত্র হিসেবে কাজ করেছেI শুধু তাই নয় ঐ গানগুলো বাঙালি জাতির সকল আনন্দ, বেদনায় কিংবা দুঃসময়ে এখনো প্রেরণা হয়েই প্রজ্জ্বলিত অবিরতI স্বাধীনতার ৫২ বছর পূর্তির এই লগ্নে সকল বীর শহীদ, বীরমাতা, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি মুক্তিযুদ্ধের সকল কণ্ঠযোদ্ধাদেরI 

“পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে
রক্ত লাল, রক্ত লাল, রক্ত লাল
জোয়ার এসেছে জন-সমুদ্রে
রক্ত লাল, রক্ত লাল, রক্ত লাল।” 
সুবর্ণজয়ন্তীর উচ্ছ্বাসে, আবেগে অবারিত ধারায় বাঙালির প্রতিঘরে বাঙালির প্রতি প্রাণ ভেসে যাক মুক্তিযুদ্ধের গানে গানে! 
(কথা: গোবিন্দ হালদার, সুর: সমর দাস)
তথ্যসূত্র : বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র এবং
বেলাল মোহাম্মদ রচিত গ্রন্থ ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র।' 

 

 

 

একাত্তরের ঘ্রাণ
কাজী ইসলাম

সুখের নয় রুনার দাম্পত্য জীবন।স্বামী মানতে পারে না রুনা বিয়ের আগে পরপুরুষের সঙ্গে একবার এক লেপের নিচে শুয়েছিল। আর রুনার অভিযোগ তার স্বামীটি কাপুরুষ, এদিকে আবার বড় সুবাসিত, বড় ম্রিয়মাণ চাহনি তার! তো রুনার স্বামীর অভিযোগের ব্যাপারটা একটু খতিয়ে দেখা যাক। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্রী রুনা। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে গ্রামের বাড়িতেই আছে। ৭১-এর নভেম্বরের শেষের দিকে শীত জেঁকে বসেছে। ওদিকে বোঝাই যাচ্ছে পাকিদের দিন শেষ হয়ে আসছে। দুজন মুক্তিযোদ্ধাকে রুনাদের বাসায় আশ্রয় দিলেন রুনার বাবা। ২৩-২৪ বছর হবে তাদের বয়স।বড়বড় চুল, মুখ ভর্তি দাড়ি, অবিন্যস্ত পরিচ্ছদের রুক্ষ্ম চেহারার দুই মূর্তি। তীক্ষ্ন চোখে জ্বলন্ত জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। আরো কয়েকজন গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রইল।বলেনি তারা কিছু, তবে মনে হলো এই দলটা কাছে কূলে কোথাও কোন অপারেশন করবে। শীতের রাত ১১টা মানে গ্রামে অনেক রাত। মা আবার রান্না করলেন ছেলে দুটোর জন্য। খাওয়া দাওয়ার পর পুকুরের ঘাটলায় যেয়ে হাতমুখ ধুয়ে এলো ছেলেটা। আরেক জন বোধহয় বিড়ি সিগারেট টানতে পুকুর পাড়েই রয়ে গিয়েছিল।

বাড়ির কুকুরগুলো হঠাৎ বিষম শোরগোল তুলে ডাকতে লাগলো। কাজের ছেলেটা দহলিজ থেকে দৌড়ে ভিতরে এলো, "খালু মেলেটারি আইছে গিরামে,আমগো বাড়ি ঘিরা ফালাইছে, কুত্তায় ধরছে অগো।" বেরোবার উপায় নেই।বাইরের ছেলেটা মনে হয় পুকুরঘাট থেকেই সটকে পড়েছে।ছেলেটার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। কি হবে এখন! হঠাৎ বাবা চাপা গলায় রুনাকে বললেন, "মা অরে তর ঘরে লইয়া যা, তর বিছানায় ল্যাপ গায় দিয়া অরে লইয়্যা শুইয়্যা পর।খানেগো কমু ওইডা আমার জামাই।জলদি যা মা।” ছেলেটাকে বলল, “বাবা তুমি ওর লগে যাও।” 

দৌড়ে ঘরে যায় রুনা। ছেলেটাও যায় ওর পেছনে পেছনে, অনেকটা ভীত, দ্বিধান্বিত পায়ে। সঙ্গে নিজের এবং সঙ্গীর  হাতিয়ার দুটি নিতে ভোলে না। দ্রূত বিছানায় গিয়ে লেপ মেলে গায়ে দেয় রুনা। "জলদি আসেন লেপের ভিতর।" ছেলেটাকে বলে রুনা। গলা পর্যন্ত লেপ টেনে নেয় দুজনে। রাইফেল দুটিও লেপের মধ্যে। এতক্ষণে কুকুর সামলে পাকি সেনারা ভিতর আঙিনায় ঢুকেছে। বুটের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। ভারি গলায় উর্দ্দুতে কি সব বলছে। বাবার গলাও শোনা যাচ্ছে। বুটের শব্দ এবার বারান্দায় উঠলো। এক সময় রুনাদের দরজার বাইরে থামলো সে শব্দ। বাবার কাঁপা গলা, "বেটি দামাদ হ্যায় ঘরমে স্যার। শো গ্যায়া হোগা।” 

ধমকের স্বরে কে যেন হুকুম দিলো, "খোলনে বোলো দরবাজা।” 

ঘরের মধ্যে মৃদু হারিকেনের আলোয় আঁধারই বেশি। দরোজা ভেজানোই ছিল। বাবা বললেন, "মা রুনা, তরা কি ঘুমাইয়া পড়ছস?" 

"না বাবা, কি হইসে?” রুনা বলে। "মিলিটারি স্যারেরা আইসে, তগো দেখবার চায়।"

"দরোজা খোলাই আছে বাবা"-বলে রুনা। বাবা আস্তে করে ভেজানো দরজা খোলেন। এক পা ঘরের ভিতরে দিয়ে একজন বয়েসী সেপাহী জোরালো টর্চ জ্বালে। বিছানার ওপর আলো ফেলে কয়েক লহমা স্থির রাখে। দেখে স্বামী-স্ত্রী কে, তারপর ঘরের ভিতর চারিদিকে আলো ফেলে দেখে নেয়। “ঠিক হ্যায়, শো রাহো"-বলে বেরিয়ে যায় সৈন্যটা। আটকে  রাখা নিঃশ্বাসটা এবার আস্তে আস্তে ছাড়ে রুনা। আবার শ্বাস নিতে যেয়ে গন্ধটা পায়। কদিনের স্নানহীন দেহের একটা বুনো পুরুষালি গন্ধ। রুনা টের পায় লেপের মধ্যে ছেলেটার ভীতি।হৃৎপিণ্ডের ধকধক শব্দও মনে হয় শোনা যায়। বড়মায়া লাগে রুনার,আহা ছেলেটা জীবনকে তুচ্ছ করে দেশের মুক্তির জন্য যুদ্ধে নেমেছে, কোন সে মায়ের স্নেহের বাঁধন ছিন্ন করে! সেই মা হয়তো প্রহর জেগে দুয়ারে বসে আছে ছেলের পথ চেয়ে! রুনার খুব ইচ্ছা করে মায়ের মমতা নিয়ে জড়িয়ে ধরে ছেলেটিকে ভোলায়, শিশুর মত করে আগলে রাখে। রুনা আস্তে হাত রাখে ছেলেটার বুকে ঠিক হৃৎপিণ্ডের ওপর, ফিসফিসিয়ে বলে, "ভয় পাবেন না। ওরা চলে যাবে।” ছেলেটা মনে হয় আশ্বস্ত হয় একটু, চুপচাপ শুয়ে থাকে। 

দুজনের দেহের উত্তাপে লেপের নিচে ওম। জীবনের উষ্ণতা।বাইরে মৃত্যুর মত শীতল হিম! ছেলেটার অস্নাত শরীরের বুনো পুরুষালি গন্ধটা লেপের ওমে মিশে থাকে। নিঃশব্দে শুয়ে থাকে দুজন। নড়াচড়া করতেও যেন ভয় লাগে, খানেরা আবার চলে না আসে!

সময় যেন আর কাটে না। হারিকেনের কেরোসিন বোধহয় শেষ। কয়েকবার দপদপ করে নিভে যায় শিখাটা। নিকষ আঁধার ঘনতর হয়। বাইরে মাঝেমাঝে কুকুরের ডাক। কাছের ছাতিমগাছে একটা হুতুম পেঁচা বুকের ভিতর অমঙ্গলের কাঁপন তুলে ডাকে। মানুষের অস্পষ্ট কথা শোনা যায়। দূরে কিছু আর্তনাদের মত শব্দ। ঘন্টাখানেক পর রুনার বাবা আসেন রুনার ঘরে। কয়েক বছর বয়স যেন বেড়ে গেছে উনার এই কয় ঘন্টাতেই। ঘর থেকে বেরুতে বেরুতে রুনার কি আবছা মনে হয়, লেপের নিচের সময়টা আরেকটু দীর্ঘ হলে ভালো হতো!  ভীতি, আতঙ্ক আর তুমুল উদ্বেগ সত্বেও! রমণীর মন, অতলান্ত রহস্যময়, রমণীর চোখের মতই!

সাব্যস্ত হয় ছেলেটা রাত্রেই গ্রাম ছেড়ে যাবে। খানেরা বিভিন্ন বাড়ি থেকে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে বন্দী করে জীপ ও ট্রাক নিয়ে সদরে চলে গেছে।যাবার সময় দ্রূতই চলে যায় ছেলেটা কিছু না বলেই! একবার শুধু তাকিয়েছিল রুনার চোখের দিকে,এক ঝলক।

বিয়ের পরে গর্বের সঙ্গে রুনাই গল্পটা করেছিল স্বামীর কাছে। সেটাই কাল হয়েছিল।স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ ‘৭১ কে ধারণ করতে পারেনি। রুনার স্বামীও পারেনি রুনার পুরুষকারের তেজস্বীতা ধারণ করতে। দেশ স্বাধীন হলো কত মায়ের কোল খালি করে। ছেলেটার কোন খবর আর কোনদিন পাওয়া যায় নি। রুনার স্মৃতিতে থেকে গেছে ছেলেটা। বিজয় দিবস,স্বাধীনতা দিবস এইসব দিনে ছেলেটার কথা বেশি করে মনে পড়ে রুনার। সেই জ্বলজ্বলে  চোখ, কদিনের স্নানহীন শরীরের বুনো আদিম ঘ্রাণ, একটু ছোঁয়ার বিদ্যুত তরঙ্গের অনুভূতি!  আহ্, ছেলেটা বোধহয় মরেই গেছে, বেঁচে থাকলে কি একবারও আসতো না দেখা করতে! নিশ্চয়ই বেঁচে নেই! 

স্বাধীনতার পর, সব কিছুই আগের মত আবার। শুধু কিছু মায়ের চোখের জল শুকায় না, কিছু বাবার পাঁজর ভাঙা দীর্ঘশ্বাস থামেনা, কিছু ভাইয়ের হাহাকার চরাচর চৌচির করে দেয়, কিছু বোনের ক্রন্দন আর বিলাপ বিষাদের সুর হয়ে বাতাস ভারী করে।

অনার্স পাশ করেই বিয়ে হয় রুনার। প্রথমেই মন ভাঙে।বাসর রাতে স্বামীকে জিজ্ঞেস করে, "তুমি মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলে?” আমতা আমতা করে স্বামী, "না মানে মা যেতে দেয় নি।” মা যেতে দেয় নি- শুনে খিলখিল করে হাসতে গিয়ে নিজেকে সামলে নেয় রুনা। সরাসরি দেখে স্বামীকে। সুবেশ,পরিচ্ছন্ন পোষাক। চোখের দিকে তাকায়, কই এ চোখ তো জ্বলজ্বল করে জ্বলেনা!  দাম্পত্যের শুরুতে আকুল হয়ে খোঁজে রুনা, তপ্ত একটি দেহ, সেই দেহে আদিম বুনো পুরুষালি গন্ধ! নাহ্! কিছুই মেলে না, এ এক ম্রিয়মাণ দৃষ্টির পুরুষ,গায়ে দামি সুগন্ধির সুবাস! সিঁটিয়ে যায় রুনা।

কোথায় হারালো সেই ‘৭১- এর সবকিছু? সেই বাংলাদেশ, সেই জ্বলজ্বলে দৃষ্টির পুরুষেরা, সেই আদিম বুনো পুরুষালি ঘ্রাণ? '৭১-এ রুনার মত মেয়েরা স্বপ্নলোকের সেই সব অলৌকিক অতি মানবের মত পুরুষদের বাঁচাতে কুমারী হয়েও স্বামী সাজিয়ে লেপের নিচে আশ্রয় দিয়েছিল। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশে সেইসব পুরুষেরা হারিয়েই গেল, একাত্তরের বাংলাদেশের মত। 

রুনা সেই ‘৭১-এর স্মৃতির ঘ্রাণ বা ঘ্রাণের স্মৃতি নিয়ে আজো খুঁজে ফেরে বাংলাদেশের মৃত্তিকায়,জলে,বৃক্ষে- প্রকৃতিতে সেই ঘ্রাণ, ছেলেটার দেহ তো মিশে আছে এই মৃত্তিকায়, এই জলে, এই প্রকৃতিতেই! কোথাও!

 

 

 

সবুজের লাল পতাকা
লুনা রাহনুমা


সারাটাদিন ঝকঝকে আলো বিলিয়ে বলা কওয়া ছাড়াই ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে আসে কান্দিপাড়া গ্রামে। সরল সাধারণ মানুষগুলোর নিত্যকার জীবন উল্টেপাল্টে দিয়ে পুরো দেশটাতে যুদ্ধ বেঁধেছে। প্রথম প্রথম সবাই মনে করেছিল হয়তো কিছুদিন পরেই সব আবার আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে যাবে। সবাই আবার আগের মতোই প্রাণ ভরে বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নেবে। কিন্তু মাসের পর মাস পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকল। ঘরের নানা বয়সী ছেলেরা বেশির ভাগই যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে চলে গিয়েছে। এখনো যারা পরিবারের মায়া ছাড়তে পারেনি তারা ঘরে থাকলেও দিনের বেশিরভাগ সময়টুকু তারা নিজের ঘরেই ভয়েভয়ে আড়ালে আবডালে লুকিয়ে থাকে। মানুষজন প্রকাশ্যে হাঁটা চলা করতে আতঙ্কবোধ করে। কেউ শব্দ করে হাসে না। জোরে কথা বলে না। চিৎকার করে ডাকে না আর মানুষ মানুষকে।

-ময়না! ময়না!

-আস্তে কথা কন। বাইরে আন্ধাইর। কোনখানে কেডা বইয়া রইছে কে জানে?

-আস্তেই তো ডাকছি। তোমারে গলা ফাটাইয়া না ডাকলে আমার মনডা ভরে না।

-তবুও, বেশি শব্দ কইরেন না। আমার খুব ডর লাগে।

-ডর পাইয়া লাভ নাই বৌ। আমি সিদ্ধান্ত নিছি এমুন কইরা আর লুকাইয়া থাকুম না।

-কী করবেন?

-আমি যুদ্ধে যামু। বাঁচলে সবার লগেই বাঁচমু। আর বেবাকের লগে দেশের জন্য যুদ্ধ করতে গিয়া যদি মইরা যাই তাইলেও আমার কোনো দুঃখ থাকব না মনে।

ময়না আর সবুজের ঘরে টিমটিম করে জ্বলছে একটি হারিকেন। যুদ্ধের বাজারে এখন সবকিছুরই দাম সাংঘাতিক চড়া। দাম বেশি দিয়েও জিনিসপত্র পাওয়া যায় না সবসময়। ঘরে কেরোসিন তেল সামান্য যেটুকু আছে ময়না সেটুকু যতখানি পারে বাঁচিয়ে রাখতে চেষ্টা করছে। আর কিছুদিন পর হয়তো রাতের বেলা আকাশের চাঁদ তারার উপরই ভরসা করে থাকতে হবে তাদেরকে।

-আপনি যদি বাড়িতে না থাকেন, আমি কেমনে থাকুম এই শরীরে? আমার তো আর বেশিদিন নাই। আপনি বাচ্চাডারে দেইখ্যা তারপরে যান না হয়!

-তোমার থিকা আমার বেশি চিন্তা আছে ময়না। তুমি আর এই গেরামে থাকতে পারবা না। গ্রামে রাজাকারগুলার উৎপাত খুব বাইড়া গেছে। তোমারে তোমার মার বাড়িতে দিয়া আমি জাহাঙ্গীরের দলে যোগ দিমু।

সাতমাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে রেখে যেতে সবুজের খুব কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু উপায় নেই। পাকিস্তানী মিলিটারিদের একটা শিক্ষা দিতেই হবে এইবার। সবুজের লুঙ্গির গিঁটের ভেতর যত্ন করে পেঁচানো আছে ময়নার চুলের এক টুকরো ফিতা আর ওদের অনাগত প্রথম সন্তানের জন্য খুব শখ করে কেনা একটি লাল নিমা।

 বিদায় নেবার সময় ময়না শাড়ির আঁচলে চোখের পানি মুছে বাচ্চার জন্য কেনা প্রথম কাপড়- নিমাটি সবুজের হাতে দিয়ে বলে, আপনি আমার মাথা ছুঁইয়া কথা দেন, আবুদের গতরে এই নিমা আপনি নিজে আইস্যা পড়াইবেন!

 অবুঝ ময়নার মাথায় হাত রেখে কথা দিয়েছে সবুজ। যুদ্ধ যতদিনই চলুক, সে অবশ্যই বাচ্চা হবার সময় হিসেব করে একবার হলেও বাড়ি আসবে।

রাইফেল, গুলি, বোমা, বন্দুকের আওয়াজে, ভারী বুটের গমগমে শব্দে সবুজের মনের তলায় থেঁতলে যেতে থাকে জীবনের স্বপ্নগুলো। নিজের জীবনটাকে এখন আর নিজের একার জন্য মনে হয় না। মনে হয় এই শরীরটি খুব দামি। এটাকে দেশের কাজে লাগাতে হবে। দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে দেশের জন্য রক্ত ঝরানোই এখন সকল মুক্তিযোদ্ধার প্রাণের স্বপ্ন।

-সবুজ, কাইল রাইতে কই অপারেশন করছস তোরা?

-পাশের গেরামের একটা হাইস্কুলে পাকিস্তানী মিলিটারি ক্যাম্পে। পাঁচটা পাকিস্তানী মারছি। অল্পের জন্য বাইচ্যা আসছি আমি।

-ব্যাটারা খুব সেয়ানা। কান একদম শিয়ালের মতো খাড়া থাকে সক্কল সময়।

-তয় কি হইছে? আমরাও কম নাকি!

-খবর পাইছি তোগোর গেরামে মিলিটারি গেছিল? তুই খোঁজ নিছস পরিবারের সবাই কেমন আছে?

-আমাগো ঘর খালি। বাপ মায় বাঁইচ্যা নাই। বৌরে রাইখ্যা আইছি হের বাপের বাড়িতে। অনেক দূরের গেরাম।

-আমার বইনডারে রাজাকারেরা পাকিস্তানিগো কাছে নিয়ে গেছে। আমার বইনেও অনেক দূরে জঙ্গলের ভিতরে গিয়া লুকায়া আছিল। সেইখান থিকা খুইজা ধইরা নিয়ে গেছে ওরে। মনে হয় রাজাকারের বাচ্চাডারে যদি একবার পাইতাম হাতের মইধ্যে!

রাগের চোটে চোখে পানি চলে আসে সহযোদ্ধা সুবীরের। তবুও কিছুই থেমে থাকে না। যুদ্ধের দামামার ভেতর জীবন বয়ে চলে খরস্রোতা নদীর মতো। অগভীর পানির জল আগের মতোই কুলকুল শব্দে টলটলে হাসে। কিন্তু এখন সরলা নদীর গায়ে পায়ে কোথাও কোথাও আলতার মতো রং ভাসে। আগে এমন গুলানো রং দেখা যেত বাঙালি মেয়েদের পায়ে, হাট থেকে কিনে আনা আলতার শিশিতে পাওয়া যায় যেসব রং। দেশের মাটি আর নদীর জলে এখন এখানে সেখানে তরল লাল রং দেখা যায়, সেগুলো তাজা রক্তের রং। সাথে পচে যাওয়া মৃতদেহের অসহ্য বোঁটকা গন্ধ!   

একদিন বিকেলে মুক্তিযোদ্ধাদলের কমান্ডার পলাশ এসে বলল, সবাই তৈরি হয়া নাও। খবর আসছে আমাগো এই গেরামের পাশ দিয়া আইজ রাইতে একটা মিলিটারি ভ্যান যাইব। মিলিটারিগুলারে মাইরা ভ্যানটা নিতে অইবো আমাগো। ভ্যানের ভিতরে অনেক অস্ত্র-সস্ত্রও থাকার কথা।

-শহরের দিকে যাইতাছে তারা। দেশের সব মিলিটারিরা এখন ঢাকার দিকে ছুটতাছে। মনে হয় খুব বড় কোনো অপারেশনের প্রস্তুতি নিতাছে শয়তানের দল, সুবীর বলে।

 -তাইলে তো আমাগো সবাইরে অহন ঢাকাতেই যাওন দরকার, উত্তেজিত হয়ে বলে জয়নাল।

-মনে অইতাছে দেশটা এইবার স্বাধীন হয়া যাইব। নিজের একটা দেশ পামু। নিজের ভাষায় কথা কমু। নিজের আয় রোজগার নিজের জন্য খরচ করমু, হাততালি দিয়ে ওঠে কালাম।

সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে যখন, সাথে হালকা কুয়াশাও নেমে এলো চারপাশে। ডিসেম্বরের শুরুর সময় এখন। হালকা শীত বাতাসে। গরমের দেশে বছরের এই সময়টা সবার কাছে খুব আরামের। সবুজদের মুক্তিবাহিনীতে টানটান উত্তেজনা। ওদের রক্তে টগবগ করে ফুটছে পাকিস্তানিদের কাছ থেকে নিজের দেশকে ছিনিয়ে নেওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। গ্রামের পাশে যে পাকা সড়কটি আছে সেখানে রাস্তার দুইধারে মুক্তিবাহিনীর গোটা চৌদ্দ সাহসী সৈনিক ঝোপঝাড়ের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ওঁৎ পেতে আছে। মিলিটারির গাড়ির শব্দ পেলে ওরা কমান্ডারের নির্দেশে ঝাঁপিয়ে পড়বে। পাকিস্তানী মিলিটারিগুলোকে মেরে ওদের গাড়িটি নিয়ে নিতে হবে। এই গাড়িতে করেই তারা আগামী সপ্তাহে ঢাকা যাবে। অন্ধকারে মশার কামড় গায়ে হুল ফোটাচ্ছে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশা বেড়ে ঠান্ডাও পড়েছে খুব। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের কারো ভ্রূক্ষেপ নেই তাতে। সবাই প্রস্তুত। নেতার দিকে ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছে সবাই একটু পরপর।

অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে থাকার পর অবশেষে মনে হলো পাকা রাস্তার সুতো ধরে দূরে কোথাও মৃদু কাঁপন অনুভূত হচ্ছে। চাকার ক্ষীণ শব্দ শোনা যাচ্ছে অন্ধকারের অদেখা গহ্ববরের অন্তস্থল থেকে। ধীরে ধীরে অনেকদূর থেকে গাড়ির হেডলাইটের আলো ফুটে উঠছে। ক্রমান্বয়ে শব্দ, আলো, আর মিলিটারিবহনকারী গাড়িটি স্পষ্ট হতে লাগল। অপেক্ষায় থাকা মুক্তিবাহিনীর ছেলেগুলো রাস্তার দুইপাশ থেকে দুইটি পেট্রল ভরা ড্রাম ঠেলে রাস্তার মাঝখানে নিয়ে এলো। একজন ম্যাচের একটি কাঠি দিয়ে ড্রাম দুটিতে আগুন ধরিয়ে দিলো। পুরো রাস্তায় দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন। মিলিটারি গাড়িটি শুনশান নীরবতার বুক ফুঁড়ে হঠাৎ আগুন জ্বলে উঠতে দেখে কিছুটা ভড়কে গিয়েছিল। গাড়ির গতি কমিয়ে ফেলেছে মিলিটারি ড্রাইভার। সেই সুযোগে মুক্তিবাহিনীর চারটি ছেলে লাফিয়ে উঠে গেল গাড়ির ছাদে। বন্দুকের হাতলের কাঠ দিয়ে, হাতে করে আনা ইট দিয়ে বাড়ি মেরে মেরে গাড়ির কাঁচ ভেঙে ফেলল মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা। মিলিটারিরা গাড়ি থামায়। তারাও এখন যুদ্ধ করতে প্রস্তুত। পিছিয়ে পড়া মুক্তিবাহিনীর বাকি ছেলেরা ততক্ষণে পৌঁছে গেছে গাড়ির কাছে।

কমান্ডারের নির্দেশে সুবীর সামনে আর পেছনে জয়নাল ও সবুজ গুলি করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে গাড়ির কাছে। শবে-বরাত অথবা ঈদের আগে, কিংবা দিওয়ালি আর বিসর্জনের রাত্রিতে যতরকম আলোকসজ্জা আতশবাজির খেলা দেখা যেত একসময়, আজ রাতেও কুয়াশামাখা অন্ধকারে ছিটকে ছিটকে অনেকটা তেমনই আলোর বিচ্ছুরণ ঘটাচ্ছে বাঙালি আর পাকিস্তানিদের বন্দুক ও রাইফেলের আগুন। আচমকা কানে আসে উর্দু ভাষায় বুক হিম করা আর্তনাদ। বাংলা ভাষায় মৃত্যু চিৎকার। কিন্তু কী উর্দু, কী বাংলা- কেউ থামে না। ইতিহাসের নিয়ম অনুযায়ী আবারো বৃহৎ জয়ের জন্য মানবপ্রাণ বিসর্জন ক্ষুদ্র বলেই বিবেচিত হয় যুদ্ধক্ষেত্রে। এইসময় সবুজের একহাত সামনে জয়নাল বুকে হাত দিয়ে মাটিতে পড়ে গেল। সবুজ থেমে যায়। ফিসফিস করে ডাকে, জয়নাল, ওই জয়নাল। কিরে তোর গুলি লাগছে নাকি?

রক্তে ভেজা হাতটি বুকের উপর থেকে চোখের সামনে আনে জয়নাল। বলল, মনে অয় গুলি লাগছেরে। তুই যা। একটারেও পলাইতে দিবি না এইখান থিকা। মিলিটারির গাড়িও নিবি আর তাগোর সবগুলার জানও নিবি।

হাঁপাতে থাকে জয়নাল। কথা বলছে না আর। জয়নালের মৃতদেহটিকে টেনে নিতে নিতে সবুজের কাঁধ থেকে ওর রাইফেলটি ফস্কে রাস্তার পাশে খাদের দিকে গড়িয়ে চলে গেল। অন্ধকারে সেটিকে আর খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা বৃথা। কিন্তু সবুজ হাল ছাড়ল না। খালি হাতেই মোকাবেলা করবে সে।

সবুজ দ্রুত চিন্তা করছে। হাতে সময় কম। অন্ধকারে হামাগুড়ি দিয়ে আস্তে আস্তে করে মিলিটারির গাড়ির নিচে ঢুকে গেল। গাড়ির পেছনের চাকার ঠিক পাশেই বুট পরা একজোড়া পা নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছে। সবুজের হাতে এইমুহূর্তে কোনো অস্ত্র নেই। সবুজ চিন্তা করছে, আচমকা আক্রমণ করে লোকটাকে কোনোভাবে মাটিতে ফেলে দিতে পারলেই… কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে যখন দেখল আশেপাশে আর কোনো মিলিটারি নেই, তখন সবুজ নিঃশব্দে গাড়ির তলা থেকে বের হয়ে এক ধাক্কায় লোকটিকে রাস্তার উপর ফেলে দিলো। বা হাতে লোকটির টুটি চেপে ধরে সবুজ ডান হাতের কুনুই উঁচু করেছে, মেরে লোকটার নাক মুখ ফাটিয়ে দিতে যাবে এমন সময় পেছন থেকে একটা গুলি এসে লাগে সবুজের পিঠের মাঝখানে। কয়েক সেকেন্ড থমকে থাকে সবুজ। তারপর আবার গুলি। আবারো। শরীর ভেঙে রাস্তার উপর কাত হয়ে পড়ে সবুজের রক্তাক্ত শরীর। শার্টের বুক পকেটে আঙ্গুল ঢুকিয়ে সবুজ বের করে আনে নরম সুতোয় বোনা একেবারে নতুন ছোট্ট রঙিন নিমাটি।

কথা ছিল, সবুজ তার সন্তানের গায়ে নিজের হাতে পরাবে এই নিমা। কিন্তু এইমুহূর্তে ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসা চোখের দৃষ্টিতে সবুজের কাছে মনে হচ্ছে, গোটা দেশটিই সবুজ আর ময়নার প্রাণপ্রিয় সন্তান। তাই দেশের গায়েই পরিয়ে দিলো সবুজ তার হাতে ধরা রক্তমাখা নিমাটি। চিরতরে চোখ বন্ধ করার আগে শরীরের শেষ শক্তিটুকু একত্রিত করে মুক্তিযোদ্ধা সবুজ রক্তাক্ত লাল নিমাটি হাতে উঁচিয়ে ধরল। গলা ফাটিয়ে শেষবারের মতো চিৎকার করল, জয় বাংলা!

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন