https://www.prothomalony.com/
7523
literature
শুভদিন
ভজন দত্ত
মায়ের সংসারে শুভদিন এলে
রান্নাঘর থেকে উঠোন
পায়েসের সুগন্ধ ভরে যেত
মায়ের দেশে ছড়িয়ে পড়ত সুসংবাদ
এখন শুভদিন এলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত
শোরুমের ফ্রিজ থেকে কেনা হয় কেক
মা-হীন পৃথিবী কেক কেনো
আমরা সংসারের আদা-রসুন-পেঁয়াজ
কিনতে কিনতে লুকিয়ে মুছে রাখি
চোখের জল …।
রুবাইয়াত
টি এইচ মাহির
রুবাই-১
মর্মর পাতার ধ্বনি, ঝর্ণা সরোবরে পানি
তৃষাতুর কালকূট ছোটে ঠাঁয় স্থির কানি,
যে যার জীবনে ব্যস্ত,দায়িত্ব তাদের ন্যস্ত
জলের স্রোতে ভেসে যায় নম্র চিত্তখানি।
রুবাই-২
সত্য লুকিয়ে ফেলে সাদা কালো
ছায়া ঢেকে দেয় চাঁদের আলো।
দূত দিবে সেলাম, আলো পেলাম
মন্দকে গুঁড়িয়ে ডাক দেয় ভালো।
রুবাই-৩
ঢেউয়ের তোপে মাস্তুল ভাঙ্গে
ঘূর্ণিপাকে একলা নাবিক গাঙ্গে,
শান্ত জলে অশান্ত তুফান এ কি!
নিস্ফল বাঁধ, জল ছুঁয়েছে চাঙ্গে।
চতুর পুণ্যার্থী
সুশান্ত হালদার
যারা চতুর, পুণ্যার্থী
ঘুরে এসেছেন আজমীর, শাহ জালাল পুণ্যভূমি
লটারি টিকেটে আজ তারাই মেট্রোরেলে কাশ্মীর গামি
আপেল রাঙা গালে অভ্যর্থনায়
জাহাজের ককপিটে মিশরীয় নারী
কে হে সীমানা লঙ্ঘনকারী?
মাত্রারিক্ত ভোজনে তুমিও কি দিব্য পুরুষ
নাকি লালসালু মজিদের আশ্রয় প্রশ্রয়কারী?
প্রশ্ন তবু থেকে যায়
আমার দেশে আমারই মা তবে কেন-
ধর্ষণ যোগ্য পটভূমি?
আনমনে
কোমল দাস
ততক্ষণে ফুলকলিদের সমস্ত অভিসন্ধি থেমে গেছে
অস্পষ্ট সীমান্তে গড়িয়ে গেছে অনুভূতির রঙ-
বেরঙের সমস্ত ব্যকুলতা
তৃষ্ণার্ত অনুক্ষণে পিপাসার জ্বালা নিবারিত হয়েছে অভিমানে,
অথচ স্বস্তি মেলেনি এতটুকু,মেলেনি বিন্দুমাত্র জ্বালা।
জীবনের সন্ধ্যে ঘনিয়েছে বারান্দায়
ধূসর দৃষ্টিতে যতটুকু বোঝা যায়, তাতে-
ছবি আঁকলেও আঁকা যায়না স্বপ্ন।
কয়রার মেলায় ভিড় জমিয়েছে বাহারি রঙ্গের পুতুল
উদাসী হাওয়ায় নিজেকে অতিকায় বিকিয়ে নিয়েছে বক্রতার
ঝঞ্ঝাটেরা, তবু-
সারাক্ষণ তারা বিনে সুতায় মালা গাঁথে
আর আমার মতই আনমনে গেয়ে চলে সুখ সারি
গান পালা।
নীল অ্যাকুরিয়ামের ভেতর থেকে
আবির হাসান
নীল অ্যাকুরিয়ামের ভেতর থেকে পৃথিবীকে নিজের
প্রতিপক্ষ মনে হয়
তাই জীবনের সমস্ত কিছু দিয়ে তার সাথে কম্পায়ার করি,
কিন্তু পৃথিবীর সমস্ত বস্তুর ভিন্নতা আমাকে অক্ষমতারই
কালাম হাদিয়া দেয়-
আকাশের রঙ ভিন্ন, প্রাণের ইলম ভিন্ন
আর সমস্ত বস্তুর কার্যক্ষমতা স্রষ্টার হাতে ভিন্ন ভিন্ন,
কিংবা অভিন্নতার অস্তিত্ব ভিন্ন-অথচ
আমার পুরো দেহ'ই নীল!
দৃষ্টি নীল, অশ্রু নীল, ভাবনা নীল, মৃত্যু নীল—
আমি কখনোই পৃথিবীর সাথে পেরে উঠতে পারিনা!
পৃথিবীকে নিজের প্রতিপক্ষ মনে করলেই
আমার ভাবনাগুলো নীল হয়ে মৃত্যুবরণ করে।
কবিতার মানুষ
জসীম উদ্দীন মুহম্মদ
---------------------
হাতের করপুটে গোনে রাখি নিষিদ্ধ হাত
তবুও সকিনার বেলোয়ারি চুড়ি কথা বলে
সারাদিন কেবল এটা নাই... ওটা নাই
তবুও গরলে-সরলে একসাথেই পথ চলে!
ওজনদরে যদি সবকিছুই বেচা-বিক্রি হয়
তবে খুনসুটি, ঝগড়াঝাটি ওদের কী দোষ
সকিনা আমাকে এতো এতো ভালোবাসে
তবু্ও নুন না থাকলে হঠাৎ করেই বেহুশ!
তখন সকি কেবল বুঝে না, বুঝতে চায় না
আমি কিছু না, নগণ্য কবিতা লেখা মানুষ।
অপেক্ষা আছে বলেই
জহিরুল হক বিদ্যুৎ
অপেক্ষা আছে বলেই কবিতারা এখনো
বিষণ্ণতার শিকল ভেঙে চৈতন্যের গান গায়;
গোধূলি ঢলে পড়ে উন্মুখ রাতের বুকে
রাতের নিস্তব্ধতা শিশিরসিক্ত হয়ে ফিরে আসে
প্রতীক্ষিত ভোরের স্নিগ্ধতায়।
অপেক্ষা আছে বলেই
প্রকৃতি আসে বৈচিত্র্যের উন্নাসিক ডালি খুলে।
গ্রীষ্ম,বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত আসে
আসে বসন্ত বাহারি নানা ফুলে।
চোখের জানালায় এসে বসে স্বপ্নীল প্রজাপতি
কখনো সুখে, কখনো বা মৌন-বেদনায়।
অপেক্ষা আছে বলেই
কেউ বা পথ চেয়ে থাকে কারো জন্য,
অথবা তার জন্য অন্য কেউ
এমন তো হয়, সবাই প্রতীক্ষায় থাকে
অনন্ত এ প্রতীক্ষার কোনো দিগন্ত নেই।
জীবনের জটিল ব্যাকরণ
মনোয়ারা স্মৃতি
জানালায় হেমন্ত আমার, সাথে শিউলি, ছাতিম
আর কাশফুলেদের মাদকতা।
এমন দিনেও বৈশ্বিক দুর্ভিক্ষ হামলে পড়ে
কালবৈশাখীর মাতাল উৎসবে।
অবোধ্য সময় সূচনায়, দরোজায় দ্বিধার কপাট
ভেতরে থই থই দরিয়া।
চুরি করা সময়গুলো বোদলেয়ার, শঙ্খ ঘোষ,
জীবনান্দকে দেয়া হয় না আর
শরৎ, হেমন্ত, কিংবা বসন্ত কোনটাই যেনো
ভেতরের মানুষটাকে ছুঁতে পারে না।
টেবিল জুড়ে এখন জাতীয় প্রবৃদ্ধির চ্যাপ্টার উল্টানো
অর্থনীতির মোটা বই
তাবৎ দুনিয়াটা গিলে খাওয়া মানুষের হাহাকারে বিস্মিত
এই পৃথিবী।
চাল-ডালের হিসেব মেলানোর তড়িৎ প্রবাহে
জীবনের মেদুর চাওয়ারা স্তব্ধ
বিলাসিতার অবসর নেই আর জীবন জুড়ে জটিল
ব্যাকরণের ধুন্ধুমার।
আমি একা থাকি
সৈয়দ নূরুল আলম
সাদা রঙের একটা গাড়ি বাংলা মোটর হয়ে শাহবাগের দিকে দ্রুত ছুটে চলেছে, পিছনের সিটে হেলান দিয়ে বসে আছে পরমা। গাড়ির ভেতরে কড়া এসি থাকলেও, বাইরে তীব্র দাবদাহ, পুরো ঢাকা শহর পুড়ছে।
শাহবাগের মোড়ের কাছে আসতেই রাস্তার পাশে মাসুদকে দেখতে পায় পরমা। ড্রাইভারকে গাড়ি সাইড করতে বলে নিজেই নেমে পড়ে। এগিয়ে আসে মাসুদের দিকে। এই কাঠফাটা গরমে মোড়ের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করছে মাসুদ।
পরমা আজ একটা নীল শাড়ি পরেছে। সাথে একই রঙের ব্লাউজ, কপালের টিপ, হাতে কাচের চুড়ি। ওর বয়স ছয়চল্লিশ, কিন্তু দেখলে মনে হবে বত্রিশ। হালকা ছিপছিপে শরীর। একারণে হয়ত প্রকৃত বয়স বোঝা যায় না। ও যাবে টিএসসিতে একটা সাহিত্য অনুষ্ঠানে। ওখানে পরমা কবিতা পড়বে। অনুষ্ঠান পাঁচটায়, এখন বাজে চারটা কুড়ি। হাতে এখনও চল্লিশ মিনিট সময় আছে।
মাসুদের কাছে যেয়ে পরমা নরম স্বরে বলল, 'আমাকে চিনতে পেরেছ মাসুদ দা? আমি পরমা, গত বছর বইমেলায় দেখা হলো।'
চশমাটা মুখ থেকে নামিয়ে চশমার গ্লাস জামার হাতার গুটায় পরিষ্কার করে, উপর দিকে তাকাল মাসুদ। ভালো করে মুখটা দেখে তারপর বলল, 'ও হ্যাঁ। তুমি পরমা সুন্দরী তো? রামপুরা বাসা। শিক্ষামন্ত্রী তোমার কী রকম আত্মীয় হন না? ঠিক তো?'
পরমার মধ্যে একটা ভালো লাগা কাজ করতে লাগল। তার কি সৌভাগ্য! এত বড় মানুষটা তাকে মনে রেখেছে।
মাসুদ ইকবাল অনেক বড় লেখক। বই মেলায় ওঁর বই নিয়ে অনেক মাতামাতি হয়। তরুণ প্রজন্ম মাসুদ ইকবালের বই বলতে পাগল। বয়স ষাটের কাছে। বয়সের তুলনায় শরীরের বাঁধন এখনও শক্ত আছে।
পরমা ঢাকার শিল্পপতির, বনেদি পরিবারের মেয়ে। জন্মের পর থেকেই ঢাকায় ফ্ল্যাটে থেকে, গাড়িতে চড়ে বড় হয়েছে। ইদানিং প্রায়ই বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায় গল্প কবিতা লেখে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি গল্প-কবিতার বই বের হয়েছে তার। নিজে লেখক, তাই মাসুদের মূল্য পরমা বোঝে। মাসুদকে মনে মনে ওস্তাদ মানে পরমা। শুধু ওস্তাদ মানা নয়, অনেকের কাছে বলে, মাসুদ ইকবালের সাথে তার পরিচয় আছে। এই বলে একটু গর্ববোধও করে।
মাসুদের পরনে পাজামা-পাঞ্জাবি। চোখে কালো চশমা। মাথার চুল এলোমেলো। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। এই অবস্থাতেও মাসুদের চোখে আগুন। মাসুদ মানেই এক আগুনের নাম। তার সব লেখায় আগুনের ছাপ স্পষ্ট।
পরমা খেয়াল করে মাসুদের পেছনে একটা ব্যানারে বড় করে লেখা, 'বাংলা দেশের প্রতিভাবান তরুণ নির্মাতা শামীম শাহরিয়ারের চিকিৎসার জন্য দান করুন।'
ব্যানারের পাশে একটা টুল। তার ওপর একটা মেয়ে বসে আছে। মেয়েটির বয়স পনের ষোল হবে। গায়ের রং শ্যামলা, সূর্যের তাপে পুড়ে তামাটে দেখাচ্ছে, মাথায় লম্বাচুল, চোখ দুটো কালো এবং মায়াময়। পরনে একটা ছাপার শাড়ি। মুখটা মলিন। মেয়েটির কোলের ওপর একটা বাক্স, সেখানে রাস্তার মানুষ টাকা ফেলে যাচ্ছে।
মাসুদ মেয়েটিকে দেখিয়ে বলে, ও হল ময়না। গ্রামে থাকে। শামীম শাহরিয়ারের বোন লাগে। ভাইয়ের অসুখের সংবাদ শুনে ছুটে এসেছে।
পরমা, ময়না বিষয়ে কোনো কৌতুহল দেখাল না। পরমা জানতে চাইল, শামীম শাহরিয়ার এখন কোথায়? মাসুদ বলল, ‘ও এখন হলিফ্যামিলি হাসপাতালে আছে। ওর পাশে আজ কেউ নেই। গতকাল অবধি টাকাপয়সা যা জমেছিল তা দিয়ে ওষুধ আর খাবার কিনে দিয়ে এসেছি।’
একটু থেমে শ্বাস নিয়ে মাসুদ বলে, 'ওর প্রথম ছবিটা এখনও রিলিজ হয়নি, হলে হয়ত কিছু টাকা হাতে আসত। এলেই যখন, দশটা টাকা দিয়ে যাও।' লজ্জায় মাথা নীচু করে পরমা বলল, 'মাসুদদা। এমন করে বলছ কেন? আমি কি ওর কেউ ছিলাম না?'
বলেই পরমা কয়েক সেকেন্ড থামে, তারপর নরম স্বরে বলে, ‘মাসুদদা, আমি ইচ্ছে করলে দশ টাকা কেন, অনেক টাকাই দিতে পারি, কিন্তু দেব না। ওকে বলো, আমি একা আছি, ইচ্ছে করলে ও আমার ফ্ল্যাটে এসে থাকতে পারে। বললে না, ওর পাশে এখন কেউ নেই। বলো, আমি আছি।' একথা বলে, পরমা আর দেরি করল না। ছুটে গিয়ে নিজের গাড়িতে বসলো।
শামীম শাহরিয়ার, এই মানুষটার জন্য একদিন পরমা পাগল ছিল, তার জন্য তীব্র তাপদাহে পুড়েছে, কেঁদেছে, চিৎকার করেছে। সেই দিনগুলো আর কখনোই ফিরে পাবে না জেনেও, পরমা শামীম শাহরিয়ারের অপেক্ষায় থাকে।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন